¦

এইমাত্র পাওয়া

  • রাজধানীর দক্ষিণখানে এক নারীসহ ৩ জনের লাশ উদ্ধার
পেশকারদের চাতুরিতে স্থবির এক হাজার মামলার বিচার

ওবায়েদ অংশুমান | প্রকাশ : ২৩ জুন ২০১৪

পেশকারদের চাতুরির ফলে ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলার ৭৪টি ফৌজদারি আদালতে কমপক্ষে প্রায় এক হাজার মামলার বিচারকাজ স্থবির হয়ে আছে। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এর পেশকার ইফতেখার উদ্দিন কামাল গত ১৯ জুন যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টা মামলায় সাক্ষীদের বিরুদ্ধে মামলার নথিতে গ্রেফতারি পরোয়ানার আদেশ রয়েছে কিন্তু কখনই তা পাঠানো হয়নি। বিচারক দেওয়ান মোঃ শফিউল্লাহ পরোয়ানা পাঠাতে নিষেধ করেছিলেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড বোমা হামলা মামলায় যেদিন তারিখ থাকত, সেদিনও এই মামলার তারিখ ফেলতে বলতেন বিচারক। যাতে মামলার বিচার বন্ধ থাকে। কারণ ২১ আগস্ট ও এই মামলার অধিকাংশ আসামিই এক। প্রায় তিন বছর এভাবেই মামলার বিচার কার্যত বন্ধ ছিল। আসামিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কিংবা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়ে পরোয়ানা না পাঠিয়ে পেশকাররা গুরুতর অনিয়ম করে চলেছেন। সাক্ষী ও আসামিদের কাছে পরোয়ানা না পাঠানোর কারণে সাক্ষীরা আদালতে আসেন না ও আসামিকে গ্রেফতারও করতে পারে না পুলিশ। পাশাপাশি ইচ্ছা করেই ভুল ঠিকানায় পরোয়ানা পাঠান অনেক পেশকার, যাতে করে সাক্ষীদের গ্রেফতার করে আদালতে না আনতে পারে পুলিশ। অনেক সময় সাক্ষী এলেও তাদের পেশকাররা সাক্ষ্য না দিয়ে চলে যেতে বলেন। এসব কারণে বছরের পর বছর শেষ হয় না মামলার বিচার। ঢাকার উল্লেখিত আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলোর নথি পর্যালোচনা ও যুগান্তরের নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা গেছে উল্লেখিত সব তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩০ মে পর্যন্ত ৭৭৭ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিতে এসে ফিরে গেছেন। এর মধ্যে পুলিশ সদস্য ৫৫৫ জন আর পাবলিক সাক্ষী আছেন ২২২ জন। বিশেষ করে পেশকাররা সাক্ষ্য না দিয়ে বাড়ি চলে যেতে বলেছেন ১৯৩ জন সাক্ষীকে। ভুল ঠিকানায় গ্রেফতারি পরোয়ানা পাঠানোর কারণে ৭৩ জন আদালতে এসে সাক্ষ্য দিতে পারেননি। আর সঠিক সময়ে পরোয়ানা না পাঠানোর কারণে ১৩৮ জন সাক্ষী আদালতে এলেও সাক্ষ্য দিতে পারেননি। এছাড়া বিচারক ছুটিতে ও উপস্থিত না থাকা এবং আলামত ও আসামি আদালতে উপস্থিত না করার কারণে ৪০৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে পারেননি। আর পরোয়ানা পাঠানো হয় না এমন মামলার সংখ্যা ২২৪। ভুল ঠিকানায় সমন পাঠানো হয়েছে এমন মামলার সংখ্যা ৩২৪। আর এক বছর পর পর মামলার তারিখ ফেলানো হচ্ছে এমন মামলার সংখ্যা ১৫৪।
মামলার তারিখ পেশকারদের জালিয়াতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যুগান্তরকে শুক্রবার টেলিফোনে বলেন, পেশকারদের জালিয়াতির কারণে মামলার বিচারকাজ স্থবির হয়ে পড়বে তা কখনই মেনে নেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর হত্যাচেষ্টা মামলায় পরোয়ানা না পাঠানোর বিষয়টি তদন্ত করে অবিলম্বে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। আর যেসব পেশকার এইসব কারসাজির সঙ্গে জড়িত রয়েছে তাদের তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।
ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এ বিচারাধীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টা মামলার নথি পর্যালোচনায় জানা যায়, জনসভায় শেখ হাসিনার ভাষণের জন্য মঞ্চ নির্মাণের সময় গত ২০০০ সালের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ার শেখ লুৎফর রহমান মহাবিদ্যালয়ের উত্তর পাশের একটি দোকানের সামনে থেকে মাটিতে পুঁতে রাখা ৭৬ কেজি ওজনের বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। দুদিন পরে ওই কলেজের মাঠে জনসভায় ভাষণ দেয়ার কথা ছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী গোপালগঞ্জ সদর থানার সাবেক পরিদর্শক মোঃ আমিনুর রহমান। বর্তমানে যিনি ঢাকা মহানগরের অপরাধ ও তথ্য বিভাগের সহকারী কমিশনার। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের নিচে তার অফিস। মামলার নথিতে তার বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। কিন্তু তিনি গত তিন বছরে আদালতের কোনো সমন কিংবা পরোয়ানা পাননি।
জানতে চাইলে আমিনুর রহমান সম্প্রতি যুগান্তরকে বলেন, সমন না পেলে কিভাবে সাক্ষ্য দিব। আমি নিজে গিয়ে ওই আদালতের পিপি সৈয়দ শামসুল হক বাদল সাহেবকে বলেছি, আমার সাক্ষ্য নেয়ার ব্যবস্থা করতে। আমার নামে সমন পাঠাতে। অপরদিকে পিপি বাদল যুগান্তরকে বলেন, এ মামলাটি নিয়ে বিপদে আছি। দেওয়ান মোঃ শফিউল্লাহসহ অনেকে বিচারক মামলাটি করতে চাননি। পেশকার সমন কিংবা গ্রেফতারি পরোয়ানা পাঠিয়েছেন কিনা জানি না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৫ জুন ঢাকার বিশেষ জজ-২ আদালতে বিচারাধীন দায়রা ১৬০/১৩ মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন কনস্টেবল মুরাদুজ্জামান। আর ঢাকা দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতে ১৪৭/১৩ মামলায় সাক্ষ্য দিতে যান কনস্টেবল আলাউদ্দিন। এই দুই সাক্ষীকে ফেরত দেন সংশ্লিষ্ট আদালতের দুই পেশকার। কনস্টেবল মুরাদুজ্জামান ও আলাউদ্দিন টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, আমরা আদালতের সমন পেয়ে সাক্ষ্য দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওই আদালতের পেশকাররা বলেছেন, আজ সাক্ষ্য হবে না। পরে আবার হবে। কবে হবে তা বলেননি।
একইভাবে গত মে মাসে ঢাকার পঞ্চম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে ৩৭/১৪ মামলার সাক্ষী এসআই আবু সালেহ, বিশেষ জজ-৩ আদালতে বিচারাধীন পল্লবী ৪০(৭)১৪ নম্বর মামলায় এএসআই আসলাম খান, পরিবেশ আপিল আদালতের ৭৫১০/১০ নম্বর মামলায় কনস্টেবল মাহাবুবুর রহমান, ঢাকার ১ম যুগ্ম দায়রা আদালতের ৫৯৭/৭৭ নম্বর মামলায় আনোয়ার নামের সাক্ষীকে ফেরত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের পেশকাররা।
আরও জানা যায়, পুলিশ যাতে আসামিকে গ্রেফতার করতে না পারে সেজন্য ঢাকার আদালতের অধিকাংশ পেশকার পয়সার বিনিময়ে ভুল ঠিকানায় গ্রেফতারি পরোয়ানা পাঠান। আর বিচার যাতে শেষ না হয় এর জন্য ভুল ঠিকানাতেও সাক্ষীদের পরোয়ানা পাঠানো হয়। এসব পরোয়ানায় সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকদের স্বাক্ষরও থাকে। ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে ৪৪৭/০৫ মামলাটি বিচারাধীন। সাভার থানার মামলা নম্বর ১৭(৮)০৫। এ মামলার এক নম্বর আসামি মোঃ সোনা মিয়া। এই আসামিকে গ্রেফতার করতে ঢাকা মহানগরের শ্যামলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর পরোয়ানা পাঠায় আদালত। পরোয়ানায় উল্লেখ করা হয়, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, শ্যামলী থানা। বাস্তবে শ্যামলী নামে ঢাকা মহানগরীতে কোনো থানা নেই। এই পরোয়ানায় ওই আদালতের বিচারকের স্বাক্ষর রয়েছে। একইভাবে ঢাকার প্রথম যুগ্ম দায়রা জজ আদালত থেকে ৬৫৮৭/১৩ মামলায় ওসি শ্যামলীকে জুনায়েদ হোসেন লস্কর নামের আসামিকে গ্রেফতার করতে পরোয়ানা পাঠানো হয় প্রসিকিউশন বিভাগে। ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে অবস্থিত ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের সাক্ষী সেলের দায়িত্বরত এসআই শেখ আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আদালত থেকে এমন পরোয়ানা আমাদের কাছে জমা দেয়া হয় যে, পরোয়ানায় যে থানার নাম থাকে সে থানার কোনো অস্তিত্ব নেই। আমাদের কাছে শ্যামলী থানা, শান্তিনগর থানা, মহাখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পাঠানোর জন্য অনেক পরোয়ানা জমা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের পেশকাররা। এ ব্যাপারে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের পেশকার ইফতেখার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আদালতের অনেক পেশকার এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত।
প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close