বই নয়, ব্যাট-বল নিয়ে ক্যাম্পাসে হাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা

  দিনাজপুর প্রতিনিধি ১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:২৯ | অনলাইন সংস্করণ

ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ, তাই ক্রিকেট খেলে সময় পার করছেন শিক্ষার্থীরা
ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ, তাই ক্রিকেট খেলে সময় পার করছেন শিক্ষার্থীরা

‘বাবা-মা তাদের কষ্টার্জিত উপার্জন দিয়ে আমাদের লেখাপড়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছে-কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে সংকটাবস্থার জন্য দীর্ঘদিন থেকে আমাদের ক্লাস ও পরীক্ষা হচ্ছে না। যে সময়ে আমাদের পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকার কথা। বই হাতে নিয়ে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকার কথা। কিন্তু শিক্ষকরা আন্দোলন করায় এবং প্রশাসনও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম একপ্রকার অচল হয়ে পড়েছে।’

‘আমরা বসে বসে অলস সময় পার করছি। ক্লাস ও পরীক্ষার জন্য আন্দোলন করেও কোনো ফল হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের তীর্থস্থান এই ক্যাম্পাসে বই-খাতার বদলে ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে নেমেছি। ক্লাস ও পরীক্ষা না হওয়ায় ক্রিকেট খেলে সময় পার করছি। কী করব-এ ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’

দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) প্রশাসনিক ভবনের সামনের ক্যাম্পাসে ক্রিকেট ব্যাট হাতে নিয়ে এমন কথা জানাচ্ছিলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ অনুষদের লেভেল-৪, সেমিস্টার-২ এর শিক্ষার্থী আলমগীর হোসেন আকাশ।

টানা দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ক্লাস ও পরীক্ষা না হওয়ায় শিক্ষাজীবন নিয়ে চরম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আলমগীর হোসেন আকাশ জানায়, ক্লাস ও পরীক্ষার দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরে আন্দোলন করে আসছি। প্রশাসন এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না। তাই প্রতীকী আন্দোলন কর্মসূচি হিসেবে হাবিপ্রবির প্রশাসনিক ভবনের সামনের ক্যাম্পাসে মঙ্গলবার তারা ক্রিকেট খেলার আয়োজন করে।

তিনি জানান, এটি কোনো টুর্নামেন্ট নয়, বা মনের আনন্দে তারা এই খেলা খেলছে না। শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হওয়ায় মনের কষ্টে প্রতীকী আন্দোলন হিসেবেই তাদের এই ক্রিকেট খেলা।

একই রকম কথা জানান ক্রিকেট খেলায় অংশ নেয়া হাবিপ্রবির ছাত্র রাকিবুল ইসলাম, আখতারুজ্জামান বাবু, আরিফ সরকারসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিন থেকে ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ায় সেশনজটের মধ্যে পড়ে শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হওয়ায় প্রশাসনকেই দায়ী করেন তারা।

এদিকে শিক্ষা কার্যক্রমে টানা দুই মাসের অচলাবস্থার অবসান হয়নি। ক্লাস-পরীক্ষা চালু করার কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত ছাড়াই মঙ্গলবার শেষ হয়েছে দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সভা।

মঙ্গলবার সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে একাডেমিক কাউন্সিলের সভা বসে। প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও চেয়ারম্যানরা উপস্থিত ছিলেন। দুপুর আড়াইটার দিকে ক্লাস-পরীক্ষা চালুর কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা শেষ হয়।

ক্লাস-পরীক্ষা চালুর ব্যাপারে আন্দোলনরত শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করার সুপারিশ করেছেন ডিন ও চেয়ারম্যানরা। আন্দোলরত শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে ক্লাস-পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অবস্থায় যাতে করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় সে জন্য ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরামের সহসম্পাদক প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬১ জন সহকারী শিক্ষকদের ঘটনাকে নিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলন চলছে। তাদের সঙ্গে প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরাম ও অন্যান্য শিক্ষকরাও একাত্মতা প্রকাশ করে আন্দোলন করছেন। সহকারী শিক্ষকদের সমস্যাটি সমাধান হলেই সবাই ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরে যাবে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে বলা হয়েছে, তিনি সহকারী শিক্ষকদের দাবিগুলোর ব্যাপারে তেমন উদ্যোগ গ্রহণ না করায় সংকট নিরসন হচ্ছে না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষকদের ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরে আসার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের বলা হয়েছে। কিন্তু একজন শিক্ষক লাঞ্ছিত হবে, নারী শিক্ষিকা শ্লীলতাহানির শিকার হবে আর সেটির বিচার না হয়ে আমরা চুপ থাকব এটি হতে পারে না। তাহলে শিক্ষকদের মান-সম্মান কোথায়? শিক্ষকদের দাবিগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেই ক্লাস-পরীক্ষা শুরু হবে এ জন্য কোনো শিক্ষককে বলতে হবে না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার প্রফেসর ড. সফিউল আলম বলেন, ‘ক্লাস-পরীক্ষা শুরু হোক দুই একজন ছাড়া এটিতে সবাই একমত। সহকারী শিক্ষকদের আন্দোলনের ব্যাপারে তাদের সঙ্গে উপাচার্য আলোচনা করবেন। তবে কখন আলোচনা হবে তা এখনও জানানো হয়নি। আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান হবে।

কবে নাগাদ সমস্যার সমাধান হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিচার মানি কিন্তু তালগাছটা আমার এমন মনোভাব সবার মধ্যে। এর জন্যই সমস্যাগুলোর সমাধান হচ্ছে না।’

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬১ জন সহকারী অধ্যাপক বেতন বৈষম্যের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর বিধান হালদারের কক্ষে যান। সেখানে তাদের ওপর হামলা হলে সেদিন থেকে বেতন বৈষম্য দূরীকরণ, সহকারী অধ্যাপকদের লাঞ্ছিত ও নারী শিক্ষিকাদের শ্লীলতাহানিকারীদের বিচার, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, রেজিস্ট্রার ও ছাত্র উপদেষ্টার বহিষ্কারের দাবিতে ক্লাশ-পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলন করছেন ৬১ জন সহকারী অধ্যাপক। তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরামও।

এতে করে গত ২ মাস ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আড়াই শতাধিক শিক্ষকের মধ্যে দেড় শতাধিক শিক্ষক আন্দোলনে থাকায় অধিকাংশ ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×