সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম    |    
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০:০০ | অাপডেট: ১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০৬:০৮:০৪
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে লক্ষ্য থেকে কখনও বিচ্যুত হননি। ১৯৬৬ সালে যখন তিনি ছয় দফার আন্দোলন শুরু করেন, পাকিস্তানি শাসকরা তাকে নিষ্ক্রিয় করতে নেমেছিল। তাকে কারাগারে পাঠানো হল, তার ওপর জুলুম হল, কিন্তু তিনি ভয় পাননি অথবা ছয় দফার কোনো দফাকে একটুখানি কাটছাঁট করেননি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এ ছয় দফার আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত আমাদের একাত্তরে নিয়ে গেছে। পাকিস্তানিদের দমন-পীড়নকে গুরুত্ব না দিয়ে তিনি বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বেগবান করেছেন। পাকিস্তানিরা তাকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছে, আগরতলা মামলায় তাকে রাজনীতির মঞ্চ থেকে চিরতরে সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছে, কিন্তু প্রতিটি ষড়যন্ত্রই তাকে নতুন থেকে নতুনতর উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ১৯৭০-এর নির্বাচন প্রতিষ্ঠা করল, তিনিই বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা এবং বাঙালির ভবিষ্যৎ রচনা হবে তারই নেতৃত্বে।

এত বিরোধিতা, কোনো কোনো মহলে সন্দেহ সত্ত্বেও কীভাবে বঙ্গবন্ধু এগিয়ে গেলেন ছয় দফা এবং স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নিয়ে? এর কারণ খুঁজতে গেলে বঙ্গবন্ধুর জীবনে, দর্শনে, রাজনৈতিক চিন্তা ও কর্মপরিকল্পনায় আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে। তাহলে অনেক বিষয় আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে।

প্রথমত ছিল, বঙ্গবন্ধুর অবিচল আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়প্রত্যয়, তার প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতা। দ্বিতীয়ত ছিল, তৃণমূলে তার আস্থা, তৃণমূলে তার বিপুল গ্রহণযোগ্যতা, তার বিস্ময়কর সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং তৃতীয়ত ইতিহাস, সংস্কৃতি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতায় তার আস্থা। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে আছে, তিনি নানা প্রতিকূলতার মাঝেও এ সত্যকে ধারণ করে এগিয়েছেন যে, উদ্দেশ্য সৎ, জনহিতৈষী হলে এবং তাতে মানুষের সমর্থন থাকলে যে কোনো শক্তিকে অবজ্ঞা করে এগিয়ে যাওয়া যায়। যারা ঢাকা বা শহরকেন্দ্রিক রাজনীতি করতেন, তারা এ বিষয়টি বুঝতে পারতেন না, তারা সরকারের শক্তি ও ক্ষমতাকে উদ্বেগ নিয়ে দেখতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সহযোগীরা জানতেন, এ উদ্বেগ সংগ্রামের পথটাকে বন্ধুর করে দেয় এবং সংগ্রামে অবিচল নিষ্ঠা সেই পথকে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে নিয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধুর প্রজ্ঞা ছিল, দূরদৃষ্টি ছিল। তিনি পরিষ্কার চোখে ভবিষ্যৎকে দেখতে পেতেন। অনেক রাজনীতিবিদ সাময়িক বাধার ও সংকটের বৃক্ষের জন্য বৃহত্তর সংগ্রামের বনটাকে দেখতে পেতেন না। বঙ্গবন্ধু দেখতেন। জাতির জন্য ঠিক যখন যে দিকনির্দেশনা ও কর্মসূচির প্রয়োজন, তা তিনি দিয়েছেন। ১৯৪৬-৪৭-এ পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করেছেন, কিন্তু ১৯৫২-এ পাকাপাকিভাবে তিনি বাঙালির আত্ম-অধিকারের সংগ্রামে নামলেন। তিনি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তার অনেক সহকর্মীও তখন তার মতো স্বচ্ছ দৃষ্টি নিয়ে ইতিহাসকে পড়তে পারেননি, তারা বুঝেছেন আরও পরে- ১৯৫৮তে সামরিক শাসন জারির পর।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট যখন নির্বাচনে জিতল, পাকিস্তানের রাজনীতিকে বিদায় জানিয়ে বাঙালির নিজস্ব রাজনীতির অভ্যুদয় ঘটল। সেই অভ্যুদয়ের একজন রূপকার এবং রূপান্তরের কারিগর ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার পরের ইতিহাস তো আমাদের জানা। ১৯৫৮ সালের পর বাঙালির রাজনীতি, সংগ্রাম ও কর্মসূচি ছিল পাকিস্তানের সবকিছু থেকে পৃথক। এজন্য আওয়ামী লীগ একটি সর্ব-পাকিস্তান রাজনৈতিক সংগঠন হলেও পশ্চিম পাকিস্তানে এর কার্যক্রম ছিল সীমিত। কারণ বঙ্গবন্ধুর চিন্তার মাঝখানে ছিল বাংলাদেশ ও বাঙালি।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বাঙালিকেন্দ্রিকতা তাকে একটি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ থেকে বিরত রাখেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আন্দোলনের নয় মাস তিনি পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পেছনে তিনি জুগিয়েছেন প্রেরণা ও শক্তি। এটি সম্ভব ছিল দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তার দীর্ঘদিন রাজনীতি করার কারণে। মানুষ তাকে বিশ্বাস করত, তার ডাকে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ত। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ তিনি যে ভাষণ দেন, তাকেই দেশের মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামের নির্দেশ ও রূপরেখা হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর বৈশ্বিক দৃষ্টির কারণে তিনি বাংলাদেশের সম্ভাবনাগুলো এবং সমকালীন বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুচিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। সেই লক্ষ্যেই তিনি এগোচ্ছিলেন, কিন্তু তার ঘাত০করা সেই সুযোগ তাকে দিল না। তারা দেশটাকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল - এখনও তারা আছে, তাদের পেছনে সক্রিয় নানা শক্তি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যে বাঙালিকে বিশ্বাস করতেন, সেই বাঙালি আবার জেগেছে এবং তাদের প্রতিহত করছে।

বাঙালি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আশাবাদ ছিল। এ আশাবাদ জিইয়ে রেখে দেশটিকে সামনে নিয়ে এগোলে আমরা তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা দেখাতে পারব। বাংলাদেশ নিয়ে তার স্বপ্ন এখনও অসমাপ্ত, তাকে সমাপ্ত করার পথে নিয়ে যেতে পারলে তার প্রতি আমাদের ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ প্রকাশটা দেখাতে পারব।


 
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by