jugantor
বাংলার যাত্রা : বাঁকে বাঁকে এবং একুশ শতকে

  মিলন কান্তি দে  

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে দেশজ সংস্কৃতি ধারার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে যাত্রার স্বীকৃতি আছে। নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ি বলেন, ‘আমাদের জাতীয় নাট্য বলিয়া যদি কিছু থাকে তাহাই যাত্রা।’ অধ্যাপক ও নাট্য গবেষক জিয়া হায়দার (১৯৩৬-২০০৮) এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘যাত্রাই আমাদের জাতীয় নাট্য’। শুরুতেই যাত্রাপালার যে কনসার্ট অর্থাৎ ঐকতান বেজে ওঠে, তার সুরে সুরে যেন আমরা অনুভব করি শস্য শ্যামল এ বাংলার বহুমাত্রিক সঙ্গীতের তাল-লয়-ছন্দের এক অপূর্ব সম্মিলন। ‘যাত্রা’ শব্দটি আবেগপ্রবণ বাঙালি মনকে আলোড়িত করে নিমিষেই এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ে এর বহুবিধ ব্যবহার এরকম : শোভাযাত্রা, স্নানযাত্রা, রথযাত্রা, মঙ্গলযাত্রা, যুদ্ধযাত্রা, বরযাত্রা, বিদেশ যাত্রা, শবযাত্রা, শুভযাত্রা-বহু রকমারী যাত্রা। আবার হাটে-বাজারে কিংবা নদীর পাড়ে কোনো যাত্রা প্যান্ডেল থেকে মাইকে ভেসে আসে কানফাটা আওয়াজ ‘যাত্রা-যাত্রা-যাত্রা’। সংস্কৃতির এই ধারাটি যুগের পর যুগ এসেছে ভিন্ন রূপে ভিন্ন সাজে।

উনিশ শতকের ষষ্ঠ ও সপ্তম দশকে শিক্ষিত ও সৌখিন সমাজে যাত্রার এক নতুন রূপান্তর ঘটে, যার নাম গীতাভিনয়। এ নতুন ধারার যাত্রাকে সমাজের বিশিষ্টজনদের কাছে সমাদৃত করে তোলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির সদস্যরা। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের গবেষণা থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের শৈশব ও কৈশোরকালে কলকাতায় নতুন যাত্রার যুগ। বাংলায় একদা কৃষ্ণযাত্রা, রাসযাত্রা, রাই জন্মাদিনী যাত্রা ও বিদ্যাসুন্দর যাত্রার যে রূপ ছিল, তা পরিবর্তিত হয়ে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে পরিমার্জিত রূপে নতুন যাত্রার আত্মপ্রকাশ ঘটে। কবিগুরুর বাল্যকালে দেখা এমনি এক পালার নাম ‘নলদময়ন্তী।’

১৮৭২ সাল সাধারণ রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠার বছর। এ বছরেই যাত্রাকে আধুনিক চিন্তাচেতনায় উন্নীত করলেন ‘যাত্রাগুরু’ বলে খ্যাত বর্ধমানের ভার্ৎশালা গ্রামের মতিলাল রায় (১৮৩২-১৯০৮)। ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশালের মাচরঙ্গের নট্ট কোম্পানি ইংরেজশাসিত বাংলাদেশে প্রথম পেশাদারি যাত্রা সংগঠন। পশ্চিমবঙ্গে এ দলের সক্রিয় কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে।

যাত্রাপালার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ‘বিবেক।’ নাট্যতত্ত্বমীমাংসা গ্রন্থে ড. সাধন কুমার ভট্টাচার্যের উক্তি-‘বিবেকই বাংলা যাত্রা নাটকের পতাকা চিহ্ন।’ ১৮৯৪ সালে পালাকার অহীভূষণ ভট্টাচার্য তার ‘সুরথ-উদ্ধার’ যাত্রাপালায় সর্বপ্রথম বিবেক সৃষ্টি করেন। ১২২ বছর আগে যাত্রাপালায় প্রথম বিবেকের গান-

‘ওরে আপন বুঝে চল এই বেলা

ও যে বাস্তু শকুন উড়ছে মাথার গো

বসে যুক্তি দিচ্ছেন হাড়গেলা।’

(সংক্ষেপিত)

এভাবে বিভিন্ন পালাবদলের মধ্য দিয়ে রূপান্তর ঘটেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার।

স্বদেশী যাত্রা : বিশ শতকের সূচনায় পরাধীন জাতিকে মুক্তির গান শোনালেন নতুন যাত্রার নতুন যুবরাজ চারণকবি মুকুন্দ দাশ (১৮৭৮-১৯৩৪)। তার স্বদেশী যাত্রার বিস্ফোরণ ঘটল গোটা দেশজুড়ে। প্রেক্ষাপটটি ছিল এরকম : ১৯০৫ সালের অক্টোবরে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা ছিল এ দেশের মিলিত হিন্দু মুসলমানের সাম্য সম্প্র্রীতি বিনষ্ট করার জন্য ইংরেজ বেনিয়াদের এক পরিকল্পিত রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি। শুরু হল দেশব্যাপী বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন। এ সময় থেকে বাঙালির মানসভূমে স্বদেশ চেতনা এক ভিন্নমাত্রায় রূপ নিল। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন- ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘আমার সোনার বাংলা’, রমেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী লিখলেন, ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা।’ পাশাপাশি মঞ্চায়ন হতে লাগল ‘পলাশীর পরে’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’, ‘রানাপ্রতাপ’ প্রভৃতি দেশপ্রেমমূলক নাটকগুলো। বঙ্গভঙ্গ আইনজারির ওই বছরেই (১৯০৫) আধুনিক রঙ্গমঞ্চের জনক গিরিশ ঘোষ (১৮৪৪-১৯১২) নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে একটি উৎকৃষ্ট নাটক রচনা করেন। মঞ্চস্থ হয়েছিল কলকাতার মিনার্ভা থিয়েটারে ১৯০৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। সেই উত্তাল সময়ে জাতীয় জাগরণের এক সংগ্রামী নায়ক হিসেবে সিরাজকে মঞ্চে আনার গিরিশ ঘোষের এ কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। অনেকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে এ জন্য যে, বঙ্গভঙ্গ বিধানটি তো সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয় ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর। তাহলে এর একমাস আগে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন শুরু না হতেই জাতীয় চেতনা সৃষ্টিকারী নাটক লেখার প্রয়াস কেন? আসলে বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার খসড়া তৈরি হয়েছিল ১৯০৩ সালে বাংলার ছোট লাট এন্ডু ফ্রেজার আর ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব হার্বাট রিজলের প্রস্তাবেই। তখন থেকেই ইংরেজ শাসকচক্রের অশুভ পাঁয়তারার বিরুদ্ধে জনরোষ ধূমায়িত হচ্ছিল। আর বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন থেকেই ঐতিহ্যবাহী যাত্রার একটি নতুন ধারা সৃষ্টি হল- ‘স্বদেশী যাত্রা।’ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধের এ নতুন যাত্রার অধিকর্তা মুকুন্দদাশ গলা ছেড়ে গাইলেন :

‘আমি দশ হাজার প্রাণ যদি পেতাম

তবে ফিরিঙ্গি বণিকের গৌরব রবি

অতলে জলে ডুবিয়ে দিতাম।’

(যাত্রাপালা মাতৃপূজা)



যাত্রাপালার প্রাণশক্তি যে কত প্রবল এবং এর ভাবরস মুহূর্তেই বিপরীত চিন্তার মানুষগুলোকে সুস্থ ভাবনায় ফিরিয়ে আনতে পারে, এমনই একটি ঘটনার অবতারণা হয়েছিল মুকুন্দ দাশের যাত্রাগানে। প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর ‘বাতায়ন’ নামে স্মৃতিচারণ গ্রন্থে আছে তারই উল্লেখ- ‘একবার ময়মনসিংহ শহরে মুকুন্দ দাশের দল আছে। তখন বাংলাময় মুকুন্দ দাশের নাম।ক্সক্স তখন আমার বাসায় ছিলেন নোয়াখালীর মৌলভী আহ্ছানউল্লা।ক্সক্স- বললাম, ‘মৌলভী সাহেব চলুন, গানটি শুনে আসি।’ যাত্রা শুনাকে যে আমি গুনাহ্ মনে করি।’ মৌলভী সাহেবের এ কথার উত্তরে আমি বললাম, ‘কিন্তু না দেখেশুনেই তো এতকাল রায় দিয়ে এসেছেন, আজ গিয়ে শুনুন, দরকার হয় কাল সকালে তওবা করে জোরেসোরে ফতোয়া দেবেন।’ মৌলভী সাহেব রাজি হলেন। গেলাম। মুকুন্দ দাশের বিরাট বপু। সেই বপু নিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে তার বিশাল বাহু দুলিয়ে আর অপূর্ব সুন্দর কণ্ঠে সুললিত ভাষায় যে অভিনয় করলেন, যে গান গাইলেন, প্রায় ২০ হাজার লোক রাত ৯টা থেকে ২টা পর্যন্ত তা মুগ্ধ চিত্তে শুনল। কোথাও সুই পড়ার শব্দ হল না। ফিরার পথে মৌলভী সাহেবকে বললাম, ‘তাহলে মৌলভী সাহেব, সকালে তো তওবা করতেই হবে।’ তওবা! কি জন্য তওবা?! ‘এই যে গান শুনলাম।’ মৌলভী সাহেব বললেন, ‘গান! এই জিনিসকে গান বলে কে?ক্সক্স- মানুষকে সেবার জন্য, মানুষকে হক পথে পরিচালনার জন্য উনি যেসব কথা বললেন, সে যে সত্যিকারের ওয়াজ-নসিহত।

মুকুন্দ দাশ সাতটি যাত্রাপালা রচনা করেছেন। তার যে পালাটি ইংরেজ সরকার প্রথম বাজেয়াপ্ত করে এবং তাকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হয় তার নাম ‘মাতৃপূজা।’

রাজা বাদশার ঘরে যাত্রা : ১৯১০ সালে যাত্রার নতুন পালাবদল। প্রথম ঐতিহাসিক পালা রচনা- ‘পদ্মিণী।’ তবে উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে পরীক্ষামূলকভাবে ঐতিহাসিক পালা রচনার সূচনা করেন- চ’য়ে পাগলা নামে এক মুসলিম পালাকার। পালাটির নাম ছিল- ‘কালাপাহাড়।’ দিল্লির বাদশাহ আলাউদ্দিন খিলজীর অতর্কিতে চিতোর আক্রমণ এবং রাজপুত রানা ভীমসিংহের অপরূপা স্ত্রীকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা- এ আখ্যান অবলম্বনে রচিত হয়েছে পদ্মিণী পালা। এ কৃতিত্ব পালাকার হরিপদ চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৭১-১৯২৬)। যাত্রায় ব্যালে নৃত্যের প্রচলন এ পালা থেকে। পরবর্তীতে ব্যালের নতুন নাম হয় ‘ব্যালট।’ ১২টি মেয়ের অংশগ্রহণে ব্যালট তৈরি হয় এবং তারা সম্রাট-বেগম, রাজা-রানী কিংবা যে কোনো উল্লেখযোগ্য চরিত্রের তাৎক্ষণিক মানসিক প্রতিক্রিয়া নৃত্যগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করে। ‘সোহরাব-রুস্তম’ যাত্রাপালায় সূচনা দৃশ্যে সন্তানসম্ভবা তাহমিনা যখন পরম করুণাময়ের দোয়া কামনা করছেন, সেই সময় ব্যালটের মেয়েরা ত্বরিত গতিতে মঞ্চে এসে হেসে খেলে আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে এভাবে :

‘ভাবনা কি আর সই

ঘরের কাছে এসে গেছে স্বর্গে ওঠার মই।’

যাত্রার জয়যাত্রা : গত এক’শ বছরের যাত্রাশিল্পের ক্রমবিকাশ এবং এর উন্নয়ন উৎকর্ষের মূলে রয়েছে শিক্ষিত, সমকালীন সচেতনতাবোধ ও জ্ঞানবুদ্ধি সম্পন্ন যাত্রাপালাকারদের নিরবচ্ছিন্ন কর্মপ্রয়াস। বাঙালির অন্যতম আদি সংস্কৃতি যাত্রার প্রতি এক শ্রেণী শিক্ষিত বাঙালিরই মজ্জাগত অনীহা রয়েছে। এই হীনমন্যতা সেকালেও ছিল, একালেও আছে। উন্নাসিক ও ম্লেষাত্মক মনোভাব নিয়ে তারা ‘যাত্রা’ শব্দটি উচ্চারণ করে থাকেন। এ শ্রেণীর শিক্ষিতদের বিশ্বাস, যাত্রা যারা করে কিংবা লেখে তারা সমাজের অপাঙ্ক্তেয়, স্কুল-কলেজের চৌকাঠ মাড়ায়নি। যাত্রার ধারাবাহিক ইতিহাস জানা থাকলে এ রকম অমূলক ধারণার সৃষ্টি হতো না।

প্রথম সার্থক ঐতিহাসিক পালার রচয়িতা হাওড়া জেলার কল্যাণপুরের হরিপদ চট্টোপাধ্যায় (১৮৭১-১৯২০) হুগলি নর্মাল স্কুলের এবং কলকাতা সংস্কৃত কলেজের ছাত্র ছিলেন। তার পালা রচনার বিশেষত্ব এই যে, পৌরাণিক কিংবা ঐতিহাসিক যে কাহিনীই হোক রূপক ও প্রতীকের মাধ্যমে স্বদেশ চেতনায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। এ কারণে ইংরেজ সরকার হরিপদ’র তিনখানা পালা ‘পদ্মিণী’, ‘রনজিৎ রাজার জীবন যজ্ঞ’ ও ‘দুর্গাসুর’ বাজেয়াপ্ত করেছিল।

যাত্রাপালাকার অঘোর চন্দ্র ভট্টাচার্য (১৮৭২-১৯৪৩) ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। ভাষা ও ব্যাকরণে অগাধ পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘কাব্যতীর্থ’ উপাধী পান। বাংলাদেশের নড়াইল জেলার মল্লিকপুরে তার জন্ম। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পালা: ‘মগধ বিজয়’, ‘দাতা কর্ণ’, ‘সমুদ্র মন্থন’, ‘হরিশচন্দ্র’ ও ‘অনন্ত মাহাত্ম্য।’ অনন্তমাহাত্ম্য যাত্রাপালায় অভিনয় করেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের নারী চরিত্রের বিখ্যাত অভিনয়শিল্পী নগেন নন্দী (১৯০৩-১৯৮৪)।

পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাত্রাকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে এক বিশিষ্ট নাম ভোলানাথ রায় (১৮৯১-১৯৩৩)। বর্ধমান জেলার রায়ান গ্রামের অধিবাসী এ পালাকারের স্বতন্ত্র শিল্প চেতনা যাত্রার যাত্রাপথকে গতিশীল করেছে। যাত্রাপালায় দার্শনিক যুক্তিতর্কের চাতুর্যময় সংলাপ বুননের প্রথম কৃতিত্ব তার। যাত্রার প্রচলিত অসম্ভব দীর্ঘ সংলাপকে যথাসম্ভব ক্ষুদ্রাকৃতি করার পরীক্ষা-নিরীক্ষাও প্রথম তার হাতেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় হাটে-মাঠে খোলা প্রান্তরে যাত্রা প্রদর্শনী যখন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল, তখন ভোলানাথ রায়ের ‘পৃথিবী’ পালাটি মঞ্চায়িত হয় কলকাতার মনমোহন থিয়েটারে। প্রসেনিয়াম মঞ্চে বিশেষ ব্যবস্থায় এটাই প্রথম যাত্রানুষ্ঠান। ১৯১৬ সালের ১৬ অক্টোবর গণেশ অপেরা পার্টির পরিবেশনায় এ যাত্রা সম্পর্কে পরের দিন অমৃতবাজার পত্রিকার রিপোর্ট : Last Tuesday (16 October, 1971) at 5. p.m the Ganesh opera party held a performance of the grand mythological five-act drama Babu Bholanath Roy called the ÔPrithiviÕ on the Stage of Monomohon Theatre, which was filled up with the highest number of enthusiastic audience.

১৯২১ সালে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ভাব ভাষা ছন্দে সাহিত্যাঙ্গণে যেমন নতুন জাগরণ নিয়ে আসে, তেমনি একই বছরে প্রকাশিত ভোলানাথ রায়ের ‘আদিশূর’ পালাটিও যাত্রাশিল্পে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ পালায় সঙ্গীতের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটি চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন। প্রথম দুই পঙ্ক্তি-

‘আমার সোনার বাঙ্গালা দেশ

সোনায় গড়া সযতনে নখ হতে দূর মাথার কেশ’



শৃংখলিত বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য আশু প্রয়োজন এক ঐক্যবদ্ধ লড়াই। এই একটি মাত্র বক্তব্যই তিনি পৌরাণিক ধাঁচে প্রতীক ও উপমা দিয়ে প্রকাশ করেছেন ‘জরাসন্ধ’ পালায় (১৯৩০)। ইংরেজ শাসকরা পালাটি বাজেয়াপ্ত করে। বাংলা ভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য ভোলানাথ রায় ‘কাব্যশাস্ত্রী’ উপাধী পান। কাব্যশাস্ত্রীর উত্তরসূরীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনজন পালাকার হলেন হাওড়া জেলার সাতরাগাছির ফণীভূষণ মুখোপাধ্যায় (১৮৯৩-১৯৬৮), চব্বিশ পরগনার রামনগর গ্রামের সৌরিন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় (১৯০০-১৯৯৮) এবং হুগলি জেলার পাকড়ি গ্রামের বিনয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় (১৯০২-১৯৬৬)। ফণীভূষণ যাত্রাজগতে ‘বড় ফনীবাবু’ নামে পরিচিত। শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান-বুদ্ধিতে সেকালে তার স্থান ছিল সর্বোচ্চে। তাকে বলা হয় ‘পণ্ডিত পালাকার।’ যে জন্য ‘বিদ্যাবিনোদ’ শব্দ অলংকারটি তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

যাত্রাপালায় জাতীয় জাগরণ : বিশ শতকের শুরু থেকেই দেখা যায় শিক্ষিত পালাকাররা যে বিষয়বস্তু এবং যে ঢংয়েই যাত্রার বই লেখেন না কেন, তার অন্তর্নিহিত মূল সরটি ছিল দেশপ্রেম। শব্দ ও সংলাপের ঝংকারে ধ্বনিত হতো ঔপনিবেশিক শাসক চক্রের কবল থেকে বাংলা ও বাঙালির মুক্তির বারতা। এসব পালা কাহিনী জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বালাতে পারে- এ আশংকায় ব্রিটিশ সরকার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মুকুন্দ দাশ থেকে পরবর্তীকালের অনেক লেখকের পালা বাজেয়াপ্ত করে। কোনো কোনো পালায় লেখকের কারাবরণও করতে হয়েছে। বড় ফনীবাবুও শ্বেতাঙ্গ ‘প্রভু’দের চক্ষুশূল ছিলেন। ‘নির্বাচিত বাংলা যাত্রা’ সংকলনের তৃতীয় খণ্ডের ভূমিকায় দেবজিত বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘ফণীভূষণের ‘বামন অবতার’ আর ‘রত্নেশ্বর’ পালার অভিনয় বন্ধ হয় ব্রিটিশ পুলিশের রোষে। এ ছাড়া তার ‘মুক্তি’ যাত্রাপালা রাজরোষে পড়ে।’

মঞ্চ ও যাত্রার অভিনয়ের রীতিনীতি নিয়ে ‘অভিনয় শিক্ষা’ নামে একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন ফণীভূষণ বিদ্যাবিনোদ।

স্কুল শিক্ষক সৌরীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় যাত্রাপালা রচনার পাশাপাশি সাময়িকীতে গল্প কবিতা লিখতেন। ‘ধর্মবল’, ‘আত্মাহুতি’, ‘ব্যাথার পূজা’, ‘পলাশীর পরে’ প্রভৃতি তার সৃষ্টিশীল পালা রচনা। তার বিশেষ কৃতিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসের পালারূপ দেয়া। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আদর্শ শিক্ষক হিসেবে সরকরি পদক লাভ করেন পালাকার বিনয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় (১৯০২-১৯৬৬)। স্বদেশ চেতনা ও সাম্য সম্প্রীতির জয়গানের পাশাপাশি তার পালায় উঠে এসেছে চোরাকারবারি, কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্য, সরকারি আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দুর্নীতি ইত্যাকার বিষয়ে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চিত্র। তার রচিত পালার তালিকায় রয়েছে, ‘রক্তকমল’, ‘সংগ্রাম’, ‘মাটির প্রেম’, ‘বেইমান’ ও ‘ভুলের কাজল।’

ইমাম যাত্রার কথা : ১৯৩০ সাল। স্বদেশী যাত্রা থেকে আর এক নতুন যাত্রার জন্ম-‘ইমাম যাত্রা’। মীর মশাররফ হোসেনের (১৮৪৭-১৯১১) ‘বিষাদ-সিন্ধু’ অবলম্বনে রচিত এজিদ বধ, জয়নাল উদ্ধার, সখিনার বিলাপ- এ তিনখানা পালা নিয়েই ইমাম যাত্রার নামকরণ। এক সময় যাত্রাপালা বলতেই হিন্দু দেবদেবীদের পুরাণনির্ভর কাহিনীই বুঝাত। তারপর রাজা বাদশাদের বীরত্বগাথা নিয়ে ঐতিহাসিক পালা রচনার একটি ধারা গড়ে ওঠে। মুসলিম ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আখ্যানভিত্তিক পালা যাত্রার আসরে পরিবেশিত হবে- সমকালীন সমাজে এটা ছিল কল্পনাতীত ব্যাপার। বরিশালের বাকেরগঞ্জ থানার দুধল গ্রামের স্বশিক্ষিত পালাকার মোজাহের আলী শিকদার (১৯১০-১৯৮৫) সেই কল্পনাকে যখন বাস্তবে রূপ দিলেন, মীর মশাররফ হোসেনকে নিয়ে এলেন যাত্রার আসরে, তখনই এ শিল্পের ইতিহাসে উন্মোচিত হল এক নতুন অধ্যায়। ইমাম যাত্রার রচয়িতা হিসেবে খ্যাত হলেন মোজাহের শিকদার। তার দলের নাম ছিল মুসলিম যাত্রাপার্টি। এখানেও আমরা দেখতে পাই এক ভিন্ন আদর্শিক চেতনা। ড. তপন বাগচী তার গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এটি মুসলিম পরিচালিত প্রথম যাত্রা দল।

যাত্রার নতুন পালাবদল : স্বদেশী যাত্রার প্রভাবে দেশপ্রেমমূলক ঐতিহাসিক যাত্রাপালা রচনার একটি ধারা গড়ে ওঠে অবিভক্ত বাংলাদেশে। স্বদেশী আন্দোলনের চেতনা সাধারণ জনগণের মধ্যে সঞ্চারিত করার দায়বোধ থেকে কোনো কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে জাতীয় নায়ক হিসেবে মঞ্চে এনে দাঁড় করিয়েছেন পালা লেখক ও নাট্যকাররা। ১৯০৫ সালে মঞ্চায়িত গিরিশ ঘোষের সিরাজউদ্দৌলার কথা আগেই উল্লেখিত হয়েছে। এ ধারার পরবর্তী নাট্যরচনা: দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের (১৮৬৩-১৯১৩) ‘মেবার পতন’, ‘রানী দুর্গাবতী’ শচীন সেন গুপ্তের ‘গৈরিক পতাকা’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং যাত্রাপালা শশাংক রায়ের ‘নবাব সিরাজ।’ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে শচীন সেন গুপ্তের সিরাজ দাঁড়িয়েছেন মঞ্চে। মুখে তার সাম্য সম্প্রীতির চিরায়ত সংলাপ- ‘বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়। মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি গুলবাগ এ বাংলা।

এ ঐতিহাসিক ঘটনার ছয় বছর আগে ১৯৩২ সালে বাংলাদেশের এক বিখ্যাত যাত্রাপালাকার ব্রজেন্দ্র কুমার দের (১৯০৭-১৯৭৬) আত্মপ্রকাশ। পেশাদার যাত্রাদল গণেশ অপেরা পার্টির জন্য প্রথম পালা লিখলেন ‘বজ নাভ।’ বিশিষ্ট যাত্রানট একুশে পদকপ্রাপ্ত অমলেন্দু বিশ্বাস (১৯২৫১৯৮৭) রামেন্দু মজুমদার সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘থিয়েটারে’ (এপ্রিল-মে-জুন সংখ্যা ১৯৮৭) ‘যাত্রার অতীত ও বর্তমান’ নিবন্ধে ব্রজেন দে সম্পর্কে লিখেছেন: ‘১৯৩২ সালে যাত্রাঙ্গনে আরেক মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হল। আধুনিক যুগের আদ্যভাগে ক্ষুরধার লেখনী হস্তে যাত্রাপালাকার রূপে আবির্ভূত হলেন পালাসম্রাট ব্রজেন্দ্র কুমার দে। শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত থেকেও তিনি পঞ্চাশ বছর ধরে যাত্রাপালা রচনায় নিবেদিত ছিলেন।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা, ১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষ- এ পটভূমিতে প্রগতিশীল ধারার লেখক ও নাট্যকর্মীদের সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে ওঠে সর্বভারতীয় গণনাট্য সংঘের নবনাট্য সংঘের নবনাট্য আন্দোলন। এ নতুন নাট্যধারার সূচনা বিজন ভট্টাচার্যের (১৯১৫-১৯৭৮) ‘নবান্ন’ নাটক দিয়ে। এর প্রভাব পড়ে যাত্রায়ও। দুর্ভিক্ষের জন্য মহাজন মজুদদার ও চোরাকারবারিদের দায়ী করে ব্রজেন্দ্র কুমার দে লিখলেন যাত্রাপালা ‘আকালের দেশ।’ অনেকে এ পালাটিকে সামাজিক পালা হিসেবে উল্লেখ করেন। পালাকার নিজেই বলেছেন, এটি আধা সামাজিক পালা। প্রথম পূর্ণাঙ্গ সামাজিক পালা ‘নিষিদ্ধ ফল’ বা ‘দোষী কে’ তিনি রচনা করেন ১৯৬০ সালে। ‘আকালের দেশ’ অভিনীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপথগামী উচ্ছৃংখল ব্যবসায়ীরা পালাকারের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে নিজের জন্মভূমি (শরীয়তপুর জেলার গংগানগর গ্রাম) ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যেতে বাধ্য হন তিনি।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এই ২৪ বছরে সংগঠিত যাত্রা দলের সংখ্যা ছিল ২৬। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দল : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জয়দুর্গা অপেরা, ভাগ্যলক্ষ্মী অপেরা, রয়েল ভোলানাথ অপেরা, চট্টগ্রামের গীতশ্রী মুক্তমঞ্চ নাট্য প্রতিষ্ঠান, ময়মনসিংহের গণেশ অপেরা, নবরঞ্জন অপেরা, ফরিদপুরের নিউ বাসন্তী অপেরা, সাতক্ষীরার আর্য অপেরা, মানিকগঞ্জের অম্বিকা নাট্য প্রতিষ্ঠান, জগন্নাথ অপেরা এবং গোপালগঞ্জের রায় কোম্পানি যাত্রা পার্টি, দিপালী অপেরা, ঝালকাঠির নাথ কোম্পানি, সিরাজগঞ্জের বাসন্তী অপেরা। পূর্ব পাকিস্তানের বহুল আলোচিত ভিন্নধর্মী একটি যাত্রা দল গড়ে ওঠে চট্টগ্রামে, ১৯৫৮ সালে। নাম বাবুল অপেরা। প্রতিষ্ঠাতা-২০, ঘাটফরহাদবেগ লেনের একজন ব্যবসায়ী আমিন শরীফ চৌধুরী। এ দল থেকেই অমলেন্দু বিশ্বাস ও তুষার দাশগুপ্ত যাত্রার বড় মাপের অভিনেতা হিসেবে বিপুল খ্যাতির অধিকারী হন। এ দলটিই প্রথম যাত্রামঞ্চে নারী-পুরুষ সমন্বয়ে সহঅভিনয় প্রথা চালু করে।

আমাদের জাতীয় জাগরণের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। সেই ক্রান্তিকালে চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান বানালেন ‘জীবন থেকে নেয়া।’ কিন্তু এটা অনেকেরই অজানা যে, তারও আগে চট্টগ্রামের বাবুল অপেরার পরিবেশনায় গণআন্দোলনভিত্তিক পালা ‘একটি পয়সা’ মঞ্চে আসে ১৯৬৮ সালে। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার পূজোবাড়িতে (আশানন্দ হলে) ভৈরবনাথ গঙ্গোপাধ্যায় রচিত পালাটি প্রথম মঞ্চস্থ হয়। কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভিনেতা ছিলেন নটসম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাস। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধুর বজ কণ্ঠে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম/ এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ চেতনার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল যাত্রাশিল্পেও। ব্যানারে, ফেস্টুনে, দেয়ালে যাত্রাশিল্পীরা লিখলেন- ‘এ দেশ ছাড়বি কিনা বল/ নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।’ দেশাত্মবোধক পালা ও গণসঙ্গীতের সুর মূর্ছনায় বিভিন্ন দলের শিল্পীরা মাতিয়ে রাখে বাংলার জনপদ।

যাত্রা : স্বাধীনতার পর : মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে শুরু হল গ্রুপ থিয়েটার নাট্যচর্চা। সমাজ জীবনের নতুন ঐকতান বেজে উঠল যাত্রামঞ্চেও। ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রামে ‘থিয়েটার-৭৩’-এর প্রতিষ্ঠা। ওই বছরের ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামেরই যাত্রাদল বাবুল অপেরা যশোরের সাগরদাঁড়ির মধুমেলায় পরিবেশন করে বিধায়ক ভট্টাচার্য রচিত যাত্রাপালা ‘বিদ্রোহী মাইকেল মধুসূদন।’ এ মঞ্চায়নের নেপথ্যে যার বিশেষ ভূমিকা ছিল, তিনি যশোরের তদানীন্তন জেলা প্রশাসক আবদুস সামাদ। মধুসূদন চরিত্রে অভিনয় করে অমলেন্দু বিশ্বাস দেশীয় যাত্রাভিনয়ের একটি নতুন ধারার পথিকৃৎ হয়ে রইলেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আমরা দেখি চট্টগ্রামের গীতশ্রী যাত্রা ইউনিটের লেনিন (১৯৭৪), মানিকগঞ্জের চারণিক নাট্যগোষ্ঠীর হিটলার (১৯৭৫), সিরাজগঞ্জের বানীশ্রী নাট্য প্রতিষ্ঠানের জানোয়ার (১৯৭৬), চট্টগ্রামের নবারুণ নাট্য সংস্থার ৯টি বিনোদিনী (১৯৭৬), সিরাজগঞ্জের বাসন্তী অপেরার মা-মাটি-মানুষ (১৯৭৯), মানিকগঞ্জের নিউ গণেশ অপেরার বিদ্রোহী নজরুল (১৯৭৯), খুলনার শিরিন যাত্রা ইউনিটের ক্লিওপেট্রা ও দস্যু রানী ফুলন দেবী (১৯৮০) এবং ময়মনসিংহের নবরঞ্জন অপেরার চিড়িয়াখানা (১৯৮১) প্রভৃতি উন্নত মানের পালা। স্বাধীনতার প্রথম দশ বছরে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাভিনয়ের যে গুণগত মান আমরা দেখলাম, এর ধারাবাহিকতা পরে আর রক্ষা করা যায়নি। ১৯৯০-এর পরের ইতিহাস, যাত্রাশিল্পের শুধু অবক্ষয়ের ইতিহাস। রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা, প্রশাসনিক জটিলতা আর অশ্লীলতার আগ্রাসন ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে ঠেলে দিয়েছে একেবারে ধ্বংসের অতলে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি যাত্রাশিল্পের সার্বিক উন্নয়নে বিচ্ছিন্ন কিছু প্রয়াস গ্রহণ করলেও এর পেশাদারিত্ব টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে তেমন কোনো বড় ধরনের উদ্যোগ কখনও দেখা যায়নি। কেবল কয়েকটি যাত্রা উৎসবের মধ্যেই একাডেমির যাত্রাবিষয়ক কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থেকেছে। যাত্রাশিল্পীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি যাত্রা-নীতিমালা গেজেটভুক্ত হলেও এর সুফল পাচ্ছে না শিল্পীরা। সমগ্র জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক যে, এ দেশে জাতীয় নাট্যশালা, চিত্রশালা, সঙ্গীত ও নৃত্যচর্চা কেন্দ্র সবই আছে। কিন্তু নেই একটি জাতীয় যাত্রামঞ্চ।

কবি শামসুর রাহমান একদা বলেছিলেন, ‘যাত্রা বাংলাদেশের হৃদয় থেকে উঠে এসেছে।’ কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এ দেশে এ মাটিতেই অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কবলে ধুঁকে ধুঁকে মরছে এ শিল্পটি। সঠিকভাবে পরিচর্যা, লালন ও সংরক্ষণ অর্থাৎ জাতীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া না গেলে আমাদের আশংকা, বাংলার গৌরবদীপ্ত যাত্রাশিল্প স্থানান্তরিত হবে জাদুঘরে।

লেখক : গবেষক

সভাপতি- বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ


 

সাবমিট

বাংলার যাত্রা : বাঁকে বাঁকে এবং একুশ শতকে

 মিলন কান্তি দে 
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে দেশজ সংস্কৃতি ধারার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে যাত্রার স্বীকৃতি আছে। নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ি বলেন, ‘আমাদের জাতীয় নাট্য বলিয়া যদি কিছু থাকে তাহাই যাত্রা।’ অধ্যাপক ও নাট্য গবেষক জিয়া হায়দার (১৯৩৬-২০০৮) এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘যাত্রাই আমাদের জাতীয় নাট্য’। শুরুতেই যাত্রাপালার যে কনসার্ট অর্থাৎ ঐকতান বেজে ওঠে, তার সুরে সুরে যেন আমরা অনুভব করি শস্য শ্যামল এ বাংলার বহুমাত্রিক সঙ্গীতের তাল-লয়-ছন্দের এক অপূর্ব সম্মিলন। ‘যাত্রা’ শব্দটি আবেগপ্রবণ বাঙালি মনকে আলোড়িত করে নিমিষেই এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ে এর বহুবিধ ব্যবহার এরকম : শোভাযাত্রা, স্নানযাত্রা, রথযাত্রা, মঙ্গলযাত্রা, যুদ্ধযাত্রা, বরযাত্রা, বিদেশ যাত্রা, শবযাত্রা, শুভযাত্রা-বহু রকমারী যাত্রা। আবার হাটে-বাজারে কিংবা নদীর পাড়ে কোনো যাত্রা প্যান্ডেল থেকে মাইকে ভেসে আসে কানফাটা আওয়াজ ‘যাত্রা-যাত্রা-যাত্রা’। সংস্কৃতির এই ধারাটি যুগের পর যুগ এসেছে ভিন্ন রূপে ভিন্ন সাজে।

উনিশ শতকের ষষ্ঠ ও সপ্তম দশকে শিক্ষিত ও সৌখিন সমাজে যাত্রার এক নতুন রূপান্তর ঘটে, যার নাম গীতাভিনয়। এ নতুন ধারার যাত্রাকে সমাজের বিশিষ্টজনদের কাছে সমাদৃত করে তোলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির সদস্যরা। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের গবেষণা থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের শৈশব ও কৈশোরকালে কলকাতায় নতুন যাত্রার যুগ। বাংলায় একদা কৃষ্ণযাত্রা, রাসযাত্রা, রাই জন্মাদিনী যাত্রা ও বিদ্যাসুন্দর যাত্রার যে রূপ ছিল, তা পরিবর্তিত হয়ে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে পরিমার্জিত রূপে নতুন যাত্রার আত্মপ্রকাশ ঘটে। কবিগুরুর বাল্যকালে দেখা এমনি এক পালার নাম ‘নলদময়ন্তী।’

১৮৭২ সাল সাধারণ রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠার বছর। এ বছরেই যাত্রাকে আধুনিক চিন্তাচেতনায় উন্নীত করলেন ‘যাত্রাগুরু’ বলে খ্যাত বর্ধমানের ভার্ৎশালা গ্রামের মতিলাল রায় (১৮৩২-১৯০৮)। ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশালের মাচরঙ্গের নট্ট কোম্পানি ইংরেজশাসিত বাংলাদেশে প্রথম পেশাদারি যাত্রা সংগঠন। পশ্চিমবঙ্গে এ দলের সক্রিয় কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে।

যাত্রাপালার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ‘বিবেক।’ নাট্যতত্ত্বমীমাংসা গ্রন্থে ড. সাধন কুমার ভট্টাচার্যের উক্তি-‘বিবেকই বাংলা যাত্রা নাটকের পতাকা চিহ্ন।’ ১৮৯৪ সালে পালাকার অহীভূষণ ভট্টাচার্য তার ‘সুরথ-উদ্ধার’ যাত্রাপালায় সর্বপ্রথম বিবেক সৃষ্টি করেন। ১২২ বছর আগে যাত্রাপালায় প্রথম বিবেকের গান-

‘ওরে আপন বুঝে চল এই বেলা

ও যে বাস্তু শকুন উড়ছে মাথার গো

বসে যুক্তি দিচ্ছেন হাড়গেলা।’

(সংক্ষেপিত)

এভাবে বিভিন্ন পালাবদলের মধ্য দিয়ে রূপান্তর ঘটেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার।

স্বদেশী যাত্রা : বিশ শতকের সূচনায় পরাধীন জাতিকে মুক্তির গান শোনালেন নতুন যাত্রার নতুন যুবরাজ চারণকবি মুকুন্দ দাশ (১৮৭৮-১৯৩৪)। তার স্বদেশী যাত্রার বিস্ফোরণ ঘটল গোটা দেশজুড়ে। প্রেক্ষাপটটি ছিল এরকম : ১৯০৫ সালের অক্টোবরে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা ছিল এ দেশের মিলিত হিন্দু মুসলমানের সাম্য সম্প্র্রীতি বিনষ্ট করার জন্য ইংরেজ বেনিয়াদের এক পরিকল্পিত রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি। শুরু হল দেশব্যাপী বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন। এ সময় থেকে বাঙালির মানসভূমে স্বদেশ চেতনা এক ভিন্নমাত্রায় রূপ নিল। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন- ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘আমার সোনার বাংলা’, রমেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী লিখলেন, ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা।’ পাশাপাশি মঞ্চায়ন হতে লাগল ‘পলাশীর পরে’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’, ‘রানাপ্রতাপ’ প্রভৃতি দেশপ্রেমমূলক নাটকগুলো। বঙ্গভঙ্গ আইনজারির ওই বছরেই (১৯০৫) আধুনিক রঙ্গমঞ্চের জনক গিরিশ ঘোষ (১৮৪৪-১৯১২) নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে একটি উৎকৃষ্ট নাটক রচনা করেন। মঞ্চস্থ হয়েছিল কলকাতার মিনার্ভা থিয়েটারে ১৯০৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। সেই উত্তাল সময়ে জাতীয় জাগরণের এক সংগ্রামী নায়ক হিসেবে সিরাজকে মঞ্চে আনার গিরিশ ঘোষের এ কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। অনেকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে এ জন্য যে, বঙ্গভঙ্গ বিধানটি তো সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয় ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর। তাহলে এর একমাস আগে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন শুরু না হতেই জাতীয় চেতনা সৃষ্টিকারী নাটক লেখার প্রয়াস কেন? আসলে বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার খসড়া তৈরি হয়েছিল ১৯০৩ সালে বাংলার ছোট লাট এন্ডু ফ্রেজার আর ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব হার্বাট রিজলের প্রস্তাবেই। তখন থেকেই ইংরেজ শাসকচক্রের অশুভ পাঁয়তারার বিরুদ্ধে জনরোষ ধূমায়িত হচ্ছিল। আর বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন থেকেই ঐতিহ্যবাহী যাত্রার একটি নতুন ধারা সৃষ্টি হল- ‘স্বদেশী যাত্রা।’ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধের এ নতুন যাত্রার অধিকর্তা মুকুন্দদাশ গলা ছেড়ে গাইলেন :

‘আমি দশ হাজার প্রাণ যদি পেতাম

তবে ফিরিঙ্গি বণিকের গৌরব রবি

অতলে জলে ডুবিয়ে দিতাম।’

(যাত্রাপালা মাতৃপূজা)



যাত্রাপালার প্রাণশক্তি যে কত প্রবল এবং এর ভাবরস মুহূর্তেই বিপরীত চিন্তার মানুষগুলোকে সুস্থ ভাবনায় ফিরিয়ে আনতে পারে, এমনই একটি ঘটনার অবতারণা হয়েছিল মুকুন্দ দাশের যাত্রাগানে। প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর ‘বাতায়ন’ নামে স্মৃতিচারণ গ্রন্থে আছে তারই উল্লেখ- ‘একবার ময়মনসিংহ শহরে মুকুন্দ দাশের দল আছে। তখন বাংলাময় মুকুন্দ দাশের নাম।ক্সক্স তখন আমার বাসায় ছিলেন নোয়াখালীর মৌলভী আহ্ছানউল্লা।ক্সক্স- বললাম, ‘মৌলভী সাহেব চলুন, গানটি শুনে আসি।’ যাত্রা শুনাকে যে আমি গুনাহ্ মনে করি।’ মৌলভী সাহেবের এ কথার উত্তরে আমি বললাম, ‘কিন্তু না দেখেশুনেই তো এতকাল রায় দিয়ে এসেছেন, আজ গিয়ে শুনুন, দরকার হয় কাল সকালে তওবা করে জোরেসোরে ফতোয়া দেবেন।’ মৌলভী সাহেব রাজি হলেন। গেলাম। মুকুন্দ দাশের বিরাট বপু। সেই বপু নিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে তার বিশাল বাহু দুলিয়ে আর অপূর্ব সুন্দর কণ্ঠে সুললিত ভাষায় যে অভিনয় করলেন, যে গান গাইলেন, প্রায় ২০ হাজার লোক রাত ৯টা থেকে ২টা পর্যন্ত তা মুগ্ধ চিত্তে শুনল। কোথাও সুই পড়ার শব্দ হল না। ফিরার পথে মৌলভী সাহেবকে বললাম, ‘তাহলে মৌলভী সাহেব, সকালে তো তওবা করতেই হবে।’ তওবা! কি জন্য তওবা?! ‘এই যে গান শুনলাম।’ মৌলভী সাহেব বললেন, ‘গান! এই জিনিসকে গান বলে কে?ক্সক্স- মানুষকে সেবার জন্য, মানুষকে হক পথে পরিচালনার জন্য উনি যেসব কথা বললেন, সে যে সত্যিকারের ওয়াজ-নসিহত।

