Logo
Logo
×

বিচ্ছু

ভাষার মাসে ভাষার বিভ্রাট

আপনার বাংলা জ্ঞান কেমন? * এক কথায় দারুণ! মে হু পিওর বাঙালি! ফ্লুয়েন্ট বাংলা বলায় আমার একস্ট্রা অর্ডিনারি নলেজ আছে স্যার!

Icon

শফিক হাসান

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ভাষার মাসে ভাষার বিভ্রাট

খবরের কাগজে ‘ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা ভাষা ভাসে নাকি ডোবে’ শীর্ষক সম্পাদকীয় নিবন্ধ পড়ছিল ইকবাল। বেশ গতিময় লেখা। ভাষা তো না, যেন জলে ভাসা নৌকা। নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের গতি হঠাৎ ব্যাহত হলো। শিলা বলে উঠল, ‘গুড মর্নিং!’

বউয়ের ডাকেই কি তবে মধুর-বিধুর স্বপ্নটা ভেস্তে গেল! তবে নিবন্ধ পাঠের প্রতিক্রিয়া হিসাবে ওর ভেতরে যে ভাষাপ্রেম জাগ্রত হয়েছে, সেটা এখনো অটুট। লেখকের ভাষ্য অনুকরণ করে ইকবাল বলল, ‘গুড মর্নিং না বলে সুপ্রভাত বললেও পার। জান না, আমাদের মাতৃভাষা কতটা সমৃদ্ধ!’

‘মাতৃভাষা কেন, এটা পিতৃভাষাও হবে না? বৈষম্য করে পিতাদের দূরে সরিয়ে রাখছ কেন!’

বিছানায় বসে আড়মোড়া ভাঙল ইকবাল-‘মাতৃ-পিতৃ বাদ দিয়ে সর্বজনীন বাংলা ভাষাই বলছি। এখন থেকে তুমি আমার সঙ্গে বাংলায় কথা বলবে। ওই খিচুড়ি ভাষা আর চলবে না। যদিও তোমার রান্না করা খিচুড়িটা বেশ মজাদার হয়।’

‘ওকে, বলব না। এখন ব্রাশ করে এসো। ব্রেকফাস্ট করবে। টেবিলে খাবার দিচ্ছি।’

‘আবার ব্রেকফেল কথা বললে! প্রতিটা বাক্যেই তুমি ইংরেজি বলেছ। অথচ চাইলে সুন্দর বাংলা চুজ... স্যরি বাছাই করতে পারতে।’

‘খাবারটা টেবিলে দেব নাকি কেদারায়?’

‘কেদারায় কেন?’

‘টেবিলের বাংলা তো তুমি বলতে পারবে না। তাই মুখ বাঁচানোর জন্য যদি চেয়ারকে আঁকড়ে ধর!’

‘এই সাতসকালে দিলে তো মুডটা অফ করে! এখন বেড টি দাও। চা খেয়ে দাঁত মাজব।’

‘মুড অন করার জন্য তোমাকে বিছানা চা-ই দেওয়া উচিত হবে।’

‘ঠিক বলেছ। সেটাই দাও। বিছানায় শুয়ে... স্যরি বসে যে চা খাওয়া হয় সেটাই বিছানা চা।’

‘বানানোই আছে। কিচেন থেকে নিয়ে আসছি।’

‘উঁহু, রান্নাঘর!’

‘রান্নাঘর না, বললে ওটাকে বলতে হবে কান্নাঘর। আজকাল গ্যাস থাকে না। কত কষ্ট করে প্রতিদিন কুক করি!’

‘গ্যাস, কুক এসব বলা যাবে না। গ্যাসের ভালো বাংলা হতে পারে দাহ্য পদার্থ।’

শিলা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুমি মানুষ থেকে কবে অভিধান হয়ে উঠলে?’

‘অভিধান নয় ডিকশনারি। আজই তোমাকে ইংলিশ টু বেঙ্গলি ডিকশনারিটা কিনে এনে দেব। অনেক সুন্দর সুন্দর বাংলা শিখতে পারবে!’

