যুগান্তর রিপোর্ট    |    
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০:০০
বিচারপতি খায়রুল হক আদালত অবমাননা করেছেন : ড. আসিফ নজরুল
অপহরণের কালচার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরে ঢুকে গেছে- এমন পরিস্থিতিতে কথা বলা যায় না : সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হক জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী বাতিলের রায় প্রকাশের ১৬ মাস পর খায়রুল হক ওই রায় পরিবর্তন করে যে লিখিত রায় প্রকাশ করেছিলেন, তাতে তিনি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। এছাড়া ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া আপিল বিভাগের রায় নিয়ে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তাতে আইনের লঙ্ঘন ও আদালত অবমাননা করেছেন।’
শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি আয়োজিত ‘আইনের শাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অধ্যাপক আসিফ নজরুল তার বক্তব্যে প্রশ্ন রাখেন, ‘খায়রুল হকের মতো এরকম একজন ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা আছে? প্রধান বিচারপতি কি তাকে শাস্তি দিতে পারেন? রাষ্ট্রের এরকম সর্বোচ্চ ব্যক্তি যদি এমন করেন, তাহলে আপনি পুলিশকে কী বলবেন?’
আসিফ নজরুল আরও বলেন, ‘মানুষ তো গুম হয়নি, আইনের শাসন গুম হয়েছে, গণতন্ত্র গুম হয়েছে। রাষ্ট্রও গুম হওয়ার পথে। তথ্যপ্রযুক্তির ৫৭ ধারার আইন করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কালো আইন। আইনের বৈষম্যমূলক ব্যবহার হচ্ছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য, নির্যাতনের জন্য, মুখ বন্ধের জন্য সর্বোচ্চ ব্যক্তিরা আইনের অপপ্রয়োগ করছেন।’
আলোচনা সভায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক প্রধান সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন ‘অপহরণের ঘটনা যদি একটিতে শেষ হতো, তাহলে অপহরণের শিকার ব্যক্তি ও তাদের স্বজনরা মুখ খুলতেন।’ তিনি বলেন, ‘একটি অপহরণের ঘটনা সারতে না সারতেই যদি দেখেন, সাতজন অপহরণ হয়েছেন, তাও আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে এবং এমন পর্যায় থেকে যাকে আপনি ফেলে দিতে পারবেন না। ... অপহরণের এ কালচার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতর ঢুকে গেছে- এমন পরিস্থিতিতে কথা বলা যায় না।’
রিজওয়ানা হাসান বলেন, ?‘যেসব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতা চরম, অবিশ্বাস চরম, সেখান থেকে মুক্তি পেতে হলে, কোনো আইন বাতিল করতে হলে, তা আমাদেরই করতে হবে। তিনি বলেন, ‘মূল্যবোধ নিয়ে ব্যাজ পরতে না পারার কারণে যদি বিডিআরের নাম বদলে যেতে পারে, তাহলে র‌্যাববের ব্যাপারেও আসলে আমাদের চিন্তা করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘টেলিভিশন টকশোতে খুব কথা হয়। যারা অপহৃত হয়ে যাচ্ছেন, তারা আর কথা বলেন না। অলোচনা সভায় উপস্থিত সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘কথা কেমন করে বলবে? এটা বোঝার বুদ্ধি নেই আপনাদের? যদি একটা অপহরণের ঘটনাই শেষ অপহরণের ঘটনা হতো, তাহলে অবশ্যই যারা অপহৃত হয়েছেন, তারা এবং তাদের পরিবার কথা বলত।’ বাংলাদেশের মানুষ একটা ?‘বিপদে পড়ার কালচারের’ মধ্যে ঢুকে গেছে উল্লেখ করে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘মানুষ এখন প্রতিবাদ করতে গেলে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিপদে পড় না।’
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের মতে, ‘নাগরিকরা হারিয়ে গেলে নির্বাচনে জেতা যাবে না। তিনি বলেন, ‘?জাতীয় পরিচয়পত্রধারী নাগরিকরা হারিয়ে যায়, কেউ বলতে পারে না। পুলিশ, র‌্যাবব, বলতে পারবে না, এটা তো দিনের পর দিন হতে পারে না।’ বক্তেব্যের এ পর্যায়ে তিনি প্রশ্ন রাখেন, এটা কোনো কথা? ন্যূনতম জবাবদিহিতাটুকু থাকবে না? তারা সমানে গ্রেফতার করতে পারে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে- কেউ তো বাধা দিচ্ছে না, কিন্তু আমরা হারিয়ে যাব কেন? তাহলে এ পরিচয়পত্র দিয়ে আমাদের লাভটা কী হল? এটা কি আমাদের সুরক্ষাকবচ?’ তিনি বলেন, নাগরিকরা হারিয়ে গেলে কী হবে, আগামী নির্বাচনে জেতা যাবে? কোনোভাবেই সম্ভব না। বরং নাগরিকরা যদি থাকতে পারে তাহলেই আগামী নির্বাচনে জেতা সম্ভব।’
