সেই স্কুলছাত্রকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে না নেয়ার বিষয়ে কিশোর আলোর ব্যাখ্যা

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ১৬:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

বিদ্যুৎস্পর্শে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র নাইমুল আবরারের মৃত্যুতে ফুঁসে উঠেছে তার সহপাঠীরা।

আহত আবরারকে কাছাকাছি কোনো হাসপাতালে না নিয়ে জ্যাম পেরিয়ে কেন মহাখালীর এক বেসরকারি হাসাপাতালে নেয়া হয়েছিল, সে প্রশ্ন করছেন সহপাঠীরা।

আবরারের সহপাঠীদের অভিযোগ, এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটল অথচ আবরারকে মোহাম্মদপুর থেকে নিয়ে যাওয়া হলো মহাখালীতে। এতদূর নিতে হলো কেন? আশপাশেই তো কত হাসপাতাল ছিল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ছিল।

একই প্রশ্ন রেখেছেন রেসিডেন্সিয়াল কলেজ শিক্ষার্থীদের অভিভাবকসহ আরও অনেকেই।

তাদের প্রশ্ন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর আবরারকে চিকিৎসার জন্য রাস্তার উল্টো পাশেরই শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল।

আবরারের সহপাঠী ও অভিভাবকদের এ অভিযোগের জবাব দিয়েছে কিশোর আলো।

শনিবার সকালে কিশোর আলোর ফেসবুক পেজে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।

পাঠকের সুবিধার্থে কিশোর আলো’র পুরো ব্যাখাটি দেয়া হলো-

অনেক প্রশ্ন তোমাদের মনে। পুরো লেখাটা পড়ো, প্লিজ।

কেন সোহ্‌রাওয়ার্দীতে না নিয়ে ইউনিভারসেল মেডিকেলে নেওয়া হলো?
কেন অনুষ্ঠান বন্ধ করা হলো না?
কেন ভলান্টিয়ারদের জানানো হলো না?
কেন কিশোর আলোর পেজ থেকে বিবৃতি দেওয়া হলো না সঙ্গে সঙ্গেই?
কেন স্কুলের প্রিন্সিপাল ঘটনা জানিয়ে বিবৃতি দিলেন না?

নাইমুল আবরার যখন তড়িতাহত হয়, কিশোর আলোর স্বেচ্ছাসেবকেরা তাকে সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যায় পাশে থাকা মেডিক্যাল ক্যাম্প স্টলে। প্রতি কিআনন্দ উৎসবে ইউনিভারসেল মেডিকেল কলেজ (আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতাল) এই ক্যাম্প পরিচালনা করে। এখানে ডাক্তার থাকেন, ফার্স্ট এইড থাকে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ইউনিভারসেল মেডিকেল এটি পরিচালনা করে উপস্থিত কিশোরদের জন্য। এ জন্য কিশোর আলোর কাছ থেকে তারা একটি টাকাও নেয় না। কিশোর আলোও তাদের উৎসবে জায়গা দেওয়ার জন্য কোনো টাকা নেয় না। এখানে কোনো স্পন্সরশিপ থাকার ব্যাপার নেই। মেডিকেল ক্যাম্পে থাকা কর্তব্যরত চিকিৎসক আবরারকে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। মুহূর্তেই অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয় আবরারকে। আবরারের সঙ্গে ওঠে কিশোর আলোর স্বেচ্ছাসেবকও। ডাক্তারের পরামর্শেই আবরারকে নিয়ে রওনা দেওয়া হয় ইউনিভারসেল মেডিকেল কলেজের দিকে।

এই পুরো ঘটনাটি ঘটে কয়েক মিনিটের মধ্যে। কিশোর আলোর পক্ষ থেকে সিনিয়র সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসার আগেই। আমরা যারা পরে ঘটনা শুনি তাদের মনে নানা প্রশ্ন উঁকি দেয়, নানা কিছু ভেবে আমরা লিখতে পারি। কিন্তু ঘটনা যখন ঘটে তখন সিদ্ধান্ত নিতে হয় মুহূর্তের মধ্যেই। সিনিয়র সদস্যদের খবর দেওয়ার চেয়ে ওই কয়েক মিনিটে ভলান্টিয়ার ও ক্যাম্পের ডাক্তারের কাছে আবরারই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দুজন এফসিপিএস ডাক্তার ছিলেন ইউনিভারসেল মেডিকেলের, অ্যাম্বুলেন্সটিও ছিল আইসিইউ-এর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাদি-সম্পন্ন। পুরো সিদ্ধান্তটা ডাক্তাররাই নিয়েছিলেন। পুরো ঘটনাটা কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে যাওয়া।

ঘটনাস্থল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে সিনিয়র সদস্যরা।

২.
আবরার যখন আহত হয়, তখন তাহসানের গান শেষের দিকে। পুরো অনুষ্ঠানও তখন শেষের দিকে। অর্ণব তখন মঞ্চে ওঠার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। একটি বড় ইভেন্টে নানা ঘটনা ঘটে, কখনো কখনো কেউ আহত হয়। তখন সেই সমস্যার সমাধান করা হয়, আহতকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয় না। এখানেও তাই হয়েছে। আহত আবরারকে হাসপাতালে পাঠানোই ছিল প্রথম দায়িত্ব।

হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান আবরার বেঁচে নেই। এই খবর যখন আমরা পাই ততক্ষণে অর্ণবের গানও শেষ। আমরা যদি জানতাম আবরার আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছে, আমরা নিশ্চয় অনুষ্ঠান চালাতাম না।

৩.
আবরার স্কুল ড্রেসে ছিল না। তার পরিচয় নিয়ে একেকবার একেক কথা শোনা গেছে। ভেন্যুতে থেকে আমরা অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছি। সে কোন স্কুলের, সেটি পরে জানা গেছে। কোনো স্কুলের শিক্ষার্থী হিসেবে নয়, আবরারকে কিশোর আলোর একজন হিসেবেই বাঁচাতে চেষ্টা করেছিলেন সবাই।

মৃত্যুর খবরটা পাওয়ামাত্রই কিশোর আলো সম্পাদক আনিসুল হক ছুটে যান। স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। আবরারের পরিবারও হাসপাতালে আসে।

আনিসুল হক, স্কুলের প্রিন্সিপাল হাসপাতালে আবরারের পরিবারের সঙ্গে ছিলেন।

৪.
প্রতিটি কিআনন্দ শেষে ভলান্টিয়াররা সফলভাবে উৎসব শেষ করাটা উদ্‌যাপন করে। কিন্তু আবরারের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর এবার আর সেটি করা হয়নি। জড়ো হওয়া ভলান্টিয়ারদের তাদের অভিভাবকের সঙ্গে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ভলান্টিয়ারদের যারা টিম লিডার, তাদের জানানো হয় মৃত্যুসংবাদটি। আগত দর্শক-পাঠকেরা যেন নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারে, সে জন্য কিশোর আলোর ভলান্টিয়াররা কঠোর পরিশ্রম করেছে সারাদিন। আমাদের একজন আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, বাকিরা যেন নির্বিঘ্নে বাড়ি পৌঁছায় সেটাই তখন মূখ্য। সারা দিনের ধকল গেছে, ভেন্যুতে অবস্থানের সময়ও তখন শেষ। সব মিলিয়ে তাই সেই সন্ধ্যায় সাধারণ ভলান্টিয়ারদের এটি জানানো হয়নি। কিশোর আলোর পেজ থেকে এটি জানানো হবে ভাবা হয়।

কিআ সম্পাদক ও স্কুলের প্রিন্সিপাল যেহেতু আবরারের পরিবারের সঙ্গেই ছিলেন, তাই ঠিক করা হয় অফিশিয়াল স্টেটমেন্ট সম্পাদক আনিসুল হকই দেবেন। কিন্তু ততক্ষণে সোশাল মিডিয়ায় রটে গেল বিভ্রান্তিকর ও ভুলে ভরা তথ্য। বলা হলো ঘটনাটা সকাল ১১টার, কেউ বলল মৃতদেহ স্কুলে রেখেই চলে গেল কিআ কর্তৃপক্ষ, কেউ বলল স্পটে ও মারা যাওয়ার পরও অনুষ্ঠান চালানো হয়েছে, কেউ আবার বলল আবরার স্কুল ড্রেস পরা ছিল, কারো মন্তব্য ইউনিভারসেল মেডিকেল আমাদের স্পন্সর, তাই সেখানে নেওয়া হয়েছে, কেউ বলল ব্যাকস্টেজে নাকি ঘটনাটা ঘটেছে। প্রকৃতপক্ষে এর সবই ভুল তথ্য। এসব কথার বেশিরভাগই যারা বলছেন, তারা হয়তো ঘটনাস্থলে ছিলেন না। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল ভলান্টিয়াররা, হাসপাতালে আনিসুল হকের সঙ্গে ছিলেন আবরারের বাবা-মা।

একটা ঘটনা শুনে একটি স্ট্যাটাস লিখে ফেলা সহজ। ফেসবুকে প্রশ্ন তোলা সহজ। কিন্তু এই বিষয়টি সত্যি যে, কিশোর আলোর পেজ থেকে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পোস্ট করা কিংবা ঢাকা রেসিডেসিয়াল মডেল কলেজ থেকে বিবৃতি দেওয়ার চেয়ে ওই মুহূর্তে আবরারের পাশে থাকাটা বেশি জরুরি। আনিসুল হক এবং প্রিন্সিপাল স্যার তখন পরিবারটির পাশেই থেকেছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন।

৫.
কিআনন্দ একদিনের কোনো উৎসব না। তিনটি জেলায় এটির তিনটি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবগুলোর আগে ও পরে থাকে নানা কার্যক্রম। আবরারের মৃত্যুর পর ঢাকা পর্ব নিয়ে শনিবারের পর্যালোচনা সভাসহ কিআনন্দ-সম্পর্কিত সকল কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে।

সারা দেশে কিশোর আলোর লাখ লাখ পাঠক আছে। তারা প্রত্যেকে কিশোর আলোরই ছেলেমেয়ে। আবরারও তেমন একজন। যেকোনো মানুষের মৃত্যুই কষ্টদায়ক, সেখানে শিশুকিশোরদের নিয়ে কাজ করার সময় আবরারের মতো কিশোরের মৃত্যু আমাদের কত কষ্ট দিচ্ছে, তা বলে বোঝানো সম্ভব না।

কিশোর আলোর যে স্বেচ্ছাসেবক আবরারের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে গিয়েছিল, তার মানসিক অবস্থা খুব ভালো না। অন্য স্বেচ্ছাসেবকেরাও শোকাহত। যে কিআনন্দ তাদের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত দিন, সবচেয়ে আনন্দের দিন, সেই কিআনন্দে আবরারকে হারানোটা তাদের জন্য অনেক বড় আঘাত।

সবাইকে অনুরোধ করব সত্যটা প্রচার করুন। বিভ্রান্তিকর বা ভুল তথ্য শেয়ার করবেন না। আবরারের মৃত্যুতে আমাদের শোক জানাবার ভাষা নেই। আমরা আবরারের পরিবারের পাশে আছি।’