প্রাতকৃত্য শেষে বছরের প্রথমবারের মতো ব্রেকফাস্ট না করে নাশতা সারল ইকবাল।

শিলা বলল, ‘শাড়ির ইংরেজি কিন্তু শাড়িই। এ মাসে কিনে দেবে? তাহলে একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে শাড়ি পরেই ফুল দিতে যাব।’

ইকবাল তর্জনী নাড়িয়ে বলল, ‘ইংরেজি কপচানো চলবে না। কীসের ২১ ফেব্রুয়ারি? বলবে ৮ ফাগুন!’

‘জ্বালাবে না আগুন! রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিসহ সবখানেই খ্রিষ্টাব্দ তারিখের জয়জয়কার। তুমি আছ বাংলা মাসের নাম নিয়ে। বলতে পারবে আজ বঙ্গাব্দ কত সনের কত তারিখ?’

আমতা আমতা করে ইকবাল বলল, ‘সেটা আমি ক্যালেন্ডারে দেখে নেব! অফিসের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, এখন যাই।’

‘হয়নি। বর্ষপঞ্জি, কার্যালয়!’

দুই.

শহরের বাসচালকরা ঋষির মতোই নির্বিকার। কিছুতেই তাদের কিছু যায়-আসে না। যখন অনেকের তাড়া, তখনো তারা ধ্যানী বকের মতো ঝিম মেরে বসে থাকে মাঝরাস্তায়। নির্বিকার চালকের পেছনে যথারীতি অসহায়ের মতো বসে আছে ইকবাল। এসময় সামনের আসন থেকে জনৈক যাত্রী তাড়া দিল-‘কী ব্যাপার ড্রাইভার সাহেব, বাস ছাড়ছেন না কেন?’

চালকের উপরে ঝাড়তে না পারা খেদ প্রতিবাদী লোকটা উপরে চাপিয়ে দিল ইকবাল-‘ভাই, ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে কেন ইংরেজি শব্দ উচ্চারণ করছেন? বাসের ভালো বাংলা শব্দ কি নেই?’

‘আই সি! বলেন দেখি, কী সেটা?’

বিব্রত ইকবাল বলল, ‘আচ্ছা, আমি গুগল করে দেখছি। এত সমৃদ্ধ ভাষা, না থাকার কথা নয়।’

‘গুগলটা কি বাংলা শব্দ?’

‘না। তবে আগের শব্দটার জবাব নিন। মনে পড়েছে, বাসের বাংলা হচ্ছে মোটরচালিত দ্রুতযান!’

নানাবিধ বগিজগির মধ্যে দুপুর নেমে এলো। নিবিষ্ট মনে কাজ করছিল ইকবাল। একাগ্রতা দেখে সহকর্মী সোহান খোঁচা দিয়ে বললেন, ‘এত কাজ করে কী হবে? প্রমোশন তো কপালে জুটবে না!’

‘প্রমোশন নয়, ওটা পদোন্নতি।’

‘চমৎকার বাংলা জানেন, আপনার পদোন্নতির পাশাপাশি হস্তোন্নতিও হবে। এখন চলেন, খেতে যাই।’

ক্যান্টিনে এসে ইকবাল বেয়ারাকে বলল, ‘একটা বর্তন দাও।’

‘কীসের বর্তন?’ বলে হা করে চেয়ে রইল সে।

ইকবাল চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘বাংলা বোঝো না?’

‘ও বুঝছি পেলেট! আপনে বাংলা কইলে পরথমেই বুঝতাম।’

খেতে খেতে সোহান তাকালেন ইকবালের দিকে-‘আপনার শার্টটা সুন্দর! কবে কিনলেন?’

‘শার্ট না বলে কোর্তা বলতে পারতেন না? কবি বলেছেন-হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন!’

‘শার্টকে কোর্তা বললে প্যান্টকে কলকাতার উপন্যাসের আদলে প্যান্টলুন বলব নাকি! আপনি যেভাবে বুঁদ হয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস পড়েন, বলতেও পারেন। তবে ভুলে যাবেন না প্যান্টলুন উচ্চারণ করতে প্রথমে প্যান্ট বলতে হয়!’

‘প্যান্টের নিশ্চয়ই ভালো বাংলা আছে। গুগল ট্রান্সলেটে গিয়ে দেখতে হবে!’

‘তাই দেখুন। কবি বলেছেন, কোনো বাংলা নিজের আয়ত্তে না থাকলে অন্য দেশের প্রযুক্তি ব্যবহার করবে!’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম