Logo
Logo
×

বিচ্ছু

পর্ব-১৬

দাম্পত্য জীবন জটিল জীবন

Icon

সাদিকুল নিয়োগী পন্নী

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দাম্পত্য জীবন জটিল জীবন

এক.

রেশমির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আমাকে সবসময় গোলকধাঁধায় থাকতে হয়। মনোবিজ্ঞানের একাধিক বই পড়েও তার মনের কূলকিনারা পেলাম না আজও। রেশমির কাছে আমি সাধারণ একটা ফুটবলের মতো। কখনো আমাকে গোলকিপারের মতো অতি যত্নে আঁকড়ে ধরে, আবার হঠাৎ করেই ডিফেন্ডারের মতো কিক মেরে সীমানার বাইরে পাঠিয়ে দেয়! আমার বেহায়া মন। সবকিছু ভুলে আবার ফিরে যাই রেশমির কাছে। কিন্তু সে তার চিরায়ত রূপ থেকে বের হতে পারে না। ভালোবেসে যদি কখনো এক ফোঁটা মধু দান করে, একটু পরই দশ বোতল বিষ ঢেলে দেয় মুখে। আমাদের সংসারের এমন দূর অবস্থা মানে দুরবস্থা দেখে একাধিক বিয়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বড় ভাই আসাদ পরামর্শ দিলেন, ‘এমন পাগলাটে বউকে কবজায় রাখতে হলে তার বাবার মন জয় করতে হবে’।

দুই.

পাশের গলিতে শ্বশুরের বাসা। দূরত্ব কম হলেও জামাই হিসাবে নিজের ভাবগাম্ভীর্য ধরে রাখতে বিশেষ কারণ ছাড়া শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া হয় না। উপায় খুঁজছিলাম শ্বশুরবাড়িতে না গিয়ে শ্বশুরের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার। হঠাৎ একদিন দেখি আমাদের গলির দেওয়ালে পোস্টার সাঁটানো ‘এসো গণিত শিখি’ নামের একটি সংগঠনের। শ্বশুর এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক গণিতপ্রিয় শ্বশুর সবার মাঝে গণিতের দ্যুতি ছড়িয়ে দিতে এ উদ্যোগ নিয়েছেন। এ সংগঠনের মাধ্যমে আমি শ্বশুরের কাছাকাছি যাওয়ার পাশাপাশি নিজেকে গণিতে দক্ষ করার সুযোগ পেলাম। অফিস থেকে ফেরার পর এক-দেড় ঘণ্টা সময় দিই সংগঠনে। শ্বশুর শিক্ষক মানুষ। তার কাছে সংগঠনের সবাই সমান। জামাই হিসাবে বাড়তি কোনো সুবিধার ব্যবস্থা নেই। অঙ্কে কাঁচা হওয়ায় সংগঠনে অধিকাংশরা যখন কঠিন গণিতচর্চা করছে, তখন আমার সময় যায় যোগ-বিয়োগ করে। গণিতে দক্ষরা শ্বশুরের প্রিয় পাত্র হলেও আমি অপ্রিয়ই রয়ে গেলাম। একদিন ক্লাসের পর সুযোগ পেলাম শ্বশুরের সঙ্গে কথা বলার। ওনার সান্নিধ্য পেয়েই আমি রেশমির প্রশংসা শুরু করলাম।

আমার কথা শুনে শ্বশুর গেলেন রেগে। ভয়ে আমার কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল। শ্বশুর মশাই ছাত্রদের মতো আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘কাঁপাকাঁপি বন্ধ কর’।

আমি কিছুটা স্থির হতেই তিনি বললেন, ‘এতদিনে বুঝলাম তুমি গণিতে এত কাঁচা কেন? আমার গাধা মেয়েটার সঙ্গে থেকে তুমি এমন হয়েছ’।

মরুর বুকে ফুল ফোটার মতো আনন্দিত হলাম তার কথা শুনে। মুহূর্তের মধ্যে আমার মন থেকে ভয় দূর হয়ে গেল। আমি বললাম, ‘রেশমি সবকিছুতে অল রাউন্ডার। অঙ্কে যেমন পাকা, গানও অনেক ভালো গায়। রান্নার কোনো তুলনায় হয় না’।

‘এই দিলে আমার মাথাটা গরম করে। একটা গাধা মেয়েকে তুমি সিংহের মতো প্রশংসা করছ। আমি শিক্ষক। মেয়ে বলে সব প্রশংসা মেনে নেব-এমন ভাবার কারণ নেই’।

আমি বললাম, ‘ওর গান শুনতে পুরা ক্যাম্পাসের মানুষ হাঁ করে থাকত। আমি রেশমিকে পছন্দ করেছিলাম তার গান শুনেই’।

উনি হাসি দিয়ে বললেন, ‘তোমার শ্রবণশক্তি ঠিক না থাকলেও দৃষ্টিশক্তি ঠিকঠাক’। তার কথার ভাবার্থ বুঝতে না পেরে আমি চুপ করে রইলাম।

শ্বশুর বললেন, ‘তুমি চেহারা দেখে পাগল হয়েছিলে। সুরে মুগ্ধ হয়ে নয়। তা ছাড়া রেশমি একটা গানও মুখস্থ জানে না’। ‘সেদিনের আয়োজনে পুরাটাই গেয়েছিল’। আমি বললাম।

‘কানে হেডফোন ছিল সেটা হয়তো খেয়াল করোনি। ও রেকর্ডিং শুনে শুনে গেয়েছে’।

‘আপনি যাই বলেন, রেশমি কিন্তু অনেক পরিশ্রমী’।

‘খাবার চিবিয়ে দিলে তারপর গিলে’।

‘সুন্দরীরা একটু এমনি হয়...!’

আমার কথা শুনে শ্বশুর এবার তেলে বেগুনে রেগে বললেন, ‘রূপ দিয়ে কতদিন টিকবে? আমাদের ক্লাসের ললিতা, ঝরনা সবই ঝরে গিয়েছিল একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর’।

‘আপনি বাবা হয়ে এমন করে বলছেন’?

‘জ্বালাটা আমি জানি। তুমি সেদিন যুক্ত হয়েছ। সময় গেলে টের পাবে আমার মেয়েকে’।

‘জ্বালা কমাতেই আপনার কাছে এলাম। সেটা যদি বুঝতে পারতেন। আপনি হয়তো কোনো কারণে রেশমির ওপর রেগে আছেন’।

‘আমার মনে হয় রেশমি তোমাকে এখানে ওকালতি করতে পাঠিয়েছে। আমার শুরু থেকে সন্দেহ হচ্ছিল তোমাকে নিয়ে। আজকের পর থেকে এখানে আর আসবে না তুমি’।

আমি কথা না বাড়িয়ে মাথা নিচু করে সেখান থেকে বের হয়ে চলে এলাম।

তিন.

সপ্তাহখানের পরের ঘটনা। রেশমি বাবার বাড়িতে একরাত থেকে বাসায় ফিরল। আমি অফিস থেকে ফিরে তার চেহারা দেখে আতঙ্কিত হয়ে গেলাম। ঝড়ের আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো অবস্থা।

বললাম, ‘বাড়ি থেকে ঘুরে এলে মন ফুরফুরা থাকার কথা তোমার’।

কথা শেষ হওয়ার আগেই ব্রজপাত শুরু হলো, ‘তুমি বাবাকে কী বলেছ?

‘আমি মন্দ কিছু বলিনি। তোমার প্রসংশা করেছি’।

‘কাজটা করলে কী? আমার সর্বনাশ ডেকে আনলে’।

‘তুমি ভালো মেয়ে। তোমার প্রসংশা না করে থাকি কেমনে’?

রেশমি আরও কয়েকগুণ রেগে বলল, ‘বাবা আমাকে অপমান করেছে তোমার জন্য। তার ধারণা আমি তোমাকে পাঠিয়েছে প্রসংশা করতে’।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে বললাম, ‘তোমার মন পাবার জন্য আমি এমনটা করেছি’।

‘তুমি আমাকে বাবার কাছে ছোট করলে। এখনই বের হয়ে যাও বাসা থেকে’।

এ ঝড় থামার নয়, দেখে আমি বাসা থেকে বের হয়ে ‘এসো গণিত শিখি’ সংগঠনের দিকে রওয়ানা দিলাম।

সেখানে গিয়ে দেখি শ্বশুর মশায় দাঁড়িয়ে একজনকে জ্ঞান দিচ্ছেন।

আমি গিয়ে বললাম, ‘গণিত না শেখা পর্যন্ত আপনার এখানে আবাসিক ছাত্র হিসাবে থাকতে চাই’।

শ্বশুর বললেন, ‘গাধা মেয়েটা তোমাকে আবার পাঠিয়েছে

মনে হয়’।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম