রাশেদ রাব্বি    |    
প্রকাশ : ২০ জুন, ২০১৭ ০০:০০:০০ | অাপডেট: ২০ জুন, ২০১৭ ০২:৫৬:২০
জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট দুর্নীতির আখড়া
টেন্ডার ছাড়াই কোটি টাকার কেনাকাটা * নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী সিন্ডিকেট
দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের আওতাধীন জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট (আইপিএইচ)। কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় ঠিকাদারের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট এর সঙ্গে জড়িত। সরকারের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল (পিপিআর) নীতিমালা অমান্য করে কোটি টাকার কেনাকাটা করা হচ্ছে এই সিন্ডকেটের মাধ্যমে। এতে একদিকে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট হচ্ছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত সেবাবঞ্চিত হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ।

সম্প্রতি এ প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। তারা জানান, প্রতি বছর ভারি যন্ত্রপাতি, প্যাকেজিং ব্যবস্থা, কেমিক্যাল ও কাঁচামালসহ বিভিন্ন মালামাল বিনা টেন্ডারে কোটেশনের মাধ্যমে সরবরাহের নামে ওই সিন্ডিকেট কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এমনকি ইয়াহু সাপ্লাই, টেক কেয়ার, ইলেকট্রোভেলি, স্মৃতি ট্রেডিং, হেভেন এন্টারপ্রাইজ ইত্যাদি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে কার্যাদেশ দেয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা লেখা হয় মহাখালী স্কুল রোড। অথচ মহাখালীতে স্কুল রোড নামে কোনো সড়ক নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানের সাবেক এক পরিচালক জানান, একই বিষয়ের কেনাকাটার একাধিক বিল করে ওই সিন্ডিকেট। ২০১৬’র এ ধরনের কিছু বিলে তিনি সম্মতি না দিলে তাকে হুমকি দিয়ে জোর করে সম্মতি আদায় করা হয়।

অভিযোগে আরও জানানো হয়, দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং আইপিএইচের একজন কর্মচারী এই সিন্ডেকেট নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। কাজ নির্বিঘœ করতে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক কর্মীকে হাতে রেখেছে তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কেনাকাটার জন্য ৬টি লটে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যার পুরোটাই লুটপাট হয়। একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বার্ষিক ১০ কোটি টাকার বরাদ্দ থাকে ভারি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে। কিন্তু যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ওয়ার্ক ওর্ডার দেয়া হলেও প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কোনো কিছুই সরবরাহ করা হয় না। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা দিয়ে একটি গ্যাস জেনারেটর ক্রয় করা হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত তা চালু করা সম্ভব হয়নি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকায় একটি ডায়ালাইসিস ফ্লুইড তৈরির মেশিন কেনা হয়, যা এখনও ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৭ কোটি টাকার এমএইচআর সামগ্রী ক্রয়ের নামে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে বিল করা হয়। এ টাকার ভাগাভাগি নিয়ে সম্প্রতি আইপিএইচে হামলা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

আইপিএইচের বিভিন্ন স্তরের কর্মীরা জানান, এসব দুর্নীতি ও অপকর্মের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত আইপিএইচের এসপিও মো. মনিরুজ্জামান। এর আগে দুর্নীতির দায়ে তাকে অন্যত্র বদলি করা হলেও তিনি সেখানে যোগদান না করে স্বপদে বহাল আছেন। তারা জানান, বছরের শুরুর দিকে আইপিএইচের কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে আসে। বিষয়টির তদন্তে দুদকের পক্ষ থেকে সেখানে কর্মরত ঠিকাদারদের ডাকা হয়। কিন্তু ঠিকাদাররা যেন দুদকে সঠিক তথ্য না দেন সেজন্য মনিরুজ্জামান তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এ প্রসঙ্গে আইপিএইচে কর্মরত কয়েকজন ঠিকাদার যুগান্তরকে বলেন, দুদকে তাদের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য মনিরুজ্জামান নিজেই প্রেরণ করেন। এমনকি শুনানির দিন তিনি নিজেই ঠিকাদারদের সঙ্গে যান এবং সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদার যুগান্তরকে জানান, তৃতীয় শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত হওয়া এই কর্মকর্তা নিজেকে মন্ত্রীর লোক বলে দাবি করেন। এমনকি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তার লোক বলে প্রচার করেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে যুগান্তরকে বলেন, মনিরুজ্জমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এর আগে শাস্তিমূলকভাবে তাকে বদলি করা হয়। কিন্তু তারপরও সে কীভাবে স্বপদে থেকে গেল, সেটাই আশ্চর্যজনক বিষয়।

এ প্রসঙ্গে কথা বলতে মো. মনিরুজ্জমানের দুটি মোবাইল ফোনে (০১৯২০০৯৩৪৯০/০১৭১১৩১০৭৪৪) একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। রোববার আইপিএইচে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। আইপিএইচ থেকে জানানো হয়, তিনি বেশ কয়েকদিন ধরে অফিসে আসছেন না। এ প্রসঙ্গে আইচিএইচের বর্তমান পরিচালক মো. আনিসুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে যুগান্তরকে বলেন, আমি এখানে পরিচালক হিসেবে যোগদান করেছি ১০ দিন হল। এরই মধ্যে এসব বিষয় নজরে এসেছে। তিনি এ ধরনের দুর্নীতি নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে জানান।


 
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর
শেষ পাতা বিভাগের অারও খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by