‘আবরার ফাহাদ নামটা মনে রাইখেন’
jugantor
বুয়েট শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে খোলা চিঠি
‘আবরার ফাহাদ নামটা মনে রাইখেন’

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

০৭ অক্টোবর ২০২১, ১৪:১১:৫১  |  অনলাইন সংস্করণ

নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র।

বুয়েটের ২০১৮ সেশনের বস্তু ও ধাতবকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী এসএম প্লাবনের ওই চিঠিটি ‘বুয়েটিয়ান’ ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়েছে।

চিঠিটি বুয়েটের ‘১৯ ও আসন্ন ’২০ ব্যাচের ছাত্রদের এবং ভবিষ্যতে যারা আসবে, তাদের উদ্দেশে লেখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্লাবন।

বুধবার পোস্ট করা প্লাবনের চিঠিটি হুবহু পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—

‘আজ ২০২১ সালের ৫ অক্টোবর। এখন আমার ফোনের ঘড়িতে ১০টা ৩৫ মিনিট। আজ থেকে দুই বছর আগে আবরার ফাহাদ জীবিত ছিলেন।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র হত্যার ঘটনা নতুন নয়। তবে বুয়েট জনসংখ্যার বিচারে মোটামুটি ছোট একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েটের হলে ছাত্রের অপমৃত্যুর সংখ্যা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

যদি ভুল না করে থাকি, সর্বশেষ ছাত্র হত্যা ঘটে আট বছর আগে, ২০১৩ সালে। আরিফ রায়হান দীপকে হত্যা করা হয়।উল্লেখ্য, দীপ ভাই যে নজরুল হলে খুন হয়েছিলেন আমি সেই নজরুল হলেই থাকি। নজরুল হলে দোতলায় ওঠার পেছনের সিঁড়ির আগে ওনার একটা ম্যুরাল আছে।

ক্যাম্পাসে সর্বশেষ অরাজনৈতিক ছাত্রকে হত্যার ঘটনা ঘটে ১৯ বছর আগে। সাবেকুন নাহার সনি- খুন হয়েছিলেন দুই ছাত্র সংগঠনের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে।
কিন্তু আবরার ফাহাদের মৃত্যু এগুলোর চেয়ে ভিন্ন ছিল। জাতীয় পার্সপেক্টিভ থেকে দেখলে, সারা দেশ কেঁপে উঠেছিল ভূমিকম্পের মতো।

কিন্তু বুয়েটের অভ্যন্তরীণ মানুষদের (ছাত্র, শিক্ষক, রেজিস্ট্রার অফিসের ক্লার্ক থেকে শুরু করে হলের গার্ড, বাবুর্চি, সকলের) কাছে এই হত্যাকাণ্ড এবং এর আফটারম্যাথ ছিল আরও যুগান্তকারী।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া আমূল পাল্টে গিয়েছিল ওই কয়েক সপ্তাহের মল্লযুদ্ধে। তার পর এ যেন এক নতুন বুয়েট। কোনো ভয় নেই, আতঙ্ক নেই, নির্যাতন-নিপীড়ন নেই। কথা বলার অধিকার আছে। মত প্রকাশ করার অধিকার আছে। নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার আছে।

আগে বুয়েটে হলে ওঠার কয়েক দিন পর থেকে বুয়েট সম্পর্কে ছাত্রদের ফ্যান্টাসি আস্তে আস্তে কেটে যেত। নিদারুণ শারীরিক-মানসিক নির্যাতনে হল থেকে পালিয়ে যাওয়া ছিল দৈনন্দিন ঘটনা।

অনেকে বুয়েট থেকেই চলে গিয়ে অন্য কোথাও ভর্তি হয়েছে, এমন বহু রেকর্ড আছে।

২০১৯-এর অক্টোবরের আন্দোলনে উল্টে গেল উন্মাদের সাম্রাজ্য। টানা প্রায় মাসখানেক জহির রায়হান রোডের অটল সেই আন্দোলনে প্রশাসন রাজি হলো ছাত্ররাজনীতি

নিষিদ্ধসহ অন্যান্য দাবি মেনে নিতে।
প্রশাসন যখন আমাদের দাবি মেনে নিলো— আমাদের ‘১৮ ব্যাচের ছাত্রদের কী অনুভূতি ছিল বলে বোঝানো কঠিন।দিনের ২৪ ঘণ্টা, মাসের ৩০ দিন আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটিয়ে অভ্যস্ত ছাত্রদের মাথার ওপর থেকে হঠাৎ করে কেটে গেল ভয়ের মেঘ।

নতুন এক বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়ার অনুভূতি। সবাই ক্যান্টিনে গিয়ে খেতে পারছে, যেখানে খুশি যেতে পারছে। আগে অনেক জায়গায় যাওয়া নিষেধ ছিল। লিটারেলি লিস্ট করে দেওয়া হতো, কোন কোন জায়গায় যাওয়া যাবে, কখন যাওয়া যাবে, কী পরা যাবে, কাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে)।

২০১৯-এর নভেম্বর-ডিসেম্বর আমাদের জন্য ছিল একরকম বিজয়োল্লাসের সময়। সবার মনে একটা চাপা আনন্দ। হলে অরাজনৈতিক সিনিয়র ভাইয়েরা মিলে হলের একপ্রকার তত্ত্বাবধান করছেন। আমরাও তাদের সঙ্গে কাজ করছি। হল থেকে অছাত্রদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আমাদের আর গণরুমে গাদাগাদি করে থাকতে হবে না। একটা উৎসবমুখর পরিবেশ।

দিন বদলে গেছে। সুদিন এসেছে। এখন আমরা কথা বলতে পারব। আমাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারব। সমাধান করতে পারব।
আন্দোলন শুরুর পর পর শেরেবাংলা হলে কয়েকজন র্যা গারকে ধরা হয়েছিল।

পরে সম্ভবত ছেড়ে দেওয়া হয়। আমার হলে আমি ছিলাম কয়েকজন র্যা গারের অন্যতম টার্গেট। তারা আন্দোলনের মধ্যে চুপ ছিল। কিন্তু অক্টোবরের আন্দোলন সফল না হলে হয়তো আমাকে মার খেয়ে হল ছাড়তে হতো।

যেদিন অডিটোরিয়ামে সমাপনী সভা বসল, আমি ওইদিন অডিটোরিয়ামের বাইরে ভলান্টিয়ারের দায়িত্ব পালন করছিলাম। ভাইস চ্যান্সেলর যখন ঘোষণা দিলেন, আমি বাইরে থেকে ভিড় সামলাতে সামলাতে শুনলাম— এখনও কানে বাজে, ‘আজ থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল প্রকার ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলো’।

আবরার ফাহাদ নিজেও নিশ্চয় বুঝতে পারেননি, তার এই ট্র্যাজিক আত্মদানের ফলে বুয়েটের হাজার হাজার অরাজনৈতিক ছাত্র ক্যাম্পাসে নিরাপদে হেঁটে বেড়ানোর সাহস পাবে। হলের ছাত্ররা অন্তত আগামী কয়েক বছর নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সুযোগ পাবে। ছাত্ররা কথা বলার অধিকার ফিরে পাবে।

মহারথীরা অধিকাংশ সময়ই তাদের রচিত মহাকাব্যের পরিণতি দেখে যেতে পারেন না। পরিহাসক্রমে, এই মহাকাব্য লেখাই হয় তার প্রাণহীন দেহের রক্ত দিয়ে। ভ্যান গগ, সক্রেটিস, ব্রুনোদের ক্ষেত্রে এমনটাই দেখা গেছে।

গ্লোবাল পারস্পেকটিভে হয় তো আবরার ফাহাদ তাদের মতো প্রভাব ফেলতে পারেননি, কিন্তু কবরে শুয়ে থাকা আবরারের গগণবিদারী গর্জনে পলাশীর প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা হলগুলো থেকে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছিল হিংস্র হায়েনাদের সাম্রাজ্য।

যেই গর্জনের সরাসরি সুবিধা আজকে ভোগ করছি আমি, আমার বন্ধুরা, আপনারা, আপনাদের জুনিয়ররাও ভবিষ্যতে ভোগ করবে। তার পরিবারের জন্য এই মৃত্যু হয় তো এক পুত্রের মৃত্যু। কিন্তু বুয়েটের হাজার হাজার ছাত্রের জন্য এই মৃত্যু একজন নায়কের মৃত্যু। এক নতুন সময়ের শুরু।

জাস্ট একটা ফেসবুক পোস্ট! যদি মনে করেন, যতোটা বেশি করে বলা হয়, আবরার ফাহাদ খুব একটা সাহসী ছিলেন না। মৃত্যু ঘটে যাওয়ায় কাকতালীয়ভাবে এতকিছু ঘটে গেছে, তা হলে অনুরোধ করব— সিনিয়রদের কাছ থেকে শুনে নিতে পারেন। ওই সময় পোস্ট দূরের কথা, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো বা না পাঠানোর জন্য একজন ছাত্রকে কেমন ধরপাকড়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হতো।

আবরার ফাহাদের মৃত্যুর পর, বুয়েটের ছাত্রদের জন্য, এমনকি যারা তার সাথে একমত ছিলেন না, তাদের জন্যও এটা শুধু একটা পোস্ট, বা একটা ইস্যুতে মতামত ছিল না। মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে এক বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো পদক্ষেপ ছিল।

যার ধাক্কায় বদলে গিয়েছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়। বদলে গিয়েছিল হলগুলোতে ধুঁকতে থাকা হাজার হাজার ছাত্রের জীবন, আমাদের জীবন। এইটা শুধু একটা মানুষের মৃত্যুর চেয়ে বেশি কিছু ছিল, পুরো একটি সিস্টেম বদলে গেছিল এই ঘটনার গ্র্যাভিটিতে। আমূল পাল্টে গিয়েছিল একটি পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের।

দেশ কতদিন তার নাম মনে রাখবে জানি না, কিন্তু পলাশীর প্রান্তরে যারা থাকেন এবং ভবিষ্যতে থাকবেন, তারা মনে রাইখেন। আবরার ফাহাদ নামটা মনে রাইখেন।’

বুয়েট শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে খোলা চিঠি

‘আবরার ফাহাদ নামটা মনে রাইখেন’

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
০৭ অক্টোবর ২০২১, ০২:১১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র। 

বুয়েটের ২০১৮ সেশনের বস্তু ও ধাতবকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী এসএম প্লাবনের ওই চিঠিটি ‘বুয়েটিয়ান’ ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়েছে। 

চিঠিটি বুয়েটের ‘১৯ ও আসন্ন ’২০ ব্যাচের ছাত্রদের এবং ভবিষ্যতে যারা আসবে, তাদের উদ্দেশে লেখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্লাবন। 

বুধবার পোস্ট করা প্লাবনের চিঠিটি হুবহু পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—

‘আজ ২০২১ সালের ৫ অক্টোবর। এখন আমার ফোনের ঘড়িতে ১০টা ৩৫ মিনিট। আজ থেকে দুই বছর আগে আবরার ফাহাদ জীবিত ছিলেন।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র হত্যার ঘটনা নতুন নয়। তবে বুয়েট জনসংখ্যার বিচারে মোটামুটি ছোট একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েটের হলে ছাত্রের অপমৃত্যুর সংখ্যা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

যদি ভুল না করে থাকি, সর্বশেষ ছাত্র হত্যা ঘটে আট বছর আগে, ২০১৩ সালে।  আরিফ রায়হান দীপকে হত্যা করা হয়। উল্লেখ্য, দীপ ভাই যে নজরুল হলে খুন হয়েছিলেন আমি সেই নজরুল হলেই থাকি। নজরুল হলে দোতলায় ওঠার পেছনের সিঁড়ির আগে ওনার একটা ম্যুরাল আছে।

ক্যাম্পাসে সর্বশেষ অরাজনৈতিক ছাত্রকে হত্যার ঘটনা ঘটে ১৯ বছর আগে। সাবেকুন নাহার সনি- খুন হয়েছিলেন দুই ছাত্র সংগঠনের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে।
কিন্তু আবরার ফাহাদের মৃত্যু এগুলোর চেয়ে ভিন্ন ছিল।  জাতীয় পার্সপেক্টিভ থেকে দেখলে, সারা দেশ কেঁপে উঠেছিল ভূমিকম্পের মতো। 

কিন্তু বুয়েটের অভ্যন্তরীণ মানুষদের (ছাত্র, শিক্ষক, রেজিস্ট্রার অফিসের ক্লার্ক থেকে শুরু করে হলের গার্ড, বাবুর্চি, সকলের) কাছে এই হত্যাকাণ্ড এবং এর আফটারম্যাথ ছিল আরও যুগান্তকারী। 

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া আমূল পাল্টে গিয়েছিল ওই কয়েক সপ্তাহের মল্লযুদ্ধে।  তার পর এ যেন এক নতুন বুয়েট। কোনো ভয় নেই, আতঙ্ক নেই, নির্যাতন-নিপীড়ন নেই। কথা বলার অধিকার আছে। মত প্রকাশ করার অধিকার আছে। নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার আছে।

আগে বুয়েটে হলে ওঠার কয়েক দিন পর থেকে বুয়েট সম্পর্কে ছাত্রদের ফ্যান্টাসি আস্তে আস্তে কেটে যেত। নিদারুণ শারীরিক-মানসিক নির্যাতনে হল থেকে পালিয়ে যাওয়া ছিল দৈনন্দিন ঘটনা। 

অনেকে বুয়েট থেকেই চলে গিয়ে অন্য কোথাও ভর্তি হয়েছে, এমন বহু রেকর্ড আছে। 

২০১৯-এর অক্টোবরের আন্দোলনে উল্টে গেল উন্মাদের সাম্রাজ্য। টানা প্রায় মাসখানেক জহির রায়হান রোডের অটল সেই আন্দোলনে প্রশাসন রাজি হলো ছাত্ররাজনীতি

নিষিদ্ধসহ অন্যান্য দাবি মেনে নিতে।
প্রশাসন যখন আমাদের দাবি মেনে নিলো— আমাদের ‘১৮ ব্যাচের ছাত্রদের কী অনুভূতি ছিল বলে বোঝানো কঠিন। দিনের ২৪ ঘণ্টা, মাসের ৩০ দিন আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটিয়ে অভ্যস্ত ছাত্রদের মাথার ওপর থেকে হঠাৎ করে কেটে গেল ভয়ের মেঘ। 

নতুন এক বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়ার অনুভূতি। সবাই ক্যান্টিনে গিয়ে খেতে পারছে, যেখানে খুশি যেতে পারছে। আগে অনেক জায়গায় যাওয়া নিষেধ ছিল। লিটারেলি লিস্ট করে দেওয়া হতো, কোন কোন জায়গায় যাওয়া যাবে, কখন যাওয়া যাবে, কী পরা যাবে, কাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে)। 

২০১৯-এর নভেম্বর-ডিসেম্বর আমাদের জন্য ছিল একরকম বিজয়োল্লাসের সময়। সবার মনে একটা চাপা আনন্দ। হলে অরাজনৈতিক সিনিয়র ভাইয়েরা মিলে হলের একপ্রকার তত্ত্বাবধান করছেন। আমরাও তাদের সঙ্গে কাজ করছি। হল থেকে অছাত্রদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আমাদের আর গণরুমে গাদাগাদি করে থাকতে হবে না। একটা উৎসবমুখর পরিবেশ। 

দিন বদলে গেছে। সুদিন এসেছে। এখন আমরা কথা বলতে পারব। আমাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারব। সমাধান করতে পারব। 
আন্দোলন শুরুর পর পর শেরেবাংলা হলে কয়েকজন র্যা গারকে ধরা হয়েছিল।

পরে সম্ভবত ছেড়ে দেওয়া হয়। আমার হলে আমি ছিলাম কয়েকজন র্যা গারের অন্যতম টার্গেট। তারা আন্দোলনের মধ্যে চুপ ছিল। কিন্তু অক্টোবরের আন্দোলন সফল না হলে হয়তো আমাকে মার খেয়ে হল ছাড়তে হতো।

যেদিন অডিটোরিয়ামে সমাপনী সভা বসল, আমি ওইদিন অডিটোরিয়ামের বাইরে ভলান্টিয়ারের দায়িত্ব পালন করছিলাম। ভাইস চ্যান্সেলর যখন ঘোষণা দিলেন, আমি বাইরে থেকে ভিড় সামলাতে সামলাতে শুনলাম— এখনও কানে বাজে, ‘আজ থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল প্রকার ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলো’। 

আবরার ফাহাদ নিজেও নিশ্চয় বুঝতে পারেননি, তার এই ট্র্যাজিক আত্মদানের ফলে বুয়েটের হাজার হাজার অরাজনৈতিক ছাত্র ক্যাম্পাসে নিরাপদে হেঁটে বেড়ানোর সাহস পাবে। হলের ছাত্ররা অন্তত আগামী কয়েক বছর নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সুযোগ পাবে। ছাত্ররা কথা বলার অধিকার ফিরে পাবে।

মহারথীরা অধিকাংশ সময়ই তাদের রচিত মহাকাব্যের পরিণতি দেখে যেতে পারেন না। পরিহাসক্রমে, এই মহাকাব্য লেখাই হয় তার প্রাণহীন দেহের রক্ত দিয়ে।  ভ্যান গগ, সক্রেটিস, ব্রুনোদের ক্ষেত্রে এমনটাই দেখা গেছে। 

গ্লোবাল পারস্পেকটিভে হয় তো আবরার ফাহাদ তাদের মতো প্রভাব ফেলতে পারেননি, কিন্তু কবরে শুয়ে থাকা আবরারের গগণবিদারী গর্জনে পলাশীর প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা হলগুলো থেকে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছিল হিংস্র হায়েনাদের সাম্রাজ্য।

যেই গর্জনের সরাসরি সুবিধা আজকে ভোগ করছি আমি, আমার বন্ধুরা, আপনারা, আপনাদের জুনিয়ররাও ভবিষ্যতে ভোগ করবে। তার পরিবারের জন্য এই মৃত্যু হয় তো এক পুত্রের মৃত্যু। কিন্তু বুয়েটের হাজার হাজার ছাত্রের জন্য এই মৃত্যু একজন নায়কের মৃত্যু। এক নতুন সময়ের শুরু।

জাস্ট একটা ফেসবুক পোস্ট! যদি মনে করেন, যতোটা বেশি করে বলা হয়, আবরার ফাহাদ খুব একটা সাহসী ছিলেন না। মৃত্যু ঘটে যাওয়ায় কাকতালীয়ভাবে এতকিছু ঘটে গেছে, তা হলে অনুরোধ করব— সিনিয়রদের কাছ থেকে শুনে নিতে পারেন। ওই সময় পোস্ট দূরের কথা, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো বা না পাঠানোর জন্য একজন ছাত্রকে কেমন ধরপাকড়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হতো।

আবরার ফাহাদের মৃত্যুর পর, বুয়েটের ছাত্রদের জন্য, এমনকি যারা তার সাথে একমত ছিলেন না, তাদের জন্যও এটা শুধু একটা পোস্ট, বা একটা ইস্যুতে মতামত ছিল না।  মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে এক বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো পদক্ষেপ ছিল। 

যার ধাক্কায় বদলে গিয়েছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়। বদলে গিয়েছিল হলগুলোতে ধুঁকতে থাকা হাজার হাজার ছাত্রের জীবন, আমাদের জীবন। এইটা শুধু একটা মানুষের মৃত্যুর চেয়ে বেশি কিছু ছিল, পুরো একটি সিস্টেম বদলে গেছিল এই ঘটনার গ্র্যাভিটিতে। আমূল পাল্টে গিয়েছিল একটি পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের।

দেশ কতদিন তার নাম মনে রাখবে জানি না, কিন্তু পলাশীর প্রান্তরে যারা থাকেন এবং ভবিষ্যতে থাকবেন, তারা মনে রাইখেন। আবরার ফাহাদ নামটা মনে রাইখেন।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : বুয়েট ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু