আমরণ অনশনে ইবি শিক্ষার্থীরা, গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যার হুমকি

  ইবি প্রতিনিধি ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৩০ | অনলাইন সংস্করণ

অনশনে অসুস্থ শিক্শার্থীতকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে
অনশনে অসুস্থ শিক্শার্থীতকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে

ভিন্ন-ভিন্ন দাবিতে আমরণ অনশন, ডিন কক্ষে তালা, অবস্থান কর্মসূচি, প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলন করেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

বর্ধিত বেতন, পরিবহন, হল, সেশন ও ভর্তি ফিসহ বিভিন্ন খাতে ফি কমানোর দাবিতে আন্দোলন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান, বিক্ষোভ এবং অনশন কর্মসূচি পালন করেন।

একই সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির দাবিতে আমরণ অনশন পালন করছেন প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের প্রায় পাঁচ শাতাধিক শিক্ষার্থী।

সাড়ে ৭ ঘণ্টা অন্দোলনের পর বিশ্ববিদ্যারয় প্রশাসনের আশ্বাসে ফি কমানোর দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আন্দোলন স্থগিত করে। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির দাবিতে শিক্ষার্থীরা অন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন। দাবি না আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিযে যাবেন বলে জানা গেছে।

এ পর্যন্ত ছাত্রীসহ ৯ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, এক ধাপে ভর্তি ফিসহ বিভিন্ন খাতে ফি ৪ গুণ বৃদ্ধিতে বর্ধিত ফি কমানোর দাবিতে মঙ্গলবার ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে আন্দোলনে নামে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। সাড়ে ৯টার দিকে আন্দোলনকারীরা ডাইনা চত্বর থেকে মিছিল বের করে। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে ১০টার দিকে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নেয়।

এ সময় তারা ভবনের কলাপসিবল গেট অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। এ সময় তারা ‘বাবার রক্ত যদি সেই চুষতে হবে, প্রাইভেট না হয়ে পাবলিক কেন তবে?’, ‘ছাত্রের টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন নয়’, ‘হৈ হৈ রৈ রৈ এত টাকা গেল কই?’, ‘এক দফা এক দাবি বেতন ফি কমাতে হবে’- এসব স্লোগান দিতে থাকে।

আন্দোলনের একপর্যায়ে ছাত্র উপদেষ্টা প্রফেসর ড. পরেশ চন্দ্র বর্ম্মণ ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য এবং সাবেক প্রক্টর প্রফেসর মাহবুবর রহমান ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান তারা।

একপর্যায়ে ২ জন শিক্ষার্থী গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে শিক্ষার্থীরা ছাত্র উপদেষ্টার হাতে ম্যাচ তুলে দিতে গেলে তিনি সেখান থেকে চলে যান। এরপর আন্দোলন আরও জোরদার হতে থাকে। এর পরপরই দাবি আদায়ে অনশন শুরু করে চার শিক্ষার্থী।

এ সময় আন্দোলনকারী এক ছাত্রী জ্ঞান হারায়। পরে অবস্থা গুরুতর দেখে তাকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়।

প্রায় ৩ ঘণ্টা অবস্থান শেষে দুপুর ১টার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক অবরোধ করে আন্দোলনকারীরা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষার্থী বহনকারী কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ ও শৈলকূপা রুটের দুপুর ২টার শিফটের গাড়ি ক্যাম্পাস অভ্যন্তরে আটকা পড়ে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. আনিচুর রহমান আন্দোলনকারীদের ১০ জন প্রতিনিধিকে ভিসির সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিলে প্রত্যাখান করে তারা। বিকাল সাড়ে ৩টায় শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. কামাল উদ্দীন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি ভিসি প্রফেসর ড. রাশিদ আসকারীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে বুধবার বেলা ১১টায় ভিসির স্যারের উপস্থিতিতে ডিন, বিভাগীয় সভাপতি ও প্রভোস্টদের নিয়ে এ ব্যাপারে আলোচনা হবে বলে জানান। এমন আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে ৪টার দিকে আন্দোলন স্থগিত করেন।

এ দিকে মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব ম্যুরালের সামনে অনশনে অংশগ্রহণকারী চারজন শিক্ষার্থীই অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদেরকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে পাঠানো হয়।

জানা যায়, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে ভর্তি ফিসহ অন্যান্য ফি ৪ গুণ বৃদ্ধি করে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার করা হয়। এখন প্রতি বছর সাড়ে ৯ হাজার টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। যা আগে ছিল ৩ হাজার। এসব কারণে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে মানববন্ধন, অবস্থান, প্রশাসন বরাবর স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে। এরপরও প্রশাসন থেকে কোনো আশ্বাস না পেয়ে তারা মঙ্গলবার চূড়ান্ত আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা।

ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির দাবিতে আমরণ গণ-অনশনে পাঁচ বিভাগের শিক্ষার্থীরা:

এদিকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির দাবিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদভুক্ত পাঁচ বিভাগের অন্তত পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী আমরণ গণ-অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ অনশন চালিয়ে যাবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন অনশনকারী শিক্ষার্থীরা।

মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। পরে শিক্ষার্থীরা ডিন অফিস ঘেরাও করে তালা লাগিয়ে দেন।

এ সময় প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদভুক্ত ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগ এবং বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষার্থীরা জানায়, গত বছর ১২ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিতবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের অধীনে থাকা ১১টি বিভাগকে আলাদা করে তিনটি অনুষদে (প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ, বায়োলজিক্যাল সায়েন্স অনুষদ এবং বিজ্ঞান অনুষদ) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন বর্ষ (২০১৮-১৯) থেকে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদভুক্ত পাঁচটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির মান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও চলমান অন্যান্য ব্যাচগুলোর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।

চলমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে সব প্রকার বৈষম্য ছাড়াই সব ব্যাচগুলোকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির মান দেয়ার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিল তারা। এসব কর্মসূচির পরও দাবি আদায় না হওয়ায় মঙ্গলবার আমরণ অনশনের ঘোষণা দেন পাঁচ বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

অনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩ জন শিক্ষার্থী শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলে ভর্তি রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে তাদের কাছে যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

অনশনকারী বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, চলতি সেশন থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও আমরা যারা নিয়মিত শিক্ষার্থী আছি তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। অথচ আমরাও ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সগুলো পড়ছি। তাই ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে সব ব্যাচগুলোকে এই ডিগ্রি প্রদান করার দাবি জানায়। একই সঙ্গে দাবি মেনে নেয়া না পর্যন্ত আমাদের অনশন কর্মসূচি চালিয়ে যাব।’

জানা যায় আন্দোলনে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে শুরু করে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষেও শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছেন।

এ বিষয়ে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মমতাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘আগামী ২৭ এপ্রিল ফ্যাকাল্টি মিটিংয়ে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে। এরপর মিটিংয়ে পাস হলে বিষয়টি একাডেমিক সভায় যাবে।’

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির দায়িত্বে থাকা প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. শাহিনুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসতে হবে। ফ্যাকাল্টি মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত একাডেমিক কাউন্সিলে উত্থাপিত হলে পরবর্তীতে আমরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব।

বর্ধিত ফি কমানোর দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি একটি মীমাংসিত ইস্যু। তবে আগামীকাল ভিসি স্যার ক্যাম্পাসে আসবেন, তারপর আমরা বসে একটি সিদ্ধান্ত নেব।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর
-

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×