ফুলের বাগান ঘুরে এসে লিখেছেন- সুমন্ত গুপ্ত    |    
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০৮:১৬:০৫
ফুলের রাজধানী গদখালী

নগর জীবনের ব্যস্ততার সীমারেখা পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। বৃহস্পতিবার অফিসে কাজের খুব চাপ গিয়েছে তাই ক্লান্তি আমাকে ঘিরে ধরেছে। প্রায় সাতটার দিকে আমাদের গাড়ির যাত্রা বিরতি দেয় উজানভাটিতে গিয়ে। বাস থেকে নেমে কফি খেলাম। বিরতির পর আমাদের পাইলট মহোদয় তুফান বেগে গাড়িকে এগিয়ে নিয়ে চললেন। আমি চোখ বন্ধ করে নিদ্রা দেবীর আশ্রিত হলাম।
 
রাত সাড়ে এগারোটার দিকে সায়েদাবাদে গিয়ে কিছু সময়ের জন্য থামল। যান্ত্রিক নগরীতে প্রবেশের পর কিছু সময় গাড়ি এগোতেই চাইছিল না। রাত তিনটার দিকে আমরা ফেরিতে উঠলাম। আমাদের ভাগ্য ভালো ছিল ফেরিতে কোনো জ্যাম ছিল না। সবাই ভয় দেখিয়েছিল ফেরিতে বুঝি চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা দেরি হয়। ফরিদপুর, মাগুরা পেরিয়ে আমাদের পাইলট মহোদয় ঠিক ছয়টার দিকে নিয়ে এলেন যশোর বাসস্ট্যান্ডে। সাত-সকালে দেখি সাগর গিয়ে উপস্থিত আমাদের নিতে। 
 
আমরা সাগরের বাসা খড়কীতে গেলাম। সেখানে কিছু সময় বিরতি দিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। সাগর বারবার প্রাতরাশ করে বের হওয়ার কথা বলছিল কিন্তু নতুন গন্তব্য স্থান দেখার জন্য মন পড়ে রয়েছিল। আবার সকাল আটটার ভেতর হাট শেষ হয়ে যায়। আমরা খড়কী থেকে আবার বাসে করে গদখালী বাজারের দিকে যাত্রা করলাম। ঝিকরগাছা বাজারের ভেতর দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। বাজার পার হয়েই বেশ পুরনো এক ব্রিজ। এর নিচ দিয়েই বয়ে চলেছে মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষ নদ। তবে এ নদ এখন কচুরিপানায় বন্দি।
 
পথিমধ্যে সাগরকে জিজ্ঞেস করলাম গদখালী নাম কী করে হল ও বলল কথিত আছে যে একসময় পর্তুগিজ ডাকাত সরদার রডারিক এ অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে মানুষের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। একদিন সে স্থানীয় কমলেসের বাড়িতে হানা দেয়। সেখানে তার সুন্দরী মেয়ে মাদালসার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় রডারিকের। 
 
মাদালসার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়। ক্ষমা চেয়ে প্রেম নিবেদন করে। পণ করে, আর ডাকাতি করবে না। একপর্যায়ে মাদালসাদের বাড়ির পাশেই আশ্রয় নেয় রডারিক। আর মাদালসাকে পাওয়ার জন্য বাঘের সঙ্গে লড়াইও করে। এ ঘটনার পর মা কালীর নামে রডারিককে বরণ করে নেয় মাদালসা।
 
পরে দুজনেই সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করে। তৈরি হয় একটি মন্দির। রডারিকের ‘গড’ আর মাদালসার ‘কালী’ নিয়ে এ মন্দিরের নাম হয় ‘গডকালী’ মন্দির। সেই নামের সূত্র ধরে পরে এ জায়গার নাম হয় ‘গদখালী’। বিশ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম আমরা গদখালী বাজারে। কুয়াশার চাদরে ঘেরা তবুও লোকে লোকারণ্য। আমরা গাড়ি থেকে নেমে ভ্যানগাড়ি নিলাম ঘুরে দেখার জন্য। যশোর-বেনাপোল রোড ছেড়ে ডানে, বায়ের গ্রামগুলোর পথ ধরে এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে দিগন্তজোড়া ফুলের ক্ষেত। লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি আর সাদা রঙের এক বিস্তীর্ণ চাদর যেন বিছিয়ে রেখেছে চরাচরে। জমিতে ফুল চাষ করেন এখানকার চাষীরা। বাড়ির চার ধারে সৌখিন ফুলের বাগান নয়। মাঠের পর মাঠজুড়ে ফুলের ক্ষেত। ফুলই এখানে ফসল। অনেকেই ফুলের রাজধানী বলে এ গদখালীকে।
 
শুধু আমরাই নই, দেখা মিলল আমাদের মতো বেশ কিছু পর্যটকেরও। ফুলের সঙ্গে ছবি তুলতে তারা হাজির হয়েছেন। দেখা হল সুইজারল্যান্ড থেকে আগত পর্যটক মেলিসা ও জিগালদিনের সঙ্গে। আমি একের পর এক ছবি তুলতে লাগলাম। পথের দুই ধারে গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, গাঁদা, জারবেরা ফুলের ক্ষেত। রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, গোলাপ আর গাঁদা ফুল চাষ হয় এখানে। যেখানে গেলে চোখে পড়বে কৃষকদের ব্যস্ততা। কেউ ফুল কেটে গরুর গাড়িতে করে বাজারে নিয়ে যাচ্ছে, সেখান থেকেই বান্ডিল করে চালান হয়ে যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে। পুরুষদের পাশে নারী ও শিশুরাও কাজ করছে ফুলের ক্ষেতে। কেউ ফুল কাটেছে, কেউ নিড়ানি দিচ্ছে। আবার কেউ ফুলের বীজ বোনচ্ছে।
 
 বাতাসে ফুলের মিষ্টি সৌরভ, মৌমাছির গুঞ্জন, প্রজাপতির ডানার জৌলুস আর রঙের অফুরান শৌরভের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বাসই হতে চায় না জায়গাটা আমাদের রক্ত, ক্লোদ আর কোলাহলে ভরা মাটির পৃথিবীরই একটা টুকরা।
 
আমাদের দেশের সর্ববৃহত ফুলের জোগান আসে এ গদখালী থেকে। মোট উৎপাদনের প্রায় ৭০ ভাগই আসে এখান থেকে। এখানেই বসে বাংলাদেশের সব থেকে বড় ফুলের পাইকারি বাজার। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এখানকার কৃষকরা ফুলের চাষ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য লড়ে যাচ্ছেন। ফুলের বাগান থেকে জনৈক ভদ্রলোক আমাদের ফুল উপহার দিলেন। আমরা বাজারে এসে জলযোগ থেকে টাটকা সবজি দিয়ে তৈরি তরকারি আর লুচি খেলাম। অসাধারণ স্বাদ, ফরমালিনবিহীন। এরপর আমরা গেলাম সাগরের কর্মক্ষেত্র মৌমাছি স্কুলে। সেখানে বাচ্চাদের সঙ্গে কিছু সময় কটিয়ে আমরা ছুটে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে।
 
যেভাবে যাবেন
 
ঢাকা থেকে যশোর সরাসরি বাস ছাড়ে গাবতলি থেকে, আর সিলেটের কদমতলি থেকে বাস ছাড়ে যশোরের উদ্দেশে। যশোর বাসস্ট্যান্ড নেমে রিকশা নিয়ে চলে যান লোকাল বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকেই পেয়ে যাবেন গদখালী যাওয়ার বাস। গদখালী নেমে ক্ষেত দেখার জন্য ভ্যান নিতে পারেন। ভ্যান ভাড়া নেবে ১০০-১৫০ টাকা। গ্রামের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তার দু’পাশে চোখে পড়বে ফুলের ক্ষেত। বাসস্ট্যান্ডের রাস্তার পাশেই সকালে বসে দেশের সর্ববৃহৎ ফুলের পাইকারি বাজার।
 

  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর
ভ্রমণ বিভাগের অারও খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by