মুনীর উদ্দিন আহমদ    |    
প্রকাশ : ২১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০:০০
হাসপাতালে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু
কিছুদিন আগে ‘অঙ্কুর অরোরা মার্ডার কেস’ নামে একটি চমৎকার হিন্দি সিনেমা দেখেছিলাম। ভারতের একটি নামকরা হাসপাতালে অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশনে চিফ সার্জনের অবজ্ঞা-অবহেলার কারণে দশ-বারো বছরের অঙ্কুর অরোরা কীভাবে মৃত্যুবরণ করে, সেই ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে সিনেমায়। এ সিনেমার প্রেক্ষাপট সামনে রেখেই আমার আজকের এ প্রবন্ধের অবতারণা।
চিকিৎসকদের শপথ নিতে হয়, তারা কারও ক্ষতি করবেন না বা তাদের দ্বারা কারও কোনো ক্ষতি সাধিত হবে না। পেশাগত জীবনে তারা আরও একটি অঘোষিত নিয়ম মেনে চলেন। আর তা হল, দেখা বা জানা সত্ত্বেও চিকিৎসকরা তাদের সহকর্মীদের ভুল-ভ্রান্তি, অবজ্ঞা, অবহেলা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নীরব থাকেন বা তা এড়িয়ে চলেন। এটি একটি বড় ধরনের বিপজ্জনক সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন বা শল্যচিকিৎসকরা প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৪০ বার ভুল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অস্ত্রোপচার করে থাকেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রায় ২৫ শতাংশ রোগী কোনো না কোনো ভুল-ভ্রান্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন। চিকিৎসাসংক্রান্ত ভুল-ভ্রান্তিকে যদি রোগ ধরা হয়, তবে এ রোগ হবে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের মৃত্যুর মধ্যে ষষ্ঠ প্রধান মৃত্যুর কারণ।
জন্স হপকিন্স স্কুল অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথের অধ্যাপক বারবারা স্টারাফিল্ড ‘দ্য জার্নাল অব দি অ্যামেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে’ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লিখেছেন, চিকিৎসাসংক্রান্ত ভুলভ্রান্তি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম মৃত্যুর কারণ। তিনি রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের কারণে প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে দুই হাজার রোগী মৃত্যুবরণ করে। ওষুধের অপপ্রয়োগের কারণে মৃত্যুবরণ করে সাত হাজার রোগী। ২০ হাজার রোগী মারা যায় হাসপাতালের অন্যান্য ভুলের কারণে। হাসপাতালে উৎপন্ন সংক্রামক রোগে মারা যায় ৮০ হাজার রোগী। ১ লাখ ৬ হাজার রোগী মারা যায় ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়ার কারণে। এর অর্থ হল, চিকিৎসাসংক্রান্ত ভুলভ্রান্তি, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও ওষুধের অপপ্রয়োগ, ভুল অস্ত্রোপচার, সংক্রামক রোগের আক্রমণ এবং চিকিৎসক, কর্মচারী, কর্মকর্তাদের অবজ্ঞা, অবহেলা ও গাফিলতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ২ লাখ ২৫ হাজার রোগী মৃত্যুবরণ করে।
উন্নত দেশে প্রেসক্রিপশন ড্রাগগুলোকে সাক্ষাৎ যমদূত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। হাসপাতালে মৃত্যুর ওপর টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিচালিক এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাফিক দুর্ঘটনার কারণে বিশ্বে যত লোক মারা যায়, তার চেয়ে বেশি লোক মারা যায় ওষুধ সেবনের কারণে। গবেষণায় বলা হয়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রায় ২০ লাখ মানুষ ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং এর মধ্যে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করে প্রায় ১ লাখ রোগী।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস হাসপাতালগুলোতে মৃত্যু নিয়েও অনেক গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। এ পর্যন্ত পরিচালিত সব গবেষণার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও বিস্তারিত এক গবেষণার সূত্রমতে, প্রতি বছর ১২ হাজার রোগী অতি সাধারণ ভুলের কারণে এনএইচএস হাসপাতালগুলোতে মৃত্যুবরণ করছে। এসব ভুল-ভ্রান্তি ঘটে যাচ্ছে হাসপাতালে কর্তব্যরত মেডিকেল স্টাফদের কারণে। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রুপিক্যাল মেডিসিনের গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, ১৩ শতাংশ রোগী স্বাস্থ্যসেবার কোনো না কোনো ভুলের কারণে পরবর্তী সময়ে মৃত্যুবরণ করে। গবেষণা পরিচালনাকারী প্রধান হেলেন হোগান বলেন, আমরা দেখতে পেয়েছি, হাসপাতালের মেডিকেল স্টাফরা প্রাথমিক বা মৌলিক ক্রিয়াকর্মগুলো ঠিকমতো পালন করেন না, যার ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে এবং হাসপাতালেই রোগী মৃত্যুবরণ করে।
উন্নত বিশ্বের কোনো দেশে হাসপাতালগুলোতে এ ধরনের ঘটনা ঘটে এবং অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুহার মানুষের নজর কাড়ে তা আমরা ভাবতেও পারি না। উন্নত বিশ্বের হাসপাতালগুলোর অভ্যন্তরীণ চিত্র যদি এ রকম হয়, তবে আমাদের মতো অনুন্নত দেশগুলোর হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে কী ঘটে যাচ্ছে, আমরা তা বলতে পারি না। উন্নত দেশের হাসপাতালে যা হয়, তার ওপর গবেষণা হয়, জরিপ হয়, আর তাই পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়। আমাদের দেশের রোগ, রোগী, হাসপাতাল, ক্লিনিক, স্বাস্থ্যসেবা, ভুল-ভ্রান্তিজনিত মৃত্যু- কোনো কিছুর ওপরই কোনো গবেষণা, জরিপ হয় না, তথ্যাবলিও সংরক্ষিত হয় না। তাই আমরা অন্ধকারে থাকি। আর আমরা মনে করি, সব ঠিকমতোই চলছে।
হাসপাতাল বা ক্লিনিকে অবজ্ঞা, অবহেলা, ভুল-ভ্রান্তি বা অন্য কোনো অনিয়ম বা নিষিদ্ধ কর্মের জন্য যদি কোনো রোগী বা অন্য কোনো ব্যক্তি চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী কারও দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সেই ক্ষতির জন্য হাসপাতাল বা ক্লিনিককে দায়-দায়িত্ব নিতে হয়। উন্নত বিশ্বে উল্লিখিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বা রোগী আদালতে বিচার চেয়ে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে; কিন্তু আমাদের মতো অনুন্নত দেশগুলোতে চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, নার্স বা অন্যান্য স্টাফসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো সময়ই তাদের ভুল-ভ্রান্তির কথা স্বীকার করে না। দায়বদ্ধতা না থাকার কারণে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়াটা বহুলাংশে দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
জনসংখ্যার চাপ কোনো দেশের জন্য বড় ধরনের এক সংকট। এ সংকটের কারণে উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সহজ হয় না। বাংলাদেশে গ্রাম বলি বা শহর, কোথাও উন্নত ও গুণগত মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতাল বা ক্লিনিক গড়ে ওঠেনি। ঢাকা শহরের কথাই ধরা যাক। এ শহরে যত লোকের বাস, সেই অনুপাতে কয়টি হাসপাতাল বা ক্লিনিক আমাদের নাগাল বা আয়ত্তের মধ্যে রয়েছে? সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো নানা সংকটে জরাজীর্ণ। তারপরও অসহায়, নিরীহ, দরিদ্র মানুষ সুস্থতা ও বেঁচে থাকার তাগিদে ছুটে যায় এসব সরকারি হাসপাতালে ন্যূনতম চিকিৎসা লাভের আশায়। বহির্বিভাগের রোগীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চিকিৎসকের দেখা পায় না। চিকিৎসক পেলেও ওষুধপথ্য পায় না। রোগীদের গাঁটের পয়সা খরচ করে দোকান থেকে বেশিরভাগ ওষুধ কিনতে হয়। সরকারি পয়সায় কেনা ওষুধ চুরি হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিন থেকেই রোগীরা অবজ্ঞা, অবহেলা, অযতœ ও দুর্ব্যবহারের শিকার হয়। প্রবীণ চিকিৎসকরা প্রায়ই রোগী দেখতে যান না। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, প্রবীণ ও নামকরা চিকিৎসকরা রোগীকে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সাধারণ অপারেশনের জন্যও গরিব রোগীদের নামিদামি বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বলা হয়। সরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবার মান কিছুটা উন্নত হলেও সেই চিকিৎসাসেবা নামের দুর্লভ পণ্যের মূল্য চুকাতে গিয়ে রোগীকে ফতুর হতে হয়।
সরকারি হাসপাতালগুলোর বেহাল ও সংকটপূর্ণ অবস্থার সুযোগ নিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো দিব্যি লাভজনক ব্যবসা করে যাচ্ছে। এসব হাসপাতালেও বিদেশের মতোই অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করা হয়, ব্লাকমেইল করে রোগীকে অপ্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়, অপ্রয়োজনে রোগীকে বেশিদিন হাসপাতালে ধরে রেখে বিল বাড়ানো হয়, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ওষুধ ক্রয় করানো হয়, হাসপাতাল ছাড়ার সময় অব্যবহৃত ওষুধ রোগীকে ফেরত না দিয়ে বাইরে বিক্রি করা হয়। এছাড়া অর্থ উপার্জনের আরেক পন্থা হল প্যাথলজিক্যাল ও ডায়াগনস্টিক টেস্ট। এসব টেস্টের বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং রোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। উন্নত দেশগুলোতে চিকিৎসক বা হাসপাতাল স্টাফদের সঙ্গে কথা বলা যায়, প্রশ্ন করা যায়, তারা শোনেন ও উত্তর দেন। আমাদের দেশে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটির বেশি দুটি প্রশ্ন করলে তারা তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। কোনো কিছু জানা বা উত্তর পাওয়া তো দূরের কথা। আমি বলি না, সবাই এ রকম। আমি আমার জীবনে অনেক ভালো চিকিৎসক ও স্টাফ দেখেছি কয়েকবার হাসপাতালে থাকার কারণে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আমার অফিসের একদম কাছে। আমি মাঝেমধ্যে এই সরকারি হাসপাতালে রোগী দেখতে যাই এবং চেনা-অচেনা রোগীদের খোঁজখবর নিই। ওয়ার্ডে, ফ্লোরে, বারান্দায় যত্রতত্র পড়ে থাকা রোগীদের দুর্দশা দেখে আমি মর্মাহত হই। এই হাসপাতালে নাকি কোনো রোগীকে ফেরত পাঠানো হয় না, সবাইকে ভর্তি করা হয়। আমি দেখে আশ্চর্য হয়েছি- এখানে সব রোগীই চিকিৎসা পাচ্ছে। বেশিরভাগ চিকিৎসক তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছেন, অনেক জটিল রোগ সারিয়ে তুলছেন। আমার কয়েকজন জটিল রোগে আক্রান্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধব এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে গেছেন।
কিন্তু সব হাসপাতালের অবস্থা এ রকম নয়। ওখানেই আমার কষ্ট। আমাদের অসহায়ত্ব ও দুর্দশাকে পুঁজি করে তারা কোটি টাকার ব্যবসা করবেন, আর আমাদের কিছুই জানার থাকবে না, বলার থাকবে না- এটা হতে পারে না। আমি মনেপ্রাণে একটি কথা বিশ্বাস করি- আমাদের সুস্থ থাকতে হবে বা সুস্থ থাকার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। অসুস্থতা বা রোগ বাঁধানো আমাদের পোষায় না কোনোভাবেই। রোগ মানেই অশান্তি, দুঃখ, কষ্ট, ভোগান্তি। রোগ মানেই ওষুধ, চিকিৎসক, ডায়াগনস্টিক টেস্ট, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিড়ম্বনার কথা তো আগেই বলেছি। চিকিৎসাসংক্রান্ত ভুলভ্রান্তি, অপ্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক টেস্ট, ওষুধ, ওষুধের অপপ্রয়োগ, ওষুধের ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ভুল অস্ত্রোপচার, সংক্রামক রোগের আক্রমণ, চিকিৎসক, কর্মচারী-কর্মকর্তা, নার্সদের অবজ্ঞা-অবহেলা, গাফিলতি, অপব্যবহার ও সংশ্লিষ্ট বহু কারণে যে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও মৃত্যুবরণ করতে পারে। এসবের পেছনে অর্থ-কড়ি থাকলে খরচ করা হয়তো সহজ, আর না থাকলে সে তো আরেক মৃত্যু। জীবনের প্রতি পদে পদে এতবার মরার চেয়ে সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপনের মাধ্যমে একবার মরা কি অধিক শ্রেয় নয়? তাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন আর সুস্থ থাকার ব্রত গ্রহণ করুন।
মুনীরউদ্দিন আহমদ : প্রফেসর, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
drmuniruddin@gmail.com




  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by