ঢাবি ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ

  ঢাবি প্রতিনিধি ১২ অক্টোবর ২০১৮, ২১:১৪ | অনলাইন সংস্করণ

ঢাবি ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ
ফাইল ছবি

টানা তৃতীয়বারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ‘ঘ’ ইউনিটে সম্মান প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষা শুরুর আগেই হাতে লিখিত প্রশ্ন ভর্তিচ্ছুদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ আসছে এবার। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ৫০টি ও ক্যাম্পাসের বাইরে ৩১টি স্কুল-কলেজসহ মোট ৮১টি কেন্দ্রে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে পরীক্ষার আগে বেলা ৯টা ১৭ মিনিটে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাওয়া গেছে। নগদ অর্থের বিনিময়ে একটি চক্র ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারে উত্তর লেখাসংবলিত প্রশ্ন সরবরাহ করে। বেলা ১১টায় পরীক্ষা শেষ হলে হাতে লেখা ওই উত্তরপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, সেখানে বাংলা অংশে ১৯টি, ইংরেজি অংশে ১৭টি, সাধারণ জ্ঞান অংশে ৩৬টিসহ (বাংলাদেশ বিষয়াবলি ১৬ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি ২০) মোট ৭২টি প্রশ্নের হুবহু মিল রয়েছে। ‘ঘ’ ইউনিটে বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞান এ তিনটি বিষয়ে মোট ১০০টি প্রশ্ন থাকে।

এদিকে বেলা সোয়া ১০টার দিকে ১৪টি পৃথক কাগজে হাতে লেখা প্রশ্নপত্রের উত্তরসংবলিত কপি নিয়ে প্রক্টর অফিসে যান গণমাধ্যম কর্মীরা। সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর সোহেল রানাকে এ বিষয়ে অবগত করলে তিনি জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে হাতে প্রশ্ন না পাওয়ায় গণমাধ্যম কর্মীরা তখনো ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। পরে পরীক্ষা শেষ হলে হাতে লেখা উত্তরপত্রের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্ন মিলিয়ে দেখা যায়, সেখানে ৭২টি প্রশ্নের মিল রয়েছে।

এদিকে প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, আমরা কোনো নির্ভরশীল সূত্র থেকে প্রশ্নফাঁসের তথ্য নিশ্চিত হতে পারিনি। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছি। প্রশ্নফাঁসের কোনো সুযোগ নেই। তবে যে বিষয়টি বলা হচ্ছে সেটি প্রশ্নফাঁস নয়, ডিজিটাল জালিয়াতি।

প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি প্রমাণিত হলে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটি পরের বিষয়।

অন্যদিকে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন-উত্তর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব প্রশ্ন একই ব্যক্তির হাতে লেখা। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের বক্তব্য অনুযায়ী ১০টায় পরীক্ষা শুরুর পর যদি প্রশ্নপত্র বের হয়ে থাকে তাহলে মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে তা উত্তরসহ লিখে প্রস্তুত করা কীভাবে সম্ভব?

প্রক্টরের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জালিয়াতচক্র এখানে যৌথভাবে কাজ করে, তাদের পক্ষে সম্ভব অল্প সময়ের মধ্যে পুরো ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এগুলো ছড়িয়ে দেয়া।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পরীক্ষা শুরুর পূর্বে জানানো হয়, পরীক্ষাটি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন বা টেলিযোগাযোগ করা যায় এরূপ কোন ইলেকট্রনিক ডিভাইস/যন্ত্র সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব ডিভাইস নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষার হল থেকে যদি প্রশ্ন বের হয় তাহলে এক্ষেত্রে প্রশাসনের ব্যর্থতা আছে কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রক্টর বলেন, ‘এটা সফলতা ব্যর্থতার কথা না। আমরা পুরো বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখব। যদি কারো বিরুদ্ধে এ রকমের কোনো কর্মকাণ্ডের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এই বিষয়ে নিজ কার্যালয়ে ‘ঘ’ ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়কারী ও সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, ‘আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। আমরা যতটুকু জানি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে শেষ হয়েছে। আপনারা (সাংবাদিক) অভিযোগগুলো প্রক্টরিয়াল টিমকে দিয়েছেন। সেটা তারা যাচাই-বাছাই করে দেখবেন। শিক্ষকদের সহযোগিতায় সর্বোচ্চ নজরদারিতে পরীক্ষা নেয়া হয়।’ ফাঁস হওয়া প্রশ্নসমূহ হাতে লেখা। সেখানে হুবহু মিল পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাইরের কেন্দ্রগুলোতে পরীক্ষা নেয়া হয়। সেখানে যদি কোনো শিক্ষক-কর্মকর্তারা বাইরে গিয়ে ছবি তুলে পাঠিয়ে দেন সেটা কিছুটা। তবে সর্বোচ্চ নজরদারির মধ্যে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।’

এ সময় তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন নৈতিক দায়িত্ব রেজাল্ট তৈরি করা, আমরা সে দিকে এগোচ্ছি।’

এদিকে এর আগে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষার শুরুর প্রায় ৪২ মিনিট বা তারও আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ আসে। তার পরের বছর ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে একই ইউনিটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছিল। পরীক্ষা শুরুর আগের রাতে ইংরেজি প্রশ্নের ২৪টা প্রশ্নফাঁস হওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে এ দুটি ঘটনাতেই পরীক্ষা পুনরায় গ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থেকেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তখনও তারা এটাকে ডিজিটাল জালিয়াতি বলে উল্লেখ করেছিল।

এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনায় ‘ঘ’ ইউনিটের পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানিয়েছে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। এ দাবিতে তারা শুক্রবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনের সামনে বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা পরীক্ষা বাতিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়।

এ বিষয়ে সংগঠনটির ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক রাজিব দাস যুগান্তরকে বলেন, গত বছর যখন একই ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয়, তখনও প্রশাসন এটিকে অস্বীকার করেছিলে। পরে প্রমাণিত হয়েছে, সেটি প্রশাসনের মিথ্যাচার ছিল। আমরা চাই না এবারও তেমন হোক। একটি তদন্ত কমিটির গঠনের মাধ্যমে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এ ঘটনার বিস্তারিত আমরা জানতে চাই। পাশাপাশি যদি পরীক্ষা বাতিল না হয়, তাহলে আগামীতে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচি পালনে বাধ্য হব।

এদিকে পরীক্ষা চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান ভর্তি পরীক্ষার বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দীন, সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও ‘ঘ’ ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়কারী অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী তার সঙ্গে ছিলেন।

উল্লেখ্য, এ বছর ঘ-ইউনিটে ১ হাজার ৬১৫টি (বিজ্ঞানে- ১১৫২টি, বিজনেস স্টাডিজে- ৪১০, মানবিকে- ৫৩টি) আসনের বিপরীতে মোট ৯৫ হাজার ৩৪১ জন ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরের ৮১টি কেন্দ্রে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×