হৃদয়বিদারক সব ঘটনা
jugantor
হৃদয়বিদারক সব ঘটনা

  রোহিত হাসান কিছলু  

০১ অক্টোবর ২০২০, ২০:০০:৩৯  |  অনলাইন সংস্করণ

দিন ধরে বুকের বাঁ পাশে খুব ব্যথা করছে। আমি ডাক্তার না হয়েও বুঝতে পারছি আমার কোমল হৃদয়ের মধ্যে কোনো হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে চলেছে! ঘটবেই না বা কেন? এ হৃদয়ের ওপর দিয়ে তো আর কম ঝড় গেল না!

এ মুহূর্তে হৃদয়টা কেন এত ব্যথা করে সেটি জানতে ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছি। ডাক্তার সাহেবের নাম হৃদয় খান। নামটি আমার পছন্দ হয়েছে। হৃদয়ের ডাক্তারের নাম তো এমনই হওয়া উচিত! ঠিক তেমনি পাইলসের ডাক্তারের নাম থাকবে পাইলস সরকার! ধুর কী সব ভাবছি আমি! আমার আসলে হৃদয়ের ওপর ফোকাস রাখা উচিত।

হৃদয়টি আমার প্রথম নাড়া খেয়েছিল ক্লাস ফাইভে থাকতে। আমার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত রুবিনা। একদিন ওর চোখে চোখ পড়তেই বুকের ভেতরটি কেমন যেন নড়ে উঠল। সেই থেকে শুরু। তারপর প্রতি ক্লাসেই কাউকে না কাউকে দেখে হৃদয়ে আমার ঝড় বয়ে যেত!

হৃদয়ে সবচেয়ে খারাপ ঝড়টা ছিল সিমলার দেয়া। আমার মনে হয়, ওই ঝড়ের পর আমার হৃদয়ের আশি শতাংশ ড্যামেজ হয়ে গেছে! সেই ঝড়ের পর হৃদয়ে আমার ত্রাণ নিয়ে এল রিতা। হৃদয় আমার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখল! কিন্তু একদিন একটা বিসিএস ক্যাডার মেঘ এসে আমার হৃদয়ের আকাশ কালো করে ফেলল। তারপর শুরু হল ঝড়। ঝড় শেষে দেখি রিতা নেই! বিসিএস ক্যাডার মেঘের সঙ্গে উড়ে গেছে।

হৃদয় নিয়ে আমি খুব বিপদে পড়ে গেলাম। ঝড়ে সব তছনছ হয়ে গেছে। এক বন্ধু বলল, চল পাগলা বাবার আশীর্বাদ নিয়ে আসি! ঝড়ে পোড় খাওয়া তোর হৃদয়টা আরাম পাবে। বন্ধুর সঙ্গে পাগলা বাবার আশ্রমে গেলাম। বাবা সব শুনে পাগলা পানি খাইয়ে দিলেন! হৃদয়টা জ্বলে গেল আমার। হুশ হারিয়ে বাবার আশ্রমে পড়ে থাকলাম সাত দিন।

সাত দিন পর চোখ খুলে স্মিতাকে পেলাম। আমার কপালে জলপট্টি দিচ্ছিল। ওকে দেখেই আমার হৃদয়টা আবার ধক করে উঠল। স্মিতাকে বললাম, কপালে জলপট্টি দিচ্ছে কেন? আমার সমস্যা তো হৃদয়ে! তুমি কি পারবে আমার হৃদয়টাকে ঠিক করে দিতে?

স্মিতা স্মিত হেসে বলল, আমি তো হৃদয়েরই কারিগর! হৃদয় ঠিক করার জন্যই তো বাবা আমাকে এখানে রেখেছেন!’

স্মিতার জবাব আমার পছন্দ হল না। আমার নিজের হৃদয়ের জন্য নিজস্ব কারিগর দরকার। সবার হৃদয় ঠিক করে এমন কাউকে আমার দরকার নেই। কিন্তু স্মিতার রূপ দেখে হৃদয়ে আবার ঝড় শুরু হল।

হৃদয়টা ঝড়ে তছনছ হওয়ার পর বুঝলাম, প্রেম-প্রীতি আসলে আমার দ্বারা হবে না। মাঝখান দিয়ে শুধু শুধু হৃদয়টার পেরেশানি বাড়বে।

আমি একটা চাকরিতে জয়েন করলাম। মনে আশা, অফিসের কাজ নিয়ে চরম ব্যস্ত থাকব। কোনো রূপসীর দিকে তাকাব না। কারণ আমি এত দিনে এসে বুঝেছি, আমার হৃদয়ের যতœ আমাকেই করতে হবে। যাই হোক, আমি অফিসের কাজ করি। সারা দিন-রাত গাধার মতো খাটি। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে অফিসের বস আমাকে দেখতে পারেন না। আমি সামনে গেলেই খালি খ্যাঁকখ্যাঁক করে ওঠেন। হৃদয়টা আমার চোট খেল আবার। আমি চাকরি ছেড়ে দিলাম।

ভেবেছিলাম, বাকি জীবন হৃদয়টা নিয়ে বেশ আরামে থাকব। কিন্তু হল না। বাবা-মা ধরে বিয়ে করিয়ে দিল। বিয়ের পর হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটার পরিমাণ আরও বেড়ে গেল! এই যেমন গত পরশু বউ আমাকে ঝাড়ি দিয়ে বলল, ‘মশারি খাটাও নাই ক্যান এখনও?’ বললাম, ‘প্রতিদিন তো আমি মশারি খাটাই, আজ তুমি খাটাও।’ বউ ক্ষেপে উঠল। তারপর যা না তা-ই বলল। তারপর থেকেই আসলে বুকের বাম পাশের ব্যথাটা বেড়েছে। স্বামী-স্ত্রীর সব কিছু হবে হাফ-হাফ, সব কিছু করবেও হাফ-হাফ! অথচ আমার বউ একদিনও মশারি খাটাল না।

ডাক্তার টেস্টের কাগজ নিয়ে এসেছেন। তার মুখ হাসি হাসি। ডাক্তারকে এখন আর আমার ভালো লাগছে না। একটা মানুষের হৃদয় তছনছ হয়ে গেল! আর হৃদয়ের ডাক্তার হয়ে সে কি না হাসছে! ডাক্তার হাসি দিয়ে বলল, ‘আপনার হৃদয় একদম ঠিক আছে। ব্যথাটা আসলে গ্যাস্ট্রিকের!’

হৃদয়বিদারক সব ঘটনা

 রোহিত হাসান কিছলু 
০১ অক্টোবর ২০২০, ০৮:০০ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

দিন ধরে বুকের বাঁ পাশে খুব ব্যথা করছে। আমি ডাক্তার না হয়েও বুঝতে পারছি আমার কোমল হৃদয়ের মধ্যে কোনো হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে চলেছে! ঘটবেই না বা কেন? এ হৃদয়ের ওপর দিয়ে তো আর কম ঝড় গেল না!

এ মুহূর্তে হৃদয়টা কেন এত ব্যথা করে সেটি জানতে ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছি। ডাক্তার সাহেবের নাম হৃদয় খান। নামটি আমার পছন্দ হয়েছে। হৃদয়ের ডাক্তারের নাম তো এমনই হওয়া উচিত! ঠিক তেমনি পাইলসের ডাক্তারের নাম থাকবে পাইলস সরকার! ধুর কী সব ভাবছি আমি! আমার আসলে হৃদয়ের ওপর ফোকাস রাখা উচিত।

হৃদয়টি আমার প্রথম নাড়া খেয়েছিল ক্লাস ফাইভে থাকতে। আমার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত রুবিনা। একদিন ওর চোখে চোখ পড়তেই বুকের ভেতরটি কেমন যেন নড়ে উঠল। সেই থেকে শুরু। তারপর প্রতি ক্লাসেই কাউকে না কাউকে দেখে হৃদয়ে আমার ঝড় বয়ে যেত!

হৃদয়ে সবচেয়ে খারাপ ঝড়টা ছিল সিমলার দেয়া। আমার মনে হয়, ওই ঝড়ের পর আমার হৃদয়ের আশি শতাংশ ড্যামেজ হয়ে গেছে! সেই ঝড়ের পর হৃদয়ে আমার ত্রাণ নিয়ে এল রিতা। হৃদয় আমার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখল! কিন্তু একদিন একটা বিসিএস ক্যাডার মেঘ এসে আমার হৃদয়ের আকাশ কালো করে ফেলল। তারপর শুরু হল ঝড়। ঝড় শেষে দেখি রিতা নেই! বিসিএস ক্যাডার মেঘের সঙ্গে উড়ে গেছে।

হৃদয় নিয়ে আমি খুব বিপদে পড়ে গেলাম। ঝড়ে সব তছনছ হয়ে গেছে। এক বন্ধু বলল, চল পাগলা বাবার আশীর্বাদ নিয়ে আসি! ঝড়ে পোড় খাওয়া তোর হৃদয়টা আরাম পাবে। বন্ধুর সঙ্গে পাগলা বাবার আশ্রমে গেলাম। বাবা সব শুনে পাগলা পানি খাইয়ে দিলেন! হৃদয়টা জ্বলে গেল আমার। হুশ হারিয়ে বাবার আশ্রমে পড়ে থাকলাম সাত দিন।

সাত দিন পর চোখ খুলে স্মিতাকে পেলাম। আমার কপালে জলপট্টি দিচ্ছিল। ওকে দেখেই আমার হৃদয়টা আবার ধক করে উঠল। স্মিতাকে বললাম, কপালে জলপট্টি দিচ্ছে কেন? আমার সমস্যা তো হৃদয়ে! তুমি কি পারবে আমার হৃদয়টাকে ঠিক করে দিতে?

স্মিতা স্মিত হেসে বলল, আমি তো হৃদয়েরই কারিগর! হৃদয় ঠিক করার জন্যই তো বাবা আমাকে এখানে রেখেছেন!’

স্মিতার জবাব আমার পছন্দ হল না। আমার নিজের হৃদয়ের জন্য নিজস্ব কারিগর দরকার। সবার হৃদয় ঠিক করে এমন কাউকে আমার দরকার নেই। কিন্তু স্মিতার রূপ দেখে হৃদয়ে আবার ঝড় শুরু হল।

হৃদয়টা ঝড়ে তছনছ হওয়ার পর বুঝলাম, প্রেম-প্রীতি আসলে আমার দ্বারা হবে না। মাঝখান দিয়ে শুধু শুধু হৃদয়টার পেরেশানি বাড়বে।

আমি একটা চাকরিতে জয়েন করলাম। মনে আশা, অফিসের কাজ নিয়ে চরম ব্যস্ত থাকব। কোনো রূপসীর দিকে তাকাব না। কারণ আমি এত দিনে এসে বুঝেছি, আমার হৃদয়ের যতœ আমাকেই করতে হবে। যাই হোক, আমি অফিসের কাজ করি। সারা দিন-রাত গাধার মতো খাটি। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে অফিসের বস আমাকে দেখতে পারেন না। আমি সামনে গেলেই খালি খ্যাঁকখ্যাঁক করে ওঠেন। হৃদয়টা আমার চোট খেল আবার। আমি চাকরি ছেড়ে দিলাম।

ভেবেছিলাম, বাকি জীবন হৃদয়টা নিয়ে বেশ আরামে থাকব। কিন্তু হল না। বাবা-মা ধরে বিয়ে করিয়ে দিল। বিয়ের পর হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটার পরিমাণ আরও বেড়ে গেল! এই যেমন গত পরশু বউ আমাকে ঝাড়ি দিয়ে বলল, ‘মশারি খাটাও নাই ক্যান এখনও?’ বললাম, ‘প্রতিদিন তো আমি মশারি খাটাই, আজ তুমি খাটাও।’ বউ ক্ষেপে উঠল। তারপর যা না তা-ই বলল। তারপর থেকেই আসলে বুকের বাম পাশের ব্যথাটা বেড়েছে। স্বামী-স্ত্রীর সব কিছু হবে হাফ-হাফ, সব কিছু করবেও হাফ-হাফ! অথচ আমার বউ একদিনও মশারি খাটাল না।

ডাক্তার টেস্টের কাগজ নিয়ে এসেছেন। তার মুখ হাসি হাসি। ডাক্তারকে এখন আর আমার ভালো লাগছে না। একটা মানুষের হৃদয় তছনছ হয়ে গেল! আর হৃদয়ের ডাক্তার হয়ে সে কি না হাসছে! ডাক্তার হাসি দিয়ে বলল, ‘আপনার হৃদয় একদম ঠিক আছে। ব্যথাটা আসলে গ্যাস্ট্রিকের!’