¦

এইমাত্র পাওয়া

  • দাবি মেনে নেয়ায় লাইটার শ্রমিকদের ধর্মঘট প্রত্যাহার || চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ৮ দেশ
প্রশাসনে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি

মোঃ ফিরোজ মিয়া | প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০১৫

যুক্তি ও প্রমাণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মতবাদ এবং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষে কল্যাণকর লিখিত বা অলিখিত নির্দেশনা বা প্রথা বা নৈতিক অনুশাসনই নীতি। নীতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে ন্যায়-অন্যায়, কর্তব্য-অকর্তব্য ইত্যাদির বিচারবোধ। নিয়মনীতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং ন্যায়-পরায়ণতার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় সুনীতি এবং
সুনীতির বিপরীত বা পরিপন্থী কাজই দুর্নীতি।
সুতরাং বলা যায়, ভালো-মন্দবোধসম্পন্ন নৈতিক শৃংখলার পরিপন্থী এবং প্রতিষ্ঠিত নীতি ও আইন বিরুদ্ধ কাজই দুর্নীতি।
স্বজনপ্রীতি, প্রিয়তোষণ, দলীয় বা গোষ্ঠীতোষণ, চতুরতা, কূটকৌশল ইত্যাদি মূল্যবোধ ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে দুর্নীতিমূলক অপরাধ হলেও দেশের ফৌজদারি আইনে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য নয়। দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে আর্থিক দুর্নীতিকেই কেবল দণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যার কারণে আর্থিক দুর্নীতি নিয়েই সমাজে হৈচৈ বেশি। বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি নিয়ে তেমন আলোচনা-সমালোচনা আমরা লক্ষ্য করি না। অথচ আর্থিক দুর্নীতির চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি অনেক ভয়াবহ এবং সমাজে এর পরিণতিও মারাত্মক।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে আর্থিক দুর্নীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির দুর্নীতির স্বরূপ কেমন। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিজে আর্থিক লাভবান হওয়া বা অন্যকে আর্থিক লাভবান হওয়ার সুযোগ করে দেয়াই আর্থিক দুর্নীতি। আর্থিক দুর্নীতি তথ্য ও সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণযোগ্য। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি তথ্য ও সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণযোগ্য নয়। এখন প্রশ্ন হল বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি কী। বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিকে অনেকে চতুরতা এবং কূটকৌশল মনে করেন। প্রকৃতপক্ষে চতুরতা ও কূটকৌশলের সঙ্গে অনৈতিকতার সংমিশ্রণ ঘটলে তা বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিতে রূপ নেয়। বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি নৈতিকতার বিচারে অবৈধ ও অপরাধ, যা ফৌজদারি আইনে অবৈধ বা অপরাধ হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে। কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির মাধ্যমে কৃত কাজটিকে জনস্বার্থে করা হয়েছে বলে প্রচার ও প্রকাশ করা হয়।
প্রশাসনে পদোন্নতিবঞ্চনা হল বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বর্তমানে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি মহামারির আকার ধারণ করেছে। এর মূল কারণ হল প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নসংক্রান্ত বিধিবিধানে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির যথেষ্ট সুযোগ রাখা হয়েছে। যেমন সরকারের উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতির বিধিমালায় যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সমগ্র চাকরিকালীন পালনকৃত দায়িত্বের গুরুত্ব ও প্রকৃতি এবং তার ব্যক্তিগত সুনামসহ প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয় বিবেচনার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু ওই বিধিমালায় তা যাচাই বা বিচারের কোনো পদ্ধতি ও মানদণ্ড নির্ধারণ করা নেই। যার কারণে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে দক্ষ কর্মকর্তা নির্বাচনের আড়ালে অধিকতর সৎ, দক্ষ ও যোগ্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে পদোন্নতিবঞ্চিত করে আনুগত্য ও দলীয় বিবেচনায় অপেক্ষাকৃত কম দক্ষ, অসৎ ও কনিষ্ঠ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া যায়, যা আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ বা দুর্নীতি হিসেবে গণ্য করা বা প্রমাণ করা আদৌ সম্ভব নয়। ফলে এর প্রতিকার করা বা পাওয়াও সম্ভব হয় না। এছাড়া গণকর্মচারী অবসর আইনের অধীনে চাকরির পঁচিশ বছরপূর্তিতে কোনোরূপ কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে কোনো কর্মচারীকে বাধ্যতামূলক অবসরদানের বিধানটিতেও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির অগাধ সুযোগ রয়েছে। এখানেও জনস্বার্থ দেখিয়ে অধিকতর দক্ষ ও সৎ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিতে পারদর্শী অসৎ এবং অপেক্ষাকৃত কম দক্ষ কনিষ্ঠ কর্মকর্তার উচ্চ পদে আসীন হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। এছাড়া বিসিএস ক্যাডারে সরাসরি নিয়োগের বিধিমালার বিষয়টিও উল্লেখ করা যায়। লিখিত পরীক্ষায় বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির মাধ্যমে পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়ার তেমন সুযোগ থাকে না, যার কারণে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০০ থেকে বৃদ্ধি করে ২০০ করে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির অধিকতর সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। কারণ অনুগত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে মৌখিক পরীক্ষার বোর্ড গঠন করে সহজেই পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব, যা সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা প্রমাণযোগ্য নয়।
সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রের মতো সম্পূর্র্ণ দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনও আশা করা যায় না। সমাজ ও রাষ্ট্রের মতো প্রশাসনেও দুর্নীতি আছে। দুর্নীতি হয়তো একেবারে নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে একে কমিয়ে আনা বা সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব। আর এজন্য প্রয়োজন সত্যিকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে যত কঠোর আইনই প্রণয়ন করা হোক না কেন প্রশাসনের দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব নয়। কারণ প্রশাসনের দুর্নীতির প্রকৃতি ও চরিত্র একটু ভিন্ন প্রকৃতির। এছাড়া প্রশাসনের উচ্চতর ও নীতিনির্ধারণী স্তরের আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে প্রচ্ছন্নভাবে জুড়ে থাকে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি, যা শনাক্ত করা এবং আইনের আওতায় আনা সম্ভব নয়।
বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির ক্ষেত্রে জনস্বার্থ শব্দটির ব্যবহার অহরহ ঘটানো হয়। অথচ জনস্বার্থের আড়ালে প্রচ্ছন্নভাবে লুকিয়ে থাকে অনৈতিক প্রিয়তোষণ, গোষ্ঠীতোষণ, দলীয়তোষণ, আত্মতোষণ, ইত্যাদি। বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিতে পারদর্শী কর্মকর্তাদেরই প্রশাসনের উচ্চস্তরে আসীন করা হয় স্বীয় বা দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে। এক্ষেত্রে জনস্বার্থ রক্ষার বা জনসেবার কোনো উদ্দেশ্যই থাকে না।
বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা জনগণের সেবার পরিবর্তে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের সেবা করে নিজের অনৈতিক কার্যকলাপ অব্যাহত রাখার জন্য, বাণিজ্যে লাভবান হওয়ার জন্য। সংবিধান মতে জনগণের সেবার চেষ্টা করা প্রত্যেক কর্মকর্তার দায়িত্ব ও কর্তব্য হলেও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিতে পারদর্শী কর্মকর্তারা তাদের মেধা, দক্ষতা ও কর্ম জনসেবায় কাজে না লাগিয়ে আত্মসেবায় লাগায়।
বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি আর্থিক দুর্নীতির জন্ম দেয়। যার কারণে আর্থিক দুর্নীতির চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি অধিকতর ভয়াবহ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অধিকতর ক্ষতিকর। লোভ-লালসার বশে মানুষ আর্থিক দুর্নীতি করে। আর বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি লোভ-লালসার জন্ম দেয়। আইনের শাসনের কঠোর প্রয়োগের দ্বারা আর্থিক দুর্নীতি অনেকাংশে দূর করা যায়, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি দূর করা যায় না। বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি ব্যক্তির মননে ও চিন্তায় মিশে যায় বলে তাকে দূর করতে দীর্ঘ সময়ের আইনের শাসনের মধ্য দিয়ে মূল্যবোধের চর্চার প্রয়োজন হয়। বর্তমানে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে আর্থিক দুর্নীতির চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দুনীতির পরিমাণ অনেক বেশি। প্রশাসনে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি হয় লোভনীয় পদে আসীন হওয়ার জন্য বা বহাল থাকার জন্য অথবা অনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য অথবা কাউকে কোনো লোভনীয় পদে আসীন করার জন্য বা বহাল রাখার জন্য। বর্তমানে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি মহামারীর মতো প্রশাসনের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ায় প্রশাসন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে এবং দেশ ও জাতি অধিকতর সৎ, দক্ষ, মেধাবী ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি আইনের শাসনের অন্তরায়। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি রোধের পদক্ষেপ না নেয়া হলে একসময় তা সমগ্র প্রশাসনে ছড়িয়ে পড়বে, ফলে প্রশাসন একটা অকার্যকর হয়ে পড়বে, যা কারও কাম্য নয়। তাই শক্তিশালী জনসেবামূলক প্রশাসন গড়ার লক্ষ্যে শিগগিরই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, এটাই সবার প্রত্যাশা।
মোঃ ফিরোজ মিয়া : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব, চাকরি ও আইনসংক্রান্ত গ্রন্থের লেখক
উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close