বদরুদ্দীন উমর    |    
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০২:৫৭:৩৫
মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারের ভূমিকা
বাংলাদেশে সরকারিভাবে কয়েকটি মাস আছে যা শোক-দুঃখ বা উৎসবের মাস হিসেবে পালিত হয়। ডিসেম্বর হল একই সঙ্গে শোক ও উৎসবের মাস। মাসব্যাপী লাখ লাখ লোকের মৃত্যুর জন্য শোক প্রকাশ করা হয় এবং স্বাধীনতার উৎসব চলতে থাকে। ১৬ ডিসেম্বর মূলত ভারতের কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হয়। এ দিনটিকে পালন করা হয় বিজয়ের দিবস হিসেবে। এ দিন থেকেই যাত্রা শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশের।

এ বছরও ১৬ ডিসেম্বরে পালিত হল বিজয় দিবস। সরকারি এবং আধাসরকারিভাবে নানা ধরনের উৎসবের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হলেও এর মধ্যে প্রাণের স্পর্শ ছিল, এটা ঠিক বলা যাবে না। মনে হবে সবকিছুই আনুষ্ঠানিকতা। এ কারণে এমন একটি দিবসের উৎসব অনুষ্ঠানগুলোতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বলে কিছু ছিল না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভে ভারতের সেনাবাহিনী ও ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে যথার্থভাবেই অনেক রিপোর্টিং এবং আলোচনা এখানকার সংবাদপত্রগুলোতে হচ্ছে। ভারত থেকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সামরিক ব্যক্তিদের ৮২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বিজয় দিবস উপলক্ষে ঢাকায় এসেছেন। মানেকশ, জগজিৎ সিং অরোরা, জেকবসহ সর্বোচ্চ পর্যায়ের ভারতীয় সামরিক কর্তাব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে লেখালেখি হয়েছে, যেমন হয়ে থাকে প্রত্যেক বছর। ১৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে প্রথম আলোর বিশেষ ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত অনেকগুলো লেখার মধ্যে একটি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ওপর। প্রবন্ধটির নাম ‘মুক্তিযুদ্ধের ধাত্রী’। মুক্তিযুদ্ধে অবদান নিয়ে অনেকের কীর্তি সম্পর্কে নানা মিথ্যা কথা বলা হয়ে থাকে। তাদের ‘কৃতিত্ব’ নিয়ে বাড়াবাড়ির অন্ত থাকে না। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারতীয় সরকার ও ভারতের সেনাবাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে যা কিছু লেখা হয় তা যথার্থ। শুধু তাই নয়, তাদের ভূমিকাকে অনেকাংশে খর্ব করার দরকার হয় অন্যদের ‘কৃতিত্ব’ দেয়ার জন্য। আসলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ও তার সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মতো। বাংলাদেশ যেভাবে স্বল্প সময়ে স্বাধীন হয়েছে সেটা ভারতীয় সেনাবাহিনী ছাড়া সম্ভব ছিল না। এদিক দিয়ে শুধু ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নয়, ভারতের সেনাবাহিনীকেও ‘মুক্তিযুদ্ধের ধাত্রী’ বললে তা অতিরঞ্জিত হয় না।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের জনগণের ওপর যে সর্বাত্মক সশস্ত্র আক্রমণ শুরু করেছিল তারপর আওয়ামী লীগের সমগ্র নেতৃত্ব, তাদের কর্মীদল, তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। দেশের মাটির ওপর দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ করার মতো কোনো প্রস্তুতিই তাদের ছিল না। ভারতে গিয়ে তাদের অবস্থা খুবই অসহায় ছিল এবং তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ভারত সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। সেই নির্ভরশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার ও ভারতীয় সেনাবাহিনী যে মুক্তিযুদ্ধের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নেবে এবং সেই যুদ্ধের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রাখবে, এটা খুব স্বাভাবিক ছিল। কাজেই হাজার হাজার বাংলাদেশী ভারতে গিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও তাদের ওপর কর্তৃত্ব ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর। আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিবাহিনীতে তাদের অন্তর্ভুক্তি বা রিক্রুটমেন্ট, তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, তাদের অস্ত্র সরবরাহ করা ইত্যাদি সবই হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন। শুধু তাই নয়, যারা সেক্টর কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করতেন, তারাও অনেকটা নিয়ন্ত্রিত হয়েছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর দ্বারা।

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারত সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল এবং তা শেষ হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর মূলত ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ড একটা থাকলেও যুদ্ধে বাংলাদেশী কমান্ডের তেমন কোনো জোরালো ভূমিকা না থাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণটা হয়েছে মূলত ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না। দ্বিতীয় ব্যক্তি এয়ার ভাইস মার্শাল একে খন্দকার উপস্থিত থাকলেও তিনি একজন অবলোকনকারী হিসেবে পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন, যা খুব স্পষ্টভাবেই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের ছবিগুলোতে দেখা যায়। আত্মসমর্পণ দলিলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কারও স্বাক্ষর ছিল না। তৎকালীন পরিস্থিতিতে সেটাই স্বাভাবিক ছিল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকার ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই ভূমিকার জন্য ১৬ ডিসেম্বর শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতেও ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। প্রকৃত অর্থেই এ দিবসটি ভারতের জন্য ছিল বিজয় দিবস। কারণ ওই দিন ভারত সরকারের শত্রু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের কাছে পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল। পাকিস্তান বিভক্ত হয়েছিল। ভারত এটা বরাবরই চাইত। কিন্তু এটা তারা চাইলেও সম্ভব ছিল না। এটা সম্ভব করেছিল পাকিস্তান সরকার নিজেই। তারা যদি ২৫ মার্চ আমাদের জনগণের ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ না চালাত তাহলে লাখ লাখ লোক ভারতে শরণার্থী হতো না। এভাবে শুধু এই লাখ লাখ লোকই নয়, আওয়ামী লীগের নেতারাও ভারতে শরণার্থী হয়েছিলেন। সেই অবস্থায় হাজার হাজার বাংলাদেশী মুক্তিযোদ্ধা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকলেও এবং যুদ্ধে অংশ নিয়ে জীবন দেয়া সত্ত্বেও পরিস্থিতির ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সে নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারত যদি আওয়ামী লীগ দেশ ছেড়ে ভারতে শরণার্থী না হয়ে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করত। সে অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ভারত সরকারের হাতে নয়, আওয়ামী লীগের হাতেই থাকত। সে অবস্থায় ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র ইত্যাদি সরবরাহ করে সাহায্য করতে পারত, কিন্তু যেভাবে তারা ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিল সেটা সম্ভব হতো না। কাজেই বাংলাদেশের বিজয় দিবস এখন ভারতেও বিজয় দিবস হিসেবে যেভাবে পালিত হয় সেটা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও থাকত না। পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী এবং আওয়ামী লীগ উভয়ে মিলেই ভারতের জন্য এই সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি করেছিল।

১৯৭১ সালে ভারত সরকার শরণার্থীদের চাপে এবং পাকিস্তানকে বিভক্ত করার সুযোগের ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ স্বাধীন করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। কাজেই ভারত সরকার বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসার কারণে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিল এটা ঠিক নয়। তাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সেই পরিস্থিতিতে ছিল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্যাতিত কোনো জনগণের জন্য, বিশেষত বিদেশী জনগণের স্বাধীনতার জন্য নির্ধারক ভূমিকা বা কোনো ধরনের ভূমিকা পালনের মতো চরিত্র ভারতীয় রাষ্ট্রের নেই। কাশ্মীরের জনগণের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক মিল আছে। কাশ্মীরের এই আন্দোলন ভারত সরকার নির্মমভাবে দমন করছে। সেখানে প্রতি তিনজনে একজন সামরিক বাহিনীর লোক মোতায়েন রাখা হয়েছে। এ কাজ যারা করে তারা অন্য দেশের জনগণের ওপর নির্যাতনে বিচলিত হয়ে তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করবে এ চিন্তা সম্পূর্ণ অবান্তর। কিন্তু এর জন্য ভারতকে দোষারোপ করা অর্থহীন। ১৯৭১ সালে তাদের সামনে যে সুযোগ উপস্থিত হয়েছিল তার ব্যবহার না করা হতো রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় ধরনের মূঢ়তা। ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত সরকার এদিক দিয়ে কোনো মূঢ়তার পরিচয় দেয়নি।

১৭.১২.২০১৬

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর
মতামত বিভাগের অারও খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by