মুকুন্দ দাশ সাতটি যাত্রাপালা রচনা করেছেন। তার যে পালাটি ইংরেজ সরকার প্রথম বাজেয়াপ্ত করে এবং তাকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হয় তার নাম ‘মাতৃপূজা।’

রাজা বাদশার ঘরে যাত্রা : ১৯১০ সালে যাত্রার নতুন পালাবদল। প্রথম ঐতিহাসিক পালা রচনা- ‘পদ্মিণী।’ তবে উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে পরীক্ষামূলকভাবে ঐতিহাসিক পালা রচনার সূচনা করেন- চ’য়ে পাগলা নামে এক মুসলিম পালাকার। পালাটির নাম ছিল- ‘কালাপাহাড়।’ দিল্লির বাদশাহ আলাউদ্দিন খিলজীর অতর্কিতে চিতোর আক্রমণ এবং রাজপুত রানা ভীমসিংহের অপরূপা স্ত্রীকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা- এ আখ্যান অবলম্বনে রচিত হয়েছে পদ্মিণী পালা। এ কৃতিত্ব পালাকার হরিপদ চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৭১-১৯২৬)। যাত্রায় ব্যালে নৃত্যের প্রচলন এ পালা থেকে। পরবর্তীতে ব্যালের নতুন নাম হয় ‘ব্যালট।’ ১২টি মেয়ের অংশগ্রহণে ব্যালট তৈরি হয় এবং তারা সম্রাট-বেগম, রাজা-রানী কিংবা যে কোনো উল্লেখযোগ্য চরিত্রের তাৎক্ষণিক মানসিক প্রতিক্রিয়া নৃত্যগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করে। ‘সোহরাব-রুস্তম’ যাত্রাপালায় সূচনা দৃশ্যে সন্তানসম্ভবা তাহমিনা যখন পরম করুণাময়ের দোয়া কামনা করছেন, সেই সময় ব্যালটের মেয়েরা ত্বরিত গতিতে মঞ্চে এসে হেসে খেলে আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে এভাবে :

‘ভাবনা কি আর সই

ঘরের কাছে এসে গেছে স্বর্গে ওঠার মই।’

যাত্রার জয়যাত্রা : গত এক’শ বছরের যাত্রাশিল্পের ক্রমবিকাশ এবং এর উন্নয়ন উৎকর্ষের মূলে রয়েছে শিক্ষিত, সমকালীন সচেতনতাবোধ ও জ্ঞানবুদ্ধি সম্পন্ন যাত্রাপালাকারদের নিরবচ্ছিন্ন কর্মপ্রয়াস। বাঙালির অন্যতম আদি সংস্কৃতি যাত্রার প্রতি এক শ্রেণী শিক্ষিত বাঙালিরই মজ্জাগত অনীহা রয়েছে। এই হীনমন্যতা সেকালেও ছিল, একালেও আছে। উন্নাসিক ও ম্লেষাত্মক মনোভাব নিয়ে তারা ‘যাত্রা’ শব্দটি উচ্চারণ করে থাকেন। এ শ্রেণীর শিক্ষিতদের বিশ্বাস, যাত্রা যারা করে কিংবা লেখে তারা সমাজের অপাঙ্ক্তেয়, স্কুল-কলেজের চৌকাঠ মাড়ায়নি। যাত্রার ধারাবাহিক ইতিহাস জানা থাকলে এ রকম অমূলক ধারণার সৃষ্টি হতো না।

প্রথম সার্থক ঐতিহাসিক পালার রচয়িতা হাওড়া জেলার কল্যাণপুরের হরিপদ চট্টোপাধ্যায় (১৮৭১-১৯২০) হুগলি নর্মাল স্কুলের এবং কলকাতা সংস্কৃত কলেজের ছাত্র ছিলেন। তার পালা রচনার বিশেষত্ব এই যে, পৌরাণিক কিংবা ঐতিহাসিক যে কাহিনীই হোক রূপক ও প্রতীকের মাধ্যমে স্বদেশ চেতনায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। এ কারণে ইংরেজ সরকার হরিপদ’র তিনখানা পালা ‘পদ্মিণী’, ‘রনজিৎ রাজার জীবন যজ্ঞ’ ও ‘দুর্গাসুর’ বাজেয়াপ্ত করেছিল।

যাত্রাপালাকার অঘোর চন্দ্র ভট্টাচার্য (১৮৭২-১৯৪৩) ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। ভাষা ও ব্যাকরণে অগাধ পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘কাব্যতীর্থ’ উপাধী পান। বাংলাদেশের নড়াইল জেলার মল্লিকপুরে তার জন্ম। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পালা: ‘মগধ বিজয়’, ‘দাতা কর্ণ’, ‘সমুদ্র মন্থন’, ‘হরিশচন্দ্র’ ও ‘অনন্ত মাহাত্ম্য।’ অনন্তমাহাত্ম্য যাত্রাপালায় অভিনয় করেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের নারী চরিত্রের বিখ্যাত অভিনয়শিল্পী নগেন নন্দী (১৯০৩-১৯৮৪)।

পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাত্রাকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে এক বিশিষ্ট নাম ভোলানাথ রায় (১৮৯১-১৯৩৩)। বর্ধমান জেলার রায়ান গ্রামের অধিবাসী এ পালাকারের স্বতন্ত্র শিল্প চেতনা যাত্রার যাত্রাপথকে গতিশীল করেছে। যাত্রাপালায় দার্শনিক যুক্তিতর্কের চাতুর্যময় সংলাপ বুননের প্রথম কৃতিত্ব তার। যাত্রার প্রচলিত অসম্ভব দীর্ঘ সংলাপকে যথাসম্ভব ক্ষুদ্রাকৃতি করার পরীক্ষা-নিরীক্ষাও প্রথম তার হাতেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় হাটে-মাঠে খোলা প্রান্তরে যাত্রা প্রদর্শনী যখন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল, তখন ভোলানাথ রায়ের ‘পৃথিবী’ পালাটি মঞ্চায়িত হয় কলকাতার মনমোহন থিয়েটারে। প্রসেনিয়াম মঞ্চে বিশেষ ব্যবস্থায় এটাই প্রথম যাত্রানুষ্ঠান। ১৯১৬ সালের ১৬ অক্টোবর গণেশ অপেরা পার্টির পরিবেশনায় এ যাত্রা সম্পর্কে পরের দিন অমৃতবাজার পত্রিকার রিপোর্ট : Last Tuesday (16 October, 1971) at 5. p.m the Ganesh opera party held a performance of the grand mythological five-act drama Babu Bholanath Roy called the ÔPrithiviÕ on the Stage of Monomohon Theatre, which was filled up with the highest number of enthusiastic audience.

