নুরুল আমিন    |    
প্রকাশ : ২১ মার্চ, ২০১৭ ০২:৪১:১৯
জেলে বসেই সদস্য সংগ্রহ ও দল গঠন
১২ গ্রুপে ৭০ ভুয়া ডিবি
টার্গেট হুন্ডি ব্যবসায়ী, সোনা চোরাকারবারি * শাস্তি না হওয়ায় বেপরোয়া * চুক্তির টাকা বকেয়া রেখেও জামিন
ভুয়া ডিবি চক্রের সদস্যদের সরঞ্জামাদি (ফাইল ছবি)

পুলিশের মতো অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত তারা। হাতে ওয়াকিটকি, হাতকড়া, গায়ে ডিবি লেখা জ্যাকেট, কোমরে গোঁজা পিস্তল। অভিযানের সময় সঙ্গে থাকে ডিবি লেখা কালো গ্লাসের মাইক্রোবাস। এভাবেই ডিবি পুলিশ সেজে ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে ১২টি গ্রুপ। এদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৭০। চক্রটির মূল টার্গেট হুন্ডি ব্যবসায়ী, সোনা চোরাকারবারি। এছাড়া ব্যাংক থেকে মোটা অংকের টাকা উত্তোলনকারীদেরও এরা নজরে রাখে। সুযোগমতো যাকেই পায় তাকেই ছোঁ-মেরে গাড়িতে তুলে নিয়ে সবকিছু কেড়ে নেয় এই ভুয়া ডিবি পরিচয়দানকারী চক্রের সদস্যরা। বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হলেও কঠোর শাস্তি হয় না। চুক্তির টাকা বকেয়া রেখেই জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসছে। জেলখানায় বসেই চক্রের হোতারা সদস্য সংগ্রহ করে দল চালাচ্ছে। কারাগারের একাধিক অসাধু কর্মকর্তা ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাকরিচ্যুত কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে ভুয়া চক্রের সদস্যরা কাজ করছে। কঠোর সাজা না হওয়ায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি গ্রেফতার ভুয়া ডিবি পরিচয়দানকারী অপরাধীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এবং মামলার এজাহার সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
 
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার মহরম আলী যুগান্তরকে বলেন, ভুয়া ডিবি চক্রের সদস্যরা মাঝে মধ্যেই গ্রেফতার হয়। তবে গ্রেফতার হয়ে বেশিদিন তাদের জেলে থাকতে হয় না। মোটা অংকের টাকা দিয়ে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবারও ছিনতাই, ডাকাতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় টাকা বাকি রেখেই তারা কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে। তিনি বলেন, সম্প্রতি ঢাকার রায়েরবাজার এলাকা থেকে ভুয়া ডিবি চক্রের মূল হোতা জাহাঙ্গীর আলম ওরফে শাকিলকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল জানায়, এবার গ্রেফতারের ২৫ দিন আগে সে জেল থেকে বেরিয়ে এসেছে। এর আগে শাকিল অন্তত তিনবার গ্রেফতার হয়েছে।
 
সহকারী কমিশনার মহরম আলী আরও জানান, গ্রেফতার হয়ে জেলে গিয়ে দল গঠন ও সদস্য সংগ্রহ করে তারা। এরপর জামিনে বেরিয়ে এসে একই অপরাধ করে তারা।
 
চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি প্রতিরোধ সংক্রান্ত মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ দলের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, রাজধানীতে ভুয়া ডিবি পরিচয়দানকারী ১২টি গ্রুপ সক্রিয়। এই চক্রের সোর্স রয়েছে বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা শহরে। তাদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে টার্গেট নির্ধারণ করা হয়। এ চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন সময় আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়। তবে শাস্তি না হওয়ায় আবারও একই অপরাধ করে এ চক্রের সদস্যরা।
 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ভুয়া ডিবি আটকের পর তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৭০/১৭১/৩৯৯/৪০২ ধারায় মামলা হয়। এ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের জেল। সরকারি অফিসার পরিচয়ে অপরাধ করার দায়ে তাদের ২ বছরের শাস্তি হওয়ার কথা। কিন্তু গ্রেফতারের পর তাদের তিন মাসও জেলে থাকতে হয় না। বাইরে থাকা এই চক্রের সদস্যরা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাদের জামিনে বের করে আনে।
 
ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, আদালতে এই চক্রের লোক ঠিক করা থাকে। মোটা অংকের টাকার চুক্তিতে তাদের জামিনের ব্যবস্থা করে কিছু আইনজীবী। চুক্তির পুরো টাকা তাৎক্ষণিক পরিশোধ করতে না পারলেও জামিনে বের হওয়ার পর ছিনতাই, ডাকাতি করে টাকা পরিশোধ করে চক্রের সদস্যরা। এ চক্রের সদস্যরা জেলে বসে দল গঠন করে। অন্য অপরাধে জড়িয়ে যারা জেল খাটছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এ চক্রের সদস্যরা। খাওয়া ও গোসলের সময় এদের সঙ্গে আলোচনা হয়। জেল থেকে বের হয়ে তাদের সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হলেই জামিনের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর বাইরে থাকা চক্রের মূল হোতাদের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করে তাদের জামিনের ব্যবস্থা করে। এভাবেই কারাগারে বসে চিহ্নিত অপরাধীদের নিয়ে দল গঠন করে তারা।
 
সূত্র জানায়, ডিবি পুলিশের মতো অস্ত্র, জ্যাকেট ও গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় চক্রের সদস্যরা। আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে ধরাও পড়ে কম। লম্বা ও সুঠাম দেহের অধিকারী এ চক্রের সদস্যদের ভাবসাব দেখে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, থানা ও টহল পুলিশও তাদের সন্দেহ করে না। এ সুযোগে চক্রটি প্রকাশ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই, ডাকাতি করে বেড়াচ্ছে।
 
গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, প্রত্যেক গ্রুপে থাকে ৬-১০ জন সদস্য। আর দলনেতা থাকেন সহকারী কমিশনারের ভূমিকায়। তার সঙ্গে থাকে পিস্তল ও ওয়াকিটকি। এই ভুয়া ডিবি পরিচয়দানকারী চক্রের প্রত্যেক গ্রুপে থাকে পিস্তলধারী দু’জন ভুয়া এসআই। আর লাঠি হাতে থাকে একজন ভুয়া কনস্টেবল। তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রতিটি গ্রুপের রয়েছে নিজস্ব সোর্স। সোর্সদের তথ্যের ভিত্তিতে এভাবেই সংগঠিত হয়ে শিকার খোঁজে এ প্রতারক চক্রের সদস্যরা।
 
ডিবির রামপুরা জোনের সহকারী কমিশনার ইকবাল হোসাইন যুগান্তরকে জানান, সম্প্রতি খিলগাঁও এলাকা থেকে ১১ ভুয়া ডিবিকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে সম্প্রতি ১১ অপরাধ সংঘটনের কথা স্বীকার করেছে তারা। মূল হোতা এবং প্রত্যেক সদস্য একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছে বলে তারা জানিয়েছে।
 
তবে তিন মাসের বেশি কেউ কারাগারে থাকেনি। এদের জামিনের জন্য আদালতে নির্দিষ্ট কয়েকজন আইনজীবী কাজ করেন বলে জানিয়েছে চক্রের সদস্যরা।
 
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি মো. আবদুল্লাহ আবু যুগান্তরকে বলেন, গুরুতর অপরাধে জামিন হওয়া উচিত নয়। তবে দুর্বল চার্জশিট ও মামলার এজাহারের কারণে জামিন হতে পারে। হাতেনাতে গ্রেফতার এমন গুরুতর অপরাধে জড়িতদের এত তাড়াতাড়ি জামিন হওয়া উচিত নয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনের আশ্রয় যে কেউ চাইতে পারেন। কোনো অপরাধীর পক্ষে যদি কোনো আইনজীবী লড়েন সেটা তার নৈতিকতার ব্যাপার।
ভুয়া ডিবি চক্রের টার্গেট : ভুয়া ডিবি চক্রের প্রধান টার্গেট হুন্ডি ব্যবসায়ীরা। হুন্ডি ব্যবসা অবৈধ বলে এদের টার্গেট করে তারা। কারণ হুন্ডি ব্যবসায়ীদের টাকা ছিনিয়ে নিলেও আইনশৃংখলা বাহিনীর কাছে কোনো অভিযোগ করতে পারে না। এ চক্রের সদস্যদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, হুন্ডির টাকা চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি হলেও অভিযোগ করতে পারেন না ভুক্তভোগীরা। তাই এই প্রতারক চক্রের প্রধান টার্গেট হুন্ডি ব্যবসায়ীরা। আর তাদের দ্বিতীয় টার্গেট অবৈধ সোনা চোরাকারবারিরা। এছাড়া ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনকারী ব্যক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লেনদেনকারীরা রয়েছে এদের টার্গেটে।
 
কারাগারে বসেই সদস্য সংগ্রহ ও দল গঠন : আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে প্রায় গ্রেফতার হয় সক্রিয় ১২ চক্রের সদস্যরা। জেলে গিয়েও বসে থাকে না তারা। সেখানে বিভিন্ন অপরাধে আগে থেকেই যারা জেলে রয়েছে, তাদের টার্গেট করে এ চক্রের সদস্যরা। জেলে দায়িত্বরত কারারক্ষীদের ম্যানেজ করে খাওয়া ও গোসলের সময় তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। জেলে থাকা অপরাধীরা ভুয়া ডিবি চক্রের সঙ্গে কাজ করতে রাজি হলেও তাদের জামিনের ব্যবস্থা করে বাইরে থাকা চক্রের সদস্যরা। জেল থেকে নিয়মিতভাবে এরা বাইরে যোগাযোগ রক্ষা করে বলেও জানা গেছে।
 
এ বিষয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির যুগান্তরকে বলেন, জেলে বসে অপরাধীদের মধ্যে যোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই। তবে আদালতে আনা-নেয়ার সময় অপরাধীরা বাইরে যোগাযোগ করে থাকতে পারে।
যেভাবে হয় ভুয়া ডিবির অপারেশন : ডিবি পুলিশের মতোই ভুয়া ডিবিদের অপারেশন টিমে থাকে একজন সহকারী কমিশনার। তার নেতৃত্বে একজন পরিদর্শক, দু’জন এসআই ও একজন কনস্টেবল একটি কালো গ্লাসের মাইক্রোবাস নিয়ে রাজধানীর পোস্তগোলা, আশুলিয়া, টঙ্গী, গাবতলী দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে। তাদের নিজস্ব সোর্সদের তথ্যের ভিত্তিতে টার্গেট করা জায়গা গিয়ে ছিনতাই, ডাকাতি ও ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নেয়। চক্রের মূল হোতা থাকেন সহকারী কমিশনার। টাকার সিংহভাগ পায় তিনি। বাকি টাকা ভাগ করে নেয় চক্রের অন্য সদস্যরা। আর ডিবি লেখা গাড়িটি থাকে ভাড়া করা। ১ মার্চ রাজধানীর কদমতলী এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ছয় ভুয়া ডিবিকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

গ্রেফতারকৃতরা হল- জাহাঙ্গীর আলম ওরফে মাকিল, মামুন হোসেন, আমিন গাজী, রনি ওরফে মাহবুব, ইব্রাহিম ও শাখাওয়াত হোসেন সজিব। এ সময় তাদের কাছ থেকে আসল ওয়াকিটকি, পিস্তল ও ডিবি লেখা জ্যাকেট উদ্ধার করা হয়। এর আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর খিলগাঁও এলাকা থেকে ১১ ভুয়া ডিবিকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের রামপুরা জোনাল টিম। গ্রেফতারকৃতরা হল- ইউসুফ গাজী, মালেক, আকাশ রহমান মিন্টু, আলাউদ্দিন আলী, আফসার আলী, ফারুক হোসেন, মাসুদ পারভেজ, মাহীন কাজী, লিটন শেখ, মাসুম গাজী, আসলাম শেখ।
  • সর্বশেষ খবর
জাতীয় বিভাগের অারও খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by