বেজার যদি হন ঘরের উনি...

  মোকাম্মেল হোসেন ২৯ জুলাই ২০২০, ২১:৩৬:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ

মুক্তাগাছা থেকে ফিরে নাকে-মুখে খাচ্ছি। ডালের বাটি এগিয়ে দিয়ে লবণ বেগম বলল-

: গলায় ভাত ঠেইকা মরবা তো! একটু আস্তে খাও।

খাওয়াটা ধীরেসুস্থেই শুরু করেছিলাম। আউলা লেগে গেল আলালের ফোন পেয়ে। আলাল জানতে চাইল-

: তুমি কই?

: বাড়িতে; ভাত খাইতেছি।

: অহনও খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে আছ; গরু কিনবা কখন?

কোরবানির গরু কিনতে আজ আমার অষ্টধার বাজারে যাওয়ার কথা। বন্ধু আলালকে সাহায্যকারী হিসেবে সঙ্গে থাকার অনুরোধ করেছি। সে এত তাড়াতাড়ি বাজারে পৌঁছে যাবে ভাবিনি। আলাল পুনরায় বলল-

: খাওন-দাওন সাইডে রাইখ্যা দৌড় দেও। নইলে পরে কিন্তু পস্তাবা...

আলালের কথা শোনার পর খাবারের থালা একপাশে রেখে দৌড় দেয়া উচিত। কিন্তু একজন ক্ষুধার্ত মানুষের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। তাই দ্রুত খাবারগুলো পেটে চালান করে দিচ্ছিলাম। লবণ বেগম সামনে থাকায় সমস্যা হচ্ছে দেখে বললাম-

: তুমি ফোন কইরা যেসব জিনিস আনতে বলছিলা; আনছি।

: কই?

: আমার ব্যাগের সামনের পকেটে আছে।

লবণ বেগম উঠে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর চিৎকার শোনা গেল। একটু পরে আমার সামনে এসে বিস্ফোরিত চোখে বলল-

: হোয়াট ইজ দিস?

: বলপেন।

: আমি কি তোমারে বলপেন আনতে বলছিলাম?

: কী আনতে বলছ!

: তুমিই বল, কী আনতে বলছি!

: বলাবলির কী আছে! তুমি যা যা আনতে বলছ- তাই তো আনছি!

: অবশ্যই আন নাই। আমি তোমারে আনতে বলছি ভ্রু পেন; আর তুমি আনছ বলপেন!

: ভ্রু পেন?

: হ্যাঁ, ভ্রু পেন। মানুষের চোখের ওপর যে দুইটা ভ্রু আছে, এইটা জান তো!

: জানি।

: সেই ভ্রুতে মেয়েরা যে বস্তু ব্যবহার করে, সেইটারে ভ্রু পেন বলে।

: অঃ।

: আর এইটা কী আনছ?

: লিপ লাইনার!

: ব্যাগে ভরার আগে জিনিসটা একবার নাকের কাছে নিছিলা?

: না।

: এখন নিয়া দেখ, কী পচা গন্ধ!

: পচা গন্ধ মানে? দোকানদাররে বলছি, সবচাইতে ভালোটা দেন। দোকানদার নিশ্চিত করছে, এইটা বিখ্যাত জর্ডানা কোম্পানির মাল। কোম্পানির নাম লেখা আছে দেখ।

: লেখা থাকলেই সব হইয়া গেল! আমি একটা সাদা কাগজের ওপর এক হাজার টাকা লেখলেই সেইটা এক হাজার টাকার নোট হইয়া যাবে?

মাথা নেড়ে বললাম-

: না।

থুম ধরে বসে থাকার একপর্যায়ে লবণ বেগম হাতের জিনিসগুলো সশব্দে টেবিলের ওপর রেখে বলল-

: বুঝছি! তোমার প্রতি মায়া দেখাইয়া কোনো লাভ নাই। চল আমার সঙ্গে...

: কোথায়?

: মুক্তাগাছা।

: এখন মুক্তাগাছা গেলে গরু কিনব কখন?

: সর্বপ্রথম আমার আর পোলাপানের কেনাকাটা শেষ করব। এরপর তুমি তোমার ছাগল-গরু-উট; যা খুশি কিনতে যাবা।

নৌকাডুবির পর সাঁতার না জানা কোনো যাত্রী যেমন সামনে খড়কুটো যা পায়, আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে; আমিও তাই করলাম। বললাম-

: এই এলাকায় আজই গরু-ছাগলের শেষ হাট।

: আগামীকাল বিদ্যাগঞ্জের হাট আছে।

: এতদূরে যাব!

: মানুষ গরু কিনবার লাইগা নদী পার হইয়া সিরাজগঞ্জ চইলা যায়; আর তুমি বিদ্যাগঞ্জে যাইতে পারবা না?

মহাফাঁপরে পড়ে গেলাম। লবণ বেগমের হুকুম পালন না করলে সে বেজার হবে। আবার আলালকে ডেকে আনার পর যদি বাজারে না যাই তাহলে সে বেজার হবে। কী করব, তাই নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছি; লবণ বেগম বলল-

: কী হইল, যাবা না?

এ প্রশ্নের একমাত্র উত্তর হওয়া উচিত, না। কিন্তু বউকে বেজার কি ঠিক হবে? অশান্তি নিরসনে সংসার রণাঙ্গনে নিয়োজি প্রত্যেক বিবাহিত পুরুষের উচিত, ঘরের যৈবতীর মন রক্ষা করে চলা। কাজেই এ মুহূর্তে লবণ বেগমের হুকুম তামিল করাই সঙ্গত।

পরদিন প্রতিবেশী হারেজকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যাগঞ্জ গেলাম। গরু কিনতে কিনতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। লেনদেন সম্পন্ন করে চা-নাস্তা খাওয়ার পর হারেজকে বললাম-

: বিসমিল্লাহ বইল্যা তুমি গরু লইয়া হাঁটা দেও। আমি ট্রেনে পিয়ারপুর হইয়া বাড়িতে যাব।

বাড়িতে পৌঁছে চায়ের কাপ সামনে নিয়ে বসেছি, এ সময় হারেজের ফোন পেলাম। সে বলল-

: ভাইজান, একটা ঘটনা ঘইটা গেছে! নিমতলী পৌঁছার পর রেললাইন পার হইতেছিলাম, এমন সময় একটা ট্রেন...

: কও কী! গরু কি ট্রেনের নিচে কাটা পড়ছে?

: না।

: তাইলে?

: ট্রেনের শব্দ শুইন্যা গরুটা একটা লাফ দিয়া আমার হাত থেইক্যা ছুইটা গেছে। বিশ্বাস করেন ভাইজান, লেঙুর ধরার জন্য পিছনে-পিছনে অনেকক্ষণ দৌড়াইছি; ধরতে পারি নাই।

: আশপাশে খোঁজ নেও নাই?

: পুরা এলাকা মই দিয়া ফেলছি; কোনো লাভ হয় নাই।

একটা ভ্যানগাড়ি জোগাড় করে নিমতলী পৌঁছলাম। হারেজ আমাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কান্না থামানোর নির্দেশ দিয়ে তাকে বললাম-

: কইন্দা কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। কান্না বন্ধ কর।

আকাশে জ্বিলহজ মাসের অপূর্ণ চাঁদ। চপলা নারীর ন্যায় ভেসে বেড়ানো শ্রাবণের মেঘমালা সেই চাঁদকে একটু পরপর তার ভালোবাসার চাদরে ঢেকে দিচ্ছে। আধো আলো আধো ছায়ার মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া চারপাশের পরিবেশ রহস্যের অবগুণ্ঠানে আবৃত, যা ভেদ করে সচল-গতিসম্পন্ন কোনো প্রাণীকে খুঁজে বের করা দুঃসাধ্য বলে মনে হল। হঠাৎ হারেজ বলল-

: ভাইজান, মাইকিং করলে কি খোঁজ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে?
নিমতলী বাজারে মাইকের কোনো দোকান নেই। একজন বলল-

: আধামাইল সামনে এতিমখানায় একটা মাইক আছে। এতিমখানার লোকজন সেইটা দিয়া টাকা-পয়সা কালেকশন করে। পয়সাকড়ি দিলে তারা রাজি হইতে পারে।

মাইকিং করতে করতে অগ্রসর হচ্ছি, গতিরোধ করে বয়স্ক এক ব্যক্তি বললেন-

: ভালো লোকের হাতে পড়লে গরু ইনশাল্লাহ ফেরত পাওয়া যাবে। আর বদলোকের হাতে পড়লে তার গোশত দিয়া আগামীকাল কোন হোটেলের কাবাব তৈরি হবে, সেইটা আল্লাহপাক ছাড়া কেউ জানে না। আইচ্ছা, গরুর ‘সাইড়’ করেন নাই?

বললাম-
: করছি।

: ইজারাদার যে কাগজ দিছে, তাতে গরুর মালিকের নাম-ঠিকানা লেখা নাই?

পকেট থেকে কাগজটা বের করলাম। মালিকের নাম লেখা ইজ্জত আলী। ঠিকানা কাবারিকান্দা।

বয়স্ক লোকটি এবার বললেন-

: পোষা প্রাণীরা অনেক সময় মালিকের মায়া ত্যাগ করতে পারে না। আপনেরা একবার গরুর মালিকের বাড়িতে যাইয়া খোঁজ নিতে পারেন।

কাবারিকান্দা যখন পৌঁছলাম, তখন গভীর রাত। তার বাবা এলেম আলী সবকিছু শোনার পর বললেন-

: খাওন-দাওন শেষ কইরা শুইতে যামু, এমন সময় দেখি লালু উঠানে খাঁড়া। লালুরে গোয়ালে বাইন্ধা রাখছি; কিন্তু ইজ্জত তো বাড়িতে নাই। সে বোরোরচর গেছে তার মেয়ের জামাইরে ঈদের দাওয়াত দিতে। গরু কার কাছে সে বিক্রি করছে, কী বিষয়-বৃত্তান্তÑ তা না জাইনা তো গরু দিতে পারি না।

ষাঁড়টার তাহলে একটা নামও আছে, লালু! নশ্বর পৃথিবীর এই সংসার-বাগানে মানুষ ও একটা অবলা জীবের মধ্যে যে মায়াবৃক্ষটি দিনে দিনে বেড়ে ওঠেছে, তার শেঁকড় কতটা গভীরে প্রোথিত, তা আবিষ্কার করার চেষ্টা করতে করতে বললাম-

: সমস্যা নাই। ঈদের তো এখনও কয়েকদিন বাকি আছে। লালু আপনের বাড়িতেই থাকুক। আমরা ঈদের আগের দিন আইসা নিয়া যাব।

মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক
[email protected]

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত