কিনতে গেলে চিন্তে হয়
jugantor
মলাট বৃত্তান্ত
কিনতে গেলে চিন্তে হয়

  শফিক হাসান  

১১ মে ২০২১, ২২:২৭:৫৪  |  অনলাইন সংস্করণ

লকডাউন বহাল কিন্তু শপিংমল খুলে দেওয়া হয়েছে, পর্যায়ক্রমে মলত্যাগের আইমিন শপিংমলত্যাগের সময়ও বাড়ানো হয়েছে। দফায় দফায় খুশিতে চোখের তারায় ঝিলিক দিয়েছে নয়নার। ঈদের আগে কেনাকাটা এই বঙ্গের ঐতিহ্য। ঐতিহ্য ও ভ্রমণ অনুরাগী নয়না চাইলেই অস্তিত্বের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না! খুশির দিনেও রাকিবের মুখ গোমড়া কেন! কপালে মৃদু কুঞ্চন ফোটে নয়নার। রাকিব কি আরও ধানাইপানাই করবে! যা-ই করুক, ওকে শপিং থেকে ফেরাতে পারবে না। ইতোমধ্যে তিন পাতার ফর্দ করেছে নয়না। নিজের জন্য, বাবা-মা, ভাইবোন ও তাদের সন্তানদের জন্য কী কী কিনবে বা কোন মার্কেটের কোন পণ্য ভালো, সেই তালিকা প্রণয়নও শেষ। এমন রক্তিম মুহূর্তে রাকিবের দুমড়ানো গাল দেখে মেজাজ খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। তবুও নয়না ঠান্ডা রাখল নিজেকে। সন্ধ্যা ৭টায় চোটপাট দেখালে নিজেরই ক্ষতি!

রাকিবের দিকে মসলাদার চা এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘এখন যাবে নাকি আরও দশ মিনিট পরে?’
বহুতল ভবন থেকে পড়ার আতঙ্ক-অনুভ‚তি নিয়ে রাকিব বলে, ‘কোথায় যেতে হবে!’

‘শপিং পিরিয়ড চলছে না! মার্কেটিং থেকে পিছিয়ে থাকব কেন?’
মেজাজের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রাকিবের গলা চড়ল, ‘তোমাকে কতবার বলেছি, শব্দটা মার্কেটিং নয়শপিং। কোম্পানিগুলোর বাজারে পণ্য বিপণন করাকে বলে মার্কেটিং।’
‘জ্ঞান দেবে না। মার্কেটে যাব, তাই মার্কেটিং। তোমার মতো এমএ পাস করিনি, তাই বলে কম বুঝি না!’
‘নমুনা দেখতেই পাচ্ছি!’

‘চালাকি বুঝি না মনে করেছ! তুমি চাচ্ছ, গতবারের মতো এবারও আমড়াতলা বাজারে নিয়ে সস্তা জামা-জুতো গছিয়ে দেবে! আমি মার্কেটে যাব, মার্কেটিংই করব।’
বাদানুবাদের ঝুঁকিতে গেল না আর রাকিব। গত বছর লকডাউনে দেশের মার্কেট ও শপিংমল বন্ধ ছিল। নয়নার বায়না মেটাতে আমড়াতলা বাজার আবিষ্কার করেছিল সে। সীমিত পরিসরে ছোট বাজার থেকে কেনাকাটার সুযোগ ছিল। পরে বুঝেছেকেনাকাটা নয়, আদতে গলাকাটা! দেশীয় মোটা কাপড়কে পাকিস্তানি লেহেঙ্গা হিসাবে উপস্থাপন করেছিল দোকানি। কিন্তু নয়না পাকিস্তানি লেহেঙ্গা কিনবে না, ওর প্রিয় নায়ক ভারতের শাহরুখ খান। ধুরন্ধর দোকানদার শেষ পর্যন্ত আলগা কাগজে সাঁটানো পাকিস্তান শব্দটা ছিঁড়ে ফেলে এগিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় লেহেঙ্গা। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে সেই যাত্রায় গিলোটিনে কাটা পড়েছিল রাকিবের মাথা। নতুন করে আবার পুরনো আতঙ্ক ঝেঁকে ধরল।

কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। শপিং-মার্কেটিং বিতর্কে হেরে গেলে কিছুক্ষণের মধ্যেই হয় নয়না ওর বাবাকে কল করবে। জানতে চাইবেÑ বেছে বেছে তাকে কেন হাড়কিপটে পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হলো; ভাত-কাপড়ের জোগান দেওয়ার মুরোদও যার নেই! শ্বশুরের ভ্রƒকুটির ভয়ে তড়িঘড়ি করে বলল, ‘চলো, মার্কেটিংয়েই যাই!’

রিকশায় উঠে নয়নার কণ্ঠে সুর উঠল। রাকিব মনে করার চেষ্টা করল, পকেটে মোট কত টাকা আছে। সবটা যদি নয়না একাই হাপিস করে নিজের বাবা-মাকে কী দেবে, বাড়িওয়ালাকেই বা কী বুঝ দেবে! এদিকে বেতন অর্ধেকে নেমেছে, বোনাস হবে না। বুক দুরুদুরু করলেও হাসিটা জাপটে রাখতে হলো। স্বামী হয়েছে অথচ বড় অভিনেতা হবে না, তা কী হয়!

মার্কেট গিজগিজ করছে সাহসী সব মানুষে। সবাই করোনাভীতিমুক্ত। নামি দোকানটায় আধাঘণ্টার মধ্যে দেড়শ’ শাড়ি নামাল নয়না। একটার দাম দেড় লাখ টাকা শুনে গলা শুকিয়ে তিস্তা-মরুভ‚মির বিস্বাদ পেল রাকিব। সুদর্শন বিক্রেতার সঙ্গে অল্প সময়েই ভাইবোন সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলেছে নয়না। নিকট আত্নীয়তার কারণেই দাম নামল এক লাখে। রাকিবের তব্দা-মারা চেহারার দিকে তাকিয়ে নয়না বলল, ‘কী হলো, ভাইয়াকে টাকা দাও!’
‘দিচ্ছি। তার আগে এটিএম বুথে যাই।’
‘সাবধানে যাও। মাস্ক খুলবে না যেন!’

দোকান থেকে বেরোতে পারল বটে, অক্টোপাসের যাঁতাকল থেকে মুক্তি পাবে কীভাবে! বাপ-মা উভয়ের জšে§ও এত টাকা একত্রে দেখেনি। লাভ নেই জেনেও অন্ধকার আকাশপানে তাকাল। বাঁকা চাঁদ আড়ালে এখনো। অপেক্ষা করতে হবে আরও। চাঁদের এক কোণে দড়ি লাগিয়ে যদি ঝুলে পড়তে পারত রাকিব!

মলাট বৃত্তান্ত

কিনতে গেলে চিন্তে হয়

 শফিক হাসান 
১১ মে ২০২১, ১০:২৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

লকডাউন বহাল কিন্তু শপিংমল খুলে দেওয়া হয়েছে, পর্যায়ক্রমে মলত্যাগের আইমিন শপিংমলত্যাগের সময়ও বাড়ানো হয়েছে। দফায় দফায় খুশিতে চোখের তারায় ঝিলিক দিয়েছে নয়নার। ঈদের আগে কেনাকাটা এই বঙ্গের ঐতিহ্য। ঐতিহ্য ও ভ্রমণ অনুরাগী নয়না চাইলেই অস্তিত্বের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না! খুশির দিনেও রাকিবের মুখ গোমড়া কেন! কপালে মৃদু কুঞ্চন ফোটে নয়নার। রাকিব কি আরও ধানাইপানাই করবে! যা-ই করুক, ওকে শপিং থেকে ফেরাতে পারবে না। ইতোমধ্যে তিন পাতার ফর্দ করেছে নয়না। নিজের জন্য, বাবা-মা, ভাইবোন ও তাদের সন্তানদের জন্য কী কী কিনবে বা কোন মার্কেটের কোন পণ্য ভালো, সেই তালিকা প্রণয়নও শেষ। এমন রক্তিম মুহূর্তে রাকিবের দুমড়ানো গাল দেখে মেজাজ খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। তবুও নয়না ঠান্ডা রাখল নিজেকে। সন্ধ্যা ৭টায় চোটপাট দেখালে নিজেরই ক্ষতি!

রাকিবের দিকে মসলাদার চা এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘এখন যাবে নাকি আরও দশ মিনিট পরে?’
বহুতল ভবন থেকে পড়ার আতঙ্ক-অনুভ‚তি নিয়ে রাকিব বলে, ‘কোথায় যেতে হবে!’

‘শপিং পিরিয়ড চলছে না! মার্কেটিং থেকে পিছিয়ে থাকব কেন?’
মেজাজের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রাকিবের গলা চড়ল, ‘তোমাকে কতবার বলেছি, শব্দটা মার্কেটিং নয় শপিং। কোম্পানিগুলোর বাজারে পণ্য বিপণন করাকে বলে মার্কেটিং।’
‘জ্ঞান দেবে না। মার্কেটে যাব, তাই মার্কেটিং। তোমার মতো এমএ পাস করিনি, তাই বলে কম বুঝি না!’
‘নমুনা দেখতেই পাচ্ছি!’

‘চালাকি বুঝি না মনে করেছ! তুমি চাচ্ছ, গতবারের মতো এবারও আমড়াতলা বাজারে নিয়ে সস্তা জামা-জুতো গছিয়ে দেবে! আমি মার্কেটে যাব, মার্কেটিংই করব।’
বাদানুবাদের ঝুঁকিতে গেল না আর রাকিব। গত বছর লকডাউনে দেশের মার্কেট ও শপিংমল বন্ধ ছিল। নয়নার বায়না মেটাতে আমড়াতলা বাজার আবিষ্কার করেছিল সে। সীমিত পরিসরে ছোট বাজার থেকে কেনাকাটার সুযোগ ছিল। পরে বুঝেছে কেনাকাটা নয়, আদতে গলাকাটা! দেশীয় মোটা কাপড়কে পাকিস্তানি লেহেঙ্গা হিসাবে উপস্থাপন করেছিল দোকানি। কিন্তু নয়না পাকিস্তানি লেহেঙ্গা কিনবে না, ওর প্রিয় নায়ক ভারতের শাহরুখ খান। ধুরন্ধর দোকানদার শেষ পর্যন্ত আলগা কাগজে সাঁটানো পাকিস্তান শব্দটা ছিঁড়ে ফেলে এগিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় লেহেঙ্গা। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে সেই যাত্রায় গিলোটিনে কাটা পড়েছিল রাকিবের মাথা। নতুন করে আবার পুরনো আতঙ্ক ঝেঁকে ধরল।

কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। শপিং-মার্কেটিং বিতর্কে হেরে গেলে কিছুক্ষণের মধ্যেই হয় নয়না ওর বাবাকে কল করবে। জানতে চাইবেÑ বেছে বেছে তাকে কেন হাড়কিপটে পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হলো; ভাত-কাপড়ের জোগান দেওয়ার মুরোদও যার নেই! শ্বশুরের ভ্রƒকুটির ভয়ে তড়িঘড়ি করে বলল, ‘চলো, মার্কেটিংয়েই যাই!’

রিকশায় উঠে নয়নার কণ্ঠে সুর উঠল। রাকিব মনে করার চেষ্টা করল, পকেটে মোট কত টাকা আছে। সবটা যদি নয়না একাই হাপিস করে নিজের বাবা-মাকে কী দেবে, বাড়িওয়ালাকেই বা কী বুঝ দেবে! এদিকে বেতন অর্ধেকে নেমেছে, বোনাস হবে না। বুক দুরুদুরু করলেও হাসিটা জাপটে রাখতে হলো। স্বামী হয়েছে অথচ বড় অভিনেতা হবে না, তা কী হয়!

মার্কেট গিজগিজ করছে সাহসী সব মানুষে। সবাই করোনাভীতিমুক্ত। নামি দোকানটায় আধাঘণ্টার মধ্যে দেড়শ’ শাড়ি নামাল নয়না। একটার দাম দেড় লাখ টাকা শুনে গলা শুকিয়ে তিস্তা-মরুভ‚মির বিস্বাদ পেল রাকিব। সুদর্শন বিক্রেতার সঙ্গে অল্প সময়েই ভাইবোন সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলেছে নয়না। নিকট আত্নীয়তার কারণেই দাম নামল এক লাখে। রাকিবের তব্দা-মারা চেহারার দিকে তাকিয়ে নয়না বলল, ‘কী হলো, ভাইয়াকে টাকা দাও!’
‘দিচ্ছি। তার আগে এটিএম বুথে যাই।’
‘সাবধানে যাও। মাস্ক খুলবে না যেন!’

দোকান থেকে বেরোতে পারল বটে, অক্টোপাসের যাঁতাকল থেকে মুক্তি পাবে কীভাবে! বাপ-মা উভয়ের জšে§ও এত টাকা একত্রে দেখেনি। লাভ নেই জেনেও অন্ধকার আকাশপানে তাকাল। বাঁকা চাঁদ আড়ালে এখনো। অপেক্ষা করতে হবে আরও। চাঁদের এক কোণে দড়ি লাগিয়ে যদি ঝুলে পড়তে পারত রাকিব!
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন