বিনা টেস্টে বজ্রপাত
jugantor
বিনা টেস্টে বজ্রপাত

  মোহাম্মদ কামরুজ্জামান  

২৯ অক্টোবর ২০২০, ২০:৫৫:৩২  |  অনলাইন সংস্করণ

নাহার আপা আজকে ফোন দিয়েছিলেন। আমি বললাম, ‘হ্যালো!’ উনি বললেন, ‘হ্যালো!’ তারপর খানিকক্ষণ ব্যাক-টু-ব্যাক ‘হ্যালো হ্যালো’ করলাম। ওনার কণ্ঠে সন্দেহ। সন্দেহ দূর করার জন্য প্রশ্ন করলেন, ‘কামরুজ্জামান?’

আমি উত্তর দিলাম, ‘হ্যাঁ!’ তিনি আবারও প্রশ্ন করলেন, ‘কামরুজ্জামান?’ আমি আবারও উত্তর দিলাম, ‘হ্যাঁ!’ তিনি নিশ্চিন্ত হলেন আমি মরিনি। ‘তোমার করোনা সারেনি?’ প্রশ্নটা করেই তিনি বুঝলেন প্রশ্নটা নিয়ন্ত্রণহীন বাঁক নিয়ে ফেলেছে। তিনি মানে মানে করতে লাগলেন। আমি বললাম, ‘আমার যে করোনা হয়েছে কে বলল?’
‘তাহলে যে পোস্ট দিচ্ছ না।’
‘ও আচ্ছা!’

সোশ্যল মিডিয়ার সংস্কৃতিতে বেঁচে থাকার লক্ষণ প্রকাশ করে চলতে হয়। সবচেয়ে বড় লক্ষণ হচ্ছে কারণে-অকারণে পোস্ট দিতে থাকা। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে অসুস্থতার খবর জানাতে হয়-তারপর ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট; দুর্ঘটনা ঘটলে তৎক্ষণাত পোস্ট দিতে হয়-তারপর ফার্স্ট এইড। সুস্থ হলে সাথে সাথে জানাতে হয়, ‘আমি ভালো হয়ে গিয়েছি।’ বজ্রপাত থেকে বর্জ্যপতন যাই ঘটুক না কেন তৎক্ষণাত প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে-তারপর সরে দাঁড়ানো। কেবল অজ্ঞান হয়ে গেলে, তৎক্ষণাত কিছু জানানোর দরকার নেই। তবে জ্ঞান ফেরা মাত্রই জানাতে হবে!

একজন মানুষ জ্ঞান হারিয়ে কতক্ষণ থাকতে পারে? এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা, আধাবেলা, পুরো এক দিন, পরপর কয়েক দিন। এর বেশি তো না। কিন্তু দীর্ঘ দিন যদি কেউ ফেসবুকে কোনো পোস্ট না দেয় তাহলে অনেকে ধরে নেয় অবশ্যই সে মারা গিয়েছে! সে কারণে নাহার আপা নিশ্চিত হওয়ার পরে চিন্তিত হয়ে পড়লেন-ছেলেটা তাজা আছে অথচ কোনো পোস্ট দিচ্ছে না!

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কতদিন হবে দেই না, আপা?’ আপা বললেন, ‘এক মাস তো হবেই।’ আমি ‘তাই নাকি’ বলে সন্দেহ প্রকাশ করলাম। তিনি ‘অবশ্যই’ বলে নিশ্চিত করলেন। তারপর কণ্ঠে উদ্বেগ এনে বললেন, ‘তোমার মাথায় এত গোলমাল হচ্ছে কেন, জামান?’
‘আমার বোধহয় করোনা হয়েছিল।’
‘ও, সেরে গিয়েছে তাহলে? কবে হয়েছিল?’
‘কবে হয় নাই সেইটা বলেন। গত ছয় মাস ধরেই তো হচ্ছে!’
‘বল কী! টেস্ট করিয়েছ?’
‘না।’
‘তাহলে কীভাবে বলছ?’
‘কেন বলব না? জানুয়ারিতে যখন প্রথম করোনার কথা শুনলাম, তারপর থেকে আমি কোনো সিম্পটমই মিস করিনি।’
‘মানে?’
‘প্রথম যখন শুনলাম করোনা হচ্ছে এক ধরনের ফ্লু, তখন আমার সর্দি লাগল। কিছুদিন পর যখন সবাই বলল করোনা হলে গলায় ব্যথা হয়, আমার সর্দি সেরে গলায় ব্যথা শুরু হলো! তারপর আবার লোকজন যখন বলতে শুরু করল শ্বাসকষ্টও হয়, আমার দমবন্ধ হয়ে যেতে লাগল!’
‘বল কী!’

‘হ্যাঁ আপা, যা বলছি সব ঠিক বলছি। আবার যখন শুনলাম হালকা জ্বরও নাকি হয়, আমার তাপমাত্রা কিছুতেই ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের উপরে উঠল না। অনেকদিন পর যখন শুনলাম করোনার মোক্ষম সিম্পটম নাকি স্বাদ-গন্ধ হারানো, আমার স্বাদ-গন্ধ চলে গিয়ে ১০ দিনের আগে ফিরে এলো না।’
‘আচ্ছা, তোমার কি ডাইরিয়াও হয়েছিল?’
‘মনে পড়ছে না।’
নাহার আপা চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘তাহলে তো তোমার কোভিড-নাইনটিনই হয়েছিল। কোভিড রোগীদের সবকিছু মনে থাকে না।’

বিনা টেস্টে বজ্রপাত

 মোহাম্মদ কামরুজ্জামান 
২৯ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৫৫ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

নাহার আপা আজকে ফোন দিয়েছিলেন। আমি বললাম, ‘হ্যালো!’ উনি বললেন, ‘হ্যালো!’ তারপর খানিকক্ষণ ব্যাক-টু-ব্যাক ‘হ্যালো হ্যালো’ করলাম। ওনার কণ্ঠে সন্দেহ। সন্দেহ দূর করার জন্য প্রশ্ন করলেন, ‘কামরুজ্জামান?’

আমি উত্তর দিলাম, ‘হ্যাঁ!’ তিনি আবারও প্রশ্ন করলেন, ‘কামরুজ্জামান?’ আমি আবারও উত্তর দিলাম, ‘হ্যাঁ!’ তিনি নিশ্চিন্ত হলেন আমি মরিনি। ‘তোমার করোনা সারেনি?’ প্রশ্নটা করেই তিনি বুঝলেন প্রশ্নটা নিয়ন্ত্রণহীন বাঁক নিয়ে ফেলেছে। তিনি মানে মানে করতে লাগলেন। আমি বললাম, ‘আমার যে করোনা হয়েছে কে বলল?’ 
‘তাহলে যে পোস্ট দিচ্ছ না।’
‘ও আচ্ছা!’

সোশ্যল মিডিয়ার সংস্কৃতিতে বেঁচে থাকার লক্ষণ প্রকাশ করে চলতে হয়। সবচেয়ে বড় লক্ষণ হচ্ছে কারণে-অকারণে  পোস্ট দিতে থাকা। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে অসুস্থতার খবর জানাতে হয়-তারপর ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট; দুর্ঘটনা ঘটলে তৎক্ষণাত পোস্ট দিতে হয়-তারপর ফার্স্ট এইড। সুস্থ হলে সাথে সাথে জানাতে হয়, ‘আমি ভালো হয়ে গিয়েছি।’ বজ্রপাত থেকে বর্জ্যপতন যাই ঘটুক না কেন তৎক্ষণাত প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে-তারপর সরে দাঁড়ানো।  কেবল অজ্ঞান হয়ে গেলে, তৎক্ষণাত কিছু জানানোর দরকার নেই। তবে জ্ঞান ফেরা মাত্রই জানাতে হবে!

একজন মানুষ জ্ঞান হারিয়ে কতক্ষণ থাকতে পারে? এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা, আধাবেলা, পুরো এক দিন, পরপর কয়েক দিন। এর বেশি তো না। কিন্তু দীর্ঘ দিন যদি কেউ ফেসবুকে কোনো পোস্ট না দেয় তাহলে অনেকে ধরে নেয় অবশ্যই সে মারা গিয়েছে! সে কারণে নাহার আপা নিশ্চিত হওয়ার পরে চিন্তিত হয়ে পড়লেন-ছেলেটা তাজা আছে অথচ কোনো  পোস্ট দিচ্ছে না!

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কতদিন হবে দেই না, আপা?’ আপা বললেন, ‘এক মাস তো হবেই।’ আমি ‘তাই নাকি’ বলে সন্দেহ প্রকাশ করলাম। তিনি ‘অবশ্যই’ বলে নিশ্চিত করলেন। তারপর কণ্ঠে উদ্বেগ এনে বললেন, ‘তোমার মাথায় এত  গোলমাল হচ্ছে কেন, জামান?’
‘আমার বোধহয় করোনা হয়েছিল।’
‘ও, সেরে গিয়েছে তাহলে? কবে হয়েছিল?’
‘কবে হয় নাই সেইটা বলেন। গত ছয় মাস ধরেই তো হচ্ছে!’
‘বল কী! টেস্ট করিয়েছ?’
‘না।’
‘তাহলে কীভাবে বলছ?’
‘কেন বলব না? জানুয়ারিতে যখন প্রথম করোনার কথা শুনলাম, তারপর থেকে আমি কোনো সিম্পটমই মিস করিনি।’
‘মানে?’
‘প্রথম যখন শুনলাম করোনা হচ্ছে এক ধরনের ফ্লু, তখন আমার সর্দি লাগল। কিছুদিন পর যখন সবাই বলল করোনা হলে গলায় ব্যথা হয়, আমার সর্দি সেরে গলায় ব্যথা শুরু হলো! তারপর আবার লোকজন যখন বলতে শুরু করল শ্বাসকষ্টও হয়, আমার দমবন্ধ হয়ে যেতে লাগল!’
‘বল কী!’

‘হ্যাঁ আপা, যা বলছি সব ঠিক বলছি। আবার যখন শুনলাম হালকা জ্বরও নাকি হয়, আমার তাপমাত্রা কিছুতেই ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের উপরে উঠল না। অনেকদিন পর যখন শুনলাম করোনার মোক্ষম সিম্পটম নাকি স্বাদ-গন্ধ হারানো, আমার স্বাদ-গন্ধ চলে গিয়ে ১০ দিনের আগে ফিরে এলো না।’
‘আচ্ছা, তোমার কি ডাইরিয়াও হয়েছিল?’
‘মনে পড়ছে না।’
নাহার আপা চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘তাহলে তো তোমার কোভিড-নাইনটিনই হয়েছিল। কোভিড রোগীদের সবকিছু মনে থাকে না।’