অ্যামচেমের বাজেট-পরবর্তী আলোচনা
বাজেট অন্তর্ভুক্তিমূলক তবে রাজস্বের লক্ষ্য অবাস্তব
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জনমুখী, উন্নয়নমুখী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। স্থানীয় শিল্প বিনিয়োগ সুরক্ষায় করছাড় ও ব্যবসা সহজীকরণে ডিরেগুলেশন উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে রাজস্ব আয়ের অবাস্তব ও অতি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কাগজে-কলমে প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে লক্ষ্য পূরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৫০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, যা অসম্ভব। এতে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে, তাও বাস্তবভিত্তিক নয়।
সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী আলোচনা সভায় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা এসব কথা বলেন। অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামালের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, ফরেন ইনভেস্টর চেম্বারের সাবেক সভাপতি নাসের এজাজ বিজয়, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান খান চৌধুরী। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ।
মূল প্রবন্ধে ড. মাশরুর রিয়াজ বলেন, বাজেটের দর্শন জনমুখী ও ব্যবসাবান্ধব। এটি একটি ‘উচ্চাভিলাষী’ সঠিক নির্দেশনার বাজেট। এ বাজেট অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও রূপান্তরে সক্ষম। এতে ব্যবসা ও জনগণের কর কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ (ডিরেগুলেশন) করা হয়েছে। শিল্পের লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা আছে। কিন্তু এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর। প্রশাসনিক কাঠামো এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তিনি বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, এডিপি বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার মতো সামষ্টিক অর্থনীতির বিদ্যমান সংকটগুলোর সুনির্দিষ্ট সমাধান না থাকায় বাজেট শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তবায়ন করা যাবে, তা নিয়েই বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ফরেন ইনভেস্টর চেম্বারের সাবেক সভাপতি নাসের এজাজ বিজয় বলেন, সরকার বাজেটে উচ্চমানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, যা অনেক বেশি উন্নয়নমুখী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। তবে এটি খুবই উচ্চাভিলাষী। বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রকৃত অর্থে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এটা কীভাবে এবং কোথা থেকে আসবে? এই বাজেট নথিতে সেই বিষয়টি অনুপস্থিত। তাই রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংকের দিকে নজর দিতে হবে, যে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে।
তিনি আরও বলেন, বিপুলসংখ্যক ব্যাংক সচল নেই। বাজারে তারল্য পরিস্থিতি ভালো নয়। এ অবস্থায় সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাজেট বাস্তবায়ন করবে এবং এই মেকানিজমে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে-এমনটা স্ববিরোধী। বাজেট বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। শেষ পর্যন্ত যা ঘটবে তা হলো-মূল্যস্ফীতি কমার পরিবর্তে আরও বেড়ে যাবে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত ৪ বছর যাবৎ উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকায় এটি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি করা হয়েছে। অন্যদিকে নতুন সরকারের বাজেটে সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতি গ্রহণ করেছে। এই দুটির মধ্যে সমন্বয় করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তাই এই বাজেটে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরবে কি না বা বাজেটটি আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারবে কি না, তা মূলত অর্থবছরের শেষের দিকেই বোঝা যাবে।
তিনি বলেন, সরকারকে এমন জায়গায় ব্যয় করতে হবে যা উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, খাদ্য সরবরাহ সচল রাখে, কৃষি উৎপাদন, পরিবহণ, লজিস্টিকস সুবিধা, জ্বালানি ও আইটি খাতকে সহায়তা করে। এর ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে, যাতে ১ টাকা ব্যয় করলে বিপরীতে ১০ টাকা ফেরত আসে। তবেই মানুষের হাতে টাকা থাকবে এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার হবে। আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে এটাই হওয়া উচিত মূল কৌশল।
ড. ফাহমিদা বলেন, যেহেতু এই সরকার জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে এসেছে, তাই তাদের উচিত প্রথম বছর থেকেই অপ্রিয় সংস্কারগুলো শুরু করা। তা না হলে তৃতীয়, চতুর্থ বা পঞ্চম বছরে গিয়ে তারা পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে এবং তখন আর কোনো অপ্রিয় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।
অ্যামচেমের নতুন সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, এই বাজেটে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত আছে। যেমন-মুনাফা বা লভ্যাংশ নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা, রপ্তানিমুখী শিল্প, শিল্পের কর অবকাশ, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের আয়কর বিষয়ে কিছু ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। আশা করি এটি যেন কেবল আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়। এর পাশাপাশি নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা দরকার।
