এই আষাঢ়ে তিনটি আষাঢ়ে গল্প
jugantor
মলাট বৃত্তান্ত
এই আষাঢ়ে তিনটি আষাঢ়ে গল্প

  শফিক হাসান  

২৩ জুন ২০২১, ২২:০৯:০৫  |  অনলাইন সংস্করণ

বস যখন সহমর্মী
গোলাপ মিয়ার কলিজায় কে যেন চিমটি ধরে টান দিচ্ছিল বারবার। অফিসে পৌঁছাতে আজও দেরি; বস না জানি কত গরম হবে! দুর্মূল্যের বাজারে যদি চাকরিটাই চলে যায়! ঘর্মাক্ত দেহে অফিসে ঢুকেই সবকিছু ওলটপালট মনে হলো। কেউই কিছু বলল না। মাজেদ স্যার ঘণ্টায় তিনবার চা খান; আজ তিনি নিজেই চা বানিয়েছেন। চিনির পরিমাণ ঠিক না হওয়ার অভিযোগে গোলাপকে বকলেনও না। অস্বস্তি বাড়ল আরও। ঘণ্টাখানেক পরে সহকর্মী বিল্টু এসে বলল, ‘বড় ছার তোরে ছালাম দিছে।’

এবার সত্যিই ভয় পেল গোলাপ। স্যার ওর মতো পিয়নকে সালাম দেবেন কেন! দুরুদুরু বুকে কাচ ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল সে। স্যার হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন, ‘কেমন আছ, গোলাপ?’
‘স্যার, আইজও আইতে দেরি অইয়া গেল। আমি...।’
‘দেরি হলে সমস্যা কী? বসো, কফি খাও।’

বিল্টু দুই কাপ কফি রাখল সামনে। স্যার নিজেরটা নিয়ে গোলাপের দিকে ঠেলে দিলেন অন্য কাপ। টিফিন ক্যারিয়ার থেকে বের করলেন নাস্তা। বাড়ালেন গোলাপের দিকেÑ ‘তোমার ভাবির বানানো কলিজা শিঙ্গাড়া। আমার খুব পছন্দের। খাও।’
শিঙ্গাড়ায় কামড় দিতে গিয়ে জিহŸায় দাঁত বসে গেল গোলাপের। বাদশাহি আপ্যায়ন, দুটোই খেয়ে শেষ করতে হলো। বস ওর বাসা-বাড়ির খোঁজ নিলেন। শেষে ওর হাতে একটা খামবন্দি চিঠি দিয়ে বললেন, ‘তোমার পদোন্নতিপত্র। তোমার কাজে প্রতিষ্ঠান সন্তুষ্ট। আর অফিসে আসতে আমারও দেরি হয়। এটা নিয়ে কখনো ভেবো না!’

সড়কে আশার আলো
সকাল থেকেই অবাক হচ্ছে মুহিন। এখনো হলো। আজকালকার মানুষ সত্য বলা শুরু করেছে! এখন সে বসে আছে ফার্মগেটে, বাসে। ওর বিপরীতে দিকের লোকটা মোবাইল ফোনে কাকে যেন বলছে, ‘আমি ফার্মগেটে!’ মুহিন মনে করতে পারল না, কখনো কাউকে স্থান সংক্রান্ত ব্যাপারে সত্য বলতে শুনেছে কিনা।
কন্ডাক্টর এলো ভাড়া চাইতে। ১০ টাকা কম আছে; ভয়ে ভয়ে টাকাটা দিল। কন্ডাক্টর ওকে ভালোভাবে পরখ করে বলল, ‘আপনি ছাত্র?’
ছাত্রদের সঙ্গে পরিবহণকর্মীদের বচসা লাগে প্রায়ই। সেটার পুনরাবৃত্তি হবে নাকি!
মুহিন বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে অর্ধেক ভাড়া।’ ১০ টাকা ফেরত দিল কন্ডাক্টর।
‘সমস্যা নেই। পুরোটাই রাখুন।’
‘না। ৬০ পার্সেন্ট ভাড়ায় আরও দুই টাকা পাওনা আছেন ভাই।’
‘মামা না ডেকে আজ ভাই ডাকছেন যে!’
‘মামা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তুচ্ছার্থে ডাকা হয়। আমি এটাকে অপসংস্কৃতি মনে করি।’
‘বাহ, আপনি গুছিয়ে কথা বলেন!’
‘জীবন গোছানোর চেষ্টা করছি। আমি নবীন কন্ডাক্টর থেকে বাস ড্রাইভার হয়েছিলাম। তখন এক মুরব্বিকে ধাক্কা দিয়েছিলাম। এরপর আগের অবস্থানে ফিরে এসেছি। মানুষ মারার অধিকার তো আমার নেই।’
‘বাহ। আপনার মানবিক গুণাবলি প্রবল!’
বাইরে থেকে যাত্রীরা হুড়মুড় করে উঠতে চাইলে দরজা লক করে দেয় কন্ডাক্টর। বলে, ‘সবারই উচিত স্বাস্থ্যবিধি মানা। অল্প কয়টা টাকার লোভে নিজে করোনাঝুঁকিতে পড়তে চাই না, আপনাদেরও মারতে চাই না।’
বলতে বলতে কন্ডাক্টর ঘুমন্ত এক নারীকে ডেকে তোলে, ‘খালা, আপনি না বাংলামোটর নামবেন? আমার সঙ্গে আসেন, মগবাজারে যাওয়ার রাস্তাটা দেখিয়ে দিই।’

কুৎসামুক্ত চায়ের আড্ডা
সন্ধ্যা হলেই চা দোকানে আসে গ্রামের অনেকেই। বেকাররা সকাল থেকেই আড্ডা জমাতে পারলেও শ্রমজীবীদের সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। আজকের চিত্রটা উল্টো। তেমন কেউই নেই। হাশেম মন্ডল দোকানিকে লক্ষ করে বলল, ‘তোর কাস্টমররা কই?’
‘কই আবার, বাসা-বাড়িত! যার যার কাম-কাজে।’
চা দোকানকে ঘরবাড়ি বানিয়ে মানুষের কাজ বলতে তো অন্যদের ছিদ্রান্বেষণ ও ষড়যন্ত্র করা, নারীঘটিত মুখরোচক আলোচনায় আড্ডা সরগরম করা। মনে জিজ্ঞাসা নিয়েই আয়েশ করে বসে হাশেম মন্ডল। এসময় প্রবেশ করে প্রতিবেশী রুস্তম আলী। তার সঙ্গে হাশেম মন্ডলের বিবাদ, জমির আল ঠেলাঠেলির মোকদ্দমা দীর্ঘদিনের। দুই কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে হাশেমকে রুস্তম বলে, ‘তোমার বীজতলায় দুপুরে বৃষ্টির পানি জমছিল। আমি আইল কেটে দিয়ে পানি সরিয়ে দিয়েছি। নাও, চা খাও।’
এ কেমন কথা, চিরশত্র“ নাকি খেতের পরিচর্যা করে, আবার চা-ও খাওয়াতে চায়! হাশেম বলে, ‘যতই পানি সরাও, জমি পাইবা না!’
জিহŸায় কামড় দেয় রুস্তম, ‘কী যে বলো না মিয়া। ওটা তোমার জায়গাই। আমি দুষ্ট-শয়তানের পাল­ায় পড়ে এতদিন বিরক্ত করেছি। অতীতের ভুলে জন্য আমি অনুতপ্ত।’
সুজন ছোকরা এসে ট্যাবলেট চায় দোকানির কাছে। হাশেম মন্ডল জানতে চায়, ‘কার কী হইছে?’
‘রোকেয়া আপার সর্দি-জ্বর।’
‘তুই না গতকাইল এইখানে বইসা ওর চরিত্র নিয়া প্রশ্ন তুললি!’
‘ভুল করছি কাকা। আমাগো সবারই নিজের চরিত্রের দিকেই আগে নজর দেওয়া দরকার!’ বলতে বলতে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল সুজন।

মলাট বৃত্তান্ত

এই আষাঢ়ে তিনটি আষাঢ়ে গল্প

 শফিক হাসান 
২৩ জুন ২০২১, ১০:০৯ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বস যখন সহমর্মী
গোলাপ মিয়ার কলিজায় কে যেন চিমটি ধরে টান দিচ্ছিল বারবার। অফিসে পৌঁছাতে আজও দেরি; বস না জানি কত গরম হবে! দুর্মূল্যের বাজারে যদি চাকরিটাই চলে যায়! ঘর্মাক্ত দেহে অফিসে ঢুকেই সবকিছু ওলটপালট মনে হলো। কেউই কিছু বলল না। মাজেদ স্যার ঘণ্টায় তিনবার চা খান; আজ তিনি নিজেই চা বানিয়েছেন। চিনির পরিমাণ ঠিক না হওয়ার অভিযোগে গোলাপকে বকলেনও না। অস্বস্তি বাড়ল আরও। ঘণ্টাখানেক পরে সহকর্মী বিল্টু এসে বলল, ‘বড় ছার তোরে ছালাম দিছে।’

এবার সত্যিই ভয় পেল গোলাপ। স্যার ওর মতো পিয়নকে সালাম দেবেন কেন! দুরুদুরু বুকে কাচ ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল সে। স্যার হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন, ‘কেমন আছ, গোলাপ?’
‘স্যার, আইজও আইতে দেরি অইয়া গেল। আমি...।’
‘দেরি হলে সমস্যা কী? বসো, কফি খাও।’

বিল্টু দুই কাপ কফি রাখল সামনে। স্যার নিজেরটা নিয়ে গোলাপের দিকে ঠেলে দিলেন অন্য কাপ। টিফিন ক্যারিয়ার থেকে বের করলেন নাস্তা। বাড়ালেন গোলাপের দিকেÑ ‘তোমার ভাবির বানানো কলিজা শিঙ্গাড়া। আমার খুব পছন্দের। খাও।’
শিঙ্গাড়ায় কামড় দিতে গিয়ে জিহŸায় দাঁত বসে গেল গোলাপের। বাদশাহি আপ্যায়ন, দুটোই খেয়ে শেষ করতে হলো। বস ওর বাসা-বাড়ির খোঁজ নিলেন। শেষে ওর হাতে একটা খামবন্দি চিঠি দিয়ে বললেন, ‘তোমার পদোন্নতিপত্র। তোমার কাজে প্রতিষ্ঠান সন্তুষ্ট। আর অফিসে আসতে আমারও দেরি হয়। এটা নিয়ে কখনো ভেবো না!’

সড়কে আশার আলো
সকাল থেকেই অবাক হচ্ছে মুহিন। এখনো হলো। আজকালকার মানুষ সত্য বলা শুরু করেছে! এখন সে বসে আছে ফার্মগেটে, বাসে। ওর বিপরীতে দিকের লোকটা মোবাইল ফোনে কাকে যেন বলছে, ‘আমি ফার্মগেটে!’ মুহিন মনে করতে পারল না, কখনো কাউকে স্থান সংক্রান্ত ব্যাপারে সত্য বলতে শুনেছে কিনা।
কন্ডাক্টর এলো ভাড়া চাইতে। ১০ টাকা কম আছে; ভয়ে ভয়ে টাকাটা দিল। কন্ডাক্টর ওকে ভালোভাবে পরখ করে বলল, ‘আপনি ছাত্র?’
ছাত্রদের সঙ্গে পরিবহণকর্মীদের বচসা লাগে প্রায়ই। সেটার পুনরাবৃত্তি হবে নাকি!
মুহিন বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে অর্ধেক ভাড়া।’ ১০ টাকা ফেরত দিল কন্ডাক্টর।
‘সমস্যা নেই। পুরোটাই রাখুন।’
‘না। ৬০ পার্সেন্ট ভাড়ায় আরও দুই টাকা পাওনা আছেন ভাই।’
‘মামা না ডেকে আজ ভাই ডাকছেন যে!’
‘মামা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তুচ্ছার্থে ডাকা হয়। আমি এটাকে অপসংস্কৃতি মনে করি।’
‘বাহ, আপনি গুছিয়ে কথা বলেন!’
‘জীবন গোছানোর চেষ্টা করছি। আমি নবীন কন্ডাক্টর থেকে বাস ড্রাইভার হয়েছিলাম। তখন এক মুরব্বিকে ধাক্কা দিয়েছিলাম। এরপর আগের অবস্থানে ফিরে এসেছি। মানুষ মারার অধিকার তো আমার নেই।’
‘বাহ। আপনার মানবিক গুণাবলি প্রবল!’
বাইরে থেকে যাত্রীরা হুড়মুড় করে উঠতে চাইলে দরজা লক করে দেয় কন্ডাক্টর। বলে, ‘সবারই উচিত স্বাস্থ্যবিধি মানা। অল্প কয়টা টাকার লোভে নিজে করোনাঝুঁকিতে পড়তে চাই না, আপনাদেরও মারতে চাই না।’
বলতে বলতে কন্ডাক্টর ঘুমন্ত এক নারীকে ডেকে তোলে, ‘খালা, আপনি না বাংলামোটর নামবেন? আমার সঙ্গে আসেন, মগবাজারে যাওয়ার রাস্তাটা দেখিয়ে দিই।’

কুৎসামুক্ত চায়ের আড্ডা
সন্ধ্যা হলেই চা দোকানে আসে গ্রামের অনেকেই। বেকাররা সকাল থেকেই আড্ডা জমাতে পারলেও শ্রমজীবীদের সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। আজকের চিত্রটা উল্টো। তেমন কেউই নেই। হাশেম মন্ডল দোকানিকে লক্ষ করে বলল, ‘তোর কাস্টমররা কই?’
‘কই আবার, বাসা-বাড়িত! যার যার কাম-কাজে।’
চা দোকানকে ঘরবাড়ি বানিয়ে মানুষের কাজ বলতে তো অন্যদের ছিদ্রান্বেষণ ও ষড়যন্ত্র করা, নারীঘটিত মুখরোচক আলোচনায় আড্ডা সরগরম করা। মনে জিজ্ঞাসা নিয়েই আয়েশ করে বসে হাশেম মন্ডল। এসময় প্রবেশ করে প্রতিবেশী রুস্তম আলী। তার সঙ্গে হাশেম মন্ডলের বিবাদ, জমির আল ঠেলাঠেলির মোকদ্দমা দীর্ঘদিনের। দুই কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে হাশেমকে রুস্তম বলে, ‘তোমার বীজতলায় দুপুরে বৃষ্টির পানি জমছিল। আমি আইল কেটে দিয়ে পানি সরিয়ে দিয়েছি। নাও, চা খাও।’
এ কেমন কথা, চিরশত্র“ নাকি খেতের পরিচর্যা করে, আবার চা-ও খাওয়াতে চায়! হাশেম বলে, ‘যতই পানি সরাও, জমি পাইবা না!’
জিহŸায় কামড় দেয় রুস্তম, ‘কী যে বলো না মিয়া। ওটা তোমার জায়গাই। আমি দুষ্ট-শয়তানের পাল­ায় পড়ে এতদিন বিরক্ত করেছি। অতীতের ভুলে জন্য আমি অনুতপ্ত।’
সুজন ছোকরা এসে ট্যাবলেট চায় দোকানির কাছে। হাশেম মন্ডল জানতে চায়, ‘কার কী হইছে?’
‘রোকেয়া আপার সর্দি-জ্বর।’
‘তুই না গতকাইল এইখানে বইসা ওর চরিত্র নিয়া প্রশ্ন তুললি!’
‘ভুল করছি কাকা। আমাগো সবারই নিজের চরিত্রের দিকেই আগে নজর দেওয়া দরকার!’ বলতে বলতে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল সুজন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন