কবির হোসেন    |    
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০:০০
সুপ্রিমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির উদ্যোগ
মুক্তি পাচ্ছেন দীর্ঘদিন কারাবন্দি হাজতিরা
বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় দীর্ঘদিন কারাবন্দি আসামিরা সরকারি আইনি সহায়তায় মুক্তি পেতে শুরু করেছেন। সুপ্রিমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির উদ্যোগে পাঁচ মাসে ১৮ জন মুক্তি পেয়েছেন। এ সময় এমন আরও ৪০ বন্দিকে আইনি সহায়তা দেয়া হয়েছে। বাকিরা কারামুক্তি না পেলেও মামলা নিষ্পত্তিতে সময় বেঁধে দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এসব আসামি এক থেকে দেড় যুগ ধরে কারাবন্দি থাকলেও তাদের বিচার শেষ হয়নি। হাইকোর্ট বলেছেন, এত দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকলেও তাদের বিচার শেষ না হওয়া রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক।
এ ধরনের আরও অনেক বন্দিকে আইনি সহায়তা দেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির সদস্য সচিব সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল টাইটাস হিল্লোল রেমা বলেন, পাঁচ থেকে ১০ বছরের বেশি সময় মামলা নিষ্পত্তি না হয়েও কারাগারে আটক হাজতিদের ৪৬২ জনের তালিকা পাঠিয়েছিল আইজি প্রিজন্স অফিস। এর মধ্যে ৫৮ জনের বিষয় হাইকোর্টের নজরে আনা হয়েছে। বাকি ৪০৪ জনের বিষয়ে লিগ্যাল এইড অফিস কাজ করছে, যা একটু সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
গত বছরের অক্টোবরে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল দীর্ঘদিন বিনা বিচারে আটক বাবুল ও শিপনকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার করে। এর মধ্যে বাবুল ১৭ বছর এবং শিপন ১৬ বছর ধরে কারাবন্দি ছিলেন। পরে সুপ্রিমকোর্টের একজন আইনজীবী বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনেন। পরে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাবুল ও শিপনের জামিন মঞ্জুর করেন। রাজধানীর সূত্রাপুর থানার
একটি হত্যা মামলায় আটক শিপনের জামিন আদেশে হাইকোর্ট বলেছেন, এই ১৬ বছরেও তার মামলার বিচার না হওয়াটা বিস্ময়কর। রাষ্ট্রপক্ষ চার্জশিটভুক্ত সাক্ষীকে হাজির করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এটাও স্পষ্ট হয়েছে যে, রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারিক আদালত বিচারিক মন প্রয়োগ না করেই মামলাটি বারবার মুলতবি করেছে। হাইকোর্ট আরও বলেন, ১৬ বছরেও বিচার শেষ করতে না পারাটা রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগের জন্য লজ্জাজনক। এই ব্যর্থতা দ্রুত বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার থেকে এ আসামিকে বঞ্চিত করেছে। সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক আসামির দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র এবং বিচার বিভাগ এক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না।
দীর্ঘদিন কারাবন্দিদের বিষয়ে গণমাধ্যমে তথ্য আসার পর হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটি এ বিষয়ে নজর দেয়। এই কমিটি গত বছরের ১৫ নভেম্বর দীর্ঘ সময় বন্দিদের তালিকা চেয়ে দেশের সব কারাগারে চিঠি পাঠায়। পাঁচ ও দশ বছরের অধিক সময় ধরে যারা আটক রয়েছেন। কিন্তু বিচার শেষ হয়নি তাদের বিষয়ে দুটি তালিকা প্রস্তুত করে কমিটির কাছে পাঠাতে বলা হয়।
কারাগারগুলোতে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, রাষ্ট্র গরিব ও অসহায় মানুষের সুপ্রিমকোর্টে বিনা পয়সায় মামলা পরিচালনার ভার বহন করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে দেশের কয়েকটি কারাগারে বিভিন্ন ধরনের ফৌজদারি অপরাধে বিনা বিচারে দীর্ঘ সময় ধরে আটক থাকার সংবাদ সুপ্রিমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির দৃষ্টিগোচর হয়েছে। নিম্ন আদালতে বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়া এসব মামলা সাক্ষ্যগ্রহণসহ নানাবিধ কারণে দীর্ঘ সময় ধরে অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে কার্যত সাজা হওয়ার পূর্বেই আটক বন্দি দীর্ঘদিন ধরে কারাভোগ করছেন।
এ চিঠি পাঠানোর পর গত বছরের ৭ ডিসেম্বর আইজি প্রিজন্স বিভিন্ন কারাগারে পাঁচ বছর থেকে তদূর্ধ্ব সময়ে বিচারাধীন বন্দিদের তালিকা সুপ্রিমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটিতে পাঠান। এতে মোট ৪৬২ জনের নাম রয়েছে। এখন ওই তালিকা থেকে প্রত্যেক বন্দির জীবনবৃত্তান্ত, কারাভিত্তিক পরিসংখ্যান, নারী-পুরুষের সংখ্যা এবং আসামিদের বিরুদ্ধে অন্য কী কী অভিযোগ আছে তা বের করার চেষ্টা চলছে। এদের মধ্যে ইতিমধ্যে ৫৮ জনের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে আইনি সহায়তা দিয়েছে সুপ্রিমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটি। কমিটি নিযুক্ত আইনজীবীরা তথ্য যাচাই-বাছাই করে বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনলে হাইকোর্টও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন।
এ পর্যন্ত যে ৫৮ জনকে আইনি সহায়তা দেয়া হয়েছে তার মধ্যে ১৮ জন জামিন পেয়েছেন। ২০ জনের মামলা নিষ্পত্তির জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে কারও মামলা দু’মাসের মধ্যে আবার কারও মামলা সর্বোচ্চ ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকজনকে চিকিৎসার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আবার কিছু আসামি, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর, তাদের জামিন আবেদন খারিজও করে দেয়া হয়েছে।
সারা দেশের অধস্তন আদালতের মতো দেশের সর্বোচ্চ আদালতেও সরকারি খরচে মামলা পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হয় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে। ওই মাস থেকে কার্যক্রম শুরু করে সুপ্রিমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটি। আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তি যাদের বার্ষিক গড় আয় দেড় লাখ টাকার ঊর্ধ্বে নয়, তাদেরকে এই আইনি সহায়তা দেয়া হচ্ছে। চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ৫৫৫টি মামলার আবেদনপত্র গ্রহণ করেছে সুপ্রিমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটি। এর মধ্যে আপিল ও হাইকোর্টে বিভাগে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৯৮টি মামলা। আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৪৯৭ মামলায়। পাশাপাশি ১ হাজার ২৩২ জন অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীকে আইনি পরামর্শ দেয়া হয়েছে।



  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by