ডা. শাহজাদা সেলিম    |    
প্রকাশ : ১৮ মার্চ, ২০১৭ ০৯:১০:৩০
শিশুর দৈহিক বৃদ্ধিতে করণীয়

 
 
 
সোলায়মান। মোহাম্মদ আলীর ১৭ বছর বয়সি ছেলে। উচ্চতা ১২৮ সেন্টি মিটার। নিন্ম শিক্ষিত, নিন্ম মধ্যবিত্তের মোহাম্মদ আলী আর্থিক অসঙ্গতির কারণে ছেলেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়নি। এখন মোহাম্মদ আলীর বোধদয় হয়েছে; সে চিকিৎসকের দারস্থ হচ্ছে।
 
সোলায়মানও সমাজের অন্য অনেক খাটো ছেলের মতো ঠাট্টা-তামাশার পাত্র হয়েছে। আমাদের সমাজে খাটো মানুষকে নিয়ে অনেক ঠাট্টা-তামাশা করা হয়, ব্যবহার করা হয় চলচ্চিত্র, নাটক, সার্কাস থেকে শুরু করে জীবনের বহু ক্ষেত্রেই বামনদেরকে ভাঁড় বা হাস্যরসের খোরাক হিসেবে নেয়া হয়। বামনত্ব কখনই ঠাট্টার বিষয় নয়। এটি একটি শারীরিক-হরমোনজনিত সমস্যা। 
 
যার স্বাস্থ্যসম্মত চিকিৎসা করা সম্ভব। আর সময়মতো বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা করতে পারলে ফলাফল আশাব্যঞ্জক; বিশ্বখ্যাত ফুটবলার লিওনেল মেসি এর জলজ্যান্ত উদাহরণ। এই সফল চিকিৎসার কারণেই বিশ্ব আজ তার মতো খেলোয়াড়কে পেয়েছে। 
 
কিন্তু শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া বা সঠিক দৈহিক বৃদ্ধি না হওয়ার কারণ, সমস্যা নির্ণয় ও এর চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই এখনও রয়েছে অন্ধকারে অথবা মারাত্মক ভাবে ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে অপচিকিৎসার আশ্রয় নিচ্ছে। যদিও এসব সমস্যা শনাক্তকরণ বা নিরূপণ, চিকিৎসা প্রদান ও দেখাশোনা করা আমাদের পক্ষে খুব সহজেই সম্ভব।
 
ভাবনার শুরু হতে পারে কখন
 
একটি শিশু যদি তার সমবয়সীদের তুলনায় কম উচ্চতাসম্পন্ন হয় তবেই অভিভাবকরা এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে থাকেন। তবে তার নিজের ভাই-বোনের সঙ্গে ওই একই বয়সের উচ্চতার তারতম্যটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
 
 যার বাবা-মা দু’জনই অধিক উচ্চতার, সে লম্বা হওয়ার বেশি দাবিদার। বাপ-মা খাটো হলে সন্তানও খাটো হবে সঙ্গতভাবেই তা ধরে নেয়া যায়। আবার ছেলেসন্তান সাধারণত বড় ভাই বা পিতার দৈহিক বৃদ্ধির ধারা অনুসরণ করতে পারে। 
 
কন্যা সন্তান মা বা বড় বোনের দৈহিক বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে। জেনে রাখুন একেক বয়সে উচ্চতা বৃদ্ধির হার একক রকম; ২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু বছরে ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এরপর এই হার কমে আসে এবং ৫/৬ বছর বয়স পর্যন্ত এই হার বছরে ১০-১২ সেন্টিমিটার। 
 
৬/৭ বছরে আরও কমে ৫/৬ সেন্টিমিটার হারে বাড়ে। আবার বয়ঃসন্ধিকালে হঠাৎ করে লম্বা হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং বছরে ১০/১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে থাকে। ১৪/১৫ বছর পর থেকে বৃদ্ধির হার আবারও কমতে থাকে, গড়ে ১ সেন্টিমিটার হারে বেড়ে চলে ১৯ থেকে ২১ বছর বয়স পর্যন্ত। উল্লেখ্য, এরপর বৃদ্ধি থেমে যায়।
 
দৈহিক বৃদ্ধি না হওয়া বা বামনত্বের কারণ
 
একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি অনেকটাই যেমন জিনগত ও পরিবেশগত বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, তেমনি নির্ভর করে তার সার্বিক সুস্থতা ও হরমোনের ওঠানামার ওপর। একেক এলাকায় ও একেক পরিবারে উচ্চতা প্রবণতা একেক রকম। 
 
এছাড়া শৈশবে কোনো দীর্ঘ মেয়াদি সমস্যা যেমন কিডনি বা ফুসফুসের রোগ, অপুষ্টি, হজমের গোলমাল ইত্যাদি কারণে শিশুর বৃদ্ধি ব্যহত হয়। 
 
