মলাট বৃত্তান্ত
শীতের সাতকাহন
মো: রায়হান কবির
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পরিসংখ্যানের কোনো ছাত্র আমাদের ব্যাচে নেই। তাই সঠিক হিসাব বলা মুশকিল শেষ কবে এত শীত ঢাকায় পড়েছে। নিকট অতীতে পড়েনি এটা নিশ্চিত। গত বছরও আমাদের অফিসের একাউন্টস ডিপার্টমেন্টের মোখলেস ভাই বললেন, ‘ভাই, শুধু শুধু কোট-ব্লেজার কিনলাম, ঠিকমতো দুইদিনও পড়তে পারিনি। কি শীত যে পড়ে!’
অথচ সেই মোখলেস ভাই, এবার কোট-ব্লেজারের ধারে কাছেও নেই। পুরোদস্তুর সোয়েটার, মাফলার, বানরটুপি পরে নিজেকে আড়াল করে রেখেছেন। প্রথম দর্শনে যে কেউ ভাবতে পারেন সাম্প্রতিক কোনো মামলার আসামি, যার কারণে নিজেকে লুকিয়ে রাখছেন। আসলে তিনি গোবেচারা টাইপ মানুষ, ঝুট-ঝামেলায় নেই। তাই মামলা খাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বরং শীতে থাকেন কাবু আর গরমে জুবুথুবু।
অফিসের বাইরেও আমাদের জীবন আছে। সেখানেও কিছু বন্ধু-বান্ধব আছে। তাদের মধ্যে হুরহুরিয়া অন্যতম। আসলে এটা একটা খেতাবি নাম। ছোট বেলায় মোস্তফা নামের একটা ভিডিও গেম খেলতো নিয়মিত, তাই তার নাম হয়ে গেছে সেই গেমের একটা কমন শব্দ হুরহুরিয়া নামে। ছোট বেলায় তার স্বপ্ন ছিল বিদেশ যাওয়ার। বহুবার চেষ্টা-তদবির করে ব্যর্থ হয়ে এখানেই এখন কিছু একটা করছে। সে যা হোক, ঢাকার রেকর্ড ভাঙা শীতে হুরহুরিয়ার বাসায় গিয়ে দেখি সে রীতিমতো নাচের মাস্টার রেখে নাচ শিখছে! ব্যাপার কী! পুরুষ মানুষ, তাও প্রায় ৪০-৪৫ বছর বয়স, এ বয়সে নাচ? ভাবলাম বুড়ো বয়সে ভিসরতি ধরেছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘হঠাৎ তুই নাচ শিখছিস কেন? কোনো মেয়ে বা মহিলাকে ইমপ্রেস করতে নাকি?’
হুরহুরিয়া বলল, ‘আরে ধুর, বউ কি আমার নেই? আর দরকার কি? আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইমপ্রেস করতে আইমিন তার নজড়ে পরতে চাই। শুনলাম মাদুরোকে তুলে আনা হয়েছে তার বিশেষ নাচের জন্যে। তাই আমিও সেই নাচটা নিখুঁত প্র্যাকটিস করছি, যাতে তিনি আমাকে তুলে নিয়ে যান। আর প্লিজ, দোয়া করিস আমার যাতে ৫-৭ বছর জেল হয়, তাইলে জেল থেকেই গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করে ফেলব। এ দেশে যতই শীত পরুক, তুষার তো আর পরে না? ডিরেক্ট আমেরিকার তুষারওয়ালা শীত উপভোগ করতে চাই, তাও নাগরিত্বসহ!’ শুনে আর কথা বাড়ালাম না। শীতে যে হুরহুরিয়ার মাথাটাও কিঞ্চিত গেছে বুঝতে অসুবিধা হলো না।
প্রচণ্ড শীতে যখন মানুষ কাবু, তখন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে এসেছে গ্যাস সংকট। লাইনের গ্যাসের সংকট এই দেশে আগেও ছিল, কিন্তু সিলিন্ডার গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে এবার। কিন্তু এতো এতো উৎপাদনকারী এবং পর্যাপ্ত কাঁচামাল থাকার পরও কেন এ সংকট তার সঠিক কারণ জানা যায়নি। তেল সংকটের একটি রাজনৈতিক কারণ থাকে। যখনই নতুন কোনো রাজনৈতিক ভাইব আসে, তখন তেলের দাম বেড়ে যায়। এ কারণে সম্প্রতি সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু গ্যাস সংকট? এটা মানা যায় না। আমাদের দেশের নেতারা তেল পছন্দ করেন, তাই যখনই নির্বাচন-টির্বাচন আসে তখন মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া এমনকি পোস্টার বা আশেপাশে তেলে চপচপ করে! তাই বলে গ্যাস? এটার একটা তদন্ত হওয়া উচিত। গ্যাস কি কেউ গ্রহণ করে কিনা তেলের মতো করেই ভাবতে হবে! আবার হতে পারে তেলের সংকটের কারণে গ্যাসের ওপর তীব্র চাপ পরায় গ্যাসের সংকট হয়েছে। মানে বাঙালি তেল দেওয়ার পরিবর্তে হয়তো গ্যাস দিতে শুরু করেছে!
শীতে টিকটকারদের কিছু কমন কন্টেন্ট থাকে। যেমন-গোসল। দুর্ভাগ্যবশত শীতের শুরুতেই এক টিকটকার পানিতে আগুন লাগিয়ে গোসলের কন্টেন্ট বানাতে গিয়ে বার্ন ইউনিটে কাতরাচ্ছেন। অথচ শীতে তার কাঁপার কথা ছিল তা না, উলটা-পালটা কন্টেন্ট বানাতে গিয়ে এ শীতেও ব্যাথায় তার চামড়া জ্বলছে। অন্যদিকে শীতকে কেন্দ্র করে এদেশের মানুষ নতুন অস্ত্র পেয়ে গেছে। সেই অস্ত্রের নাম হলো পানি। খুটির সঙ্গে বেঁধে ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে দেওয়া! আমরা কতটা বিচিত্র এবং অমানবিক তা এ শীত না এলে বোঝাই যেত না!
প্রচণ্ড শীতে যখন মানুষ কাবু, তখন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে এসেছে গ্যাস সংকট। লাইনের গ্যাসের সংকট এই দেশে আগেও ছিল, কিন্তু সিলিন্ডার গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে এবার। কিন্তু এতো এতো উৎপাদনকারী এবং পর্যাপ্ত কাঁচামাল থাকার পরও কেন এ সংকট তার সঠিক কারণ জানা যায়নি।
