ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গভীর রাতে মহানবমীর ঢল
মোঃ জহিরুল ইসলাম, হাজারীবাগ (ঢাকা)
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৫, ০৪:৪২ এএম
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী উপলক্ষে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির বুধবার (১ অক্টোবর) গভীর রাতেও ভরে উঠেছে হাজারো মানুষের পদচারণায়। মা দুর্গার দর্শনে ভক্তদের ভিড়ে পুরো এলাকা পরিণত হয় মিলনমেলায়। পূজা ঘিরে ছিল নিরাপত্তা, প্রার্থনা, মেলা, গান আর অসংখ্য স্মৃতি ধরে রাখার উচ্ছ্বাস। তবে মায়ের বিদায়ের আগাম সুরে ভক্তদের মনেও ফুটে ওঠে বেদনার ছায়া।
বুধবার সরেজমিনে দেখা গেছে, রাত বারোটা থেকে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে লম্বা দুটি লাইন। একটিতে পুরুষ, অন্যটিতে নারী। নিরাপত্তার অংশ হিসেবে পুলিশ বসিয়েছে আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখেমুখে আনন্দ আর ভক্তির ঝলক স্পষ্ট। প্রবেশের পরেই চোখে পড়ে রঙিন আলোয় সজ্জিত মন্দির চত্বর। কেন্দ্রীয় পূজা মণ্ডপের বিশাল প্রতিমার সামনে অগণিত ভক্ত প্রণাম করছেন, ছবি তুলছেন, সন্তানের হাত ধরে ফুল দিতে এগিয়ে যাচ্ছেন। কারও হাতে ধূপ-প্রদীপ, কারও হাতে ফুলের ঝুড়ি। অনেকে আবার মোবাইলে ভিডিও করছেন মায়ের দর্শন। প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে একসাথে ছবি তুলতে ভিড় জমিয়েছেন তরুণ-তরুণীরা। শিশুদের হাতে বেলুন, আবার কেউ কেউ খেলনায় মেতে আছে।
প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি মেলার দোকানগুলোতেও ভিড় লেগেছে। বিক্রেতারা বিক্রি করছেন বেলুন, প্রতিমার ছবি, শাঁখা, শোলার অলংকারসহ নানা জিনিস। এছাড়াও মিঠাইয়ের দোকানগুলোতেও ভিড়। গজা, নিমকি মুরালি, বাতাসা কৎমা, নকুল, বাতাসা, খই উখরা, সন্দেশ, সিটি, বাদামি, নারিকেলি, অনেক কিছু বিক্রি করছেন। গভীর রাতেও দর্শনার্থীরা প্রসাদ নিতে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। মন্দিরের বাইরে ও ভেতরে আলোকসজ্জায় যেন উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। ঢাকেশ্বরী চত্বরে যেন একসাথে মিলেমিশে গেছে ধর্মীয় আচার, সামাজিক মিলন আর সাংস্কৃতিক আনন্দ।
প্রতি বছর দুর্গা পূজায় মা আগমনের জন্য ভক্তরা ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করেন। মা এলে মন ভরে যায়, ক’টা দিন আনন্দে কেটে যায়। তবে বিদায়ের কথা মনে পড়তেই মনটা ভারী হয়ে আসে।
বংশালের বাসিন্দা অভিজিৎ চক্রবর্তী বলেন, প্রতি বছর মায়ের আগমনের জন্য আমরা অপেক্ষা করি। মা এলে আমাদের মন ভরে যায়। কয়েকটা দিন আনন্দে কাটাই। তবে কাল মা বিদায় নেবেন, সেটি ভেবে মনটা ভারী হয়ে আসছে। পূজা আমাদের জীবনে আনন্দ আনে, কিন্তু বিদায়ের সময় আমাদের চোখে জল আনে।
ঢাকারই আরেক ভক্ত শুভাশিস দত্ত জানান, ঢাকা শহরে পূজার আনন্দ একটু সীমিত। কিন্তু নবমীর রাতে আমরা গ্রামের মতোই তুমুল আনন্দ করার চেষ্টা করি। সারারাত গান-বাজনা হয়। তবে ভোরের দিকে মনটা কেমন ভারী হয়ে আসে। মা বিদায় নেবেন, সেই কষ্টটা বলে বোঝানো যায় না।
পুরান ঢাকা থেকে আগত শ্রীকান্ত নামের এক ভক্ত বলেন, এবার পূজার দিনগুলোতে ঢাকেশ্বরীতে আসা হয়নি। তাই নবমীর রাতে বাসা থেকে বেরিয়ে এখানে এসেছি। মায়ের দর্শন করলাম। আজকেই বেশি ঘুরবো। কাল মা চলে যাবেন, তারপর আবার এক বছর অপেক্ষা।
সদরঘাট থেকে স্ত্রী, সন্তান, ভাইবোন ও শ্যালিকাকে নিয়ে আসা পরিমল পাল প্রতিমার সামনে ফুল দিয়ে আবেগভরে বলেন, আজকের দিনটা অনেক ভালো কাটছে। সবাই মিলে মায়ের চরণে ফুল দিলাম। তবে আগামীকাল দশমীতে বিসর্জন হবে। সেই চিন্তা করে কষ্ট হচ্ছে। আবার এক বছর পর অপেক্ষা করতে হবে।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিত শ্রী বরুণ চক্রবর্তী যুগান্তরকে জানান—মায়ের ভালোবাসার টানে গভীর রাতেও দর্শনার্থী ও ভক্তবৃন্দের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। শারদীয় দুর্গোৎসবের তিন পর্বের আজ শেষ পর্ব, আজ মহানবমী। এই শুভলগ্নে, শুভক্ষণে ও শুভতিথিতে ভক্তদের সকলেরই যে মনের বাঞ্ছনা—মা সেই বাঞ্ছনা পূর্ণ করেন। মা কৈলাশ থেকে এসেছিলেন মর্ত্যলোকে শান্তির বার্তা নিয়ে। মা যখন আসেন তখন মহাদেব থাকেন পর্বত-পাহাড়ে। সেখান থেকে তিনি দেখেন—মা ভক্তদের কী দিচ্ছেন, সন্তানদের কী দিচ্ছেন। মহানবমীর এই দিনে মা তাঁর সমস্ত সন্তানকে পূর্ণতা দিয়ে আশীর্বাদ করেন। যার রোগ আছে তাকে রোগমুক্তি দেন, যার শান্তি নেই তাকে শান্তি দেন, যার অভাব আছে তার অভাব দূর করেন। মা সুখ ও শান্তি দিয়ে সমস্ত কান্না, সমস্ত দুঃখ দূর করে দেন। যেন সব সন্তান শান্তিতে বসবাস করতে পারে, সেই বার্তাই দিয়ে মা ফিরে যান।
তিনি আরো বলেন, আজ নবমীতে মা দোলায় চড়ে ফিরে যাচ্ছেন তাঁর শ্বশুরবাড়ি কৈলাশে। আগামী দিন বিজয়া দশমী। বিজয়া দশমী হবে আগামীকাল সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে। এ সময়ের মধ্যে দশমীর বিহিত পূজা, আরতি, পুষ্পাঞ্জলি, দর্পণ বিসর্জন, ঘট বিসর্জন—সব আচার সম্পন্ন করতে হবে। একই সময়ে প্রসাদ বিতরণও করা হবে। আমি আশা করি, আজ যারা এত রাত করে, ভোরবেলায় উদাস মন নিয়ে মায়ের কাছে এসেছে—তাদের মনের শান্তি মা পূর্ণ করবেন। মায়ের আশীর্বাদে সকলের জীবনে শান্তি ও সুখ আসুক, এটাই প্রার্থনা।
বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে দশমীর বিহিত পূজা শুরু হবে। এরপর হবে নারীদের সিঁদুর খেলা, পূজা-আর্চনা ও প্রসাদ বিতরণ। বিকেল তিনটা থেকে শুরু হবে বিজয়া শোভাযাত্রা। ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শোভাযাত্রা বের হয়ে যাবে বুড়িগঙ্গার ঘাটে, সেখানেই হবে প্রতিমা বিসর্জন।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহানবমীর রাত ভরে উঠেছিল ভক্তদের উচ্ছ্বাস, প্রার্থনা ও মিলনমেলায়। তবে আনন্দের মাঝেই ছিল এক বছরের অপেক্ষার বেদনা। মহাদশমীর বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের।
