একজন পরীক্ষার্থী
jugantor
একজন পরীক্ষার্থী

  জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য  

২৪ নভেম্বর ২০২০, ২২:৪৮:৩৪  |  অনলাইন সংস্করণ

পরীক্ষার ডেট দেয়ার পর থেকে প্রচণ্ড টেনশনে আছি আমি। দম ফেলারও সময় নেই। সিলেবাসের এত এত প্রশ্ন কীভাবে শেষ করব, দিনরাত সেটা নিয়ে টেনশন করি। পরীক্ষার সময় আমার আবার ক্ষিধা বেশি লাগে। সেটা নিয়েও টেনশন করি। পর্যাপ্ত পরিমাণ চিপস, চকলেট, বিস্কুট কিনে রাখি। নুডলস, ফ্রাইড রাইস রান্না করে রাখি। পর্যাপ্ত পরিমাণ কলম কিনে রাখি, কেননা পরীক্ষার সময় দেখা গেল হঠাৎ কলম থেকে কালি বেরোচ্ছে না! তখন আরেক বিপদ!

সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে টিভি দেখতে বসি। পরীক্ষা নিয়ে বেশি টেনশন করলে মাথা কাজ করে না। তাই রিলাক্সেশনের জন্য প্রিয় সিরিজটা দেখতে বসা। এরই মধ্যে আমার বান্ধবী ফোন দিয়ে জানতে চাইল, প্রস্তুতি কতদূর?
বললাম, প্রায় সবই কমপ্লিট। খাতা, কলম কিনে রাখছি, নাস্তা বানানো আছে...!

আরে, পড়াশোনার প্রস্তুতির কথা বলছি! কী করছিস এখন?
টিভি দেখছি, আমার জন্য দোয়া করিস। পরীক্ষা নিয়ে খুব টেনশনে আছি! বলেই ফোনটা কেটে দিলাম। সিরিজ শুরু হয়ে গেছে।
পাশের বাসার আন্টি গত পরশু তার মেয়ের জন্মদিনে দাওয়াত দিতে এসেছিলেন। আমি আঁতকে উঠেছিলাম। এসব মানুষের কাণ্ডজ্ঞান কবে হবে! দেখছে দুদিন বাদে একটা মেয়ের পরীক্ষা, দম ফেলার সময় নাই! তাকে জন্মদিনের দাওয়াত দিতে আসে কীভাবে! আমার কি ফুর্তি করবার সময় এখন!
রাত তিনটা পর্যন্ত বিভিন্ন বইয়ের ধুলা পরিষ্কার করে সাবজেক্টগুলার নাম মুখস্থ করলাম। কোনদিন কী পরীক্ষা সেই রুটিনটা মুখস্থ করলাম। সাজেশনের প্রশ্নগুলা খাতায় লিখে ফেললাম। বলা তো যায় না! যদি সাজেশন হারিয়ে যায়? খাতায় লিখে রাখা ভালো। এইটুকু করতে করতে ক্ষিদা লেগে গেল! একবাটি নুডলস নিয়ে বসে ফেসবুক স্ক্রল করতে লাগলাম। মিমিকে দেখছি এতরাতে অনলাইনে! এদের কি কোনোদিন বুঝ হবে না! পরীক্ষার আগে এতরাত জেগে ফেসবুকে কী করে! নিশ্চয়ই প্রেম করে! স্কুল লাইফ থেকেই মিমির ক্যারেক্টার ভালো না!
স্কুল লাইফ থেকে মিমি কতগুলা প্রেম করছে আর কী কী অন্যায় করছে, এর জন্য পরকালে ওর কী বিচার হবে এসব ভাবতে ভাবতে শিউরে উঠলাম! এরই মধ্যে ছয়টা বেজে গেছে। আজ আর পড়া হবে না। ঘুম দরকার। অনেকেই মনে করে পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়লেই পাশ! এটা ভুল, পরীক্ষার আগে মস্তিষ্কের দরকার পূর্ণ রিলাক্সেশন। মাথাটা ফাঁকা রাখা জরুরি। তার জন্য ঘুম জরুরি। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে দেয়ে টেবিলে বসতেই টুং করে একটা নোটিফিকেশন এলো। আমার ফেভারিট ইউটিউব চ্যানেল নতুন একটা ফানি ভিডিও ছেড়েছে। এই চ্যানেলের ভিডিওগুলো আমি একটাও মিস করি না। কতক্ষণ আর লাগবে? দেখে ফেললাম! সেটা দেখতে গিয়ে সাজেশনে দেখি গোল্ডমাইনে নতুন মুভি ছেড়েছে। এই হিরোর মুভিগুলো বরাবর জোশ হয়। দেখে ফেলি! কতক্ষণ আর লাগবে! তাছাড়া পরীক্ষার আগে মনটাকে ফুরফুরে রাখতে হয়।
সিনেমা শেষ করতে করতে দুপুর হয়ে গেল। আম্মু এসে বললেন, ‘চিনি শেষ হয়ে গেছে। সামনের দোকান থেকে একটু এনে দিবি?’
আম্মুর কাণ্ডজ্ঞান দেখে আমার বিস্ময় আকাশ স্পর্শ করল! দুদিন পর যে মেয়ের পরীক্ষা তাকে বলে চিনি আনতে! পরে ফেল করলে তিনিই তো একগাদা কথা শোনাবেন!
বিকাল নাগাদ এক হাতে চ্যাটিং করতে করতে আর অন্য হাতে বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে সিদ্ধান্ত নিলাম, এই সাজেশন আমার পক্ষে শেষ করা সম্ভব। তাহলে তাড়াহুড়োর কিছু নাই। আমার ব্রেইন তো খারাপ না! এটা বারো-তের ঘণ্টার একটা কাজ। একটানা পড়ে ফেললেই শেষ করা সম্ভব। পরীক্ষার এখনো তিন দিন বাকি আছে। এই সময়ে চার-পাঁচ বার শেষ করা সম্ভব এই সাজেশন। এখনই এত প্রেসার নেয়ার কিছু নাই। তারচেয়ে বরং লুডু খেলা যাক। লুডু খেললে মন উৎফুল­ হয়। তারও আগে কিছু নাস্তা বানিয়ে রাখতে হবে। আজ রাতে অনেক পড়া। টেনশনের সময় আমার আবার বরাবরই ক্ষুধা বেশি লাগে।
আরাম-আয়েশে কয়দিন কাটিয়ে দিয়ে অবশেষে আগামীকাল পরীক্ষা। দুপুর নাগাদ টেবিলে বসে চা আর আলুর চপ খেতে খেতে ঠিক করে ফেললাম, বিকাল থেকে টানা পড়ব। নো রেস্ট। বিকাল নাগাদ মনে হল, কী দরকার! পুরো রাত তো পড়েই আছে! এই সিলেবাস কমপ্লিট করার জন্য জাস্ট একটা রাত দরকার! রাত এগারোটার দিকে নতুন একটা জোশ ফেসবুক পেজে ঢুকে পড়লাম ওদের ফানি মিম আর ফানি ভিডিওগুলো দেখে হাসতে হাসতে আমার চোখে পানি চলে আসছে। এত ক্রিয়েটিভ মানুষ যে কেমনে হয়!
একটা, দুইটা, তিনটা, চারটা, পাঁচটা.... বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছি আর ফেসবুকিং করছি। মিমি দেখি এখনো অনলাইনে! বদ মেয়েটা পড়াশোনা বাদ দিয়ে অনলাইনে কী করে! কল দিয়ে জিজ্ঞেস করব নাকি?
ছয়টা নাগাদ ঘুমিয়ে পড়লাম। পরীক্ষার আগের রাতে পড়া আর ঘুম দুইটাই খুব জরুরি। আর পরীক্ষা নিয়ে চিন্তা নাই। আমার পাশে যে মেয়েটা আছে খুবই হেল্পফুল। তাছাড়া আমি অত্যন্ত ক্রিয়েটিভ। কিছু না পারলে বানিয়ে লিখে দিবো!

একজন পরীক্ষার্থী

 জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য 
২৪ নভেম্বর ২০২০, ১০:৪৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

পরীক্ষার ডেট দেয়ার পর থেকে প্রচণ্ড টেনশনে আছি আমি। দম ফেলারও সময় নেই। সিলেবাসের এত এত প্রশ্ন কীভাবে শেষ করব, দিনরাত সেটা নিয়ে টেনশন করি। পরীক্ষার সময় আমার আবার ক্ষিধা বেশি লাগে। সেটা নিয়েও টেনশন করি। পর্যাপ্ত পরিমাণ চিপস, চকলেট, বিস্কুট কিনে রাখি। নুডলস, ফ্রাইড রাইস রান্না করে রাখি। পর্যাপ্ত পরিমাণ কলম কিনে রাখি, কেননা পরীক্ষার সময় দেখা গেল হঠাৎ কলম থেকে কালি বেরোচ্ছে না! তখন আরেক বিপদ! 

সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে টিভি দেখতে বসি। পরীক্ষা নিয়ে বেশি টেনশন করলে মাথা কাজ করে না। তাই রিলাক্সেশনের জন্য প্রিয় সিরিজটা দেখতে বসা। এরই মধ্যে আমার বান্ধবী ফোন দিয়ে জানতে চাইল, প্রস্তুতি কতদূর?
বললাম, প্রায় সবই কমপ্লিট। খাতা, কলম কিনে রাখছি, নাস্তা বানানো আছে...!

আরে, পড়াশোনার প্রস্তুতির কথা বলছি! কী করছিস এখন?
টিভি দেখছি, আমার জন্য দোয়া করিস। পরীক্ষা নিয়ে খুব টেনশনে আছি! বলেই ফোনটা কেটে দিলাম। সিরিজ শুরু হয়ে গেছে।
পাশের বাসার আন্টি গত পরশু তার মেয়ের জন্মদিনে দাওয়াত দিতে এসেছিলেন। আমি আঁতকে উঠেছিলাম। এসব মানুষের কাণ্ডজ্ঞান কবে হবে! দেখছে দুদিন বাদে একটা মেয়ের পরীক্ষা, দম ফেলার সময় নাই! তাকে জন্মদিনের দাওয়াত দিতে আসে কীভাবে! আমার কি ফুর্তি করবার সময় এখন!
রাত তিনটা পর্যন্ত বিভিন্ন বইয়ের ধুলা পরিষ্কার করে সাবজেক্টগুলার নাম মুখস্থ করলাম। কোনদিন কী পরীক্ষা সেই রুটিনটা মুখস্থ করলাম। সাজেশনের প্রশ্নগুলা খাতায় লিখে ফেললাম। বলা তো যায় না! যদি সাজেশন হারিয়ে যায়? খাতায় লিখে রাখা ভালো। এইটুকু করতে করতে ক্ষিদা লেগে গেল! একবাটি নুডলস নিয়ে বসে ফেসবুক স্ক্রল করতে লাগলাম। মিমিকে দেখছি এতরাতে অনলাইনে! এদের কি কোনোদিন বুঝ হবে না! পরীক্ষার আগে এতরাত জেগে ফেসবুকে কী করে! নিশ্চয়ই প্রেম করে! স্কুল লাইফ থেকেই মিমির ক্যারেক্টার ভালো না!
স্কুল লাইফ থেকে মিমি কতগুলা প্রেম করছে আর কী কী অন্যায় করছে, এর জন্য পরকালে ওর কী বিচার হবে এসব ভাবতে ভাবতে শিউরে উঠলাম! এরই মধ্যে ছয়টা বেজে গেছে। আজ আর পড়া হবে না। ঘুম দরকার। অনেকেই মনে করে পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়লেই পাশ! এটা ভুল, পরীক্ষার আগে মস্তিষ্কের দরকার পূর্ণ রিলাক্সেশন। মাথাটা ফাঁকা রাখা জরুরি। তার জন্য ঘুম জরুরি। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে দেয়ে টেবিলে বসতেই টুং করে একটা নোটিফিকেশন এলো। আমার ফেভারিট ইউটিউব চ্যানেল নতুন একটা ফানি ভিডিও ছেড়েছে। এই চ্যানেলের ভিডিওগুলো আমি একটাও মিস করি না। কতক্ষণ আর লাগবে? দেখে ফেললাম! সেটা দেখতে গিয়ে সাজেশনে দেখি গোল্ডমাইনে নতুন মুভি  ছেড়েছে। এই হিরোর মুভিগুলো বরাবর জোশ হয়। দেখে ফেলি! কতক্ষণ আর লাগবে! তাছাড়া পরীক্ষার আগে মনটাকে ফুরফুরে রাখতে হয়।
সিনেমা শেষ করতে করতে দুপুর হয়ে গেল। আম্মু এসে বললেন, ‘চিনি শেষ হয়ে গেছে। সামনের দোকান থেকে একটু এনে দিবি?’
আম্মুর কাণ্ডজ্ঞান দেখে আমার বিস্ময় আকাশ স্পর্শ করল! দুদিন পর যে মেয়ের পরীক্ষা তাকে বলে চিনি আনতে! পরে ফেল করলে তিনিই তো একগাদা কথা শোনাবেন!
বিকাল নাগাদ এক হাতে চ্যাটিং করতে করতে আর অন্য হাতে বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে সিদ্ধান্ত নিলাম, এই সাজেশন আমার পক্ষে শেষ করা সম্ভব। তাহলে তাড়াহুড়োর কিছু নাই। আমার ব্রেইন তো খারাপ না! এটা বারো-তের ঘণ্টার একটা কাজ। একটানা পড়ে ফেললেই শেষ করা সম্ভব। পরীক্ষার এখনো তিন দিন বাকি আছে। এই সময়ে চার-পাঁচ বার শেষ করা সম্ভব এই সাজেশন। এখনই এত প্রেসার নেয়ার কিছু নাই। তারচেয়ে বরং লুডু খেলা যাক। লুডু খেললে মন উৎফুল­ হয়। তারও আগে কিছু নাস্তা বানিয়ে রাখতে হবে। আজ রাতে অনেক পড়া। টেনশনের সময় আমার আবার বরাবরই ক্ষুধা বেশি লাগে।
আরাম-আয়েশে কয়দিন কাটিয়ে দিয়ে অবশেষে আগামীকাল পরীক্ষা। দুপুর নাগাদ টেবিলে বসে চা আর আলুর চপ খেতে খেতে ঠিক করে ফেললাম, বিকাল থেকে টানা পড়ব। নো রেস্ট। বিকাল নাগাদ মনে হল, কী দরকার! পুরো রাত তো পড়েই আছে! এই সিলেবাস কমপ্লিট করার জন্য জাস্ট একটা রাত দরকার! রাত এগারোটার দিকে নতুন একটা জোশ ফেসবুক পেজে ঢুকে পড়লাম ওদের ফানি মিম আর ফানি ভিডিওগুলো দেখে হাসতে হাসতে আমার চোখে পানি চলে আসছে। এত ক্রিয়েটিভ মানুষ যে কেমনে হয়!
একটা, দুইটা, তিনটা, চারটা, পাঁচটা.... বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছি আর ফেসবুকিং করছি। মিমি দেখি এখনো অনলাইনে! বদ মেয়েটা পড়াশোনা বাদ দিয়ে অনলাইনে কী করে! কল দিয়ে জিজ্ঞেস করব নাকি? 
ছয়টা নাগাদ ঘুমিয়ে পড়লাম। পরীক্ষার আগের রাতে পড়া আর ঘুম দুইটাই খুব জরুরি। আর পরীক্ষা নিয়ে চিন্তা নাই। আমার পাশে যে মেয়েটা আছে খুবই হেল্পফুল। তাছাড়া আমি অত্যন্ত ক্রিয়েটিভ। কিছু না পারলে বানিয়ে লিখে দিবো!