চকবাজার ট্রাজেডি: ৪২ লাশ হস্তান্তর, নিখোঁজ ৯

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

লাশ নিয়ে যাচ্ছেন স্বজনরা। ছবি-যুগান্তর

পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪২ জনের লাশ বৃহস্পতিবার রাত ৯টা পর্যন্ত স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ সময় পর্যন্ত ৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসন।

যাদের লাশ হস্তান্তর : কামাল হোসেন (৪৫), ওয়াসি উদ্দিন (২৩), মোশারফ হোসেন (৪৩), হাফেজ মো. কাওছার আহমেদ (২৬), আলী হোসেন (৬৫), মো. ইয়াসিন (৩৩), শাহাদাৎ হোসেন (৩০), আবু বকর সিদ্দিক (২৭), জুম্মন (৫২), মজিবুর হাওলাদার (৫০), হেলাল উদ্দিন (৩২), আশরাফুল হক (২৭), ইমতিয়াজ ইমরোজ রাজু (২২)।

সিদ্দিক উল্লাহ (৪৫), মাসুদ রানা (৩৫), আবু রায়হান (৩১), আরাফাত আলী (৩), মোহাম্মদ আলী (২২), মাহবুবুর রহমান রাজু (২৯), এনামুল হক কাজী (২৮), শিপন আরাফাত (১৯), ওমর ফারুক (৩০), সৈয়দ খবির উদ্দিন (৩৮), আয়েশা খাতুন (৪৫), নয়ন খান (২৫), আবদুর রহিম (৫১), জসিম উদ্দিন (২২)।

সাহির (৩), মিঠু (৩৮), সোনিয়া আক্তার (২৮), বিল্লাল হোসেন (৪৭), ইসহাক ব্যাপারি (৪২), ইব্রাহিম (৩০), সুজন হক (৫৩), শামসুল হক (৬২), পারভেজ (১), খোরশেদ আলম (৪৫), রাজু (৫৩), সজীব (২৩), জয়নাল আবেদীন (৪৩), আনোয়ার হোসেন (৩৭) ও নাসির উদ্দিন (৩৩)। প্রতিটি লাশ দাফনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেন্সিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ ময়নাতদন্ত কার্যক্রম শেষে রাত পৌনে ৯টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, ৪২টি মৃতদেহ আমরা পুলিশের মাধ্যমে তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছি। আরও ২৫টি মৃতদেহ মর্গে আছে। তাদের শনাক্ত করা যায়নি। এর মধ্যে যদি কেউ এসে মৃতদেহ শনাক্ত করেন, তবে তাকে তা বুঝিয়ে দেয়া হবে। 

ডা. সোহেল আরও বলেন, হস্তান্তর না করতে পারলে অবশিষ্ট মৃতদেহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হবে। কারণ, ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে এত লাশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। পরবর্তীতেও যদি কেউ লাশ দাবি করে তাহলে তাদের ওই হাসপাতালে পাঠানো হবে।

তিনি বলেন, সেখানেও তারা লাশ শনাক্ত করার সুযোগ পাবেন। আমরা প্রতিটি মৃতদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছি। তা ডিএনএ ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। কেউ যদি আরও খোঁজ করেন তাহলে তাদের ডিএনএ ল্যাবে পাঠানো হবে।

জেলা প্রশাসন বলছে, এখন (বৃহস্পতিবার রাত ৯টা) পর্যন্ত নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন : তানজিল হাসান রোহান, হাজী ইসমাইল, দোলা, বৃষ্টি, শাহাদাত উল্লাহ হীরা, বিল্লাল, ওয়াইজ হোসেন, সামসুল হক ও বিবি হালিমা শিল্পী।

তবে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ফিল্ড অফিসার শাকিলা আক্তার বলেন, চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে তাদের কাছে ৬৯ জন নিখোঁজের তালিকা আছে। এটি যাচাই-বাছাই করে প্রকাশ করা হবে।

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হাজীগঞ্জের ১ জনের মৃত্যু হয়েছে, আরও একজন নিখোঁজ রয়েছেন। মারা যাওয়া ছিদ্দিকুর রহমান (২৭) মোহাম্মদপুর গ্রামের কাজী বাড়ির কাজী আবুল হোসাইনের ছেলে। তারা ৩ ভাই দুই বোন। তিনি সবার বড়। ছিদ্দিক ওই মার্কেটে ছুট মালামালের ব্যবসা করত। 

খবর শুনে মা নুরুন নেছা অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। চলছে পরিবারে আহাজারি। পাশের গ্রাম আহাম্মদপুরের হাজী ইসমাইল হোসেন (৭০) রয়েছেন নিখোঁজ। তিনি সে মার্কেটেই ছিলেন। তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন জানিয়েছেন, তার পরনের কাপড়ে আগুন লাগে। তারপর থেকে তারে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। 

ইসমাইলের ভাই লিটন জানান, সব হাসপাতালসহ স্বজনদের কাছে খুঁজেছি। এখনও তার খোঁজ মেলেনি। ওই মার্কেটে তার একটি দোকান ছিল। হাজী ইসমাইল মৃত ইসহাক ছয়ানির বড় ছেলে। তার ঢাকার বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।

ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্ন ছিল ঢাবি শিক্ষার্থী কাউসারের : কুমিল্লা ব্যুরো জানায়, কুমিল্লার সন্তান ঢাবি শিক্ষার্থী হাফেজ মো. কাউসার আহমেদ ও খবির উদ্দিন নাহিদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। কাউসার (৩২) হোমনা উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে। খবির উদ্দিন নাহিদ (৩৫) চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা গ্রামের সৈয়দ কামাল উদ্দিন লাভলুর ছেলে। 

ঢাবি শিক্ষার্থী হাফেজ মো. কাউসার আহমেদ লেখাপড়ার পাশাপাশি চুড়িহাট্টায় ওষুধের ব্যবসা করতেন। সেখানে তার আল মদিনা মেডিকেল নামে একটি ফার্মেসি ছিল। ভর্তি পরীক্ষায় ‘ডি’ ইউনিটে ১৭তম মেধায় ভর্তি হন কাউসার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনি নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ছিলেন। 

কাউসারের বন্ধু সূর্যসেন হলের ছাত্র শরীফুল আলম বলেন, কাউসার ছিল খুবই মেধাবী ও পরিশ্রমী। নিজের খরচ নিজেই বহন করত। সেজন্য ফার্মেসি দিয়েছিল। কাউসার কোরআনে হাফেজ ছিল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। কাউসার বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জনক। আবদুল্লাহ নামে একটি ছেলে এবং নুসাইবা নামে একটি মেয়ে আছে তার।

শরীফুল আরও বলেন, কাউসারের ইচ্ছা ছিল বড় ব্যাংকার হবে, পরিবারের হাল ধরবে। ওর স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। ওর মতো মেধাবীদের এমন করে পুড়ে মরে যাওয়া রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা। বৃহস্পতিবার ঢামেকের মর্গে গিয়ে কাউসারের দুই ভাই, মা ও স্ত্রী লাশ শনাক্ত করেন। এদিকে নিহত খবির উদ্দিন নাহিদ চকবাজার এলাকায় ব্যবসা করতেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই অবস্থান করছিলেন।