আহমাদ মাযহার    |    
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০:০০
আহমাদ উল্লাহর ছড়া পাতার নৌকা নিয়ে
আহমাদ উল্লাহ ছড়া লিখছেন সেই সত্তরের দশক থেকে। নব্বইয়ের দশকের প্রথম ভাগেও বেশ সক্রিয় ছিলেন। মাঝে অনেকগুলো বছর তার ছড়া আর তেমন দেখা যায়নি। তার ছড়া হাজির হয়নি পত্রপত্রিকার পাতায় কিংবা দুই মলাটের ভাঁজে। মনে হচ্ছিল কর্মক্ষেত্রের জন্য লেখালিখি করলেও ছড়ায় বোধ হয় আর তেমন উৎসাহী নন তিনি। এমনিতেও ব্যক্তিজীবনে কথা বলেন কমই। বয়স বাড়ায় বুঝি-বা আরও কমে গেছে। সামান্য যা দু-একটা কথা বলেন তাতে অনুভূত হয় তার জীবনদৃষ্টিতে গভীরতর হয়েছে আধ্যাত্ম বোধের মাত্রা। কথাবার্তায় এক ধরনের নির্মোহতাও লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ছড়াকারের তো প্রধান অস্ত্র মুখের কথা। হ্যাঁ, ছড়াকার এক বিশিষ্ট বচনভঙ্গিতে তার ভাব প্রকাশ করেন। কম কথা এ বিশিষ্ট বচনভঙ্গির সহায়ক। কারণ সরলতার সবলতার জন্য, পরিমিতির জন্য কম কথাই সুবিধাজনক। আহমাদ উল্লাহ বুঝি-বা সেই অনুশীলনই করেছেন তার দীর্ঘ জীবনে। তা না হলে ছড়া পাতার নৌকার ছড়াগুলো এমন সরল অথচ গভীর বোধের প্রকাশক হল কী করে!
দীর্ঘ বিরতির পর প্রকাশিত হল ছড়া পাতার নৌকা। ‘কেয়া পাতার নৌকা’ ধারণাকে রবীন্দ্রনাথ তার গানের বিষয় করে তোলায় তা আমাদের মনে এক ধরনের আদিকল্প সৃষ্টি করে রেখেছে। আহমাদ উল্লাহ প্রথম অভিঘাতটি সৃষ্টি করলেন ‘কেয়া পাতা’র আদিকল্পকে ভেঙে ‘ছড়া পাতা’য় রূপ দিয়ে। বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আমরা এমন এক ছড়াকারকে পেয়ে যাই যিনি প্রায়ই সহজ কথাকে সহজভাবে বলতে পারেন। কাছে পাওয়া অনুষঙ্গ দিয়ে ছড়ার বাকভঙ্গিতে নিজের দার্শনিক অনুভবকে পারেন ফুটিয়ে তুলতে। তাই মেঘনা নদীর বয়ে যাওয়া তার জীবনের নির্মোহ বহমানতায় রূপান্তরিত হয়, বহুব্যবহৃত ‘চাঁদমামা’ বা ‘চাঁদের বুড়ি’ রূপকল্প ‘চাঁদ-মা’ হয়ে ওঠে তার ছড়ায়। লোকছড়ার চেনা ভুবন তো বারবারই হাজির হয়। সামাজিক অসঙ্গতি উপস্থাপনের তীর্যকতা সত্তরের ছড়ায় যেমনটা দেখা যেত তার উপস্থিতি এ বইয়েও বেশ উজ্জ্বলভাবে দেখা দিয়ে মনে করিয়ে দেয় তার সূচনাকালকে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহু অনুষঙ্গ যুক্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কয়জন ছড়াকার সে সবের অভিঘাতকে ধারণ করতে পারেন। খানিকটা বিস্ময়ের যে, আহমাদ উল্লাহর চেতনা জীবনের নতুন অনুষঙ্গগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে নিচ্ছে নানা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। যেমন উড়াল সেতুকে তিনি অঙ্গীভূত করেছেন ছড়াকারের অনুভবে। অথবা আমাদের জীবন থেকে ‘ফেব্রুয়ারির ছেলে’ বাংলা ভাষা কোথায় যেন চলে যাচ্ছে এ বেদনা সূক্ষ্ম হয়ে বাজে তার ছড়াকার-সত্তায়!
এ বইয়ের ছড়াগুলো পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হতে পারে আহমাদ উল্লাহ তার ছড়া গঠনে বৌদ্ধিক তীক্ষèতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারে যতটা দক্ষ তার চেয়ে বেশি অনায়াস সরল অনুভবের উপস্থাপনায়। এ ক্ষেত্রে ছড়াকারের নিজস্ব আধ্যাত্ম অনুভব প্রভাব ফেলেছে। আমার মনে হয়, আধুনিক বাংলা ছড়ায় আধ্যাত্ম বোধের উপস্থিতি আহমাদ উল্লাহর ছড়ায় যতটা প্রাধান্য পেয়েছে ততটা আর কারও বেলায় নায়। পাঠক হিসেবে আমাকে যদি বলা হয় তার ছড়ার এ বইটি থেকে আমার কী প্রাপ্তি, তাহলে আমি বলব ছড়ার অবয়বে এ আধ্যাত্ম বোধের অনুভবটাই সুস্পষ্ট। আহমাদ উল্লাহ সম্ভবত সবচেয়ে স্বতন্ত্র ও শক্তিমান এখানেই।
আহমাদ উল্লাহর ছড়াকে বিশ্লেষণ করতে গেলে অনেক কথা বলতে হবে। কারণ ছোটদের জন্য উপস্থাপন করলেও ছড়া মাধ্যমটি শুধু ছোটদের জন্যই ফুরিয়ে যায় না, বড়দের মনেও যথেষ্ট আবেদন রাখে। স্থান ও সময়াভাবে সেসব কথা বিশ্লেষণের অবকাশ এখানে নেই। তার জন্য না-হয় অন্য কখনও প্রয়াসী হওয়া যাবে। এখানে শুধু সার কথাটাই উল্লেখ করা হল।



  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by