প্রসঙ্গত, প্রায় তিন বছর আগে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক অপহরণের শিকার হন। নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় লোকজন তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এ নিয়ে হৈচৈ শুরু হলে অপহরণকারীরা আবু বকর সিদ্দিককে আবার ফেলে রেখে যায়। অপহরণের পরপরই থানায় মামলা দায়ের হলেও ওই ঘটনায় কারা জড়িত ছিল পুলিশি তদন্তে আজও তা জানা যায়নি। এমনকি আবু বকর সিদ্দিক কিংবা তার স্ত্রী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও এ ব্যাপারে এতদিন মুখ খোলেননি। তবে শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির আলোচনা সভায় ওই অপহরণের বিষয়ে কিছুটা ইঙ্গিত দিলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
ডিআরইউর সাগর-রুনী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেন, ‘আলোচনার বিষয়বস্তুতে সজ্ঞানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিবর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলা হয়েছে। কারণ বাহিনীর সঙ্গে রক্ষাকারী শব্দটা আর যায় না।’ তিনি বলেন, ‘অপহরণের বেশিরভাগ ঘটনায় অভিযোগের আঙুল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে।’
আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরউল্লাহ চৌধুরী এবং অপহরণের শিকার সাতক্ষীরার এক ব্যক্তির স্ত্রী জেসমিন নাহার।
‘আইনের শাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেদওয়ানুল হক। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র ছাড়া আইনের শাসন হবে না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের ভূমিকা পালন করতে পারবে না। নির্যাতন, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতারের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। বর্তমানে ঘরের ভেতর আলোচনা করলেও অনুমতি নিতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৫৭ ধারার মতো আইনের বৈষম্যমূলক ব্যবহার হচ্ছে।
অ্যাডভোকেট জ্যোতির্ময় বড়–য়া বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, তারা কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গ্রেফতার করছে। সে কারণে গ্রেফতারের পরিবর্তে তুলে নিয়ে যাওয়া বা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো বেআইনি শব্দগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যেহেতু আইনি প্রক্রিয়া না মেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তাই এর বিরুদ্ধে কোনো আইনগত প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।’
আলোচনা সভায় সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘সম্প্রতি ঢাকা শহরে যেমন চিকুনগুনিয়া নামক রোগের প্রকোপ বেড়েছে, ঠিক তেমনি পুরো বাংলাদেশ যেন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত। আপিল বিভাগ যে রায় দিয়েছেন, তাতে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে রিভিউ করতে পারেন। কিন্তু সব পক্ষ যেভাবে এ রায়ের পিছু লেগেছে, তাদের সঙ্গে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি ক্ষমার অযোগ্য কাজ করেছেন। তার নিজের কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন আছে বলে মন্তব্য করেন সুব্রত চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের অনাস্থা তৈরি হতে পারে। এই একটা জায়গাই আছে। এটা নষ্ট করবেন না।’ সুব্রত চৌধুরী বলেন, আগামীকাল (আজ) সাত খুন হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়, এটাও তো হতো না। এ ঘটনায় জড়িতদের স্ব স্ব বাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। তিনি প্রশ্ন রাখেন- হাইকোর্টে মামলা করে কেনো অভিযুক্তদের গ্রেফতারের ব্যবস্থা করতে হল?’
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয়করণের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। আমরা সবাই হতাশায় ভুগছি। একটা স্বাধীন কমিশন গঠন করে এ সমস্যার কিছুটা সমাধান করা যেতে পারে। সাবেক বিচারপতি খায়রুল হককে কি কিছু করা যায় না? আমি কিংবা আসিফ নজরুল তো আদালত অবমাননা করিনি। অবমাননা করেছেন খায়রুল হক।’
সভায় উপস্থিত জেসমিন নাহার বলেন, ‘আমার স্বামীকে গুম করা হয়েছে। আমার স্বামীকে আমি ফিরে পাব কিনা জানি না। তবে আমি এ জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি, যেন আর কোনো পরিবারকে এ ধরনের ঘটনার শিকার হতে না হয়।’ তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি তার স্বামী হঠাৎ করেই নিখোঁজ হন। স্থানীয় থানাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তিনি তার স্বামীর সন্ধান পাচ্ছিলেন না। পরে তিনি জানতে পারেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছেন। তার স্বামী তিন দিন হাজতে ছিলেন। আদালতের প্রতিবেদনে তার স্বামীর হাজতে অবস্থানের বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার পরও পুলিশ অভিযোগ অস্বীকার করছে। এখন পুলিশ তাকে (স্বামী) ?‘জঙ্গি’ বলে প্রচার করছে।



  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by