ইতিহাস কি এই প্রশাসনকে ক্ষমা করবে?

কোটা আন্দোলনের নেতা রাশেদ খানের আবেগঘন স্ট্যাটাস

  যুগান্তর ডেস্ক ২৮ মার্চ ২০১৯, ১৩:২০ | অনলাইন সংস্করণ

মুহাম্মদ রাশেদ খান
মুহাম্মদ রাশেদ খান। ছবি: সংগৃহীত

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ও ডাকসু নির্বাচনে জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী মুহাম্মদ রাশেদ খান সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

তার জীবনের নানাদিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির পরের জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বুধবার এ স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি।

তার দেয়া স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন- আমি তখন নবম শ্রেণিতে পড়ি। স্কুলের স্যারদের অনুরোধে আমি বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। অথচ আমি খুব বেশি ভালো ছাত্র ছিলাম না।

স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আছে, কিন্তু সেই স্কুলের কোনো শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতে চাই তো না৷ এ যেন শিক্ষকদের জন্য লজ্জার ব্যাপার।

শিক্ষকরা তাদের সম্মান বাঁচাতে কিছু শিক্ষার্থীকে কনভেন্স করে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করতেন। এখন সেই স্কুলের কী অবস্থা আমি বলতে পারব না। আমার সেশনে আমরা মাত্র দুজন বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। এর পর ইতিহাস...।

পারি না ইংরেজি ও ম্যাথ! আর এদিকে ফিজিকস, ক্যামেস্ট্রি, বায়োলজি, হাইয়ার ম্যাথ কোনটা রেখে কোনটা পড়ব?

শিক্ষকরা যেন মাথার ওপর পাহাড় সমান বোঝা চাপিয়ে দিলেন।

ইংরেজিতে অতিমাত্রায় দুর্বল ছিলাম। টেনস পর্যন্ত পারতাম না। ইংরেজি পড়তে শুরু করলাম স্কুলের এক শিক্ষকের কাছে। তিনি আমাকে টেনস শেখানো শুরু করলেন।

বললেন, টেনস ইংরেজির জননী। টেনস ভালো করে শেখো, ইংরেজি পানির মতো সহজ হয়ে যাবে। পরবর্তী সময় স্যারের কথায় সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল। আর এদিকে বিজ্ঞানের সাবজেক্টগুলো আরেকজন শিক্ষকের কাছে পড়া শুরু করলাম।

প্রথম প্রথম আমি কিছুই পারতাম না, বুঝতাম না। সব কিছু যেন মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল।

সব কিছু বাদ দিয়ে পড়ালেখা শুরু করলাম। শুরু বলতে চোখ-কান বন্ধ করে যতটা জোরে ক্রিকেট খেলায় নো বল করা যায়, ঠিক ততটাই জোরে।

মাসখানেক পর স্কুলের শিক্ষকের কাছে ইংরেজি পড়া বাদ দিয়ে শামীম স্যারের কাছে ইংরেজি পড়তে চলে গেলাম। শামীম স্যার আমাদের শহরে ইংরেজি পড়াতেন। তিনি ইবির ছাত্র ছিলেন৷ তার কাছে গিয়েই মূলত জীবনের অনেক কিছু বদলে গেল।

নবম শ্রেণি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা পর্যন্ত তার পরামর্শ নিয়েই চলেছি।

গ্রামের একটা রোগাপটকা ছেলের মধ্যে স্যার কি পেয়েছিলেন তা আমি জানি না! তিনি আমাকে একটু বেশিই ভালোবেসে ফেললেন।

নবম শ্রেণির মাঝামাঝি সময়ে স্যার একদিন আমাকে বললেন, তোর মতো ছেলেরাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়।

স্যারের সেই কথাটি আমার মনের মধ্যে গেঁথে গেল। এই একটি কথা আমার জীবনকে পরিবর্তন করে দিল।

দিনরাত পরিশ্রম করতে থাকলাম। একটা পর্যায়ে আমি সব কিছু বুঝতে শুরু করলাম। পড়ালেখাটা আমার কাছে সহজ লাগতে লাগল। আমি পড়তাম আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখতাম। এই একটি স্বপ্নই আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে সাহায্য করত।

স্বপ্ন একদিন সত্যি হয়। আমি স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাই৷ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পর গণরুম, গেস্টরুমের নির্যাতন ও জোরপূর্বক রাজনৈতিক প্রোগ্রামে নেয়ার কারণে আমার স্বপ্নগুলো ম্লান হতে থাকে।

গণরুম, গেস্টরুম সম্পর্কে বিশ্লেষণ করার কিছু নেই। এগুলো সবাই জানেন। আর ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে যে লোকগুলো দেখেন তার অধিকাংশই গণরুম ও হলের পোলাপান। হলে থাকার বিনিময়ে ১ম বর্ষ থেকে শুরু করে ৪র্থ বর্ষ পর্যন্ত গোলামি করা লাগে।

আজ আমি এসব কেন লিখছি?

এগুলো লেখার কারণ একটিই- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যে স্বপ্ন নিয়ে চান্স পাই, তার কতটুকু পূরণ হয়, স্বপ্নটা ধীরে ধীরে কীভাবে ম্লান হয়, তা বোঝাতেই এই লেখা৷

আমার আপনার স্বপ্ন ম্লান হওয়ার পেছনে আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যতীত কাউকে দায়ী করব না।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চোঁখের সামনে ও তাদের সহায়তায় দীর্ঘ ২৮ বছর শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হয়।

তার পরও এই শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের একটা সম্মান ও ভালোবাসা ছিল। আমরা মেনে নিয়েছিলাম- শিক্ষকরা অসহায়। তারা আমাদের জন্য কিছু করতে চাইলেও ক্ষমতাসীন দল ও তাদের ছাত্র সংগঠনের ভয়ে কিছু করতে পারে না৷

ধারণা একদম ভুল। শিক্ষকরা অসহায় না। তারা সবচেয়ে বড় অপরাধী। আজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অবস্থা কোনো রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করেনি।

শিক্ষকরা ক্ষমতা ভোগদখল ও ভাগ বণ্টন করার জন্যই এ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। ছাত্র সংসদ থাকলে তারা পছন্দের প্রার্থীকে চাকরি দিতে পারবে না, পছন্দের শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে না, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আয়েশি জীবনযাপন করতে পারবে না, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রভুর মতো আচরণ করতে পারবে না।

এসব কারণেই তারা ছাত্র সংসদের অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছিল।

তারা যে কি পরিমাণ নৈতিকভাবে স্খলিত হয়েছে, তার প্রমাণ তারা ডাকসু নির্বাচনে দেখিয়েছে। তারা ধরে নিয়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা ডাকসুর প্রতিনিধি হিসেবে এলে তারা যে পাপ ও অন্যায় করে, তা তারা করতে পারবে না।

সে কারণে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনকে জেতাতে তারা যা যা করা দরকার, তার সব কিছু করেছে।

তারা প্রার্থীদের এজেন্ট রাখেনি, তারা ভোট দেয়ার পর ভোটারদের হাতে কালি দেয়নি। যে কারণে ১ম ও ২য় বর্ষের শিক্ষার্থীদের দ্বারা পুনরায় কৃত্রিম লাইন সৃষ্টি করা হয়েছে।

তারা হলে হলে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভোটের রেজাল্ট প্রকাশ করেনি, তারা ভোটের স্থানে/বুথে সাংবাদিকদের প্রবেশ ও লাইভ নিষিদ্ধ করেছে।

সাংবাদিকদের সামনে ভোট গণনা করেনি। তারা ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হাতে ভোটার লাইন তদারকির দায়িত্ব দিয়েছিল। তারা ভোর ৫টা থেকে হলে হলে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের লোক দিয়ে দীর্ঘলাইন সৃষ্টি করে রাখতে সহায়তা করেছিল, যাতে করে অনাবাসিক ও অন্য শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে না পারে।

এক কথায়, প্রশাসন ও শিক্ষকরা ভোট ডাকাত ও চোরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল।

এ সকল ভোট ডাকাত ও চোর শিক্ষকের কাছ থেকে আমাদের কিছুই শেখার নেই। তারা নৈতিকভাবে পরাজিত ও স্খলিত। কথায় আছে- দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য।

এই শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের কাছে পরিত্যাজ্য। তারা শিক্ষক হয়ে শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার হরণ করেছে। এসব শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে?

আমি মনে করি, তাদের কাছ থেকে ন্যূনতম জ্ঞানলাভ করার আগে বিষপানে মরা উচিত৷ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যে গৌরব, অহংকার ছিল; তা ম্লান করে দিয়েছে ২০১৯ সালের প্রশাসন।

কীসের স্বপ্ন দেখতাম?

আমার স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়?

না। আর কোনো শিক্ষার্থী এই স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেবে না। হয়তো পড়ার জন্য পড়া, সেটি ভেবে ভর্তি পরীক্ষা দেবে, আমার মতো স্বপ্ন নিয়ে আর কেউ পরীক্ষা দেবে না।

শিক্ষার্থীদের এই স্বপ্ন হত্যা করেছে ভিসি আখতারুজ্জামান প্রশাসন।।

ইতিহাস কি এই প্রশাসনকে ক্ষমা করবে?

ঘটনাপ্রবাহ : ডাকসু নির্বাচন

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর
-

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×