মুজিব মাসুদ ও মিজান চৌধুরী    |    
প্রকাশ : ১৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০:০০ | অাপডেট: ১৪ মার্চ, ২০১৭ ০২:০৫:৩৮
তেলের দাম কমাতে বাধা দুই মন্ত্রণালয়ের দ্বন্দ্ব
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ভোক্তা * অর্থ বিভাগের প্রস্তাবে সায় নেই * মুনাফার পাহাড় গড়ছে বিপিসি
বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য স্থিতিশীল থাকবে এমন আভাসের পর দেশে জ্বালানির দাম কমছে না। অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, প্রকারভেদে ৫ থেকে ৮ শতাংশ মূল্য কমানো সম্ভব। এ হারে কমানোর পরও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের

(বিপিসি) বছরে মুনাফা থাকবে ১৮৫৪ কোটি টাকা। এর সুফল সর্বস্তরে পড়বে। মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে। ভিন্নমত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের। এই মুহূর্তে তেলের মূল্য কমানোর পক্ষে নয় মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ প্রস্তাবেও সম্মতি দেয়নি জ্বালানি মন্ত্রণালয়। খোদ অর্থমন্ত্রী একাধিকবার তেলের দাম কমানোর বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় বিষয়টি আমলেই নিচ্ছে না। দুই মন্ত্রণালয়ের দ্বন্দ্বের কারণে আপাতত জ্বালানি তেলের দাম কমছে না।

চলতি বছরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য স্থিতিশীল থাকবে এমন পূর্বাভাস দিয়েছে ব্লুমবার্গসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী তিনটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এসব সংস্থার মতে, ব্যারলপ্রতি ৫৫ থেকে ৬০ মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করবে তেলের দাম। এই আভাসের পর বিশ্বের অনেক দেশ দাম কমিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয় দাম কমানোর পক্ষে মত দিলে বিপক্ষে রয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সদ্যবিদায়ী সিনিয়র সচিব এবং বর্তমান এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বিকল্প পরিচালক মাহবুব আহমেদ ম্যানিলায় যাওয়ার আগে যুগান্তরকে বলেন, অর্থনীতির সুফলের জন্য জ্বালানি তেলের মূল্য কমানো দরকার। এ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে অর্থ বিভাগ থেকে একটি গবেষণা করা হয়। সেখানে দেখা গেছে, দাম কমানো হলেও মুনাফা কমবে না। এই প্রতিবেদন জমা দেয়ার আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মতামত পাওয়া যায়নি। পরে তা অর্থমন্ত্রীর কাছে দাখিল করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য কমানোর কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। এ ধরনের কোনো নির্দেশও দেয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় জ্বালানি তেলের মূল্য কমানো নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। এ সংক্রান্ত কোনো বিষয় আমাকে জানানো হয়নি।

জানা গেছে, চলতি বছর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ ৬০ ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে- এমন ভিত্তি ধরেই মূল্য সমন্বয় পর্যালোচনা করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এরপর জ্বালানি তেলের দাম প্রকারভেদে ৫ থেকে ৮ শতাংশ কমানোর পক্ষে মত দেয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ডিজেল ও কেরোসিনের লিটারপ্রতি ৮ শতাংশ দাম কমালে বিপিসির লাভ থাকবে ১ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। অকটেন ও পেট্রুলের দাম ৫ শতাংশ কমালেও মুনাফা থাকবে ২৪১ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী মূল্য কমানোর পরও এই ৪টি জ্বালানি পণ্যে বছরে বিপিসির লাভ থাকবে ১ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। সেখানে আরও বলা হয়, বিশেষ করে ডিজেল এবং কেরোসিনের দাম কমলে লাভের অংকে কোনো হেরফের হবে না। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে, ভর্তুকি কমবে। কৃষকরাও সুফল পাবে। অর্থ মন্ত্রণালয় তেলের আমদানির মূল্য পর্যালোচনা করে দেখেছে, কেরোসিন ও ডিজেলে ৮ শতাংশ এবং অকটেন ও পেট্রুলে ৫ শতাংশ মূল্য হ্রাস করা যেতে পারে। এতে বছর শেষে প্রতি লিটার অকটেনে মুনাফা থাকবে ৬.০৯ টাকা, কেরোসিনে ১০.৫৬ টাকা, জেট-এ-১ এ ৬.৯২ টাকা, ডিজেলে ৩.২২ টাকা ও পেট্রুলে ৫.০৮ টাকা এবং ফার্নেস অয়েলে ২.৬৪ টাকা। কারণ ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বিপিসি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জেট-এ-১, প্রতিলিটার ৫৬.০৮ টাকা, ডিজেল ৫৯.৬৪ টাকা এবং ফার্নেস অয়েল ৪৪.৬৬ টাকায় আমদানি করেছে। বর্তমান সরকারের নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি লিটার অকটেন ৮৯ টাকা, কেরোসিন ৬৫ টাকা, জেট-১-এ ৬৩ টাকা, ডিজেল ৬৫ টাকা, পেট্রুল ৮৬ টাকা ও ফার্নেস অয়েল বিক্রি করছে ৪২ টাকা।

মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হলে বর্তমান এই খাতে বছরে মুনাফা দাঁড়াবে ৭ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিজেলে লাভ হবে ৬ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, কেরোসিনে লাভ থাকবে ৫০১ কোটি টাকা, অকটেনে লাভ হবে ২১৯ কোটি টাকা ও পেট্রুলে হবে ২১৪ কোটি টাকা।

জানা গেছে, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদা হচ্ছে ৫৫ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদা ৩৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন, কেরোসিন আড়াই লাখ, অকটেন দেড় লাখ, এবং পেট্রুল ১ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশই যাচ্ছে পরিবহন খাতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাচ্ছে ২৬ শতাংশ, কৃষিতে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এসব খাতে মোট আমদানির ৪১ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল ব্যবহার হচ্ছে। তেলের দাম কমানো হলে চলতি বোরো মৌসুমে এবং পরিবহন খাতে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়ত। দাম না কমানোয় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বোরো চাষীসহ পরিবহন সংশ্লিষ্টরা চাপের মুখে পড়েছেন।

আন্তর্জাতিক বাজারে সোমবার প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম গেছে ৫১ দশমিক ৩৭ মার্কিন ডলার। ব্লুমবার্গের তথ্য মতে, ২০১৭ সালে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য কিছুটা স্থিতিশীল থাকবে। জ্বালানি তেলের মূল্য সংক্রান্ত বিশ্বের ৪০টি আগাম পর্যালোচনা বিশ্লেষণ করে ব্লুমবার্গ বলেছে, চলতি বছরে সম্ভাব্য তেলের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি হবে ৫৬ মার্কিন ডলার। তবে সৌদি আরব চেষ্টা করছে তা ৬০ থেকে ৭০ ডলার পর্যন্ত উঠানো। অপরদিকে গ্লফ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য মতে, চলতি বছরে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করবে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক তাদের পর্যালোচনায় বলেছে, ১৯৬৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিশ্ববাজারে তেলের গড় মূল্য ছিল ৪৮ দশমিক ২৪ মার্কিন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মাত্র ৮৩ দিনের জন্য এই মূল্য ৮১ শতাংশ কমেছিল। আন্তর্জাতিক এই দাতা সংস্থার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০১৭ সালে তেলের বিক্রির সম্ভাব্য গড় মূল্য হবে ৫৫ দশমিক ২০ মার্কিন ডলার।

সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয় করে ভারত ইতিমধ্যে ২২ থেকে ২৪ দফা জ্বালানি তেলের দাম কমিয়েছে। তেলের দাম সমন্বয় করেছে পাকিস্তান ও শ্রীলংকাও। পাকিস্তান শুধু তেলের মূল্য সমন্বয় করেনি। জনগণ কম মূল্যে বিদ্যুৎ বিল দিতে পারে তা নিশ্চিতও করেছে। শ্রীলংকা মূল্য সমন্বয়সহ ফুয়েল প্রাইজ ফরমুলা চালু করেছে। যাতে জনগণের কাছে অধিক স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়। পাশাপাশি উভয় দেশের কৃষক, অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকারীরা এর সুফল ভোগ করতে পারছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় গবেষণায় বলেছে, বাংলাদেশ মাত্র একবার জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করেছে। এই মূল্য কমানোর পর দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৬ দশমিক ৫৫ থেকে ৭ দশমিক ১১ শতাংশ, রফতানি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩৯ থেকে ৯.৭৭ শতাংশ, মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস পেয়ে ৭ থেকে ৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ হয়েছে। পুনরায় তেলের মূল্য কমানো হলে উল্লিখিত খাতসহ অর্থনীতির অন্য খাতগুলো সুফল পাবে মর্মে প্রতীয়মান হয়।

অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফার্নেস অয়েলের দামের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এর ব্যবহার থাকায় বিদ্যুতের দাম কম-বেশি বিষয়টি জড়িত। আন্তর্জাতিক বাজার দর অনুযায়ী প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ৪৪ দশমিক ৬৬ টাকা। ইআরএল কস্ট বিবেচনায় প্রকৃত মূল্য হচ্ছে ৩৯ দশমিক ৩৬ টাকা। এর আগে ৩০ শতাংশ মূল্য কমানোর ফলে এর সুফল ভোগ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পেয়েছে। মূল্য কমানোর পরও বর্তমান প্রতি লিটারে সরকারের মুনাফা হচ্ছে ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জ্বালানি তেলের সঙ্গে সিংহভাগ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন জড়িত। এদের মধ্যে অনেকে দরিদ্র, মধ্যবিত্ত ও গ্রামাঞ্চলের বসবাসকারী আছেন। এক্ষেত্রে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য হ্রাস করা হলে এসব জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ উপকৃত হবে। এছাড়া বিদ্যুৎ খাত বিশেষ করে ইন্ডিপেন্ডেট পাওয়ার প্লান্ট, রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট এবং কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টে ডিজেল ব্যবহার হচ্ছে। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ প্লান্টের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। ফলে ডিজেলের দাম কমলেও উৎপাদন ব্যয় ও সরকারের দেয়া ভর্তুকি কমবে। সুফল পাবে কৃষিতে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহারকারী কৃষক। এ বিবেচনায় ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৮ শতাংশ কমানো যেতে পারে।


 
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by