ভোটের মিছিলে নাস্তার প্যাকেট
jugantor
ভোটের মিছিলে নাস্তার প্যাকেট

  হিমু চন্দ্র শীল  

১৩ মে ২০২২, ২২:২৯:০১  |  অনলাইন সংস্করণ

ক্লাস ফোরে পড়ি তখন। চারদিকে আসন্ন ভোটের আমেজে কিয়েক্টা অবস্থা! পোস্টার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা রাত পেরিয়ে দিন পোহালে শোনা যায়, অমুক মার্কায় ভোট চাই।

মাইকের আওয়াজ আর প্রার্থীর নিয়োগ দেওয়া ক্যানভাসে উঠে আসত প্রার্থীর শিক্ষার দৌড়। ভোট এলে কেউ খুশি হোক কিংবা না হোক, আমরা ছোটরা কিন্তু ঠিকই খুশি হতাম। কারণ কোনো প্রার্থী পাড়ায় ভোট চাইতে গেলে সঙ্গে করে আমাদের জন্য চকোলেট কিংবা অন্য কোনো খাবারের জিনিস নিয়ে আসত। আর আমরা ছোটরা ভোট দেওয়ার অধিকার না থাকলেও প্রার্থীদের মিছিল কিংবা সমাবেশে ওসবের লোভে নিয়মিতভাবে ঘোরাঘুরি করতাম। আর কোনো জায়গায় কোনো প্রার্থীর মিছিল হবে, মিছিল শেষে কী ধরনের নাস্তা দেওয়া হবে তার নিয়মিত আপডেট রাখতাম।

ঠিক এমনই একদিন এক সমবয়সির মুখ থেকে শুনলাম বিকালে এলাকার নামকরা এক চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর মিছিল হবে বিশাল আকারে। সেখানে নাস্তার প্যাকেটও দেবে। প্যাকেটের কথা শুনে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। কিন্তু বিপত্তিটা বাধল স্কুলের পড়া নিয়ে। সেদিন ক্লাসে অনেক হোমওয়ার্ক দিয়েছিল। আর মিছিল শুরু হবে বিকালে, কিন্তু শেষ কখন হবে তার কোনো খবর নেই।

ওদিকে হোমওয়ার্ক শেষ না করে মা কোথাও বের হতে দেবেন না। আর হোমওয়ার্ক না করে ক্লাসে গেলে দুদিন ধরে জ্বরে ভুগতে হবে। অগত্যা নাস্তার প্যাকেটের লোভ বিসর্জন দিয়ে মিছিলে আর গেলাম না। বিকালে শান্ত ছেলেটি হয়ে হোমওয়ার্ক করতে লাগলাম মায়ের সামনে বসে। যদিও মনটা পড়ে রইল মিছিলের নাস্তার প্যাকেটে।
সন্ধ্যার দিকে হুট করে মা বললেন, ‘কেরোসিন ফুরিয়ে গেছে। স্টেশনে গিয়ে দোকান থেকে কেরোসিন নিয়ে আয়। অমনি আমি কেরোসিনের বোতলটা নিয়ে দিলাম দৌড়। স্টেশনে গিয়ে দোকান থেকে কেরোসিন নিচ্ছি এমন সময় দেখলাম, যে মিছিলে নাস্তার প্যাকেট দেওয়ার কথা বলেছিল সে হাতে নাস্তার প্যাকেট নিয়ে খেতে খেতে আমার দিকে আসছে। এসে বলল, দ্যাখ দ্যাখ, কত ধরনের নাস্তা দিয়েছে।


তার হাতে থাকা প্যাকেটে হরেক রকমের খাবার দেখে আমার ভীষণ লোভ হলো। কিন্তু ওদিকে বাড়িতে কেরোসিন না পেলে বাতি জ্বলবে না। আর নাস্তার প্যাকেট যে জায়গায় দিচ্ছে, ওই জায়গাটা বহু দূর। কিন্তু প্যাকেটের লোভে আগপাছ না ভেবে কেরোসিনের বোতল হাতে দিলাম দৌড়।

মিনিট দশেক দৌড়ে পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট স্থানে, যেখানে নাস্তার প্যাকেট দিচ্ছে। গিয়ে দেখি নাস্তার প্যাকেট দেওয়া শেষ! কয়েকজন লোক ষাট ওয়ার্ডের বাল্বটা নিভিয়ে বড় বড় দুটা পাতিল সাজিয়ে রাখছে। প্যাকেটের দায়িত্বে থাকা একজন লোক হাতে কয়েকটা নাস্তার প্যাকেট নিয়ে চলে যাচ্ছেন।

ঝিঁঝি পোকা ঘুটঘুটে অন্ধকারে অনবরত ডেকে চলছে। আমি ঘেমে-নেয়ে একাকার। এ অবস্থায় আমি গিয়ে ওই লোকটাকে ধরলাম। আর কাকুতি-মিনতি করে বললাম, ‘আমি নাস্তার প্যাকেট পাইনি।’

লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে যখন দেখলেন আমার শার্ট ঘেমে ভিজে একাকার, তখন মনে করলেন হয়তো আমিও মিছিলে গিয়েছিলাম। কিন্তু সবার শেষে থাকার কারণে নাস্তার প্যাকেট পায়নি। লোকটা একটা প্যাকেট আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। অমনি আমি তার হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে দৌড়ে চলে এলাম বাড়িতে। আর প্যাকেটটা সবাইকে দেখিয়ে বলতে লাগলাম মিছিলে না গিয়েও নাস্তার প্যাকেট কীভাবে পেতে হয় তা আমি ভালো করেই জানি!

কক্সবাজার সরকারি কলেজ।

ভোটের মিছিলে নাস্তার প্যাকেট

 হিমু চন্দ্র শীল 
১৩ মে ২০২২, ১০:২৯ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ক্লাস  ফোরে পড়ি তখন। চারদিকে আসন্ন ভোটের আমেজে কিয়েক্টা অবস্থা! পোস্টার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা রাত পেরিয়ে দিন পোহালে শোনা যায়, অমুক মার্কায় ভোট চাই।

মাইকের আওয়াজ আর প্রার্থীর নিয়োগ দেওয়া ক্যানভাসে উঠে আসত প্রার্থীর শিক্ষার দৌড়। ভোট এলে কেউ খুশি হোক কিংবা না হোক, আমরা ছোটরা কিন্তু ঠিকই খুশি হতাম। কারণ কোনো প্রার্থী পাড়ায় ভোট চাইতে গেলে সঙ্গে করে আমাদের জন্য চকোলেট কিংবা অন্য কোনো খাবারের জিনিস নিয়ে আসত। আর আমরা ছোটরা ভোট দেওয়ার অধিকার না থাকলেও প্রার্থীদের মিছিল কিংবা সমাবেশে ওসবের লোভে নিয়মিতভাবে ঘোরাঘুরি করতাম। আর কোনো জায়গায় কোনো প্রার্থীর মিছিল হবে, মিছিল শেষে কী ধরনের নাস্তা দেওয়া হবে তার নিয়মিত আপডেট রাখতাম।

ঠিক এমনই একদিন এক সমবয়সির মুখ থেকে শুনলাম বিকালে এলাকার নামকরা এক চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর মিছিল হবে বিশাল আকারে। সেখানে নাস্তার প্যাকেটও দেবে। প্যাকেটের কথা শুনে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। কিন্তু বিপত্তিটা বাধল স্কুলের পড়া নিয়ে। সেদিন ক্লাসে অনেক হোমওয়ার্ক দিয়েছিল। আর মিছিল শুরু হবে বিকালে, কিন্তু শেষ কখন হবে তার কোনো খবর নেই।
 
ওদিকে হোমওয়ার্ক শেষ না করে মা কোথাও বের হতে দেবেন না। আর হোমওয়ার্ক না করে ক্লাসে গেলে দুদিন ধরে জ্বরে ভুগতে হবে। অগত্যা নাস্তার প্যাকেটের লোভ বিসর্জন দিয়ে মিছিলে আর গেলাম না। বিকালে শান্ত ছেলেটি হয়ে হোমওয়ার্ক করতে লাগলাম মায়ের সামনে বসে। যদিও মনটা পড়ে রইল মিছিলের নাস্তার প্যাকেটে। 
সন্ধ্যার দিকে হুট করে মা বললেন, ‘কেরোসিন ফুরিয়ে গেছে। স্টেশনে গিয়ে দোকান থেকে কেরোসিন নিয়ে আয়। অমনি আমি কেরোসিনের বোতলটা নিয়ে দিলাম দৌড়। স্টেশনে গিয়ে দোকান থেকে কেরোসিন নিচ্ছি এমন সময় দেখলাম, যে মিছিলে নাস্তার প্যাকেট দেওয়ার কথা বলেছিল সে হাতে নাস্তার প্যাকেট নিয়ে খেতে খেতে আমার দিকে আসছে। এসে বলল, দ্যাখ দ্যাখ, কত ধরনের নাস্তা দিয়েছে।


তার হাতে থাকা প্যাকেটে হরেক রকমের খাবার দেখে আমার ভীষণ লোভ হলো। কিন্তু ওদিকে বাড়িতে কেরোসিন না পেলে বাতি জ্বলবে না। আর নাস্তার প্যাকেট যে জায়গায় দিচ্ছে, ওই জায়গাটা বহু দূর। কিন্তু প্যাকেটের লোভে আগপাছ না ভেবে কেরোসিনের বোতল হাতে দিলাম দৌড়। 

মিনিট দশেক দৌড়ে পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট স্থানে, যেখানে নাস্তার প্যাকেট দিচ্ছে। গিয়ে দেখি নাস্তার প্যাকেট দেওয়া শেষ! কয়েকজন লোক ষাট ওয়ার্ডের বাল্বটা নিভিয়ে বড় বড় দুটা পাতিল সাজিয়ে রাখছে। প্যাকেটের দায়িত্বে থাকা একজন লোক হাতে কয়েকটা নাস্তার প্যাকেট নিয়ে চলে যাচ্ছেন। 

ঝিঁঝি পোকা ঘুটঘুটে অন্ধকারে অনবরত ডেকে চলছে। আমি ঘেমে-নেয়ে একাকার। এ অবস্থায় আমি গিয়ে ওই লোকটাকে ধরলাম। আর কাকুতি-মিনতি করে বললাম, ‘আমি নাস্তার প্যাকেট পাইনি।’ 

লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে যখন দেখলেন আমার শার্ট ঘেমে ভিজে একাকার, তখন মনে করলেন হয়তো আমিও মিছিলে গিয়েছিলাম। কিন্তু সবার শেষে থাকার কারণে নাস্তার প্যাকেট পায়নি। লোকটা একটা প্যাকেট আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। অমনি আমি তার হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে দৌড়ে চলে এলাম বাড়িতে। আর প্যাকেটটা সবাইকে দেখিয়ে বলতে লাগলাম মিছিলে না গিয়েও নাস্তার প্যাকেট কীভাবে পেতে হয় তা আমি ভালো করেই জানি!

কক্সবাজার সরকারি কলেজ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন