সংসদ রিপোর্টার    |    
প্রকাশ : ২০ জুন, ২০১৭ ০০:০০:০০
এমপিদের তোপের মুখে অর্থমন্ত্রী
কার পরামর্শে নির্বাচন বিরোধী বাজেট?
‘আপনার বয়স হয়ে গেছে, কখন কী বলে ফেলেন, হুঁশ থাকে না।’ * ব্যাংক লুটপাটের তদন্ত না করে এক হাজার কোটি টাকা মূলধন বরাদ্দের তীব্র সমালোচনা
জাতীয় সংসদে ফের নিজ দলের সংসদ সদস্যদের (এমপি) তোপের মুখে পড়লেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা তাকে কথা কম বলার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, ‘একগুঁয়েমি বাদ দেন’। ব্যাংক হিসাবে লেনদেনের ওপর আরোপিত আবগারি শুল্ক কমান। জনগণের ওপর থেকে করের মাত্রা কমান। ‘এ বাজেট নির্বাচনী বাজেট নয়’- অর্থমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে তারা আরও বলেন, কার পরামর্শে, আর কেন-ই বা অর্থমন্ত্রী নির্বাচনবিরোধী বাজেট দিলেন। যেখানে এবার নির্বাচনমুখী একটি বাজেট দেয়া ছিল অত্যন্ত জরুরি।
সোমবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এসব কথা বলেন। এদিন প্রথমে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং পরে ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে অধিবেশন চলে।
প্রসঙ্গত, ‘সরকার নির্বাচনমুখী, বাজেট নির্বাচনবিরোধী’- বিশ্লেষকদের এমন উদ্ধৃতি দিয়ে বাজেট ঘোষণার পরদিন যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছিল একটি বিশেষ প্রতিবেদন। বাজেট আলোচনায় সরকারি দলের এমপিদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রতিবেদনটির সত্যতা প্রমাণিত হল।
এদিকে সোমবার বাজেট আলোচনায় অংশ নেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, সেক্টর কমান্ডার (অব.) মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, ইস্রাফিল আলম, ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি, মাহবুব আলী, মনিরুল ইসলাম, মোসলেম উদ্দিন, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল, বিএনএফের এসএম আবুল কালাম আজাদ এবং বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নাসরিন জাহান রতœা ও সেলিম উদ্দিন। বাজেট আলোচনার শুরুতে অর্থমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত থাকলেও একপর্যায়ে তাকে আর অধিবেশনে দেখা যায়নি।
গত ১ জুন প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপনের পর থেকে ব্যাংক হিসাবের ওপর বাড়তি আবগারি শুল্ক, সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোর ঘোষণা এবং ভ্যাট নিয়ে অর্থমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করে আসছেন একাধিক মন্ত্রীসহ সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিরা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিম অর্থমন্ত্রীর অতিকথনের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, আওয়ামী লীগ জনকল্যাণের জন্য রাজনীতি করে। জনগণের কষ্ট হয়, সেটা আওয়ামী লীগ মেনে নিতে পারে না। তাই অর্থমন্ত্রীকে বলব- আবগারি শুল্ক যেটা দিয়েছেন, সেটা প্রত্যাহার করেন। এটা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। এই আবগারি শুল্কের জন্য গোটা জাতি আওয়ামী লীগ সম্পর্কে খারাপ ধারণা নেবে এটা আমরা চাই না। অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনার কিছু কথাবার্তায় আমাদের সরকারকে অনেক সময় বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। এই সংসদেই একদিন বলেছিলাম আপনি কথা কম বলেন। আপনার বয়স হয়ে গেছে, কখন কী বলে ফেলেন, হুঁশ থাকে না।’ অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন- বাজেটে কোনো অসংগতি থাকলে সেটা আমি দেখব। আর আপনি (অর্থমন্ত্রী) সিলেটে গিয়ে বললেন এক লাখ টাকা যার আছে, সে ধনী ও সম্পদশালী! আপনি হলমার্ক কেলেঙ্কারির সময় বলেছিলেন, ৪ হাজার কোটি টাকা কোনো টাকাই না। আর এখন এক লাখ টাকা বেশি টাকা হয়ে গেল? অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব বাজেট পেশ করা। সংসদে ৩৫০ জন সদস্য ঠিক করবেন জনগণের কল্যাণে কোনটা থাকবে, কোনটা থাকবে না। এটা আপনি (অর্থমন্ত্রী) সিদ্ধান্ত নেবেন না। আপনার এক গুঁয়েমি বন্ধ করেন। কথা কম বলেন। আপনি আইএমএফের কথা শুনে সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদের হার কমিয়েছেন। এই আইএমএফ কোনো দিনই ভালো চায় না। তারা একবার বলেছিল কৃষিতে ভর্তুকি না দিতে। সেটা করলে কী হতো? ঢালাওভাবে ভ্যাট আরোপের কড়া সমালোচনা করেন তিনি।
নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি নাকচ করে দিয়ে শেখ সেলিম বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাগরে ডুবে গেছে। এখন বিএনপি নেত্রী চান সহায়ক সরকার। সংবিধানে সহায়ক বলে কোনো কিছু নেই। খালেদা জিয়া যতই হুঙ্কার দেন, সংবিধানের বাইরে নির্বাচন হবে না। শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আগামী নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে। খালেদা জিয়াকে শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে আসতে হবে। অন্য কোনো পথ নেই। ড. ইউনূস গং কখনোই ক্ষমতায় আসতে পারবে না। আন্দোলনের নামে অগ্নিসন্ত্রাস চালালে জনগণ গণপিটুনি দিয়ে আপনাদের দেশছাড়া করবে।
ব্যাংকের জন্য এক হাজার কোটি টাকা মূলধন বরাদ্দের তীব্র সমালোচনা করে মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, অর্থমন্ত্রী এই টাকা কেন দিলেন? কার টাকা দিলেন? যেখানে লুটপাটের মাধ্যমে ব্যাংকের টাকা নয়ছয় হয়েছে। তাতে ব্যাংকের মূলধনে টান পড়েছে। সেটা নিয়ে তদন্ত না করে উনি নতুন করে মূলধনের টাকা দিলেন। এটা হতে পারে না। তিনি বলেন, বাজেটটা নির্বাচনী হওয়া উচিত ছিল। আমি জানি না অর্থমন্ত্রী কী কারণে কার কারণে নির্বাচনী বাজেট না করে নির্বাচনবিরোধী বাজেটে পরিণত করেছেন। তিনি আবগারি শুল্ক কমানোর দাবির পাশাপাশি আরও তিনটি দাবি জানান। সেগুলো হল : অর্থবছর জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করা, আদালতের পিপি, জিপি, এপিপিদের বেতন বাড়ানো এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের ভাতা ১৫ হাজার টাকা ও মেম্বারদের ১০ হাজার টাকা করা।
সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে বলেন, আপনি এক কাপড়ে বিদায় করে দেবেন? মুখে বড় বড় কথা বলে লাভ নেই। আপনারাই তো বিদায় হয়ে গেছেন। জনগণ শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে আছে। বাজেটে প্রস্তাবিত কর ও ভ্যাটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বাজেট নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। তাই ব্যাংক আমানতের ওপর আরোপিত শুল্ক পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। গ্রামে সীমাহীন লোডশেডিং চলছে দাবি করে তিনি বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।
জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, কিছু অন্ধকার এখনও আছে। অর্থমন্ত্রী এমন প্রকল্প নিয়েছেন, ইতিহাস এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যায়, পানিতে রাজধানী ডুবে যায়। মানুষ প্রশ্ন তুলেছে- প্রধান দুই নগরীকেই অর্থমন্ত্রী জলাবদ্ধতামুক্ত করতে পারেন না। মেঘা প্রকল্পের চেয়ে এটাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার দেয়া উচিত ছিল।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘দুঃসাহসী বাজেট’ উল্লেখ করার পাশাপাশি সোলার প্যানেল, তেল ও এলপিজির ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, ২০১৮ সালের মধ্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেতে হলে আমাদের আরও অনেক দূর যেতে হবে। আগামী বাংলাদেশ হবে ‘গ্রিন ও অদম্য’ বাংলাদেশ।
জাতীয় পার্টির নাসরিন জাহান রত্না বলেন, ব্যাংকে অনেক গরিব মাও তাদের শেষ সম্বল জমা রাখেন। এক লাখ টাকার ওপর আবগারি শুল্কারোপ উচিত হয়নি। গণহারে ভ্যাট আরোপ আগামী নির্বাচনে মাঠে প্রভাব পড়বে। দেশের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র চলছে। এদের ফাঁদে পা দিয়ে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির চাকাকে স্তব্ধ করে দেয়া উচিত হবে না।
মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বলেন, বাজেট পাসে আমাদের (এমপি) কোনো ভূমিকা নেই। চিফ হুইপ যেদিকে হাত নাড়ান, আমরাও সেদিকে নাড়াই। এভাবে বাজেট পাস হলে বাজেট বাস্তবায়ন হবে না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে কিছুটা সংশোধন এনে বাজেটে যদি এমপিদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়, তবে অর্থমন্ত্রী এভাবে অনড় অবস্থানে থাকতে পারতেন না। এমপিদের কথা শুনতে হতো।



  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by