•       ইউএনও তারিক সালমনের জামিন প্রথম দফায় মঞ্জুর না করায় বরিশালের মূখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আলী হোসইনকে বদলির প্রস্তাব সুপ্রিম কোর্টে পাঠিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়
এ কে এম শাহনাওয়াজ    |    
প্রকাশ : ২১ মার্চ, ২০১৭ ০৫:৪৮:৩২
এভাবে চললে নৌকা আটকে যাবে চরে

কথাটি ভেবে বলিনি। ধরুন কথার কথা। আড্ডার সময় যেমনটি হয়। হেফাজতিদের মনতুষ্টি করে সাম্প্রদায়িক ভাবধারার কারিকুলামে আমাদের শিশুশিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করল এনসিটিবি। সচেতন সমাজ শোরগোল তুলল। পত্রিকার পাতায় সমালোচনা-প্রতিবাদের ঝড় উঠল; কিন্তু অতি আশ্চর্যের সঙ্গে লক্ষ করলাম শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কেউ তেমনভাবে মুখ খুললেন না। নীতিনির্ধারক না হয়েও বেচারা চিত্রশিল্পী আর দু-চারজন পেটি কর্মকর্তাকে যূপকাষ্ঠে নিয়ে যাওয়া হল মনোযোগ দৃশ্যান্তরে নেয়ার জন্য।

দুর্ভাগ্য এই যে, সাম্প্রদায়িকতা মোড়ানো এ হেফাজতি ইচ্ছের বিজয় হল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া দলটির ক্ষমতায় থাকার সময় এবং বলার অপেক্ষা রাখে না সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। এ কঠিন বাস্তবতা দেখে বন্ধুদের বলছিলাম, সরকার সম্ভবত নিজ রাজনৈতিক অভিলাষ চরিতার্থ করতে হেফাজতিদের জিতিয়ে দিল; কিন্তু বুঝতে পারল যে সিন্দাবাদের বুড়োকে কাঁধে তুলে নেয়া হল। অদৃশ্য সুতায় গাঁটছড়া বাঁধা, তাই এর সূত্র ধরে জঙ্গিরা আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল বলে। আমাকে আমার অনেক বন্ধুই সমর্থন দিয়েছিলেন। এরপর সত্যি গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম ও সীতাকুণ্ডে আবার জঙ্গিদের দেখা মিলল। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করেছে। রাজধানীতে র‌্যাবের নির্মীয়মাণ সদর দফতরে আত্মঘাতী জঙ্গি বোমা নিয়ে ঢুকে গেল। বিস্ফোরণ ঘটাল। আর সবশেষে খিলগাঁওয়ে র‌্যাবের চেকপোস্টের কাছে বোমাসহ আত্মঘাতী হামলাকারী নিহত হল। এসব দেখে আমার এক অধ্যাপক বন্ধু রসিকতা করে বললেন, এবার আপনি চাইলে জ্যোতিষী ব্যবসা শুরু করতে পারেন। আমি বললাম ঝড়ে বক মরেছে আর আমার কেরামতি প্রকাশ পেয়েছে।
 
এনসিটিবির কর্মকর্তাদের কতটুকু দায়ী করা যায়! সাধ্য কী এ প্রতিষ্ঠানের নিন্মস্তরের কর্তারা যা খুশি তা করতে পারেন। কর্তার ইচ্ছেয় তাদের কর্ম করতে হয়। এমন পরিবর্তন যেনতেন কর্তার ইচ্ছে পূরণের জন্য হতে পারে না- এর জন্য খুব বড় মাপের কর্তার প্রয়োজন হয়। বইগুলোর সম্পাদকমণ্ডলীর ভাষ্য যা শুনেছি, তা একেবারে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারিনি। কোনো কোনো পত্রিকা থেকে জেনেছি সম্পাদকমণ্ডলীকে অন্ধকারে রেখে নাকি সব পাল্টে ফেলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে আমরা আশা করেছিলাম সংবাদকর্মীরা হেফাজত স্টাইলের পুনর্বিন্যাসিত বইয়ের কথা লেখার আগেই সম্পাদকমণ্ডলীর শ্রদ্ধেয় সদস্যরা বিবৃতি দিয়ে বা সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের অবস্থান ও অসহায়ত্বের কথা জানাবেন। তবে আমি বিশ্বাস করি, এ ধারার তুঘলকি কাণ্ড এনসিটিবিতে ঘটতেই পারে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও দক্ষতায় এক দল অভিজ্ঞ মানুষ কারিকুলাম প্রস্তুত ও পুস্তক প্রণয়নের পর কোনো অদৃশ্য বা দৃশ্যমান প্রবল শক্তি এসে সব ছুড়ে ফেলে দিয়ে অসাধারণ ক্ষমতায় নিজেদের ইচ্ছেয় পাণ্ডুলিপি পুনর্লিখন করে ফেলেন। আবার এ বিকলাঙ্গ বইতে মূল লেখকদের নাম বসিয়ে উপহাস করেন এবং তা এনসিটিবির বই হিসেবে শিক্ষার্থীদের হাতে চলে যায়। এভাবে সরকারের বিনামূল্যে পুস্তক বিতরণের মহতী প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। এ ধরনের কর্মযজ্ঞে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কয়েকবার আমি নিজেই ভুক্তভোগী হয়েছি।
 
আমাদের শিক্ষার্থীদের দুর্ভাগ্য তারা ক্রমাগতভাবে রাজনৈতিক সুবিধাবাদের ইচ্ছে পূরণে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯৯৬-এর বিএনপি আমলে মুদ্রিত ইতিহাস বইতে রাজনৈতিক ইচ্ছে পূরণে মুক্তিযুদ্ধ পর্বের ইতিহাসে কাটাকুটি করেছিল পরের আওয়ামী লীগ সরকারের সংস্কার কমিটি। আবার পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বিএনপি ইচ্ছেমতো কাটাকুটি করেছে। ইতিহাসের সত্য বিকৃত করেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সবাই এসব চর্চা করেছে লেখকদের অগোচরেই। বেচারা লেখকদের নামেই প্রকাশ পেয়েছে বিকৃত ইতিহাস। সেসময় আমরা লেখকরা লিখিত প্রতিবাদ করেও কারও মনোযোগ আকৃষ্ট করতে পারিনি। আবার ২০১১-তে নতুন শিক্ষানীতির আলোকে কারিকুলাম এবং গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনার চূড়ান্ত অবস্থায় লেখকদের অগোচরে এক প্রভাবশালী মহল এসে প্রবল শক্তিশালী হাতে পাণ্ডুলিপি বিকলাঙ্গ করে নিজেদের মতো করে ছাপিয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিলেন। নাম ব্যবহার করে আসামি বানালেন লেখকদের। এ পর্যায়ে লেখকরা লিখিত প্রতিবাদ করেও কোনো সুফল পাননি।
 
এজন্যই বলেছিলাম এনসিটিবির ভেতরে অনেক কিছুই হতে পারে- হয়ে যায়। কিন্তু এবারের হওয়াটা বিস্ময়কর ও মর্মান্তিক। আমরা পাকিস্তানিদের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অনেক কথা বলি। পাকিস্তান আমলে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার লাইন ‘সজীব করিব মহাশ্মশান’কে অবলীলায় সম্পাদনা করে ‘সজীব করিব গোরস্থান’ বানানো হয়েছিল। বছরের পর বছর এ বিকৃত কবিতাই আমাদের পড়তে হয়েছে; কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের রক্তমূল্যে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম। নানা পালাবদলে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন। এ দলের ক্ষমতাবান নেতা-নেত্রীরা কেমন করে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আদর্শ অসাম্প্রদায়িকতা ভুলে গেলেন, আমরা বুঝতে পারি না। যেমন করে আমরা বিএনপির সমালোচনা করে বলি বাংলাদেশকেই যারা স্বীকার করে না, মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত থেকেছে সেই জামায়াতের সঙ্গে যে কোনো নামে জোটবাঁধাকে ক্ষমা করা যায় না, ঠিক একইভাবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের জন্যও গর্হিত অপরাধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ছড়ানো ইচ্ছেকে অনুমোদন দেয়া। দুর্ভাগ্য বাস্তবে তেমনটিই হয়েছে।
 
সেই শাপলা চত্বরে নিজেদের লোক সমাগমের শক্তি প্রদর্শন করেছিল হেফাজতে ইসলাম। বিএনপিপ্রধান নগরবাসীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন হেফাজতিদের খাদ্য-পানি দিয়ে সহায়তা করতে। সরকার পতনের হাতিয়ার হিসেবে তারা হেফাজতে ইসলামের শক্তিকে দেখতে চেয়েছিল। আমার এক চাচা এখন প্রয়াত, বলেছিলেন, ‘দেখ ইসলামের লেবাস পরা হেফাজতের নেতারা কেমন মোনাফেক। সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে যাবে বলে সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে এখন কেমন গেড়ে বসেছে’। যাই হোক, সেসময় শক্ত হাতে হেফাজতিদের তাড়ানো গিয়েছিল। তবে ক্ষমতাপ্রিয় দলগুলোর কাছে হেফাজতিদের সংঘশক্তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এসময়ে গণজাগরণ মঞ্চেরও বিশাল জোয়ার ছিল। এক সময় গণজাগরণ মঞ্চ ও হেফাজত মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়। এ পর্যায়ে হেফাজতের সঙ্গে ১৩ দফা নিয়ে সরকারের দরকষাকষি চলতে থাকে। বিএনপির প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকে হেফাজতে ইসলামের প্রতি। সরকার সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এরপর অলৌকিকভাবে পরিবেশ পাল্টে গেল। গণজাগরণ মঞ্চ ভেঙে দু’টুকরো হয়ে হীনবল হয়ে পড়ল। হেফাজতি নেতারা জঙ্গি হুংকার বন্ধ করে যেন অবসরে চলে গেলেন। এরপর খুব নীরবে একে একে জঙ্গি আব্দার মিটতে থাকল। বিএনপির সঙ্গে হেফাজতিদের সম্পর্কটা আর জমল না। সবশেষে নিন্মমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় শিক্ষানীতি পাশ কাটিয়ে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিসর্জন দিয়ে হেফাজতের দাবির প্রতি নতজানু হয়ে সাম্প্রদায়িক চেহারার বই প্রকাশ করে সরকার লাখ লাখ শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিল।
 
একটি ফর্মুলায় বোধহয় আটকে গেলাম আমরা। অকাজের মানুষের মাথায় কেবল উল্টোপাল্টা ভাবনা এসে ভর করে। আমারও তেমন হল। আমার কেবল মনে হচ্ছে এখানে ‘বিএনপি ফ্যাক্টর’ কাজ করছে কিনা। সরকারের ভেতর এমন কোনো শংকা কি কাজ করছে যে, হেফাজতের তালবে এলেমদের অধিকাংশই যুক্তি-তর্ক, ন্যায়-অন্যায় বুঝতে চায় না? হুজুরদের কথায় পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, তাই এ সংঘশক্তি যাতে বিএনপির ধারে ঘেঁষতে না পারে এর জন্য প্রয়োজনে একগলা কাদাতেও নামা যাবে।
 
যদি তা না হয় তাহলে আমাদের লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে এভাবে অন্ধকারে ঠেলে দেয়া কেন? সরকার একদিকে জঙ্গি ভাবধারা থেকে তারুণ্যকে ফিরিয়ে আনার জন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শিক্ষা সিলেবাসে ছড়িয়ে দিতে চাইছে, আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সাম্প্রদায়িক চিন্তা ছড়িয়ে দিতে চাইছে কোমলমতি শিশুদের মধ্যে। একবার রাজনৈতিক কৌশল করতে দিয়ে জামায়াতের দরবারে গিয়ে আওয়ামী লীগ যে পাপ কামিয়ে ছিল নির্বাচনসহ নানা ইস্যুতে, সেই চিন্তা এখনও কি আওয়ামী লীগকে তাড়া করে বেড়ায় না? আজ হেফাজতের কাছে এ নতজানু নীতি আওয়ামী লীগের গায়ে আরও বড় কালো স্ট্যাম্প মেরে দিল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কি তা অনুভব করতে পারেন?
 
জঙ্গিবাদ তো সাম্প্রদায়িকতার উগ্র রূপ। সাম্প্রদায়িক শক্তি প্রশ্রয় পেলে উগ্র শক্তি তো উৎসাহ পাবেই। এসব অপশক্তি যদি এ সত্যটি পাঠ করতে পারে যে ক্ষমতার মোহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করতে দ্বিধা করে না, তখন সরকারের সব হুমকি বজ আঁটুনি ফস্কা গেরো হিসেবেই দেখা দেবে। কে জানে হঠাৎ করে জঙ্গিদের নতুন উদ্যমে আত্মপ্রকাশ সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে সরকারের কিছুটা আত্মসমর্পণের কারণে পাওয়া উৎসাহ থেকে কিনা। জঙ্গি দমনে আমাদের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রশংসাযোগ্য ভূমিকা রাখছে। জীবনবাজি রেখে লড়ছে; কিন্তু হেফাজতের মতো সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতি সরকারের এ আপস আচরণকে আমরা কীভাবে দেখব? হতে পারে এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল। বিএনপি এতে হয়তো আরেকটু কোণঠাসা হবে। হেফাজতের নেতারা হয়তো তাদের তালবে এলেমদের নিয়ে আর কোনো ঝামেলা করবে না। ফলে উন্নয়নের নৌকা তরতর করে এগিয়ে যাবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি সম্মান না জানিয়ে যে বালু ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তাতে যে কোনো সময় আপাত গতিশীল নৌকা বিস্তীর্ণ চরে আটকে যেতে পারে। বিষয়টি কি প্রাজ্ঞ রাজনীতিকরা বিবেচনায় রাখছেন? আমরা চাই ক্ষমতার মোহ আমাদের যাতে অন্ধ করে না দেয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি সম্মান জানিয়ে হলেও আত্মচৈতন্যে ফিরে আসতে হবে। ক্ষমতাসীনদের প্রতি আমাদের এটিই বড় চাওয়া।
 
এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
 
shahnaway7b@gmail.com
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by