অন্যমত
বাজেট বাস্তবায়ন : কিছু পরামর্শ
আবু আহমেদ
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনীতিতে লুটপাট হয়েছে। কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি এখন সাড়ে ৩ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছুঁইছুঁই করছে, বলতে গেলে আর্থিক খাতের ভিত পুরোপুরি ধসে পড়েছে। দেশে এখন একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি বিরাজমান। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এ বাজেট আমার কাছে আশাব্যঞ্জকই মনে হয়েছে। বাজেট প্রায় সব খাতকেই স্পর্শ করেছে। তবে এবারের বাজেটে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে। সেটা হচ্ছে, সমাজকল্যাণ বা সোশ্যাল সেফটি নেটের জন্য বিরাট অঙ্কের টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এগুলোর অধীনে রয়েছে কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ইত্যাদি। এর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য, জুলাই শহীদদের জন্য ভাতাও রয়েছে।
বাজেটের আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, সেটা হচ্ছে, ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। এটা অর্জন করতে পারলে ভালো। তবে এটা অর্জন করতে হলে বেসরকারি খাতকে প্রাইভেট সেক্টরকে এগিয়ে আসতে হবে। বেসরকারি খাত বলতে গেলে এখন ঘুমিয়ে আছে। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি খাতের এখন ক্রেডিট ডিমান্ড নেই বললেই চলে। ফলে এ খাতে বিনিয়োগ খুব একটা হচ্ছে না। শুধু সরকারি ব্যয় দিয়ে তো ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যাবে না। তারপরও আমি আশাবাদী, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশের জায়গায় যদি ৫.৫ শতাংশও অর্জন করতে পারে, তাহলে সেটাও হবে বড় ধরনের অর্জন।
আরেকটি বিষয় নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত; সেটা হলো, রাজস্ব আয়ের বেশির ভাগই চলে যায় সরকারের পরিচালনাগত ব্যয় মেটাতে। মোট রাজস্ব আয় অর্থাৎ সরকারি আয় থেকে ৭২ শতাংশ চলে যায় সরকারের পরিচালনাগত ব্যয় বাবদ। এত বিশাল পরিমাণ টাকা যদি সরকারের পরিচালনাগত ব্যয়েই চলে যায়, তাহলে উন্নয়ন বাজেটের জন্য থাকে খুবই সামান্য। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী একটি ঘোষণা দিয়েছেন। সেটা হলো, চলতি অর্থবছরে সরকারের পরিচালনাগত ব্যয়কে ৭২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪.৮ শতাংশে নামিয়ে আনা। তার এ ঘোষণাকে আমি সাধুবাদ জানাই। এটা করতে পারলে সরকারের উন্নয়ন বাজেটে কিছুটা যোগ হবে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, সেটা দুরূহ হবে। কারণ, সরকারের আকার না কমিয়ে, অর্থাৎ এত বিভাগ, মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, এত জাতীয়করণকৃত বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, ইবতেদায়ি-এগুলো না কমিয়ে এটা কীভাবে সম্ভব হবে, আমার বুঝে আসে না। এ পরিচালনাগত ব্যয়কে যদি ৭২ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশেও কমিয়ে আনা যায়, তবুও সেটা হবে বিরাট অর্জন। তার এ উদ্দেশ্যটি সঠিক। আমরা সব সময় বলে আসছি, সরকারের আকার ছোট করা উচিত। তাতে সরকারের পরিচালনাগত ব্যয় কমবে এবং উন্নয়ন বাজেটের জন্য বেশি অর্থ পাওয়া যাবে। উন্নয়ন বাজেট এবং ঘাটতি বাজেট প্রায় ফিফটি-ফিফটি অবস্থানে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৫৪ শতাংশ আর বহির্বিশ্ব থেকে ৪৬ শতাংশ অর্থ সংগ্রহের একটি অনুপাত রয়েছে। অর্থাৎ সরকার ঘাটতি বাজেট পূরণের জন্য এ অনুপাতে দেশের আয়ের উৎস থেকে এবং দেশের বাইরে থেকে ধার করবে। একটা প্রশ্ন আছে, বৈদেশিক উৎস থেকে চাহিদামাফিক অর্থ পাওয়া যাবে কিনা। কেননা গত বছর জুনের শেষে সরকার বৈদেশিক উৎস থেকে যে পরিমাণ অর্থ প্রত্যাশা করেছিল, সে পরিমাণ অর্থ পাওয়া যায়নি। সামনে যদি ওই অনুপাতে প্রাক্কলিত অর্থ না পাওয়া যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর আবার একটা বাড়তি চাপ পড়বে।
আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। সেটা হলো, অতীতের ঋণের কারণে সরকারকে সুদ দেওয়ার পেছনে বিশাল অঙ্ক ব্যয় করতে হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারের আয়ের বিশাল একটা অংশ এ সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ফলে ঘাটতি বাজেটের পাল্লা আরও ভারী হচ্ছে। ঘাটতি বাজেট কিছুটা কম হতে পারে, যদি সরকার অভ্যন্তরীণ সম্পদ মোবিলাইজেশন করতে পারে। শুধু করের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। কারণ কর ব্যবস্থারও একটা সীমা আছে। তাছাড়া বর্তমান অর্থনীতি যেহেতু অতটা বেগবান নয়, তাই এখান থেকে অত বেশি প্রত্যাশা করাও সমীচিন হবে না। সুতরাং কর ব্যবস্থা থেকে সরকারের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, সে লক্ষ্যমাত্রা আশানুরূপ মাত্রা যোগ করতে পারবে না। সরকার যেটা করতে পারে, আশা করি হয়তো করবে, সেটা হলো, সরকারের অনেক অ্যাসেটস রয়েছে, যেগুলো নন পারফর্মিং অ্যাসেটস। মানে যেগুলো থেকে সরকারের কোনো আয় আসছে না। এ ধরনের অ্যাসেটসগুলো বিক্রি করে দেওয়া উচিত বলে মনে করি। আর যেসব সম্পদ থেকে আয় আসছে, সেগুলো ডাইরেক্ট লিস্টের মাধ্যমে ক্যাপিটাল মার্কেটে বা শেয়ারবাজারে বিক্রি করে দিতে পারে। প্রকল্প অর্থায়নের জন্য বড় প্রকল্পগুলো বন্ড বা সুকুক আকারে জনগণের মাঝে বিক্রি করে দেওয়া যেতে পারে। যেমন-ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ১০ লেন করা প্রকল্পকে পিপিপি বা প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপে করা যেতে পারে। এগুলো ছাড়া সরকারের অর্থের জোগাড় কোত্থেকে হবে, জানি না। সুতরাং, বিকল্প উৎসের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। সরকারের অ্যাসেটগুলোকে সিকিউরিটাইজেশন করা যায়। অর্থাৎ সরকারের যেসব অ্যাসেটে ক্যাশ ফ্লো আছে, সেগুলোকে সিকিউরিটাইজেশন করতে হবে। যেমন-পদ্মা সেতু, যমুনা সেতু, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর-এগুলো সিকিউরিটাইজেশন করে মানুষের কাছে বন্ড অথবা সুকুক আকারে বিক্রি করে দিতে পারে সরকার। তাহলে সরকারের হাতে অনেক অর্থ চলে আসবে। তখন এ অর্থ দিয়ে সরকার ঘাটতি বাজেট মোকাবিলা করতে পারবে। উন্নয়ন বাজেটেও একটা গতি আসবে। বিগত বছরগুলোতে ঘাটতি বাজেট যে বিশাল আকার ধারণ করত, সেটা হয়তো আর থাকবে না। অবশ্য এ বছর ঘাটতি বাজেট জিডিপির ৪ শতাংশের নিচে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এটা অবশ্যই একটা ভালো দিক। একটা পর্যায়ে আমরা জিডিপির ৪ শতাংশ অতিক্রম করে গিয়েছিলাম, যেটা আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের জন্য একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সুতরাং ঘাটতি বাজেটকে ৪ শতাংশ নিচে নামিয়ে আনা অবশ্যই একটা ভালো দিক। সবকিছু মিলিয়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনা এখন আমাদের জন্য দুরূহ ব্যাপার।
অর্থনীতির সার্বিক বিষয়গুলো মাথায় নিয়ে সরকারকে এ ব্যাপারে লিড নিতে হবে আপাতত। অন্তত একটা বছর সরকারকে লিড নিতে হবে। সরকার ঘুমিয়ে থাকলে, মানে উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকার যদি চুপ থাকে, তাহলে বেসরকারি খাত এগিয়ে আসবে না। বেসরকারি খাত এগিয়ে না এলে অর্থনীতিতে গতি আসবে না। তখন আমরা জিডিপির একই আবর্তে চলতে থাকব। অর্থাৎ জিডিপি সাড়ে তিন শতাংশ প্রবৃদ্ধি হারের মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকবে। তখন দেশে কর্মসংস্থান তৈরি হবে না, বেকার সমস্যা বাড়বে। ফলে আমাদের অর্থনৈতিক যে দৈন্য রয়েছে, তা থেকে আমরা বেরোতে পারব না। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আরও নিম্নগামী হবে।
দেশের কলকারখানা যেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলোকে আবার চালু করার জন্য সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। কলকারখানাগুলো চালু হলে এবং উৎপাদন ব্যবস্থা সচল থাকলে রপ্তানি বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে। বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে যোগ হবে। সুতরাং সরকারের উদ্দেশ্য আশাব্যঞ্জক। তবে সরকার সব ক্ষেত্রে সবাইকে যদি ঢালাওভাবে টাকা দিতে থাকে, তাহলে দুর্নীতি হবে এবং জনগণের টাকার অপব্যবহার হবে।
৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ক্যাপিটালাইজেশনের জন্য রাখা হয়েছে। এটা ঠিক আছে। কারণ খাদের কিনারে থাকা ব্যাংক ব্যবস্থাকে টেনে তুলতে হলে এর প্রয়োজন আছে। কিন্তু সরকারকে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, এগুলো যেহেতু জনগণের অর্থ, তাই এ টাকার যেন কোনো ধরনের অপচয় না হয়। চোরেরা বা ব্যাংক ডাকাতরা যেন ব্যাংক ডাকাতি করে নিয়ে যেতে না পারে। এসব দেশীয় লুটেরা যে পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার করেছে, তার খেসারত জনগণকেই দিতে হচ্ছে। জনগণের জন্য এটা একটা বড় দুঃখের বিষয়। এসবের যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সে ব্যাপারে সরকারের সজাগ দৃষ্টি থাকা উচিত। সুতরাং, সার্বিক বিষয়গুলো মাথায় রেখে অত্যন্ত বিজ্ঞতার সঙ্গেই আমাদের এগোতে হবে। (অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার)
আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি
