মৃত্যুপুরী চুড়িহাট্টা: আতঙ্ক কমেনি এখনও

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৮:৩৪ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক   

ফাইল ছবি

পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকার পশ্চিমের ওই ছোট্টগলিটি এখন মৃত্যুপুরী। শোকের চাদরে ঢাকা চুড়িহাট্টায় আতঙ্ক আজ শনিবারও কমেনি।  

৬৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ও অসংখ্য মানুষের দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় শুধু স্বজন হারারাই কাঁদছেন না, কাঁদছেন ঢাকাবাসী। কাঁদছেন সারা দেশের মানুষ। সর্বত্র এখন শোকের ছায়া। 

সেখানে নেই নিত্যদিনের কোলাহল। নেই গাড়ির হর্ন। কর্মব্যস্ত মানুষের রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলার দৃশ্যও নেই। 

বুধবার রাতে লাগা ভয়াবহ আগুনে এলাকাবাসীর চোখেমুখে বেদনার ছাপ। ঘটনার দু’দিন পরও আশপাশের এলাকাসহ ঢাকার অন্যান্য অঞ্চল এবং দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসছেন ঘটনাস্থল দেখতে।

সরেজমিন দেখা যায়, চুড়িহাট্টা যেন দুর্যোগে লণ্ডভণ্ড এক জনপদ। রাস্তার ওপর স্পষ্ট দগদগে ক্ষত। পড়ে রয়েছে কাগজ, কাপড়, প্যাকিং বাক্সের টুকরো, টিনের কৌটা। ফায়ার ব্রিগেডের পানি সেই পুড়ে যাওয়া বিপুল কালো আবর্জনাকে ধুয়েমুছে সাফ করতে পারেনি। 

ছাই-কয়লার সেইসব ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন শত শত মানুষ। শোকে বেদনায় মুহ্যমান তারা। ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকে স্বজনের জন্য চোখের পানি ফেলেছেন। অনেকে আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘জীবিকার সন্ধানে এসে জীবন দিতে হল এভাবে।’

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে ওয়াহেদ মঞ্জিলে গিয়ে তাজ্জব বনে যাওয়ার অবস্থা। আন্ডারগ্রাউন্ডে প্রবেশ করে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যালের সারি সারি ড্রাম, শত শত বস্তা, টিনের মাঝারি সাইজের ড্রাম। মূলত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা মরদেহের সন্ধান করতে গিয়ে এসব আবিষ্কার করেন। 

শুধু আন্ডারগ্রাউন্ডই নয়, নিচতলা, দোতলা, তিনতলা এমনকি চারতলায়ও কেমিক্যালের অবৈধ গোডাউন গড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে নিচতলার কেমিক্যালই আগুনের উৎস বলে মনে করা হচ্ছে। 

কেননা, আন্ডারগ্রাউন্ডের কেমিক্যালের মজুদ অক্ষতই রয়েছে। পুরে গেছে নিচতলা থেকে এর উপরের তলায় রাখা কেমিক্যালের ড্রাম-বস্তা।

ওয়াহেদ মঞ্জিলের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, ভবনটিতে নকল পারফিউম তৈরি করা হতো। আমরা যখনই যাতায়াত করতাম তখন গন্ধ পেতাম। বিষয়টি বাড়ির মালিককে জানানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। ভবনটিতে মালিকের ছেলে সোহেলও বসবাস করতেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, আগুন দেখে মানুষ ছোটাছুটি করতে থাকে। সড়কে যানজট থাকায় কেউ বের হতে পারেনি। অনেকে আবার আগুন থেকে বাঁচতে দোকানের সাটার বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু তাদের সেখানেই মৃত্যু হয়েছে।

আবদুর রহমান নামে একজন বলেন, চকবাজারের গলিগুলো অনেক সরু হওয়ায় মানুষ বের হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। যে কারণে সড়কে দাঁড়িয়ে অনেককে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। স্থানীয় এই বাসিন্দার কথায় সমর্থন পাওয়া যায় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যের মুখেও। 

নাম প্রকাশ না করে এক কর্মী বলেন, মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়া আগুন, রাসায়নিকের দম আটকানো গন্ধ, আর অপ্রশস্ত সড়কের কারণে বেশির ভাগ মানুষ এলাকা ও ঘর ছেড়ে বের হতে পারেননি। অনেকেই ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। 

তবে এই আগুন সন্ধ্যায় বা দিনের বেলা লাগলে শত শত মানুষ মারা যেত। কারণ এ সময়ে প্রায় সারা দেশের মানুষ এখানে মালামাল কিনতে আসে। পাইকারি মার্কেট এলাকা হওয়ায় চকবাজারের চুড়িহাট্টায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভাগ্যান্বেষণে আসা মানুষ কর্মচারী কিংবা ম্যানেজারের চাকরি করেন। তাদের অনেকেই এই এলাকায় বসবাস করেন। এমন বেশ কয়েকজন আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। 

দগ্ধ হয়েছেন। শুক্রবার চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ মঞ্জিল এলাকায় নিখোঁজদের খোঁজে আসা আত্মীয়-স্বজনদের দেখা গেছে। তারা সেখানে আত্মীয়দের ছবি দেখিয়ে তাদের অবস্থান জানার চেষ্টা করেন। তবে তাদের খোঁজ কেউ দিতে পারেনি।

নোয়াখালী থেকে আসা আবু সুফিয়ান জানান, তার বাবা চকবাজারে এমিটেশনের ব্যবসা করতেন। কাল অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মোবইল ফোন বন্ধ। এজন্য সকালে ঢাকায় এসেছি। মেডিকেল কলেজ ঘুরে আমরা এখানে এসেছি। 

শুক্রবার পৃথকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। প্রথমে সিটি কর্পোরেশনের তদন্ত দল, এর পরে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।