নাজমুল হক ইমন    |    
প্রকাশ : ০১ আগস্ট, ২০১৭ ০৯:৪৫:১৫
নির্ভরতা আর বিশ্বাসের নাম বন্ধুত্ব
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘বন্ধুত্ব বলিতে তিনটি পদার্থ বুঝায়। দু’জন ব্যক্তি ও একটি জগৎ। অর্থাৎ দু’জনে সহযোগী হইয়া জগতের কাজ সম্পন্ন করা। আর, প্রেম, বলিলে দু’জন ব্যক্তি মাত্র বুঝায়, আর জগৎ নেই।

দু’জনেই দু’জনের জগৎ।’ বন্ধুকে অনেকে প্রেমের সঙ্গে অথবা ভালোবাসার সঙ্গে এক করে ফেলেন।

বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ইহা ছাড়া আর একটা কথা আছে প্রেম মন্দির ও বন্ধুত্ব বাসস্থান। মন্দির হইতে যখন দেবতা চলিয়া যায় তখন সে আর বাসস্থানের কাজে লাগিতে পারে না, কিন্তু বাসস্থানে দেবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।’

বন্ধু শব্দের মাঝে মিশে আছে নির্ভরতা আর বিশ্বাস। বন্ধু আর বন্ধন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বন্ধুত্ব মানেই যেন হৃদয়ের সবটুকু আবেগ নিংড়ে, ভালোবাসা দিয়ে মন খুলে জমানো কথা বলা। বন্ধুর জন্য গেয়ে ওঠা-হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে, দেখা হবে তোমার-আমার অন্যদিনের ভোরে।

প্রতি বছর আগস্টের প্রথম রোববার দুনিয়াজুড়ে পালিত হয় দিবসটি। নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশেও পালিত হয় বন্ধু দিবস। শুভেচ্ছা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে নিত্যনতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হওয়ায় কার্ডের প্রচলন হারিয়ে যেতে বসেছে।

তারপরেও বন্ধু দিবসের কার্ড তুলে দেয় বন্ধুর হাতে বন্ধু। পাশাপাশি ফুল, চকোলেট, অন্যান্য উপহারসামগ্রী দেয় কেউ কেউ। সামাজিক ওয়েবসাইট ফেসবুক, টুইটার, মোবাইল ফোনে চলায় শুভেচ্ছা আদান-প্রদান।

বন্ধু বয়স ও শ্রেণী মানে না। বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে, মায়ের সঙ্গে, বাবার সঙ্গে, ভাইয়ের সঙ্গে, বোনের সঙ্গে।

সহপাঠী হোক, হোক সমবয়সী। কোনো তফাৎ সেই বন্ধুত্বের গভীরতায় যদি কোনো খাদ না থাকে। জীবনে প্রথম বন্ধু গড়ে ওঠার স্মৃতি থাকে অমলিন। সময়ের প্রয়োজনে কোনো বন্ধু দূরে সরে যেতে পারে কিন্তু মনের দূরত্ব কখনই তৈরি হয় না।

বন্ধুর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই অমূল্য। স্কুল শুরুর দিনে যে ছেলেটি বা মেয়েটি আপনারা পাশে বসেছিল তাকে কী ভোলা যায় সহজে? যাদের বন্ধু নেই তারা বিষণ্ণতায় ভোগে, একাকিত্ব তাকে গ্রাস করে নেয়।

এই জীবন থেকে পালিয়ে ফিরতে অনেকেই নানা পথ খোঁজে। কিন্তু যে পথটি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে এটা শুধু জানে আপনার কাছের বন্ধুটিই।

তাকেই বলেই দেখুন একবার আপনার বিষণ্ণতার কথা, একাকিত্বের কথা। বন্ধুটিই আপনাকে ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে যাবে খোলা মাঠে। সবুজ ঘাস সেখানে। ছন্দহীন জীবনে ছন্দ, নিরানন্দ জীবনে আনন্দের জোয়ার যোগ করতে বন্ধুর জুড়ি নেই।

বন্ধুত্বকে কোনো পরিমাপক যন্ত্র দিয়ে মাপা যায় না। মাপার দরকারও নেই। কিন্তু ভালো বন্ধু খুঁজে পাওয়া খুব সহজ নয়। সবাই ভালো বন্ধু হতেও পারে না। বন্ধু যেহেতু আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, তাই বন্ধু নির্বাচনে একটু সচেতন হতে হয়। বন্ধুত্বে হাত বাড়ানো অন্যায় নয়। তবে ভুল মানুষকে না বুঝেই বন্ধু বানিয়ে ফেলা ঠিক না।

বন্ধু নির্বাচনের আগে কয়েকটি মানবিক গুণ তার মধ্যে খুঁজে নেয়া উচিত। সৎ ও সত্যবাদী মানুষ ভালো বন্ধু হতে পারে।

তবে জীবনের দীর্ঘপথ একত্রে পাড়ি দিয়েছেন। হাত ধরাধরি করে পার হয়েছেন নানা ঝড়-ঝাপটা। হেসেছেন, কেঁদেছেন, ভালোবেসেছেন পরস্পরকে। এই ভালোবাসায় যেন ভালোবাসার অধিক কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।

এদের একের প্রতি অন্যের টান এতটাই গভীর যে, অনেক সময়ই হয়তো দু’জনেরই জীবনসঙ্গীর চেয়েও এদের নিজেদের সম্পর্কটাই অনেক বেশি গভীর। এবার থাকছে বন্ধুত্বের রকম ফের। নানা ধরনের বন্ধু আমাদের চারপাশ ঘিরে রেখেছে।

বন্ধু তুমি শত্রু তুমি

‘ফ্রেন্ড’ আর ‘এনিমি’, দুইয়ে মিলে ‘ফ্রেনিমি’। এরা সেই বন্ধু যাদের প্রতি ভালোবাসা আর এক রকম ঘৃণা যেন মিলেমিশে থাকে। অনেকটা পথ পেরিয়ে দু’জনেরই মনের খাতায় লেখা আছে অম্ল মধুর নানা ইতিহাস। তার প্রতি আছে গভীর টান, আছে মমতাও।

কিন্তু কোথায় যেন আছে একটা গোপন হিংসা-বিদ্বেষও। আপনিও জানেন আর সেও জানেন, এমনিতে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও হয়তো যে কোনো সময় এক ধাক্কাতেই আলগা হয়ে যেতে পারে এই সম্পর্কের ভিত।

না প্রেম না বন্ধুতা

প্রেমিক-প্রেমিকা নাকি কেবলই বন্ধু? আসলে হয়তো দুটোই। কলেজের দিনগুলোতেই কি এমনটা শুরু হয়েছিল নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পা রেখে সেটা বলাটা কঠিন। সারাক্ষণই তো দু’জনে একসঙ্গে। কার দিক থেকে কে কবে বন্ধুতার বেশি কিছু চেয়েছিল কিংবা কে কবে থেকে মনে মনে এমন কিছু ভাবছিল সেটাও যেন স্পষ্ট নয়।

কিন্তু একটা বিষয় এখন দু’জনের কাছেই স্পষ্ট। দু’জনেই জেনে গেছেন প্রেমের টান যতই থাকুক সম্পর্কটা আসলে কোনো দিনই ভালোবাসার গণ্ডি পেরোবে না!

কেবলই ইন্টারনেট বন্ধু

সাইবার জগৎ তো আসলে একটা আলাদা জগৎই! সেখানেও আলাদা নিয়মকানুন আছে, আছে হাসি-কান্না-বন্ধুত্বের নানা ধরনও। বিষয়টাকে হালকা করে দেখারও কিছু নেই।

সব হারিয়ে একেবারেই হাল ছেড়ে দেয়ার দিনগুলোতে সেই তো আপনাকে নতুন করে বাঁচার আশা জুগিয়েছিল! রাত জেগে জেগে চ্যাট করা, দীর্ঘ মেসেজে মনের কথা খুলে বলা। পরস্পরকে জেনে নেয়া।

সামনাসামনি দেখা না হোক, কথা না হোক, সাত-সমুদ্র তেরো নদীর পাড় থেকেও তো কেউ না কেউ কারও হাতখানি ধরতেই পারে, হোক না সে অন্তর্জালেই।

ভাবের বন্ধু লাভের বন্ধু

তার সঙ্গে ভাব হয়েছে, লাভ হয়েছে। হালফিলের এই বন্ধুতার মোদ্দা কথা যেন এটাই। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ফ্রেন্ডস উইথ বেনিফিট’। দু’জনেরই জানা আছে এ বন্ধুতায় কোথায় কতটা লাভ-ক্ষতি। কে কতটা ছাড় দেবেন আর কে কতটা ছাড় নেবেন।

বিষয়গুলো খোলামেলা আলোচনায় আগে থেকে বলে কয়ে নেয়া না হলেও আজকাল সবাই-ই তো স্মার্ট। ফলে এই সম্পর্ক অনেকটাই কেজো বন্ধুত্বের, দেয়ার আর নেয়ার।

পুরনো দিনের সেই বন্ধু

এতগুলো বছর পেরিয়ে আজ আর তাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। সেই কবে কোন কালে আপনারা বন্ধু হয়েছিলেন। ঘনিষ্ঠতম হয়তো কোনো দিনই ছিলেন না কিন্তু আপনাদের সবকিছুতেই তো তিনিও ছিলেন।

ছেলেবেলায় বুঝতে না পারলেও এখন জানেন, এই সময়ে দেখা হলে হয়তো তার সঙ্গে বন্ধু হওয়াই সম্ভব হতো না। কিন্তু দোষ-গুণ সব মিলিয়েই তো বন্ধু। আর পুরনো সেসব দিনের সেসব স্মৃতিগুলোকে জীবন থেকে বাদই বা দেবেন কীভাবে। অতএব বন্ধু তো বন্ধুই, তা সে যেমনই হোক।

ঘর না বাঁধা ঘরের বন্ধু

আপনি গভীরভাবে তার প্রেমে মজে আছেন। তিনিও আপনাকে ভালোবাসেন। কিন্তু সেটা তার মতো করেই। আপনিও জানেন আর সেও জানে যে, জুটি বাঁধলে আপনাদের দু’জনকে সত্যিই দারুণ মানাবে। কিন্তু আপনার মতো দিওয়ানা মজনুর লাইলী তিনি হতে চান না। বিপত্তিটা এখানেই। কিন্তু মানসিকভাবে আপনি কোনোভাবেই এটা মেনে নিতে পারছেন না।

আবার দু’জনের বন্ধুত্ব এতটাই প্রবল যে, তিনিও এই বন্ধুত্ব থেকে বেরিয়ে যেতে পারছেন না। আসলে এই বন্ধুত্ব থেকে ঘর বাঁধা যেমন সম্ভব না তেমনি বন্ধুতার এই ঘরখানি ভেঙে ফেলাও সম্ভব না।
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by