১৯২১ সালে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ভাব ভাষা ছন্দে সাহিত্যাঙ্গণে যেমন নতুন জাগরণ নিয়ে আসে, তেমনি একই বছরে প্রকাশিত ভোলানাথ রায়ের ‘আদিশূর’ পালাটিও যাত্রাশিল্পে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ পালায় সঙ্গীতের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটি চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন। প্রথম দুই পঙ্ক্তি-

‘আমার সোনার বাঙ্গালা দেশ

সোনায় গড়া সযতনে নখ হতে দূর মাথার কেশ’



শৃংখলিত বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য আশু প্রয়োজন এক ঐক্যবদ্ধ লড়াই। এই একটি মাত্র বক্তব্যই তিনি পৌরাণিক ধাঁচে প্রতীক ও উপমা দিয়ে প্রকাশ করেছেন ‘জরাসন্ধ’ পালায় (১৯৩০)। ইংরেজ শাসকরা পালাটি বাজেয়াপ্ত করে। বাংলা ভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য ভোলানাথ রায় ‘কাব্যশাস্ত্রী’ উপাধী পান। কাব্যশাস্ত্রীর উত্তরসূরীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনজন পালাকার হলেন হাওড়া জেলার সাতরাগাছির ফণীভূষণ মুখোপাধ্যায় (১৮৯৩-১৯৬৮), চব্বিশ পরগনার রামনগর গ্রামের সৌরিন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় (১৯০০-১৯৯৮) এবং হুগলি জেলার পাকড়ি গ্রামের বিনয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় (১৯০২-১৯৬৬)। ফণীভূষণ যাত্রাজগতে ‘বড় ফনীবাবু’ নামে পরিচিত। শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান-বুদ্ধিতে সেকালে তার স্থান ছিল সর্বোচ্চে। তাকে বলা হয় ‘পণ্ডিত পালাকার।’ যে জন্য ‘বিদ্যাবিনোদ’ শব্দ অলংকারটি তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

যাত্রাপালায় জাতীয় জাগরণ : বিশ শতকের শুরু থেকেই দেখা যায় শিক্ষিত পালাকাররা যে বিষয়বস্তু এবং যে ঢংয়েই যাত্রার বই লেখেন না কেন, তার অন্তর্নিহিত মূল সরটি ছিল দেশপ্রেম। শব্দ ও সংলাপের ঝংকারে ধ্বনিত হতো ঔপনিবেশিক শাসক চক্রের কবল থেকে বাংলা ও বাঙালির মুক্তির বারতা। এসব পালা কাহিনী জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বালাতে পারে- এ আশংকায় ব্রিটিশ সরকার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মুকুন্দ দাশ থেকে পরবর্তীকালের অনেক লেখকের পালা বাজেয়াপ্ত করে। কোনো কোনো পালায় লেখকের কারাবরণও করতে হয়েছে। বড় ফনীবাবুও শ্বেতাঙ্গ ‘প্রভু’দের চক্ষুশূল ছিলেন। ‘নির্বাচিত বাংলা যাত্রা’ সংকলনের তৃতীয় খণ্ডের ভূমিকায় দেবজিত বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘ফণীভূষণের ‘বামন অবতার’ আর ‘রত্নেশ্বর’ পালার অভিনয় বন্ধ হয় ব্রিটিশ পুলিশের রোষে। এ ছাড়া তার ‘মুক্তি’ যাত্রাপালা রাজরোষে পড়ে।’

মঞ্চ ও যাত্রার অভিনয়ের রীতিনীতি নিয়ে ‘অভিনয় শিক্ষা’ নামে একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন ফণীভূষণ বিদ্যাবিনোদ।

স্কুল শিক্ষক সৌরীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায় যাত্রাপালা রচনার পাশাপাশি সাময়িকীতে গল্প কবিতা লিখতেন। ‘ধর্মবল’, ‘আত্মাহুতি’, ‘ব্যাথার পূজা’, ‘পলাশীর পরে’ প্রভৃতি তার সৃষ্টিশীল পালা রচনা। তার বিশেষ কৃতিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসের পালারূপ দেয়া। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আদর্শ শিক্ষক হিসেবে সরকরি পদক লাভ করেন পালাকার বিনয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় (১৯০২-১৯৬৬)। স্বদেশ চেতনা ও সাম্য সম্প্রীতির জয়গানের পাশাপাশি তার পালায় উঠে এসেছে চোরাকারবারি, কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্য, সরকারি আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দুর্নীতি ইত্যাকার বিষয়ে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চিত্র। তার রচিত পালার তালিকায় রয়েছে, ‘রক্তকমল’, ‘সংগ্রাম’, ‘মাটির প্রেম’, ‘বেইমান’ ও ‘ভুলের কাজল।’

ইমাম যাত্রার কথা : ১৯৩০ সাল। স্বদেশী যাত্রা থেকে আর এক নতুন যাত্রার জন্ম-‘ইমাম যাত্রা’। মীর মশাররফ হোসেনের (১৮৪৭-১৯১১) ‘বিষাদ-সিন্ধু’ অবলম্বনে রচিত এজিদ বধ, জয়নাল উদ্ধার, সখিনার বিলাপ- এ তিনখানা পালা নিয়েই ইমাম যাত্রার নামকরণ। এক সময় যাত্রাপালা বলতেই হিন্দু দেবদেবীদের পুরাণনির্ভর কাহিনীই বুঝাত। তারপর রাজা বাদশাদের বীরত্বগাথা নিয়ে ঐতিহাসিক পালা রচনার একটি ধারা গড়ে ওঠে। মুসলিম ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আখ্যানভিত্তিক পালা যাত্রার আসরে পরিবেশিত হবে- সমকালীন সমাজে এটা ছিল কল্পনাতীত ব্যাপার। বরিশালের বাকেরগঞ্জ থানার দুধল গ্রামের স্বশিক্ষিত পালাকার মোজাহের আলী শিকদার (১৯১০-১৯৮৫) সেই কল্পনাকে যখন বাস্তবে রূপ দিলেন, মীর মশাররফ হোসেনকে নিয়ে এলেন যাত্রার আসরে, তখনই এ শিল্পের ইতিহাসে উন্মোচিত হল এক নতুন অধ্যায়। ইমাম যাত্রার রচয়িতা হিসেবে খ্যাত হলেন মোজাহের শিকদার। তার দলের নাম ছিল মুসলিম যাত্রাপার্টি। এখানেও আমরা দেখতে পাই এক ভিন্ন আদর্শিক চেতনা। ড. তপন বাগচী তার গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এটি মুসলিম পরিচালিত প্রথম যাত্রা দল।

যাত্রার নতুন পালাবদল : স্বদেশী যাত্রার প্রভাবে দেশপ্রেমমূলক ঐতিহাসিক যাত্রাপালা রচনার একটি ধারা গড়ে ওঠে অবিভক্ত বাংলাদেশে। স্বদেশী আন্দোলনের চেতনা সাধারণ জনগণের মধ্যে সঞ্চারিত করার দায়বোধ থেকে কোনো কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে জাতীয় নায়ক হিসেবে মঞ্চে এনে দাঁড় করিয়েছেন পালা লেখক ও নাট্যকাররা। ১৯০৫ সালে মঞ্চায়িত গিরিশ ঘোষের সিরাজউদ্দৌলার কথা আগেই উল্লেখিত হয়েছে। এ ধারার পরবর্তী নাট্যরচনা: দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের (১৮৬৩-১৯১৩) ‘মেবার পতন’, ‘রানী দুর্গাবতী’ শচীন সেন গুপ্তের ‘গৈরিক পতাকা’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং যাত্রাপালা শশাংক রায়ের ‘নবাব সিরাজ।’ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে শচীন সেন গুপ্তের সিরাজ দাঁড়িয়েছেন মঞ্চে। মুখে তার সাম্য সম্প্রীতির চিরায়ত সংলাপ- ‘বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়। মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি গুলবাগ এ বাংলা।

এ ঐতিহাসিক ঘটনার ছয় বছর আগে ১৯৩২ সালে বাংলাদেশের এক বিখ্যাত যাত্রাপালাকার ব্রজেন্দ্র কুমার দের (১৯০৭-১৯৭৬) আত্মপ্রকাশ। পেশাদার যাত্রাদল গণেশ অপেরা পার্টির জন্য প্রথম পালা লিখলেন ‘বজ নাভ।’ বিশিষ্ট যাত্রানট একুশে পদকপ্রাপ্ত অমলেন্দু বিশ্বাস (১৯২৫১৯৮৭) রামেন্দু মজুমদার সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘থিয়েটারে’ (এপ্রিল-মে-জুন সংখ্যা ১৯৮৭) ‘যাত্রার অতীত ও বর্তমান’ নিবন্ধে ব্রজেন দে সম্পর্কে লিখেছেন: ‘১৯৩২ সালে যাত্রাঙ্গনে আরেক মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হল। আধুনিক যুগের আদ্যভাগে ক্ষুরধার লেখনী হস্তে যাত্রাপালাকার রূপে আবির্ভূত হলেন পালাসম্রাট ব্রজেন্দ্র কুমার দে। শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত থেকেও তিনি পঞ্চাশ বছর ধরে যাত্রাপালা রচনায় নিবেদিত ছিলেন।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা, ১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষ- এ পটভূমিতে প্রগতিশীল ধারার লেখক ও নাট্যকর্মীদের সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে ওঠে সর্বভারতীয় গণনাট্য সংঘের নবনাট্য সংঘের নবনাট্য আন্দোলন। এ নতুন নাট্যধারার সূচনা বিজন ভট্টাচার্যের (১৯১৫-১৯৭৮) ‘নবান্ন’ নাটক দিয়ে। এর প্রভাব পড়ে যাত্রায়ও। দুর্ভিক্ষের জন্য মহাজন মজুদদার ও চোরাকারবারিদের দায়ী করে ব্রজেন্দ্র কুমার দে লিখলেন যাত্রাপালা ‘আকালের দেশ।’ অনেকে এ পালাটিকে সামাজিক পালা হিসেবে উল্লেখ করেন। পালাকার নিজেই বলেছেন, এটি আধা সামাজিক পালা। প্রথম পূর্ণাঙ্গ সামাজিক পালা ‘নিষিদ্ধ ফল’ বা ‘দোষী কে’ তিনি রচনা করেন ১৯৬০ সালে। ‘আকালের দেশ’ অভিনীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপথগামী উচ্ছৃংখল ব্যবসায়ীরা পালাকারের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে নিজের জন্মভূমি (শরীয়তপুর জেলার গংগানগর গ্রাম) ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যেতে বাধ্য হন তিনি।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এই ২৪ বছরে সংগঠিত যাত্রা দলের সংখ্যা ছিল ২৬। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দল : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জয়দুর্গা অপেরা, ভাগ্যলক্ষ্মী অপেরা, রয়েল ভোলানাথ অপেরা, চট্টগ্রামের গীতশ্রী মুক্তমঞ্চ নাট্য প্রতিষ্ঠান, ময়মনসিংহের গণেশ অপেরা, নবরঞ্জন অপেরা, ফরিদপুরের নিউ বাসন্তী অপেরা, সাতক্ষীরার আর্য অপেরা, মানিকগঞ্জের অম্বিকা নাট্য প্রতিষ্ঠান, জগন্নাথ অপেরা এবং গোপালগঞ্জের রায় কোম্পানি যাত্রা পার্টি, দিপালী অপেরা, ঝালকাঠির নাথ কোম্পানি, সিরাজগঞ্জের বাসন্তী অপেরা। পূর্ব পাকিস্তানের বহুল আলোচিত ভিন্নধর্মী একটি যাত্রা দল গড়ে ওঠে চট্টগ্রামে, ১৯৫৮ সালে। নাম বাবুল অপেরা। প্রতিষ্ঠাতা-২০, ঘাটফরহাদবেগ লেনের একজন ব্যবসায়ী আমিন শরীফ চৌধুরী। এ দল থেকেই অমলেন্দু বিশ্বাস ও তুষার দাশগুপ্ত যাত্রার বড় মাপের অভিনেতা হিসেবে বিপুল খ্যাতির অধিকারী হন। এ দলটিই প্রথম যাত্রামঞ্চে নারী-পুরুষ সমন্বয়ে সহঅভিনয় প্রথা চালু করে।

আমাদের জাতীয় জাগরণের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। সেই ক্রান্তিকালে চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান বানালেন ‘জীবন থেকে নেয়া।’ কিন্তু এটা অনেকেরই অজানা যে, তারও আগে চট্টগ্রামের বাবুল অপেরার পরিবেশনায় গণআন্দোলনভিত্তিক পালা ‘একটি পয়সা’ মঞ্চে আসে ১৯৬৮ সালে। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার পূজোবাড়িতে (আশানন্দ হলে) ভৈরবনাথ গঙ্গোপাধ্যায় রচিত পালাটি প্রথম মঞ্চস্থ হয়। কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভিনেতা ছিলেন নটসম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাস। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধুর বজ কণ্ঠে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম/ এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ চেতনার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল যাত্রাশিল্পেও। ব্যানারে, ফেস্টুনে, দেয়ালে যাত্রাশিল্পীরা লিখলেন- ‘এ দেশ ছাড়বি কিনা বল/ নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।’ দেশাত্মবোধক পালা ও গণসঙ্গীতের সুর মূর্ছনায় বিভিন্ন দলের শিল্পীরা মাতিয়ে রাখে বাংলার জনপদ।

যাত্রা : স্বাধীনতার পর : মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে শুরু হল গ্রুপ থিয়েটার নাট্যচর্চা। সমাজ জীবনের নতুন ঐকতান বেজে উঠল যাত্রামঞ্চেও। ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রামে ‘থিয়েটার-৭৩’-এর প্রতিষ্ঠা। ওই বছরের ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামেরই যাত্রাদল বাবুল অপেরা যশোরের সাগরদাঁড়ির মধুমেলায় পরিবেশন করে বিধায়ক ভট্টাচার্য রচিত যাত্রাপালা ‘বিদ্রোহী মাইকেল মধুসূদন।’ এ মঞ্চায়নের নেপথ্যে যার বিশেষ ভূমিকা ছিল, তিনি যশোরের তদানীন্তন জেলা প্রশাসক আবদুস সামাদ। মধুসূদন চরিত্রে অভিনয় করে অমলেন্দু বিশ্বাস দেশীয় যাত্রাভিনয়ের একটি নতুন ধারার পথিকৃৎ হয়ে রইলেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আমরা দেখি চট্টগ্রামের গীতশ্রী যাত্রা ইউনিটের লেনিন (১৯৭৪), মানিকগঞ্জের চারণিক নাট্যগোষ্ঠীর হিটলার (১৯৭৫), সিরাজগঞ্জের বানীশ্রী নাট্য প্রতিষ্ঠানের জানোয়ার (১৯৭৬), চট্টগ্রামের নবারুণ নাট্য সংস্থার ৯টি বিনোদিনী (১৯৭৬), সিরাজগঞ্জের বাসন্তী অপেরার মা-মাটি-মানুষ (১৯৭৯), মানিকগঞ্জের নিউ গণেশ অপেরার বিদ্রোহী নজরুল (১৯৭৯), খুলনার শিরিন যাত্রা ইউনিটের ক্লিওপেট্রা ও দস্যু রানী ফুলন দেবী (১৯৮০) এবং ময়মনসিংহের নবরঞ্জন অপেরার চিড়িয়াখানা (১৯৮১) প্রভৃতি উন্নত মানের পালা। স্বাধীনতার প্রথম দশ বছরে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাভিনয়ের যে গুণগত মান আমরা দেখলাম, এর ধারাবাহিকতা পরে আর রক্ষা করা যায়নি। ১৯৯০-এর পরের ইতিহাস, যাত্রাশিল্পের শুধু অবক্ষয়ের ইতিহাস। রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা, প্রশাসনিক জটিলতা আর অশ্লীলতার আগ্রাসন ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে ঠেলে দিয়েছে একেবারে ধ্বংসের অতলে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি যাত্রাশিল্পের সার্বিক উন্নয়নে বিচ্ছিন্ন কিছু প্রয়াস গ্রহণ করলেও এর পেশাদারিত্ব টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে তেমন কোনো বড় ধরনের উদ্যোগ কখনও দেখা যায়নি। কেবল কয়েকটি যাত্রা উৎসবের মধ্যেই একাডেমির যাত্রাবিষয়ক কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থেকেছে। যাত্রাশিল্পীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি যাত্রা-নীতিমালা গেজেটভুক্ত হলেও এর সুফল পাচ্ছে না শিল্পীরা। সমগ্র জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক যে, এ দেশে জাতীয় নাট্যশালা, চিত্রশালা, সঙ্গীত ও নৃত্যচর্চা কেন্দ্র সবই আছে। কিন্তু নেই একটি জাতীয় যাত্রামঞ্চ।

কবি শামসুর রাহমান একদা বলেছিলেন, ‘যাত্রা বাংলাদেশের হৃদয় থেকে উঠে এসেছে।’ কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এ দেশে এ মাটিতেই অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কবলে ধুঁকে ধুঁকে মরছে এ শিল্পটি। সঠিকভাবে পরিচর্যা, লালন ও সংরক্ষণ অর্থাৎ জাতীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া না গেলে আমাদের আশংকা, বাংলার গৌরবদীপ্ত যাত্রাশিল্প স্থানান্তরিত হবে জাদুঘরে।

লেখক : গবেষক

সভাপতি- বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ


 

 
প্রিন্ট সংস্করণ অনলাইন সংস্করণ
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র