বেলা বোসের অবেলায় বিয়ে ঠেকাতে
jugantor
বেলা বোসের অবেলায় বিয়ে ঠেকাতে

  মো. রায়হান কবির  

২২ অক্টোবর ২০২০, ১৮:০৭:২৭  |  অনলাইন সংস্করণ

বেলা বোসের অবেলায় বিয়ে ঠেকাতে

ঢাকার বড় বড় শপিংমলের দোকানগুলোতে একই ধরনের ফোন দুই দামে পাওয়া যায়। একটি অফিসিয়াল, অন্যটি আনঅফিসিয়াল।

ফোন কিনতে আসা প্রিয়াকে রিনি বলল, ‘পুরো মার্কেট ঘুরে ফেললাম। এবার অন্তত সিদ্ধান্তে আয়, কোন ফোনটি নিবি?’

প্রিয়া তখনও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, ‘এখনও বুঝতে পারছি না। আচ্ছা চল না, ওই ভাইয়াটাকে আরেক বার রিকোয়েস্ট করি, অফিসিয়াল ফোনটা আনঅফিসিয়াল দামে দেয় কিনা?’

রিনি রীতিমতো বিরক্ত হয়ে বলল, ‘শোন, ওই ভাইয়াটার সঙ্গে যখন দামাদামি করছিলি তখন তোকে হাসিব ভাইয়া দুইবার কল দিয়েছে। সুতরাং ওই ভাইয়াটা বুঝে গেছে একজনের সঙ্গে তোর রিলেশন আছে। তোর ঢংয়ে কাজ হবে না।’

প্রিয়াও দমবার পাত্রি নয়। বলল, ‘সেটা আমি বুঝব। আগে তো যাই দেখি কী বলে!’

সুতরাং পঞ্চমবারের মতো ওই দোকানের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল রিনি আর প্রিয়া। দোকান মালিক জামান দূর থেকে দেখেই বুঝে নিল কাস্টমার এবার মোবাইল কিনতেই আসছে।
তাই জামান এবার সহকর্মী রকিকে বলল, ‘শোন, মেয়েদের পালস আমি বেশ বুঝতে পারি। এই মেয়েটি জিততে পছন্দ করে। দেখ এর কাছে কীভাবে ফোনটা বিক্রি করি।’

‘বস, এই মেয়ে হুদাই ঘুরছে! আসলে সে কিনবে না। আপনার সঙ্গে বাজি ধরতে পারি।’
‘ওকে, সন্ধ্যার নাশতা বাজি।’

‘ওকে বস!’

এরমধ্যে প্রিয়া আর রিনি দোকানে হাজির হল। প্রিয়া বলল, ‘ভাইয়া দেখেছেন, আবার আপনার কাছে এসেছি।’

জামান নরম গলায় বলল, ‘আপু, এই দামে এই ফোন কেউ আপনাকে দিতে পারবে না। আপনি তো মার্কেট যাচাই করে দেখেছেন।’

প্রিয়া এবার কৌশল পরিবর্তন করল। আদুরে গলায় বলল, ‘ভাইয়া দিন না ফোনটা!’ জামান এ ধরনের কণ্ঠ শুনে অভ্যস্ত।

তাই গলে যাওয়ার ভান করে বলল, ‘আচ্ছা আপু, আপনি আবার কষ্ট করে এসেছেন। আপনাকে একটা হেডফোন ফ্রি দিতে পারি। কিন্তু দাম আর কম হবে না।’

প্রিয়া হেডফোনের কথা শুনে গলে গেল। বলল, ‘ওকে, দিন তাহলে।’ জামান বিজয়ীর বেশে রকির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, ‘ওকে।’

ফ্রি হেডফোন পেয়ে উচ্ছ্বসিত প্রিয়া দোকান থেকে বেরিয়ে বলল, ‘ছেলেটা কিন্তু স্মার্ট।’ রিনি মুচকি হাসল, ‘তাতে কী! হাসিব ভাইয়া আরও বেশি স্মার্ট!’

‘আরে স্মার্ট ধুয়ে পানি খাব? হাসিব এখনও স্টুডেন্ট। ওর সেটেলড হতে আরও ৭-৮ বছর লাগবে। আর এই ছেলেটা নিজেই মনে হয় দোকানের মালিক। কথাবার্তায় তাই তো মনে হল।’

‘তুই কী বলতে চাস?’ ‘এখনও বুঝিসনি? শোন, প্রেমের জন্য বেকার ছেলে ঠিক আছে। বেকাররা সারারাত কথা বলতে পারে, সকালে উঠে অ্যাসাইনমেন্ট জোগাড় করে দিতে পারে। যেটা আবার চাকরিজীবী বা বিজনেসম্যান পারবে না।

কিন্তু বিয়ের পর শো-অফের জন্য, হানিমুনের জন্য, শপিংয়ের জন্য টাকা দরকার। তাই বিয়ের জন্য বেকার ছেলে ঠিক না!’

‘চমৎকার! হবু বরের কাছ থেকে ফোন কিনলি বয়ফ্রেন্ডকে কল দেয়ার জন্য!’

এদিকে বাজিতে হেরে রকি বলল, ‘বস, আপনি কীভাবে মেয়েদের পালস বুঝেন?’

‘আরে এই মেয়েদের চক্করে পড়েই তো এমবিএ’র পাশাপাশি দোকানে চাকরি করছি। আমরা যেমন গার্লফ্রেন্ড চাই মডার্ন কিন্তু বউ চাই সবসময় স্বামীর কথা শুনবে এমন কাউকে, তেমনি মেয়েরাও চায় প্রেমিক বেকার হোক বা বোকা হোক কিন্তু জামাই হবে স্মার্ট এবং পয়সাওয়ালা।

বেলা বোসরা অঞ্জন দত্তের আমলেও চাকরিওয়ালা ছেলে খুঁজেছে এখনও তাই আছে।’

‘বলেন কী বস! আপনি প্রাইভেটে এমবিএ করছেন আবার আমার সঙ্গে দোকানদারিও!’

‘শোন, প্রেম তো করিসনি বুঝবি কী করে? বেলা বোসরা যতই আবেগ দেখাক, চাকরি-ব্যবসা ছাড়া কেউ-ই বেকার বিয়ে করতে রাজি না।

পত্রিকায় দেখলাম, সরকারি চাকরিতে ২০০ জনেরও বেশি চাকরিজীবীর সন্ধান মিলেছে, যারা বিভিন্নভাবে জালিয়াতি করে চাকরি নিয়েছে!

কেউ জাতীয় পরিচয়পত্রে প্রকৃত বাবা-মায়ের নাম গোপন করেছে, কেউ বয়স চুরি করেছে, কারও দুইটা পরিচয়পত্র! চাকরি ছাড়া আজকাল বেলা বোসদের পাওয়া যায় না।

তার ওপর সরকারি চাকরি হলে তো কথাই নেই! তাই সরকারি চাকরি বাগাতে অনেকের জালিয়াতি করতেও বাধে না!’

‘কিন্তু এটা তো ভয়াবহ রকমের অন্যায়?’ ‘শোন, যুগে যুগে বেলা বোসরা থাকবেই। তেমনি থাকবে চাকরির টেনশনও। তাই চাকরি পেতে সবাই এমন মরিয়া।

অনেকের কাছে এসব জালিয়াতিও এখন ডালভাত! আর যে দেশে পদে পদে জালিয়াতির জাল বিছানো, সে দেশে চাকরিতে এমন জালিয়াতিতে আমি অন্তত খুব বেশি অবাক হয়নি!’


বেলা বোসের অবেলায় বিয়ে ঠেকাতে

 মো. রায়হান কবির 
২২ অক্টোবর ২০২০, ০৬:০৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
বেলা বোসের অবেলায় বিয়ে ঠেকাতে
ছবি: যুগান্তর

ঢাকার বড় বড় শপিংমলের দোকানগুলোতে একই ধরনের ফোন দুই দামে পাওয়া যায়। একটি অফিসিয়াল, অন্যটি আনঅফিসিয়াল। 

ফোন কিনতে আসা প্রিয়াকে রিনি বলল, ‘পুরো মার্কেট ঘুরে ফেললাম। এবার অন্তত সিদ্ধান্তে আয়, কোন ফোনটি নিবি?’

প্রিয়া তখনও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, ‘এখনও বুঝতে পারছি না। আচ্ছা চল না, ওই ভাইয়াটাকে আরেক বার রিকোয়েস্ট করি, অফিসিয়াল ফোনটা আনঅফিসিয়াল দামে দেয় কিনা?’ 

রিনি রীতিমতো বিরক্ত হয়ে বলল, ‘শোন, ওই ভাইয়াটার সঙ্গে যখন দামাদামি করছিলি তখন তোকে হাসিব ভাইয়া দুইবার কল দিয়েছে। সুতরাং ওই ভাইয়াটা বুঝে গেছে একজনের সঙ্গে তোর রিলেশন আছে। তোর ঢংয়ে কাজ হবে না।’ 

প্রিয়াও দমবার পাত্রি নয়। বলল, ‘সেটা আমি বুঝব। আগে তো যাই দেখি কী বলে!’

সুতরাং পঞ্চমবারের মতো ওই দোকানের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল রিনি আর প্রিয়া। দোকান মালিক জামান দূর থেকে দেখেই বুঝে নিল কাস্টমার এবার মোবাইল কিনতেই আসছে। 
তাই জামান এবার সহকর্মী রকিকে বলল, ‘শোন, মেয়েদের পালস আমি বেশ বুঝতে পারি। এই মেয়েটি জিততে পছন্দ করে। দেখ এর কাছে কীভাবে ফোনটা বিক্রি করি।’

‘বস, এই মেয়ে হুদাই ঘুরছে! আসলে সে কিনবে না। আপনার সঙ্গে বাজি ধরতে পারি।’
‘ওকে, সন্ধ্যার নাশতা বাজি।’

‘ওকে বস!’

এরমধ্যে প্রিয়া আর রিনি দোকানে হাজির হল। প্রিয়া বলল, ‘ভাইয়া দেখেছেন, আবার আপনার কাছে এসেছি।’ 

জামান নরম গলায় বলল, ‘আপু, এই দামে এই ফোন কেউ আপনাকে দিতে পারবে না। আপনি তো মার্কেট যাচাই করে দেখেছেন।’ 

প্রিয়া এবার কৌশল পরিবর্তন করল। আদুরে গলায় বলল, ‘ভাইয়া দিন না ফোনটা!’ জামান এ ধরনের কণ্ঠ শুনে অভ্যস্ত। 

তাই গলে যাওয়ার ভান করে বলল, ‘আচ্ছা আপু, আপনি আবার কষ্ট করে এসেছেন। আপনাকে একটা হেডফোন ফ্রি দিতে পারি। কিন্তু দাম আর কম হবে না।’ 

প্রিয়া হেডফোনের কথা শুনে গলে গেল। বলল, ‘ওকে, দিন তাহলে।’ জামান বিজয়ীর বেশে রকির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, ‘ওকে।’ 

ফ্রি হেডফোন পেয়ে উচ্ছ্বসিত প্রিয়া দোকান থেকে বেরিয়ে বলল, ‘ছেলেটা কিন্তু স্মার্ট।’ রিনি মুচকি হাসল, ‘তাতে কী! হাসিব ভাইয়া আরও বেশি স্মার্ট!’ 

‘আরে স্মার্ট ধুয়ে পানি খাব? হাসিব এখনও স্টুডেন্ট। ওর সেটেলড হতে আরও ৭-৮ বছর লাগবে। আর এই ছেলেটা নিজেই মনে হয় দোকানের মালিক। কথাবার্তায় তাই তো মনে হল।’

‘তুই কী বলতে চাস?’ ‘এখনও বুঝিসনি? শোন, প্রেমের জন্য বেকার ছেলে ঠিক আছে। বেকাররা সারারাত কথা বলতে পারে, সকালে উঠে অ্যাসাইনমেন্ট জোগাড় করে দিতে পারে। যেটা আবার চাকরিজীবী বা বিজনেসম্যান পারবে না। 

কিন্তু বিয়ের পর শো-অফের জন্য, হানিমুনের জন্য, শপিংয়ের জন্য টাকা দরকার। তাই বিয়ের জন্য বেকার ছেলে ঠিক না!’

‘চমৎকার! হবু বরের কাছ থেকে ফোন কিনলি বয়ফ্রেন্ডকে কল দেয়ার জন্য!’

এদিকে বাজিতে হেরে রকি বলল, ‘বস, আপনি কীভাবে মেয়েদের পালস বুঝেন?’

‘আরে এই মেয়েদের চক্করে পড়েই তো এমবিএ’র পাশাপাশি দোকানে চাকরি করছি। আমরা যেমন গার্লফ্রেন্ড চাই মডার্ন কিন্তু বউ চাই সবসময় স্বামীর কথা শুনবে এমন কাউকে, তেমনি মেয়েরাও চায় প্রেমিক বেকার হোক বা বোকা হোক কিন্তু জামাই হবে স্মার্ট এবং পয়সাওয়ালা। 

বেলা বোসরা অঞ্জন দত্তের আমলেও চাকরিওয়ালা ছেলে খুঁজেছে এখনও তাই আছে।’

‘বলেন কী বস! আপনি প্রাইভেটে এমবিএ করছেন আবার আমার সঙ্গে দোকানদারিও!’

‘শোন, প্রেম তো করিসনি বুঝবি কী করে? বেলা বোসরা যতই আবেগ দেখাক, চাকরি-ব্যবসা ছাড়া কেউ-ই বেকার বিয়ে করতে রাজি না। 

পত্রিকায় দেখলাম, সরকারি চাকরিতে ২০০ জনেরও বেশি চাকরিজীবীর সন্ধান মিলেছে, যারা বিভিন্নভাবে জালিয়াতি করে চাকরি নিয়েছে! 

কেউ জাতীয় পরিচয়পত্রে প্রকৃত বাবা-মায়ের নাম গোপন করেছে, কেউ বয়স চুরি করেছে, কারও দুইটা পরিচয়পত্র! চাকরি ছাড়া আজকাল বেলা বোসদের পাওয়া যায় না। 

তার ওপর সরকারি চাকরি হলে তো কথাই নেই! তাই সরকারি চাকরি বাগাতে অনেকের জালিয়াতি করতেও বাধে না!’ 

‘কিন্তু এটা তো ভয়াবহ রকমের অন্যায়?’ ‘শোন, যুগে যুগে বেলা বোসরা থাকবেই। তেমনি থাকবে চাকরির টেনশনও। তাই চাকরি পেতে সবাই এমন মরিয়া। 

অনেকের কাছে এসব জালিয়াতিও এখন ডালভাত! আর যে দেশে পদে পদে জালিয়াতির জাল বিছানো, সে দেশে চাকরিতে এমন জালিয়াতিতে আমি অন্তত খুব বেশি অবাক হয়নি!’