যুগান্তর রিপোর্ট    |    
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০:০০
বিআইবিএমের কর্মশালায় বক্তারা
দুর্নীতিবাজ শীর্ষ কর্মকর্তাদের হাতে ব্যাংকিং খাত শেষ
হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, বেসিকসহ ব্যাংকিং খাতে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার ইচ্ছা থাকলেও ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ তা করতে পারেনি। শীর্ষ মহলের যোগসাজশে এমনটি হয়েছে বলে মনে করেন ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা। এছাড়া তদবিরের চাপে রয়েছে দেশের অর্থনীতির বড় এ খাত। খাতটিতে তদবির ছাড়া এখন আর কোনো নিয়োগ হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের ভেতরে লবিস্টদের জন্য পদও সৃষ্টি করতে হচ্ছে। বাস্তবতা হল- ব্যাংকিং খাতে এখন নৈতিকতা কাগজে-কলমে আছে, বাস্তবে নেই। মোদ্দাকথা, এক শ্রেণীর প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ শীর্ষ কর্মকর্তাদের হাতে আজ ব্যাংকিং খাত শেষ হওয়ার পথে। এদের কারণে মাত্র ৩ বছরের মাথায় এক সময়ের শ্রেষ্ঠ ব্যাংক হিসেবে পরিচিত বেসিক ব্যাংক শেষ হয়ে গেছে। মূলত শুরু থেকেই দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতা অপব্যবহারকারী কর্মকর্তাদের শাস্তি না হওয়ায় আজ ব্যাংকিং খাতের এ পরিণতি দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত এক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। কর্মশালার প্রথম পর্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান ও শেষ পর্বে সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন।
বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে কর্মশালায় অন্যদের মধ্যে সাবেক ব্যাংকার এম. এহসানুল হক, পূবালী ব্যাংকের সাবেক এমডি ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমেদ চৌধুরী, সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলী ও ওয়ান ব্যাংকের অতিরিক্ত উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) জন সরকার বক্তব্য রাখেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের দল। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতের শ্রেষ্ঠ ব্যাংক ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। কিন্তু দুর্নীতিবাজ শীর্ষ কর্মকর্তাদের কারণে মাত্র ৩ বছরেই ব্যাংকটি শেষ হয়ে গেছে। সোনালী এবং বেসিক ব্যাংকের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এসব ব্যাংকের সাবেক দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের মতো বর্তমানে কাউকে নিয়োগ দিলে তিনি ভালো ব্যাংককেও শেষ করে দেবেন। ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ব্যাংকের লভ্যাংশ সবার মাঝে ভাগ করে দেয়া উচিত। কিন্তু ইতিমধ্যে ব্যাংকের মালিকরা শেয়ার নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে ধরনা দিয়েছেন। সরকারি ব্যাংকের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, পয়সা চুরি করে সাধারণ মানুষের করের টাকা দিয়ে মূলধন ঘাটতি পূরণ করা হয়। অথচ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় না। তিনি বলেন, আগে ৬ মাসব্যাপাী বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। এখন সেটা ১৫ দিনে নামিয়ে আনা হয়েছে। তার মতে, ১৫ দিনে কোনো বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ হতে পারে না। ব্যাংকিং খাতে কাগজে-কলমে নৈতিকতা থাকলেও বাস্তবে এর কোনো চর্চা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বলেন, অনভিজ্ঞতার ভিড়ে দক্ষ কর্মকর্তার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে নতুন নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের পরিসর ও আকার বেড়েছে। কিন্তু দক্ষ কর্মকর্তার সংকট কাটেনি। প্রতিবছরই অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ উঠছে। তাই ব্যাংক কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকে অনেক লবিস্ট রয়েছেন। এদের কারণে অনেক নতুন পদ সৃষ্টি করতে হয়। যা পুরোপুরি ইচ্ছার বিরুদ্ধে। মূলত সব ব্যাংকেই লবিস্ট গোষ্ঠী থাকে। তারা লবিং করে নিয়োগ দিতে চান। বিভিন্ন পরিচালকের বরাত দিয়ে এরা এসব তদবির নিয়ে আসেন।
বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলী বলেন, ব্যাংকে নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। অসৎ কর্মকর্তা নিয়োগ পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে সবাইকে নৈতিকতা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম এহসানুল হক বলেন, ব্যাংকিং খাত তদবিরের চাপে রয়েছে। এত তদবির আসে যে, অনেক সময় সঠিক নিয়োগ দেয়া কঠিন হয়ে যায়। তিনি বলেন, মানব সম্পদের সঠিক নীতিমালা কোনো ব্যাংকে নেই। যদি কারও থেকে থাকে, তারও সঠিক চর্চা হয় না। দীর্ঘ ব্যাংকিংয়ের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রাম পর্যায়ের শাখা ব্যবস্থাপকদের ব্যাপক স্বেচ্ছাচারিতা লক্ষ্য করা যায়। একদিকে গ্রাহক, অন্যদিকে নিন্মপর্যায়ের কর্মকর্তা; সবার সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেন শাখা ব্যবস্থাপক। কেউ কেউ নিজেকে রাজা মনে করেন। এগুলো বন্ধ করতে হবে।
ওয়ান ব্যাংকের অতিরিক্ত উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) জন সরকার বলেন, দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে জনবল নিয়োগে পারিবারিক ঐতিহ্য খতিয়ে দেখতে হবে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য কমাতে হবে।


  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by