মাছ দিয়ে শাক ঢাকা!
jugantor
মাছ দিয়ে শাক ঢাকা!

  শফিক হাসান  

০৭ অক্টোবর ২০২০, ২০:৩১:১৭  |  অনলাইন সংস্করণ

দুবাই প্রবাসী পাত্রের সঙ্গে বিয়ের তিন মাসের মাথায় খানা-খাদ্যের দুর্গতিতে পড়তে হবে বুঝতে পারলে জেবুননেসা কয়েকবার ভাবত।

যে লোক দুবাইয়ের ইজ্জত ডোবায়, তার সঙ্গে কুটুম্বিতা হয় না। মোতালেব আজকাল বাজার করে নাকি দোকানদারদের ফেলে দেয়া জিনিস টুকিয়ে আনে, সন্দেহ হয় জেবুননেসার। এমন ছোটলোকির কথা বাবাকেও জানিয়েছে। তার বাবা সরকারি অফিসের তৃতীয় শ্রেণির কেরানি। তিনি বিস্তর অনুসন্ধান চালিয়ে তদন্ত রিপোর্ট দিলেন- মোতালেব আদতে ছোট বংশের ছেলে।

তার দাদা অন্যের জমিতে কামলা খাটত। মোতালেব দুবাই গিয়েছিল বটে, তবে সেখানে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি করেনি; করেছে লেবারের কাজ!
বাবার সঙ্গে কথোপকথনে হতাশ গলায় জেবুননেসা বলল, ‘অহন তাইলে কী করুম?’
বাবা প্রবোধ দিলেন, ‘সংসার করতে থাক। ওর ফকিন্নিগিরি ছুটামু আমি!’
পরদিন যখন বাজারের ব্যাগ ঢেলে আধ পচা শাকে ঘাসের আধিক্য, কুমাড়ার ফালিতে মজানো শাস দেখে চিল-চিৎকার দিল সে ‘এটা সংসার নাকি ফাজলামি!’
জেবুননেসার চিৎকারের জবাবে কী বলবে ভেবে পেল না মোতালেব। তাকাল আকাশপানে। তার হয়ে কেউ উত্তরটা দিক। চিৎকারে ছুটে এলেন মোতালেবের মা, ‘জেবু, কী অইছে?’

‘কী আর অইব, আপনের এমন পোলারে আমার লগে বিয়া করাইলেন ক্যান?’
‘আমার আবিয়াইত্যা পোলা আছিল একখানই!’

বকাবকি করে জেবুননেসা ঘরে ঢুকল বাবাকে মিসডকল দেয়ার জন্য। এমন কপাল তার! মোবাইল ফোনে ব্যালেন্সও থাকে না কখনো। মোতালেব এতক্ষণ চুপ ছিল, মায়ের অপমানে কিছু একটা বলতে চাইল। চোখ ফেটে পানি ঝরল না। মন ভাঙারও সুযোগ নেই। সেটা কবেই পুড়ে গেছে দ্রব্যমূল্যের আগুনে, ।
মা প্রবোধ দেন, ‘আমগো যুগ কি এখন আছে রে বাপ! আধুনিক জমানায় বউরা মুরুব্বিগো কতা হুনে না, জামাই মানে না।’
ভিসা জটিলতায় দুবাই থেকে ফেরার পর মোতালেবের সব সঞ্চয় শেষ। চেষ্টা করছে ব্যবসা জোটানোর। কিন্তু সেটা কি সহজ! অনেক টাকার পুঁজিরী দরকার। ধার-কর্জ করে, ক্ষুদ্রঋণের ব্যাংকের সাহায্যে দোকান দাঁড় করালেও কতটুকু চলবে, ব্যাংকের ঋণ শোধ আর বাকি বকেয়া ফতুর হতে হয়।

যাই হোক পরের বার বাজারে গিয়ে বুদ্ধি করে বয়লার মুরগি কেনে। উপকারটা পক্ষান্তরে সবজি বিক্রেতাই করেছে। যে সবজিতেই হাত দেয়, দাম পঞ্চাশ টাকার ওপরে। পটোলের কেজি ত্রিশ টাকা বলায় এক বিক্রেতা ঝারি দিয়ে বলল, ‘ফার্মের মুরগি কিইন্যা খান গা মিয়া!’

পরামর্শটা মনে ধরল। শাকসবজি বাদ দিয়ে মুরগির বাজারে ঢুকল। একশ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে বয়লার। দুই কেজি মুরগি কিনে, কেটে-ছিলে যখন বাড়িতে পৌঁছাল- বউয়ের মুখে মেঘের ঘনঘটা। শঙ্কিত বোধ করল মোতালেব। নিশ্চয়ই মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করেছে। ভাত-কাপড়ের কাজিয়া সবচেয়ে কঠিন। দুশ্চিন্তা পাশে রেখে বউয়ের হাতে তুলে দিল ব্যাগ, ‘নিরামিষ আর কদ্দিন খাইবা! আইজ আমিষই নিয়া আইলাম!’
বউ খুশিমনে রান্নাঘরে ঢুকল। মোতালেব ফেলল স্বস্তির নিঃশ্বাস। টাকা বাঁচল, বউয়ের বকা থেকেও রক্ষা পেল। এই না হলে বুদ্ধিমান দুবাইফেরত জামাই!
এভাবে টানা দেড় মাস যখন মুরগি চলল, জেবুননেসা ক্ষেপল আবার, ‘সব সময় গরিব মাইনষের জিনিস কিনলেই অইব? শাকসবজি না খাইলে চোখে জুতি বাড়ে না!’

চোখের জ্যোতি বৃদ্ধির আবদারে শঙ্কিত বোধ করল মোতালেব। জেবুননেসা তাদের চৌদ্দগুষ্টির সুলুকসন্ধান বের করে ছাড়বে তাহলে। এক বিধবা আÍীয়া ভিক্ষা করে, ফুপাতো ভাই করে বাজারে কুলির কাজ। তাদের চিনে ফেললে ‘ভিক্ষুকের বংশ’ বলে গালি দিতে সময় নেবে না। মোতালেব মিনমিন করে বলল, ‘চোখের জুতি বাড়লে কি আমার পকেটে ট্যাকা বেশি পাইবা বউ?’
‘কী কইলা, আমি তোমার পকেট মারি?’
‘ওই কতা কই নাই। বাড়িত শাকসবজির আবাদ করলে জুতি বাড়ব, চাপও কমব।’
‘তবুও তুমি ছোটমাছ, শাকসবজি কিনবা না! অপমান করনের লাইগা আমারে বিয়া কইরা আনছিলা! আমি করমু সবজি চাষ! আগে বুঝলা না ক্যান?’
গালির চোটে মোতালেবের বুদ্ধি খোলতাই হল, ‘ডাক্তর দেখাইছি। আমার কঠিন বিমার অইছে। কদিন হাসপাতালে থাকন লাগব।’

‘আইচ্ছা! আব্বারে ফোন কইরা জিগাই আমারে যক্ষ্মা রোগীর লগে বিয়া দিল ক্যান। তার বাড়িত কি মাছ-গোশত কম আছিল!’
মোতালেব ভেবেছিল কদিন হাসপাতালে ভর্তি থেকে বাজারের টাকা সাশ্রয় করবে। হল উল্টোটা। কিছুক্ষণ পর জেবুননেসা বলল, ‘আব্বা-আম্মাসহ আমার খালাতো-ফুপাতো ভাইয়েরা তোমারে দেখবার আইতাছে। রোগী দেখন সামাজিক দায়িত্ব।’

অতিথি আপ্যায়ন করবে কীভাবে! পকেটে ছেঁড়া টাকাও না পেয়ে মোতালেব বেরিয়ে এলো। আজ রাতেই শ্বশুরবাড়িতে যাবে গোপনে। বলে আসবে, বিমার ভালো হয়ে গেছে। ডাক্তার বলে দিয়েছেন, আগামী এক বছরেও মোতালেব যেন বাজারে না যায়!
[email protected]

মাছ দিয়ে শাক ঢাকা!

 শফিক হাসান 
০৭ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৩১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

দুবাই প্রবাসী পাত্রের সঙ্গে বিয়ের তিন মাসের মাথায় খানা-খাদ্যের দুর্গতিতে পড়তে হবে বুঝতে পারলে জেবুননেসা কয়েকবার ভাবত।

যে লোক দুবাইয়ের ইজ্জত ডোবায়, তার সঙ্গে কুটুম্বিতা হয় না। মোতালেব আজকাল বাজার করে নাকি দোকানদারদের ফেলে দেয়া জিনিস টুকিয়ে আনে, সন্দেহ হয় জেবুননেসার। এমন ছোটলোকির কথা বাবাকেও জানিয়েছে। তার বাবা সরকারি অফিসের তৃতীয় শ্রেণির কেরানি। তিনি বিস্তর অনুসন্ধান চালিয়ে তদন্ত রিপোর্ট দিলেন- মোতালেব আদতে ছোট বংশের ছেলে।

তার দাদা অন্যের জমিতে কামলা খাটত। মোতালেব দুবাই গিয়েছিল বটে, তবে সেখানে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি করেনি; করেছে  লেবারের কাজ!
বাবার সঙ্গে কথোপকথনে হতাশ গলায় জেবুননেসা বলল, ‘অহন তাইলে কী করুম?’
বাবা প্রবোধ দিলেন, ‘সংসার করতে থাক। ওর ফকিন্নিগিরি ছুটামু আমি!’
পরদিন যখন বাজারের ব্যাগ ঢেলে আধ পচা শাকে ঘাসের আধিক্য, কুমাড়ার ফালিতে  মজানো শাস দেখে চিল-চিৎকার দিল সে ‘এটা সংসার নাকি ফাজলামি!’
জেবুননেসার চিৎকারের জবাবে কী বলবে ভেবে পেল না মোতালেব। তাকাল আকাশপানে। তার হয়ে কেউ উত্তরটা দিক। চিৎকারে ছুটে এলেন মোতালেবের মা, ‘জেবু, কী অইছে?’

‘কী আর অইব, আপনের এমন পোলারে আমার লগে বিয়া করাইলেন ক্যান?’
‘আমার আবিয়াইত্যা পোলা আছিল একখানই!’

বকাবকি করে জেবুননেসা ঘরে ঢুকল বাবাকে মিসডকল দেয়ার জন্য। এমন কপাল তার! মোবাইল ফোনে ব্যালেন্সও থাকে না কখনো। মোতালেব এতক্ষণ চুপ ছিল, মায়ের অপমানে কিছু একটা বলতে চাইল। চোখ ফেটে পানি ঝরল না। মন ভাঙারও সুযোগ নেই। সেটা কবেই পুড়ে গেছে দ্রব্যমূল্যের আগুনে, ।
মা প্রবোধ দেন, ‘আমগো যুগ কি এখন আছে রে বাপ! আধুনিক জমানায় বউরা মুরুব্বিগো কতা হুনে না, জামাই মানে না।’
ভিসা জটিলতায় দুবাই থেকে ফেরার পর মোতালেবের সব সঞ্চয় শেষ। চেষ্টা করছে ব্যবসা জোটানোর। কিন্তু সেটা কি সহজ! অনেক টাকার পুঁজিরী দরকার। ধার-কর্জ করে, ক্ষুদ্রঋণের ব্যাংকের সাহায্যে দোকান দাঁড় করালেও কতটুকু চলবে, ব্যাংকের ঋণ শোধ আর বাকি বকেয়া ফতুর হতে হয়।

যাই হোক পরের বার বাজারে গিয়ে বুদ্ধি করে বয়লার মুরগি কেনে। উপকারটা পক্ষান্তরে সবজি বিক্রেতাই করেছে। যে সবজিতেই হাত দেয়, দাম পঞ্চাশ টাকার ওপরে। পটোলের কেজি ত্রিশ টাকা বলায় এক বিক্রেতা ঝারি দিয়ে বলল, ‘ফার্মের মুরগি কিইন্যা খান গা মিয়া!’

পরামর্শটা মনে ধরল। শাকসবজি বাদ দিয়ে মুরগির বাজারে ঢুকল। একশ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে বয়লার। দুই কেজি মুরগি কিনে, কেটে-ছিলে যখন বাড়িতে পৌঁছাল- বউয়ের মুখে মেঘের ঘনঘটা। শঙ্কিত বোধ করল মোতালেব। নিশ্চয়ই মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করেছে। ভাত-কাপড়ের কাজিয়া সবচেয়ে কঠিন। দুশ্চিন্তা পাশে রেখে বউয়ের হাতে তুলে দিল ব্যাগ, ‘নিরামিষ আর কদ্দিন খাইবা! আইজ আমিষই নিয়া আইলাম!’
বউ খুশিমনে রান্নাঘরে ঢুকল। মোতালেব ফেলল স্বস্তির নিঃশ্বাস। টাকা বাঁচল, বউয়ের বকা থেকেও রক্ষা পেল। এই না হলে বুদ্ধিমান দুবাইফেরত জামাই!
এভাবে টানা দেড় মাস যখন মুরগি চলল, জেবুননেসা ক্ষেপল আবার, ‘সব সময় গরিব মাইনষের জিনিস কিনলেই অইব? শাকসবজি না খাইলে চোখে জুতি বাড়ে না!’

চোখের জ্যোতি বৃদ্ধির আবদারে শঙ্কিত বোধ করল মোতালেব। জেবুননেসা তাদের চৌদ্দগুষ্টির সুলুকসন্ধান বের করে ছাড়বে তাহলে। এক বিধবা আÍীয়া ভিক্ষা করে, ফুপাতো ভাই করে বাজারে কুলির কাজ। তাদের চিনে ফেললে ‘ভিক্ষুকের বংশ’ বলে গালি দিতে সময় নেবে না। মোতালেব মিনমিন করে বলল, ‘চোখের জুতি বাড়লে কি আমার পকেটে ট্যাকা বেশি পাইবা বউ?’
‘কী কইলা, আমি তোমার পকেট মারি?’
‘ওই কতা কই নাই। বাড়িত শাকসবজির আবাদ করলে জুতি বাড়ব, চাপও কমব।’
‘তবুও তুমি ছোটমাছ, শাকসবজি কিনবা না! অপমান করনের লাইগা আমারে বিয়া কইরা আনছিলা! আমি করমু সবজি চাষ! আগে বুঝলা না ক্যান?’
গালির চোটে মোতালেবের বুদ্ধি খোলতাই হল, ‘ডাক্তর দেখাইছি। আমার কঠিন বিমার অইছে। কদিন হাসপাতালে থাকন লাগব।’

‘আইচ্ছা! আব্বারে ফোন কইরা জিগাই আমারে যক্ষ্মা রোগীর লগে বিয়া দিল ক্যান। তার বাড়িত কি মাছ-গোশত কম আছিল!’
মোতালেব ভেবেছিল কদিন হাসপাতালে ভর্তি থেকে বাজারের টাকা সাশ্রয় করবে। হল উল্টোটা। কিছুক্ষণ পর জেবুননেসা বলল, ‘আব্বা-আম্মাসহ আমার খালাতো-ফুপাতো ভাইয়েরা তোমারে দেখবার আইতাছে। রোগী দেখন সামাজিক দায়িত্ব।’

অতিথি আপ্যায়ন করবে কীভাবে! পকেটে ছেঁড়া টাকাও না পেয়ে মোতালেব বেরিয়ে এলো। আজ রাতেই শ্বশুরবাড়িতে যাবে গোপনে। বলে আসবে, বিমার ভালো হয়ে গেছে। ডাক্তার বলে দিয়েছেন, আগামী এক বছরেও মোতালেব যেন বাজারে না যায়!
[email protected]