কথায় আছে, বাস্তবে নেই!
jugantor
রম্য
কথায় আছে, বাস্তবে নেই!

  শফিক হাসান  

০৬ আগস্ট ২০২২, ১৭:০০:১১  |  অনলাইন সংস্করণ

প্রতিদিন আমরা এমন কিছু কথা বলি, খুঁজলে যার বাস্তব কোনো ভিত্তি পাওয়া যাবে না। তাই বলে ‘অবাস্তব’ কথাগুলোকে কেউ ভুল হিসাবে আখ্যায়িতও করে না! দেখা যাক, আমরা কী বলিÑযা বাস্তবতা থেকে বহুদূরে অবস্থান করছে!

কানাকড়িও নেই
প্রচণ্ড অর্থ সংকটের অবস্থা বোঝাতে অনেকেই বলে থাকেন, পকেটে নাকি কানাকড়িটিও নেই! কানাকড়ি না থাকায় অর্থ সংকট যেন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি, কানাকড়ি থাকলেও সমস্যা দূর হত না? প্রথম কথা হচ্ছে, এখন কানাকড়ি পরের কথা, ভালো কড়িরও কোনো মূল্য নেই! মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে কড়ি পেরিয়ে টাকা ও ডলারের যুগে প্রবেশ করেছি আমরা অনেক আগেই। এখন টাকাও তেজপাতা হওয়ার পথে। সবচেয়ে বড় কথা, কানাকড়ি তো কানা, এই কড়ি থাকলেইবা লাভ কী? এটা কি চালানো যাবে! ন্যাতানো দুই টাকার নোট না হয় চলে, বিকল্প নেই বলে! তাই বলে কানাকড়ির প্রতিও মানুষ সহানুভূতি দেখাবে এমনটি ভাবা বোধহয় ঠিক না! এই নানামাত্রিক মুদ্রার যুগে আর কত কানাকড়ির গল্প শোনাবে আজব গল্পবাজরা!
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া
ঘোরতর বিপদে আমরা বলি, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে! কিন্তু আসলেই কি মানুষের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়তে পারে! একজন মানুষকে ‘শায়েস্তা’ করতে আকাশ কেন এতো বড় তৎপরতা চালাবে? তার চেয়ে স্বস্থানে বসে নির্দিষ্ট মানুষটির মাথায় একটি বাজ ফেললেই তো কেল্লাফতে! আর আকাশ যখন ভেঙে পড়বে, তা নিশ্চয়ই শুধু একজনের মাথায় পড়বে না, পৃথিবীর সব মানুষই আকাশের ছোঁয়া পাবে! কেউ নিশ্চয়ই এই দাবি করবে না, তার মাথা আকাশ-সমানÑদৈর্ঘ্য ও প্রস্থে। সুতরাং মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার গল্পটি মোটেও সত্য নয়। গাছের নিচ দিয়ে হাঁটার সময় শুকনো ডাল ভেঙে মাথায় পড়তে পারে, কাক তার অব্যর্থ প্র্যাকটিস চালাতে পারে, দুষ্টু গোছের ছেলেরা দুই একটা ঢিল ছুড়তে পারে, বৃষ্টিদিনে ছাতাহীন অবস্থায় বের হলে পানি পড়তে পারেÑ এসবই মাথায় পড়া সম্ভব! কিন্তু আকাশ ভেঙে পড়বে, আকাশের কী এমন দায়; ক্ষুদ্র একজন মানুষকে ‘মহিমান্বিত’ করতে তার ওপর নিজের সব শরীর চাপিয়ে দিতে!
আঙুল ফুলে কলাগাছ
সহজেই যারা অর্থবিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী হয়ে যায়, তাদের আমরা বলিÑআঙুল ফুলে কলাগাছ। টাকাটা বৈধ পথে আসুক কিংবা অবৈধ পথে। যুক্তিবাদীরা বলবেন, কলাগাছের সঙ্গে থোড়ের সম্পর্ক থাকতে পারে, কলা কিংবা ডাঁটির (যে অংশ তরকারি হিসাবে ব্যবহƒত হয়) সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু টাকা আসবে কোত্থেকে, কেনইবা আসবে? আর আঙুল ফুলে কলাগাছÑকথাটা শুনতেও কেমন! আঙুল ফুলে ঢোল হতে পারে কিন্তু কলাগাছ? মাটি ছাড়া গাছ হয় নাÑএই তত্ত্বটুকু দিতে উদ্ভিদবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই। তো যেখানে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক নেই সেখানে কীভাবে গাছ জš§াবে! বনসাইয়েরও তো একটা বাহন থাকে! কারও আঙুল ফুলে যদি সত্যিই কলাগাছ হয়ে থাকে, তাহলে তিনি কেন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কলার চাষ করেন না! বেকার তরুণদের দেখিয়ে দেওয়া উচিত কীভাবে কলাগাছ বানাতে হয়!
দম ফেলারও সময় নেই
মানুষ সততই ব্যস্ত। কেউ সত্যিকার অর্থে আর কেউ বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে। ব্যস্ততা ও ব্যস্ততার রকম জনে জনে ভিন্ন। ফাঁকিবাজ অফিসার চিন্তা করে বসের আসার সময় হয়েছে এখন ব্যস্ততার ভান না করলেই নয়! আবার কেউ কেউ কোনো কাজই তো হয়নি, বসকে কী জবাব দেবে ভেবে ব্যস্ত হন। রোমিও টাইপ ছেলেরা ব্যস্ত থাকে স্কুল-কলেজের সামনে। মোদ্দা কথা, যার প্রাণ আছে তার ব্যস্ততাও আছে। সেটা কাজে হোক আর অকাজেই হোক; অর্থকরী কিংবা অনর্থকরীÑযাই হোক না কেন। কিন্তু ব্যস্ত মানুষের দম ফেলার সময় থাকবে না, এটা কি যুক্তিসংগত কথা? দম ছাড়া মানুষ বাঁচে কী করে? সবচেয়ে বড় বিষয়, মানুষকে তো স্বেচ্ছায়-স্বজ্ঞানে দম নিতে হয় না। ওটা ‘ডিফল্ট’। তাহলে দম নেওয়ার সময় কারও নেইÑ এটা কি সর্বৈব মিথ্যাচারিতা নয়!
এক ফোটা ঘুম
নানা কারণে মানুষ বিনিদ্র রাত যাপন করতে পারে। কেউ বিনিদ্র রাত কাটায় পরদিন পরীক্ষা, পরীক্ষার খাতায় কী লিখবে, কলম দিয়ে লিখবে নাকি পেন্সিল দিয়ে লিখবে এই চিন্তায়; প্রেমিক টাইপের ছেলেমেয়েরা মোবাইল ফোনে একে অন্যের সঙ্গে কুহু কুহু করে, আর নিরাপত্তা প্রহরীরা বাসা-বাড়ি ও অফিসের নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট হয়ে রাতের বেলায় থাকে। কবিরা রাত জেগে কবিতা লেখে, কাব্যদেবী নাকি রাতে বিহারে বের হন। কেউ যদি বলে কালরাতে আমার চোখে এক ফোটা ঘুম আসেনি, বা আমি এক ফোটাও ঘুমাইনি তখন কেমন লাগে? ঘুম কি তেল বা পানি, নিদেনপক্ষে ওষুধ? এটা ফোঁটা দিয়ে হিসাব করতে হবে? ঘুম পরিমাপযোগ্য কোনো বস্তু এই তত্ত্বের আবিষ্কারকইবা কে? মানুষের ঘুমের সঙ্গে ফোটা, ছটাক বা সেরের কোনো সম্পর্ক নেই। থাকতে পারেও না!

রম্য

কথায় আছে, বাস্তবে নেই!

 শফিক হাসান 
০৬ আগস্ট ২০২২, ০৫:০০ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

প্রতিদিন আমরা এমন কিছু কথা বলি, খুঁজলে যার বাস্তব কোনো ভিত্তি পাওয়া যাবে না। তাই বলে ‘অবাস্তব’ কথাগুলোকে কেউ ভুল হিসাবে আখ্যায়িতও করে না! দেখা যাক, আমরা কী বলিÑযা বাস্তবতা থেকে বহুদূরে অবস্থান করছে!

কানাকড়িও নেই
প্রচণ্ড অর্থ সংকটের অবস্থা বোঝাতে অনেকেই বলে থাকেন, পকেটে নাকি কানাকড়িটিও নেই! কানাকড়ি না থাকায় অর্থ সংকট যেন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি, কানাকড়ি থাকলেও সমস্যা দূর হত না? প্রথম কথা হচ্ছে, এখন কানাকড়ি পরের কথা, ভালো কড়িরও কোনো মূল্য নেই! মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে কড়ি পেরিয়ে টাকা ও ডলারের যুগে প্রবেশ করেছি আমরা অনেক আগেই। এখন টাকাও তেজপাতা হওয়ার পথে। সবচেয়ে বড় কথা, কানাকড়ি তো কানা, এই কড়ি থাকলেইবা লাভ কী? এটা কি চালানো যাবে! ন্যাতানো দুই টাকার নোট না হয় চলে, বিকল্প নেই বলে! তাই বলে কানাকড়ির প্রতিও মানুষ সহানুভূতি দেখাবে এমনটি ভাবা বোধহয় ঠিক না! এই নানামাত্রিক মুদ্রার যুগে আর কত কানাকড়ির গল্প শোনাবে আজব গল্পবাজরা!
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া
ঘোরতর বিপদে আমরা বলি, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে! কিন্তু আসলেই কি মানুষের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়তে পারে! একজন মানুষকে ‘শায়েস্তা’ করতে আকাশ কেন এতো বড় তৎপরতা চালাবে? তার চেয়ে স্বস্থানে বসে নির্দিষ্ট মানুষটির মাথায় একটি বাজ ফেললেই তো কেল্লাফতে! আর আকাশ যখন ভেঙে পড়বে, তা নিশ্চয়ই শুধু একজনের মাথায় পড়বে না, পৃথিবীর সব মানুষই আকাশের ছোঁয়া পাবে! কেউ নিশ্চয়ই এই দাবি করবে না, তার মাথা আকাশ-সমানÑদৈর্ঘ্য ও প্রস্থে। সুতরাং মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার গল্পটি মোটেও সত্য নয়। গাছের নিচ দিয়ে হাঁটার সময় শুকনো ডাল ভেঙে মাথায় পড়তে পারে, কাক তার অব্যর্থ প্র্যাকটিস চালাতে পারে, দুষ্টু গোছের ছেলেরা দুই একটা ঢিল ছুড়তে পারে, বৃষ্টিদিনে ছাতাহীন অবস্থায় বের হলে পানি পড়তে পারেÑ এসবই মাথায় পড়া সম্ভব! কিন্তু আকাশ ভেঙে পড়বে, আকাশের কী এমন দায়; ক্ষুদ্র একজন মানুষকে ‘মহিমান্বিত’ করতে তার ওপর নিজের সব শরীর চাপিয়ে দিতে!
আঙুল ফুলে কলাগাছ
সহজেই যারা অর্থবিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী হয়ে যায়, তাদের আমরা বলিÑআঙুল ফুলে কলাগাছ। টাকাটা বৈধ পথে আসুক কিংবা অবৈধ পথে। যুক্তিবাদীরা বলবেন, কলাগাছের সঙ্গে থোড়ের সম্পর্ক থাকতে পারে, কলা কিংবা ডাঁটির (যে অংশ তরকারি হিসাবে ব্যবহƒত হয়) সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু টাকা আসবে কোত্থেকে, কেনইবা আসবে? আর আঙুল ফুলে কলাগাছÑকথাটা শুনতেও কেমন! আঙুল ফুলে ঢোল হতে পারে কিন্তু কলাগাছ? মাটি ছাড়া গাছ হয় নাÑএই তত্ত্বটুকু দিতে উদ্ভিদবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই। তো যেখানে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক নেই সেখানে কীভাবে গাছ জš§াবে! বনসাইয়েরও তো একটা বাহন থাকে! কারও আঙুল ফুলে যদি সত্যিই কলাগাছ হয়ে থাকে, তাহলে তিনি কেন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কলার চাষ করেন না! বেকার তরুণদের দেখিয়ে দেওয়া উচিত কীভাবে কলাগাছ বানাতে হয়!
দম ফেলারও সময় নেই
মানুষ সততই ব্যস্ত। কেউ সত্যিকার অর্থে আর কেউ বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে। ব্যস্ততা ও ব্যস্ততার রকম জনে জনে ভিন্ন। ফাঁকিবাজ অফিসার চিন্তা করে বসের আসার সময় হয়েছে এখন ব্যস্ততার ভান না করলেই নয়! আবার কেউ কেউ কোনো কাজই তো হয়নি, বসকে কী জবাব দেবে ভেবে ব্যস্ত হন। রোমিও টাইপ ছেলেরা ব্যস্ত থাকে স্কুল-কলেজের সামনে। মোদ্দা কথা, যার প্রাণ আছে তার ব্যস্ততাও আছে। সেটা কাজে হোক আর অকাজেই হোক; অর্থকরী কিংবা অনর্থকরীÑযাই হোক না কেন। কিন্তু ব্যস্ত মানুষের দম ফেলার সময় থাকবে না, এটা কি যুক্তিসংগত কথা? দম ছাড়া মানুষ বাঁচে কী করে? সবচেয়ে বড় বিষয়, মানুষকে তো স্বেচ্ছায়-স্বজ্ঞানে দম নিতে হয় না। ওটা ‘ডিফল্ট’। তাহলে দম নেওয়ার সময় কারও নেইÑ এটা কি সর্বৈব মিথ্যাচারিতা নয়!
এক ফোটা ঘুম
নানা কারণে মানুষ বিনিদ্র রাত যাপন করতে পারে। কেউ বিনিদ্র রাত কাটায় পরদিন পরীক্ষা, পরীক্ষার খাতায় কী লিখবে, কলম দিয়ে লিখবে নাকি পেন্সিল দিয়ে লিখবে এই চিন্তায়; প্রেমিক টাইপের ছেলেমেয়েরা মোবাইল ফোনে একে অন্যের সঙ্গে কুহু কুহু করে, আর নিরাপত্তা প্রহরীরা বাসা-বাড়ি ও অফিসের নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট হয়ে রাতের বেলায় থাকে। কবিরা রাত জেগে কবিতা লেখে, কাব্যদেবী নাকি রাতে বিহারে বের হন। কেউ যদি বলে কালরাতে আমার চোখে এক ফোটা ঘুম আসেনি, বা আমি এক ফোটাও ঘুমাইনি তখন কেমন লাগে? ঘুম কি তেল বা পানি, নিদেনপক্ষে ওষুধ? এটা ফোঁটা দিয়ে হিসাব করতে হবে? ঘুম পরিমাপযোগ্য কোনো বস্তু এই তত্ত্বের আবিষ্কারকইবা কে? মানুষের ঘুমের সঙ্গে ফোটা, ছটাক বা সেরের কোনো সম্পর্ক নেই। থাকতে পারেও না!

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন