লেখকের কবলে

  জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য ১৫ জুলাই ২০২০, ২২:০৩:৪০ | অনলাইন সংস্করণ

‘নির্দ্বিধায় বলুন, আপনার সমস্যা কী?’

সাইকিয়াটিস্টের কথায় নড়েচড়ে বসলাম। কী উত্তর দেব ভেবে পাচ্ছি না। আমি পাগল নই। তারপরও আমার বাড়ির লোক জোর করে ধরে আমাকে সাইকিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে এসেছে। আমার দোষ একটাই আমি একজন লেখক। নতুন নতুন গল্প লিখতে শুরু করেছি। মাথার ভেতর সারাক্ষণ খালি গল্প ঘোরে। ঘুমাতে না পেরে ছটফট করি আর বারবার উঠে উঠে গল্প লিখি।

প্রায়ই বাড়ির লোককে জোর করে ধরে গল্প পড়ে শোনাই। দেখা যাচ্ছে ভাবি রান্না করছে। আমি ট্যাব নিয়ে ভাবির সামনে গিয়ে বলি, ‘একটা গল্প শুনবা? নতুন লিখেছি!’

ভাবি আতঙ্কিত গলায় বলে, ‘না না! আমি এখন কাজ করছি, প্লিজ আমাকে রেহাই দাও!’

আমি রাগী গলায় বলি, ‘আমার লেখাটাকে তুমি ছোট করে দেখলে! এই লেখাটা ফেসবুকের অনেক বড় বড় পেজ শেয়ার দিয়েছে জানো? তোমার পড়া লাগবে না। তুমি কাজ করো, আমি পড়ে শোনাচ্ছি।’

ভাবিকে গল্প শুনতে হয়। শুধু শুনলেই হয় না, গল্পের সারমর্মটা আবার আমাকে শোনাতে হয়। যাতে আমি শিওর হতে পারি যে, সে গল্পটা মন দিয়ে শুনেছে।

আমার এমন কর্মকাণ্ডের কারণে ফেসবুকে আমার ক্লোজ ফ্রেন্ডরাও আমাকে ব্লক দিয়ে দিয়েছে। আমি তাদের নক দিয়ে প্রথমে সরল গলায় কিছুক্ষণ সামাজিক আলাপ করি, ‘কেমন আছিস? আমি ভালো আছি। দিনকাল কেমন চলছে?’

আলাপের পরপরই আমার লেখা তিন-চারটা গল্প পাঠিয়ে দিয়ে বলি, ‘পড়ে জানা তো, কেমন হয়েছে?’ এরকমই দশ-পনেরোটা গল্প পড়ার পর বিরক্ত হয়ে ওরা আমাকে ব্লক দিয়ে দেয়।

পরশু রাতেও এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে। সারা দিন অফিস শেষে ভাইয়া সদ্য বাসায় ফিরেছে। আমি ট্যাব নিয়ে গিয়ে বললাম, ‘নতুন একটা গল্প লিখেছি, পড়ো!’ ভাইয়া পড়বে না। ভীতু গলায় বলল, ‘কেবল অফিস থেকে আসলাম। একটু ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে দেয়ে নিই, তারপর পড়ি?’

আমি ভাইয়ার হাতে ট্যাব ধরিয়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে রুম লক করে দিলাম। বাইরে থেকে গম্ভীর গলায় বললাম, ‘গল্পটা পড়ে আমাকে বলবা কী পড়লে! কেমন লাগল! নাহলে আজ ঘর থেকে বের হতে পারবা না।’

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে আজ সাইকিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে আসা হয়েছে। তিনি ভাইয়া-ভাবির মুখ থেকে সমস্যা শোনেননি, আমার মুখে শুনবেন।

সাইকিয়াটিস্ট আবার বললেন, ‘বললেন না, আপনি পাগল হয়েছেন কীভাবে?’

আমি তার দিকে ঝুঁকে নিচু গলায় বললাম, ‘আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসি!’

তিনি আনন্দিত গলায় বললেন, ‘জানতাম এরকম কিছুই হবে! এগুলা আজকাল কমন হয়ে গেছে। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ডিপ্রেশন থেকে তৈরি হয়েছে মানসিক সমস্যা।’

‘জি না! ব্যাপারটা এরকম না!’

‘তাহলে কী রকম?’

‘ছেলেটা আমাকে ভালোবাসে না, সে অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসে। সেই মেয়েটা আবার ওকে ধোঁকা দিচ্ছে! ছেলেটা যতদিনে এটা বুঝতে পারবে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে!’

‘তাহলে এখন কী করা যায়?’

‘পরের অংশটা এখনো ভাবিনাই!’

‘মানে?’

‘মানে এটা আমার একটা গল্পের অংশ।’

সাইকিয়াটিস্ট আমাকে খুশি করার জন্য উৎসাহী গলায় বললেন, ‘আপনি গল্প লেখেন?’

‘হুম!’

‘বাহ! শুনে আনন্দ পেলাম। একদিন বড় লেখিকা হবেন ইনশাআল্লাহ! এখন একটু বলবেন, আপনার সমস্যাটা কী? আপনাকে আমার কাছে কেন আনা হয়েছে?’

‘আমি একটা খুন করব!’

‘কাকে?’

‘আপনাকে!’

‘হোয়াট! কেন?’

আমি সহজ স্বরে বলতে শুরু করলাম, ‘একবার আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার বাড়ির লোক আমাকে একজন মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। তাদের বাইরে বসিয়ে ডাক্তারটি আমার সঙ্গে একাকী কথা বলতে থাকে। সেই সময়ে আমি হঠাৎই টেলিফোনের তার দিয়ে ডাক্তারের গলা পেঁচিয়ে ধরি...’

কথা শেষ করলাম না, সাইকিয়াটিস্ট আমার দিকে ভীতু চোখে তাকিয়ে বেল টিপতে গেলেন। আমি তার হাত চেপে ধরলাম।

থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে তিনি বললেন, ‘আপনি চান কী?’

আমি বিনয়ী গলায় বললাম, ‘ভয় পাবেন না। এটা আমার একটা গল্পের কনসেপ্ট। মাত্রই বানালাম। একটু ওয়েট করেন। গল্পটা লিখে ফেলি। একটু পড়ে দেখবেন প্লিজ? শুনেছি সাইকিয়াটিস্টরা পেশেন্টের কথা খুব মন দিয়ে শোনেন। আমার গল্প শোনানোর মানুষের খুব অভাব! আজ আপনাকে সব গল্প পড়ে শোনাবো।’

ঘণ্টাখানেক পার করে আমি বেরিয়ে এসেছি। সাইকিয়াটিস্ট এখন নিজেই মানসিক হাসপাতালে ভর্তি। লেখক দেখলে ভায়োলেন্ট হয়ে পড়েন আর বারবার বলেন, ‘গল্প শুনব না, গল্প শুনব না।’

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত