মোকাম্মেল হোসেন    |    
প্রকাশ : ০৬ মার্চ, ২০১৭ ০৭:১৪:০৮
আজিমদ্দিন খায় শোল মাছ আমি খাই পুঁটি...
আজিমদ্দিন খায় শোল মাছ। আমি খাই পুঁটি। হু ইজ আজিমদ্দিন? মহামহিম আজিমদ্দিন একটা সরকারি অফিসে কর্মরত সেকেন্ড গ্রেডের কর্মচারি। আজিমদ্দিনের বয়স আমার চেয়ে কম। উচা-লম্বায়ও আমার চেয়ে খাটো।

আজিমদ্দিন নরমাল ডিগ্রি পাস। আমি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে অনার্সসহ মাস্টার্স অব সোসিওলজি।

আজিমদ্দিনের কোনো ঠেকা নেই আমাকে মনে রাখার। আমিই তাকে স্মরণ করি। শুধু স্মরণ করা নয়, আগের দিনে জমিদার বাবুদের নায়েব-গোমস্তার সঙ্গে প্রজারা যেরকম আদব-লেহাজ নিয়ে কথা বলত, তার সঙ্গে সেরকমভাবে বাক্য বিনিময় করি।

প্রজারা জমিদারের কাচারিতে গিয়ে সেলামি না দিয়ে কথা বলার দুঃসাহস দেখাত না। বেয়াদবি হতো। সেলামি ছাড়া আমিও আজিমদ্দিনকে মুখ দেখাই না। মনে আছে, প্রথমবার সেলামি হিসেবে তার হাতে ৫শ’ টাকার নোট দিলে সেটা উল্টেপাল্টে দেখার পর আজিমদ্দিন বলেছিল,
: আপনের স্মরণশক্তি কেমন?
- খারাপ না।
: বলেন তো দেখি, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম কবে ১ হাজার টাকার নোট বাজারে ছাড়ছে?
আমতা-আমতা করছি। আজিমদ্দিন বলল,
: আমি বলি?
স্কুলের বাচ্চাদের মতো ঘাড় কাত করলাম। আজিমদ্দিন বলল,
: ২০০৮ সালের ২৭ অক্টোবর।
অত্যাশ্চর্য হয়ে বললাম,
: ভাই, আপনে তো আসলেই কঠিন মাল! একটা মুদ্রা কবে বাজারে আসছে, সেই তারিখও মনে রাখছেন!
- মনে রাখার পেছনে একজন মানুষের অবদান আছে।
: কার?

- আমার এক পার্টির। ১ হাজার টাকা দামের নোট অবমুক্ত হওয়ার খবর শুইন্যা মনের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা ভাব বিরাজ করতেছিল। আল্লাহর কী কেরামতি দেখেন- ওইদিনই আমার এক পার্টি ফুল পেমেন্ট লইয়া অফিসে হাজির। সব ১ হাজার টাকা দামের নোট। নতুন।

কড়কড়া। ওইখান থেইকা একটা নোট লইয়া সেইটার ওপর ‘... তোমার আগমন- শুভেচ্ছা-স্বাগতম’ লেইখা ভদ্রলোকরে বললাম, ভাই, এই লেখাটার নিচে দিন-তারিখ উল্লেখ কইরা একটা সিগনেচার মাইরা দেন। আমার জীবনে যদি না খাইয়া মরার মতো পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়, তবু আপনের সম্মানে এই নোট আমি খরচ করব না। যতœসহকারে সংরক্ষণ করব। কী বুঝলেন?

আজিমদ্দিন বাংলায় কথা বলছে। না বোঝার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমি চেহারায় এমন ভাব ফুটিয়ে তুললাম, যেন এমন এক শিকারীর কথা শুনছি- যে সুন্দরবন থেকে একটা বাঘ শিকার করে বাড়ি ফিরেছে। বিস্ময়াবিষ্ট শ্রোতা পেয়ে আজিমদ্দিন বেজায় খুশি। সে তার শিকার কাহিনীর পরের অংশ বলতে লাগল,

: শুনেন, সৌখিন শিকারিরা হরিণ শিকার কইরা মাথাটা দরজার উপরে লটকাইয়া রাখে। আমিও সর্বপ্রথম শিকার করা ১ হাজার টাকার সেই নোট বাসার একটা বিশেষ স্থানে আটকাইয়া রাখছি। ফলে দিন-তারিখ মিসটেক হওয়ার কোনো উপায় নাই।

এখন আপনে আমারে বলেন, প্রায় এক দশক গত হইতে চলল, বাজারে ১ হাজার টাকার নোটের আগমন ঘটছে; অথচ আপনে আমার হাতে ধরাইয়া দিলেন ৫শ’ টাকার একটা নোট। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকরে অপমান করা হইল না! আপনে শিক্ষিত লোক হইয়া এই ধরনের মারাত্মক একটা ভুল কী কইরা করলেন?
আজিমদ্দিনের দিকে কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকার পর বললাম,
: এইটা দিয়া পরিচয় হইলাম। এর পর ইনশাআল্লাহ...

আজিমদ্দিন আমার ফাইলের সাংকেতিক নাম দিল এমভি জীবন। অনেক চেষ্টার পর এটার একটা অর্থ বের করতে সক্ষম হলাম। বললাম,
: ফাইলের নাম এমভি জীবন রাইখ্যা কি ‘মোকা ভাইয়ের জীবন’ বুঝাইতে চাইতেছেন?
আজিমদ্দিন হাসল। দিলখোলা হাসি। বলল,

: আপনে তো একের ভেতর দুইয়ের জন্ম দিয়া কঠিন একটা সত্যের প্রকাশ ঘটাইয়া ফেলছেন!
- ভাই, আপনের কথা বুঝতে পারলাম না!
: বুঝতে পারেন নাই? হাঃ হাঃ হাঃ! আগে বলেন, আমাদের অফিসে তশরিফ রাখা ফাইলটা আপনের জীবন কিনা?
- শুধু আমার না, এই ফাইল এখন আমাদের পুরা পরিবারের জীবনকাঠি। আমার আব্বা সারাজীবন সৎভাবে সরকারি চাকরি কইরা অবসর গ্রহণ করছেন। এখন তিনি পেনশন হিসেবে যে কয় টাকা পাবেন, সেইটাই পরিবারের অন্যতম ভরসা।

: তাইলে বলেন, জীবন নাম রাইখ্যা ভুল করি নাই?
- তা করেন নাই। কিন্তু বিষয়টা তো মোকামিয়ার একার না!

: আরে রাখেন আপনের মোকা-ফোকা। এমভি দিয়া আমি জাহাজ বুঝাইছি। দেখেন নাই, বড় বড় তেলের ট্যাংকার বা জাহাজের নাম রাখে এমভি অমুক, এমভি তমুক। সেইরকম আমি আপনের ফাইলের নাম রাখছি এমভি জীবন। আপনের ফাইলের সাংকেতিক নাম দিতে গিয়া জাহাজের আশ্রয় নিছি কেন, বলতে পারবেন?
- না।
: দেশে দুদক নামে একটা ফালতু প্রতিষ্ঠান আছে না, সেইটার কাবড়াকাবড়ি থেইক্যা রক্ষা পাওয়ার জন্য। কেউ যদি শত্রুতামূলকভাবে আমার ফোনে আড়ি পাতে, বাপেরও সাধ্য নাই বুঝতে পারবে- আমরা গিভ অ্যান্ড টেক বিষয়ে কথা বলতেছি। বেক্কলের দল মনে করবে, আমরা জাহাজের খবরা-খবর আদান-প্রদান করতেছি।

- ভাই, আমার মতো একজন আদার বেপারিরে জাহাজের খবরা-খবরের সঙ্গে যুক্ত কইরা দিলেন?
আজিমদ্দিন চোখ দুটো মার্বেলের মতো গোল করে ফেলল। বলল,

: আরে, বলে কী! আদার বেপারিরাই তো এখন জাহাজের খবর রাখে বেশি। শুনেন, বাংলা ভাষার পণ্ডিতরা যখন এই বাগধারাটা প্রসব করছে, তখন বিদেশ থেইকা আদা আমদানি করতে হইত না। বর্তমানে আদা আমাদের অন্যতম আমদানি পণ্য। কাজেই এই যুগে আদার বেপারির জাহাজের খবরা-খবর রাখা ফরজে-কেফায়া।

কিছুদিন নিয়মিত আসা-যাওয়ার পর এমভি জীবনের নোঙর তোলার খবর পেলাম। যাত্রা শুরুর পর নতুন উদ্যমে আজিমদ্দিনের অফিসে যাতায়াত করছি। মাঝেমধ্যে ফোনেও খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করি। একদিন ফোন করার পর আজিমদ্দিন বলল,
: সাগরের আবহাওয়া অতি চমৎকার। এমভি জীবন স্বাচ্ছন্দে বন্দর অভিমুখে অগ্রসর হইতেছে...
এর কয়েকদিন পর নতুন খবর পেলাম। আজিমদ্দিন সুখবর জানিয়ে বলল,
: এমভি জীবন বর্হিনোঙরে অবস্থান করছে।
প্রতীক্ষার প্রহর পার করছি। একদিন ফোন করে মেঘজমা গলায় আজিমদ্দিন বলল,
: এমভি জীবন...
আজিমদ্দিন থেমে যাওয়ায় অবাক হয়ে বললাম,
: আজিমদ্দিন ভাই, ডট মারলেন কেন!
- ডট তো আমি মারি নাই।
: কে মারছে!
- উপরওয়ালা।
: কেন?
- বন্দরে কনটেইনার জট লাগছে। আপাতত নতুন কোনো জাহাজের মাল খালাস করা নিষেধ।
: এখন উপায়?
- উপায় একটা আছে।
: সেইটা কী?
- অন্য লাইনে হাঁটন লাগব।
: ঠিক আছে।
- এইজন্য আপনের কিন্তু ডেমারেজ খাওন লাগব।
: কেন?
- মরজ্বালা! আপনে আমদানিকারক না? তাড়াতাড়ি মাল খালাসের জন্য আপনে নতুন সিস্টেমে যাইতেছেন, এইজন্য বাড়তি খরচ করবেন না?
ডেমারেজ ফি নিয়ে আজিমদ্দিনের অফিসে গেলাম। টাকাগুলো গুনে পকেটে রাখার পর সে বলল,
: বসেন। চা খান।
চায়ের কাপ ঠোটে তুলেছি- এক লোক এসে আজিমদ্দিনকে সালাম দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। আজিমদ্দিন লোকটার দিকে তেরছা চোখে তাকিয়ে চেয়ারে কিছুক্ষণ দোল খেল। পত্রিকার পাতা উল্টাল। কাগজের মোড়ক থেকে একটা খিলিপান বের করে নাকের আগায় ঠেকিয়ে ঘ্রাণ নিল। এর পর মুখে ঢুকিয়ে দুই দাঁতের চিপায় পানের বোঁটা রেখে লোকটাকে জিজ্ঞেস করল,
: কী খবর তর?
- ভালা শইল মাছ আনছিলাম।
: লারে লারে, লা- রে রে রে...
- লইয়া আসি?
: আপা তাপা, তা পা পা...
- আনমু?
: ঝামেলায় ফেললি! গতকাইল বইদ্যা জোর কইরা ১২ পদের মাছ গছাইয়া গেছে। বাসার ফ্রিজ, ডিপ ফ্রিজ সব ভর্তি।
- আপনের কাছে মাছ আইন্যা ফেরত নিছি, এমুন ঘটনা আইজ পর্যন্ত ঘটে নাই স্যার!
: তা তো বুঝলাম রে পাগলা। কিন্তু রাখনের জায়গা তো নাই! হুম হো... হো হা। হুম। আইচ্ছা লইয়া আয়, দেখি।
মাছওয়ালা পাতিলভর্তি শোল মাছ এনে কোনোটার মাথা, কোনোটার পেট চেপে ধরে আজিমদ্দিনকে দেখাল। আজিমদ্দিন পান চিবায়। বিশেষ কায়দায় জিহ্বার আগায় চুন লাগায়। পাত্রী দেখার স্টাইলে শোল মাছের আকার-আয়তন দেখে। দেখাদেখি এক পর্যায়ে বলল,
: মাছের সাইজ মাশআল্লাহ ভালোই। আমার পছন্দ হইছে। ওয়েট কর, ছোট ভাইরে ফোন কইরা দেখি- একটা গতি করা যায় কিনা।
টেবিলের এক পাশে পড়ে থাকা মোবাইল ফোন হাতে নিল আজিমদ্দিন। কানে ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বলল,
: হ্যালো, ফজি...
লুকিয়ে ডেমারেজ ফি প্রদানের জন্য আজিমদ্দিনের গা ঘেঁষে বসার সুবাদে ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা কথাবার্তা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। ওপাশ থেকে ফজির উত্তর ভেসে এলো,
: বলেন ভাইজান।
- বড় সাইজের কিছু শোল মাছ পাইছি। আমার ফ্রিজ-ট্রিজ সব বোঝাই। তর কী অবস্থা?
: আমারও একই অবস্থা। তোমার না গতমাসে আরেকটা বড় ফ্রিজ কেনার কথা ছিল?
- ভাবছিলাম তো কিনব, কিন্তু হঠাৎ নতুন একটা ফ্ল্যাট বুকিং দিলাম...
: মাছগুলা জেতা না?
- হ। জিয়ল মাছ। শোল মাছ মরা হইলে কী আর আমি কিনি?
: জেতা মাছের পেট কাইট্যা ফ্রিজে রাখার দরকার কী? ড্রামে পানি ভইরা জিয়াইয়া রাখবা।
- বাসায় কোনো খালি ড্রাম নাই।
: আমি ব্যবস্থা করতেছি...
ব্যবস্থা হওয়ার সংবাদে আজিমদ্দিন উৎফুল্ল হল। কিছুক্ষণ আগে আমার দেয়া নোটগুলোর কয়েকটা পকেট থেকে বের করে মাছওয়ালার পওনা মেটাল সে। বিনয়ভাব বজায় রেখে আজিমদ্দিনের উদ্দেশে বললাম,
: আপনের ছোটভাইও কি সরকারি চাকরি করে?
- হুঁ। সেও আমার মতো এই প্রজাতন্ত্রের একজন সেবক।
বাসায় ফেরার পথে বাজারে ঢুকলাম। লবণ বেগম মাছ না নিয়ে বাসায় প্রবেশ করতে নিষেধ করেছে। মাছের বাজারে হরেক রকমের মাছ। ডেমারেজ ফি পরিশোধের পকেটে যে টাকা অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে বড়জোর আধাকেজি পুঁটি মাছ কেনা যেতে পারে। ভাগ্য ভালো, মাছবাজারের এক কোনায় পুঁটি মাছের সন্ধান পেলাম। মাছ বিক্রেতার সামনে দাঁড়াতেই সে বলল,
: ভাই, পুঁটি নিবেন?
- হ। পুঁটি ছাড়া কোনো উপায় নাই। আমি খাব পুঁটি মাছ। অথচ আজিমদ্দিন কী মাছ খায় জানেন? শোল মাছ!
মাছ বিক্রেতা কি আমাকে পাগল ভাবছে? ভাবুক। আজিমদ্দিন আমার ফাইলের গিট্টু ছাড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছে। মানুষের কাছে তার গুণের কথা প্রচার না করাটা এক ধরনের অন্যায়। মাছ বিক্রেতার উদ্দেশে পুনরায় বললাম,
: আজিমদ্দিন কেন শোল মাছ খায় জানেন? কারণ সে হইল এই প্রজাতন্ত্রের একজন মহান সেবক। আর আমি হইলাম কেবলই লেদক। লেদক বুঝেন তো? লেদাইয়া-লেদাইয়া স্যুয়ারেজ পাইপে জ্যাম লাগানো ছাড়া যার আর কোনো যোগ্যতা নাই।
পুঁটি মাছ দেখে লবণ বেগম রাগ করল। বলল,
: এই মাছ এখন কে কাটবে? বাজার থেইকা মাছগুলা কাটাইয়া আনতে পারলা না!

বাজারে এক কেজি পুঁটি মাছ কাটতে গেলে ৬০ টাকা লাগে। আধাকেজির জন্য মাছকুটুনিকে ৩০ টাকা দিতে হতো, যা আমার পকেটে ছিল না। বিষয়টি চেপে গেলাম। প্রতিদিন বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন রূপে লবণ বেগমের কাছে আমার দৈন্যদশা ও ফকিরি হাল পরিস্ফুট হচ্ছে। আজকের বিষয়টা অন্তত গোপন থাকুক।

মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

mokamia@hotmail.com
  • সর্বশেষ খবর
কিছুমিছু বিভাগের অারও খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by