শরীরে প্রায় সব অঙ্গ-প্রতঙ্গের বৃদ্ধি যে হরমোনগুলো নিয়ন্ত্রণ করে তার মধ্যে থায়রয়েড ও গ্রোথ হরমোন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ হরমোনগুলোর অভাবে শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি থমকে যেতে পারে বা ধীরে হতে পারে। নানা ধরনের জেনেটিক সম্যায় মানুষ খাটো হয় যেমন টার্নার বা ডাউনস সিনড্রোমে।
 
দৈহিক বৃদ্ধি প্রতিবন্ধকতা শারীরিক বা মানসিক সমস্যা সৃষ্টি করে কি
 
ঠিকমতো বৃদ্ধি না হলে একটি শিশু নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়। অনেক সময় এ বৃদ্ধি প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে যৌবন প্রাপ্ত না হওয়ার সমস্যা দেখা দেয়, যা পরবর্তীতে তার বিবাহ, সন্তান ধারণ বা পারিবারিক জীবনকে ব্যহত করবে। 
 
এছাড়া এ শিশুরা ট্রিজিং ও বুলিংয়ের শিকার হয় বেশি, সমাজে এক ঘরে হয়ে পড়ে, শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে অনেক মেধা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে পড়ে। আমাদের দেশে নানা কুসংস্কারের শিকার হয় এরা।
 
চিকিৎসা
 
কৃত্রিম গ্রোথ হরমোন আবিষ্কৃত হওয়ার আগে খর্বাকৃতি শিশুদের চিকিৎসা দুরূহ ছিল, কারণ তখন মৃত দেহের পিটুইটারি গ্রন্থির হরমোন নির্যাস সংগ্রহ করা হতো এবং এতে প্রায়ই প্রতিক্রিয়া ও নানা রোগের আশংকা থাকত। 
 
১৯৮৫ সালে এ পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়। বর্তমানে কৃত্রিম গ্রোথ হরমোন সোমাটোট্রোপিন বা নরডিট্রোপিন দিয়ে সাফল্যের সঙ্গে এর চিকিৎসা করা হচ্ছে। 
 
যে কয়েকটি সমস্যা গ্রোথ হরমোন থেরাপি ব্যহত হয় তা হল : ১ বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত শিশু যার গ্রোথ হরমোন অপর্যাপ্ত, ২. টার্নার সিনড্রোম ৩. কম ওজন ও ছোট আকার নিয়ে ভূমিষ্ঠ শিশু এবং ৪. কিডনি জটিলতা আক্রান্তের কারণে যাদের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। হরমোন বিশেষজ্ঞের (এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট) পরামর্শ অনুযায়ী এটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত প্রতিদিন রাতে নির্দিষ্ট মাত্রার গ্রোথ হরমোন ইনজেকশন দেয়া হয় এবং পর্যবেক্ষণ করা হয়। 
 
গ্রোথ হরমোনের সমস্যা ছাড়া বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার অন্য কারণ থাকলে সঠিক কারণটি নির্ণয় করে সে অনুযায়ী দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। তবে দুটো বিষয় মনে রাখবেন- এক. সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও পরামর্শ নিতে হবে এবং দুই. যত কম বয়সে চিকিৎসা শুরু করা যায় ততই ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। কৈশোর বা তারুণ্যে এসে উচ্চতা বৃদ্ধি কি সম্ভব? উচ্চতা সমস্যা নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি আমাদের দেশে কৈশরে বা তারুণ্যে এসে। 
 
যখন একটি তরুণ বা তরুণী দেখে যে সে অন্য দশ জনের মতো নয়। এ সময়ে উচ্চতা বাড়ানোর কৌশল হিসেবে নানা বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয় এবং নানা ধরনের অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার আশ্রয় নেয়। দৈহিক উচ্চতা ততদিনই বাড়ে যতদিন পর্যন্ত আমাদের কাঠামো বা কঙ্কাল বৃদ্ধি পেতে থাকে।
 
হাড়ের শেষ মাথায় অবস্থিত তরুনাস্থি বা প্লেটটি হাড়ের সঙ্গে মিশে না যায়। যৌবনপ্রাপ্ত হলে হরমোনের প্রভাবে এ প্লেট মূল হাড়ের সঙ্গে মিশে যায়। বা ফিউশন হয়ে যায়, এরপর আর হাড় লম্বায় বাড়তে পারে না। সাধারণত এ ফিউশন ছেলেদের ১৬ বছর ও মেয়েদের ১৪ বছরের মধ্যে ঘটে। যদিও ১৯ থেকে ২১ বছর পর্যন্ত আরও কিছুটা উচ্চতা বৃদ্ধি হতে পারে তবুও ফিউশন হয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসা করলে তেমন কোনো ফল পাওয়া যাবে না।
 
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট (হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
 
selimshajada@gmail.com

  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর
আমার পরিবার বিভাগের অারও খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by