সম্মতি ছাড়াই যা কিছু আরও...
jugantor
সম্মতি ছাড়াই যা কিছু আরও...

  মো. রায়হান কবির  

২৯ অক্টোবর ২০২০, ২১:৫১:২৫  |  অনলাইন সংস্করণ

ঢাকা শহরের লোকাল বাসগুলো পকেটমার থেকে শুরু করে নানা ছলচাতুরির জন্য বেশ সমালোচিত। রাজধানীর লোকাল বাসের নিয়মিত যাত্রি, অথচ পকেট থেকে অন্তত একবার মোবাইল কিংবা মানিব্যাগ গায়েব হয়নি এটা অবিশ্বাস্যই বটে! বারেক মিয়া রাজধানীর খুবই সচেতন একজন লোকাল নাগরিক। লোকাল বা স্থানীয় হওয়ার সুবিধা হলো তার স্ব-স্থানের সকল ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি অবগত।

বারেক মিয়ার বাসা ফার্মগেট। যাচ্ছেন গুলিস্তান। উদ্দেশ্য নবাবপুর মার্কেট থেকে বাসার জন্য কিছু ইলেকট্রনিক সামগ্রী পাইকারি দরে কিনবেন, যাতে টাকা বাঁচানো যায়। উনি ভালো করেই জানেন, এই টাকা বাঁচানোর জন্য গুলিস্তানের উদ্দেশ্যে যাওয়ার অর্থ হলো টাকা হারানোর ঝুঁকির মধ্যে পড়া! তবু তিনি প্রায়ই যান।

বারেক মিয়া পেছনের পকেটে কোনো মানিব্যাগ রাখেন না, রাখেন সামনের পকেটে। আর মোবাইল সব সময় হাতেই রাখেন। এভাবে নিরাপদেই কাটছিল বারেক মিয়ার দিনগুলো।
আজ সেই নিরাপদ জীবনে ছন্দপতন ঘটল। বারেক মিয়া গুলিস্তান ধরে নবাবপুরের দিকে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ তার মনে হলো হাঁটুর দিকে শীত শীত অনুভ‚তি! ব্যাপার কী? এই গরমে হাঁটুর দিকে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাবের কারণ কী? অনুসন্ধানে নেমে তো চক্ষু চড়কগাছ! প্যান্টের কাপড় হাঁটু পর্যন্ত হা করে আছে! পকেটমার কখন যে, পকেট কেটে হাঁটু অব্দি ঝুলিয়ে দিয়ে মানিব্যাগটি হাতিয়ে নিয়েছে টেরই পাননি!

নিজেকে নিয়ে গর্ব করা বারেক মিয়ার নিজের উপর ঘেন্না হতে লাগল। অন্য দিনের তুলনায় মানিব্যাগে আজ টাকার পরিমাণ বেশিই ছিল। তাই আর সাতপাঁচ না ভেবে পল্টন থানার পরিচিত পুলিশের এক এসআইকে কল দিতে গিয়ে দেখেন মোবাইলে টাকা নেই!

কথায় আছে, বিপদ যখন আসে একা আসে না। ভাই-বোন, আত্নীয়-স্বজন, শ্বশুর বাড়ির লোকজন সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে আসে! কিন্তু বারেক মিয়ার স্পস্ট মনে আছে, গতকালই মোবাইলে ত্রিশ টাকা রিচার্জ করেছেন। আর রিচার্জের পর মাত্র কয়েক মিনিট কথা বলেছেন। তাহলে বাকি টাকা গেল কোথায়? আজকাল মোবাইল চালানো গাড়ি চালানোর চেয়ে কম ঝামেলার না। সকল দিকে খেয়াল রাখতে হয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ রিচার্জ করলে মিনিট, এসএমএস কিংবা এমবি (ইন্টারনেট) প্যাকেজ চালু হয়ে যায়।
বিভিন্নভাবে ধরা খেয়ে বারেক মিয়া এখন সঠিক রিচার্জ করতে শিখেছেন। ফলে মোবাইলে টাকা থাকার কথা। আবার বেশ কিছু কল এসে গান-কবিতা কিংবা জোকস শুনিয়ে অমুক-তমুক নম্বর চাপতে বলে। সেখানেও বিপদ। তাই এসব কল আসলে বারেক মিয়া হাত থেকে মোবাইল দূরে রাখেন, যাতে কোথাও কোনো চাপ না লাগে! এতো কিছু খেয়াল রাখার পরও মোবাইলে কেন টাকা থাকবে না!
বারেক মিয়া মানিব্যাগের কথা বেলামুল ভুলে গেলেন। তিনি টাকার খোঁজে মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে হাজির হলেন। সেখানে ঘন্টা খানেক অপেক্ষার পর যখন ডাক এলো, কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি জানাল ‘লাভ গুরু’ নামক এক ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস বা ভ্যাস চালু করার কারণে দৈনিক তার এ্যাকাউন্ট থেকে এগার টাকা পঞ্চাশ পয়সা কেটে নেওয়া হয়!

বারেক মিয়া ক্ষেপে গেলেন, ‘আমার কি প্রেমের বয়স আছে যে আমাকে আবার প্রেম করার জন্য গুরু ধরতে হবে?’ শুনে কাস্টমার কেয়ারের রূপবতী তরুণী প্রতিনিধি বিগলিত হাসিতে সামনের দাঁতগুলো বিকশিত করে বললেন, ‘স্যার, প্রেমের কোনো বয়স আছে বলুন? আপনিই হয়তো মনের অজান্তেই নম্বর চেপে দিয়েছেন, পরে ভুলে গেছেন।’

মানিব্যাগ হারিয়ে বারেক মিয়ার মেজাজ এমনিতেই খারাপ, তার উপর দাঁত ক্যালানো রঙ-ঢং মার্কা কথা শুনে মাথায় আগুন ধরে গেল! বারেক মিয়া মিউ মিউ না করে রীতিমতো হুংকার ছাড়লেন, ‘আমার সম্মতি ছাড়া পয়সা কাটবেন, আবার মশকরা করবেন! এক্ষন আমার টাকা ফেরত দিন!’ কাস্টমার কেয়ারে অপেক্ষারত জনৈক যুবক বারেক মিয়ার কাটা পকেট দেখেই বুঝে যায় বেচারা শাঁখের করাতে আছেন। তাই তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘চাচা, আজকাল সম্মতি নিয়ে কোন জিনিসটা হয়? মোবাইলের টাকাই হোক কিংবা ব্যাংকের টাকা-সবই লুট হয় সম্মতি ছাড়া! আর মোবাইল অপারেটররা তো এর জন্য দায়ী নয়, ধরতে হলে ধরুন গিয়ে ওই বিটিআরসি’কে। যারা নিয়ম কানুন বেধে না দিয়ে টাকার বিনিময়ে ওই সব ভ্যাস-ভুসের সঙ্গে চুক্তি করে।’

বারেক মিয়া হতাশ দৃষ্টিতে ফ্যাল ফ্যাল করে যুবকের দিকে তাকালেন। সত্যিই তো! পকেট প্রায় সবাই মারছে! কেউ ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে মারছে, আর কেউ মারছে মিষ্টি হেসে প্রকাশ্যে!

সম্মতি ছাড়াই যা কিছু আরও...

 মো. রায়হান কবির 
২৯ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৫১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ঢাকা শহরের লোকাল বাসগুলো পকেটমার থেকে শুরু করে নানা ছলচাতুরির জন্য বেশ সমালোচিত।  রাজধানীর লোকাল বাসের নিয়মিত যাত্রি, অথচ পকেট থেকে অন্তত একবার মোবাইল কিংবা মানিব্যাগ গায়েব হয়নি এটা অবিশ্বাস্যই বটে! বারেক মিয়া রাজধানীর খুবই সচেতন একজন লোকাল নাগরিক। লোকাল বা স্থানীয় হওয়ার সুবিধা হলো তার স্ব-স্থানের সকল ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি অবগত।

বারেক মিয়ার বাসা ফার্মগেট। যাচ্ছেন গুলিস্তান। উদ্দেশ্য নবাবপুর মার্কেট থেকে বাসার জন্য কিছু ইলেকট্রনিক সামগ্রী পাইকারি দরে কিনবেন, যাতে টাকা বাঁচানো যায়। উনি ভালো করেই জানেন, এই টাকা বাঁচানোর জন্য গুলিস্তানের উদ্দেশ্যে যাওয়ার অর্থ হলো টাকা হারানোর ঝুঁকির মধ্যে পড়া! তবু তিনি প্রায়ই যান।

বারেক মিয়া পেছনের পকেটে  কোনো মানিব্যাগ রাখেন না, রাখেন সামনের পকেটে। আর মোবাইল সব সময় হাতেই রাখেন। এভাবে নিরাপদেই কাটছিল বারেক মিয়ার দিনগুলো।
আজ সেই নিরাপদ জীবনে ছন্দপতন ঘটল। বারেক মিয়া গুলিস্তান ধরে নবাবপুরের দিকে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ তার মনে হলো হাঁটুর দিকে শীত শীত অনুভ‚তি! ব্যাপার কী? এই গরমে হাঁটুর দিকে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাবের কারণ কী? অনুসন্ধানে নেমে তো চক্ষু চড়কগাছ! প্যান্টের কাপড় হাঁটু পর্যন্ত হা করে আছে! পকেটমার কখন যে, পকেট কেটে হাঁটু অব্দি ঝুলিয়ে দিয়ে মানিব্যাগটি হাতিয়ে নিয়েছে টেরই পাননি!

নিজেকে নিয়ে গর্ব করা বারেক মিয়ার নিজের উপর ঘেন্না হতে লাগল। অন্য দিনের তুলনায় মানিব্যাগে আজ টাকার পরিমাণ বেশিই ছিল। তাই আর সাতপাঁচ না ভেবে পল্টন থানার পরিচিত পুলিশের এক এসআইকে কল দিতে গিয়ে  দেখেন মোবাইলে টাকা নেই!

কথায় আছে, বিপদ যখন আসে একা আসে না। ভাই-বোন, আত্নীয়-স্বজন, শ্বশুর বাড়ির লোকজন সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে আসে! কিন্তু বারেক মিয়ার স্পস্ট মনে আছে, গতকালই মোবাইলে ত্রিশ টাকা রিচার্জ করেছেন। আর রিচার্জের পর মাত্র কয়েক মিনিট কথা বলেছেন। তাহলে বাকি টাকা গেল কোথায়? আজকাল মোবাইল চালানো গাড়ি চালানোর চেয়ে কম ঝামেলার না। সকল দিকে খেয়াল রাখতে হয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ রিচার্জ করলে মিনিট, এসএমএস কিংবা এমবি (ইন্টারনেট) প্যাকেজ চালু হয়ে যায়।
বিভিন্নভাবে ধরা খেয়ে বারেক মিয়া এখন সঠিক রিচার্জ করতে শিখেছেন। ফলে মোবাইলে টাকা থাকার কথা। আবার বেশ কিছু কল এসে গান-কবিতা কিংবা জোকস শুনিয়ে অমুক-তমুক নম্বর চাপতে বলে। সেখানেও বিপদ। তাই এসব কল আসলে বারেক মিয়া হাত থেকে মোবাইল দূরে রাখেন, যাতে কোথাও কোনো চাপ না লাগে! এতো কিছু খেয়াল রাখার পরও মোবাইলে কেন টাকা থাকবে না!
বারেক মিয়া মানিব্যাগের কথা বেলামুল ভুলে গেলেন। তিনি টাকার খোঁজে মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে হাজির হলেন। সেখানে ঘন্টা খানেক অপেক্ষার পর যখন ডাক এলো, কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি জানাল ‘লাভ গুরু’ নামক এক ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস বা ভ্যাস চালু করার কারণে দৈনিক তার এ্যাকাউন্ট থেকে এগার টাকা পঞ্চাশ পয়সা  কেটে নেওয়া হয়!

বারেক মিয়া ক্ষেপে গেলেন, ‘আমার কি প্রেমের বয়স আছে যে আমাকে আবার প্রেম করার জন্য গুরু ধরতে হবে?’ শুনে কাস্টমার কেয়ারের রূপবতী তরুণী প্রতিনিধি বিগলিত হাসিতে সামনের দাঁতগুলো বিকশিত করে বললেন, ‘স্যার, প্রেমের কোনো বয়স আছে বলুন? আপনিই হয়তো মনের অজান্তেই নম্বর চেপে দিয়েছেন, পরে ভুলে গেছেন।’

মানিব্যাগ হারিয়ে বারেক মিয়ার মেজাজ এমনিতেই খারাপ, তার উপর দাঁত ক্যালানো রঙ-ঢং মার্কা কথা শুনে মাথায় আগুন ধরে  গেল! বারেক মিয়া মিউ মিউ না করে রীতিমতো হুংকার ছাড়লেন, ‘আমার সম্মতি ছাড়া পয়সা কাটবেন, আবার মশকরা করবেন! এক্ষন আমার টাকা ফেরত দিন!’ কাস্টমার কেয়ারে অপেক্ষারত জনৈক যুবক বারেক মিয়ার কাটা পকেট  দেখেই বুঝে যায় বেচারা শাঁখের করাতে আছেন। তাই তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘চাচা, আজকাল সম্মতি নিয়ে কোন জিনিসটা হয়? মোবাইলের টাকাই হোক কিংবা ব্যাংকের টাকা-সবই লুট হয় সম্মতি ছাড়া! আর মোবাইল অপারেটররা তো এর জন্য দায়ী নয়, ধরতে হলে ধরুন গিয়ে ওই বিটিআরসি’কে। যারা নিয়ম কানুন বেধে না দিয়ে টাকার বিনিময়ে ওই সব ভ্যাস-ভুসের সঙ্গে চুক্তি করে।’

বারেক মিয়া হতাশ দৃষ্টিতে ফ্যাল ফ্যাল করে যুবকের দিকে তাকালেন। সত্যিই তো! পকেট প্রায় সবাই মারছে! কেউ ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে মারছে, আর কেউ মারছে মিষ্টি হেসে প্রকাশ্যে!