আর্থিক সংকটে নিভে যাচ্ছে জ্ঞান সৃষ্টির প্রদীপ

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৮, ১৭:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ

  রীনা আকতার তুলি

সৃষ্টি পাঠোদ্যানের প্রতিষ্ঠাতা আশরাফুল আলম, ছবি যুগান্তর

বাল্যকাল থেকেই পাঠ্যবইয়ের বাইরে কবিতা, গল্প ও সাধারণ জ্ঞান ও উপন্যাসের বই পড়তে বড় ভালোবাসতেন তিনি। ছোটবেলাতে নিজ এলাকা কিশোরগঞ্জের ইটনায় বিভিন্ন স্থান, পুরাকৃতি, প্রাচীন দালান ঘুরে বেড়াতেন। ডাকটিকিট, মুদ্রা, বই, কাগজের নোট সংগ্রহ করতেন।

তবে জ্ঞানপিপাসু এই মানুষটি লাইব্রেরি দেয়ার তীব্র ইচ্ছা তাকে সব সময় তাড়া  করে ফিরত।শেষমেশ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০০৩ সালে ঢাকার রূপনগর আবাসিক এলাকায় প্রতিষ্ঠা করলেন সৃষ্টি পাঠোদ্যান নামে একটি লাইব্রেরি।

বলছিলাম সৃষ্টি পাঠোদ্যান ও সংগ্রহশালার প্রতিষ্ঠাতা আশরাফুল আলম সিদ্দিকির কথা। যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি তুলে ধরেছেন তার লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার অনেক অজনা তথ্য।

  

বর্তমানে সৃষ্টি পাঠোদ্যানের সংগ্রহে আছে ৫ হাজারের মতো বই। এছাড়া রোহিঙ্গাদের নিয়ে লেখা ১৫০টি বই রয়েছে তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে। সৃষ্টি পাঠোদ্যানকে তিনি আগলে রেখেছেন সন্তানের মতো। জ্ঞানের এই বাতিঘরের প্রতি তার অনেক মমতা।

ব্যক্তি উদ্যোগে নিজের শখ মেটাতে আর মানুষের জ্ঞান অর্জনের জন্য ১৮ বছর এই বাতিঘরে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখলেও এখন আর পারছেন না। আর্থিক সংকটের কারণে আজ তা বন্ধের পথে। 

নিজের আর্থিক অবস্থা অনুকূলে না থাকায় কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার গুজাদিয়া গ্রামে স্থানান্তর করতে চাইছেন সৃষ্টি পাঠোদ্যান।

আশরাফুল আলম যুগান্তরকে বলেন, সৃষ্টি নামে আমর একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। আর তার নামের এই লাইব্রেরি আমি প্রতিষ্ঠা করেছি। সৃষ্টি পাঠোদ্যান লাইব্রেরি আমার সন্তান মতো।  

তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে বই পড়তে খুব পছন্দ করতাম। বইকে ভালোবেসেই আমরা আজকের এই লাইব্রেরি। বর্তমানে এই লাইব্রেরি সদস্য সংখ্যা রয়েছে ৩শ’র মতো।  আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে লাইব্রেরিটি পরিচালনা করে থাকি।
এখান থেকে জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো সম্মানী দিতে হয় না। এই সৃষ্টির জ্ঞান সবার জন্য উন্মুক্ত। 

আশরাফুল আলম বলেন, নিজের উদ্যোগে আমি ৫ হাজারে বেশি বই সংগ্রহ করেছি। এছাড়া আমি অনেক দিন বার্মায় ছিলাম। সেখান থেকে রোহিঙ্গাদের কষ্টে আমি ব্যথিত হয়েছি। 

তাদেরকে ভালোবেসে আমি তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ধর্ম সম্পর্কে অনেক কিছু জানার চেষ্টা করেছি। বর্তমানে রোহিঙ্গাদের ১৫০টি বই ব্যক্তিগতভাবে সংগ্রহ করেছি। 

রোহিঙ্গাদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি রোহিঙ্গাদের ভাষা বলতে, লিখতে ও পড়তে পারি। আগে থেকেই দেখে আসছি রোহিঙ্গা অনেক নির্যাতনের শিকার। সর্বশেষ গত বছরে  ২৫ আগস্ট তাদের ওপর বার্মা সেনাদের ভয়াবহ নির্যাতনের কারণে তারা বাংলাদেশের কক্সবাজারে উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের আশ্রয় দেয়ায় আমি সরকারকে  আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। 

লাইব্রেরির কথা উল্লেখ্য করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জ্ঞান অর্জনের জন্য লাইব্রেরিটি অনেক বড় করার ইচ্ছা থাকলে অর্থের অভাবে তা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া এখনো মাসিক ২০  হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে লাইব্রেরিটি চালাতে হচ্ছে। কিন্তু আমি আর্থিক সংকটে থাকায় তা এখন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছি। 

এটা শুধু একটি লাইব্রেরি নয় সংগ্রহশালা। এখানে আমার নিজ জেলার মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়ে  পুরাকৃতি,ডাকটিকিট, মুদ্রা, বই কাগজের নোট, নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরা পোশাক, ব্যবহৃত অনেক জিনিস, সাহিত্যপ্রেমীদের পাণ্ডুলিপি।


বিগত ১৫ বছরে এক শতাধিক রোহিঙ্গা-বার্মা বিষয়ক বই সাময়িকী সংগ্রহ করা হয়েছে। ১৮৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত (জুলাই ২০১৮) প্রকাশিত বই সাময়িকীগুলোর অধিকাংশই  


বাংলাদেশে প্রকাশিত বাংলা বই। এগুলোর মধ্যে ইতিহাস, রাজনীতি, সংকলন,গবেষণা, মানবাধিকার/শরণার্থী, গল্প, উপন্যাস, কবিতা ইত্যাদি বিষয়ের বই রয়েছে।


তিনি বলেন,  যদিও আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সৃষ্টি পাঠোদ্যানটি চালাচ্ছি। তবে আমি মনে করি এটি সাধারণ মানুষের সম্পদ। তাই আমি চাই লাইব্রেরিটির সংস্কার। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি সহযোগিতার হাত বাড়ান। তবে আমি চির কৃতজ্ঞ থাকব। 

লাইব্রেরিটিতে সংগৃহীত উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো- করিমগঞ্জ উপজেলা বিষয়ক সংগ্রহ। কলকাতা থেকে শ্রী পূর্ণচন্দ্র রায়ের লেখা উচ্ছ্বাস কাব্যগ্রন্থ, করিমগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত  পিরীতির নকশা,  ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত করিমগঞ্জ বিষয়ক সংবাদগুলোর পত্রিকার কাটিং, করিমগঞ্জ উপজেলায় মৃত বিশিষ্ট ৮০ জন ব্যক্তির  সংগৃহীত জীবনী, ছবি ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র, ইতিহাস, ঐতিহ্য। গ্রন্থগারবিষয়ক বই সংগ্রহ, গ্রন্থের তালিকা, গ্রন্থগারবিষয়ক বই ও পত্রিকার কাটিং,  বার্মা ও রোহিঙ্গাবিষয়ক  ১৫০টি বই সংগ্রহ, বার্মাবিষয়ক গ্রন্থ,  রোহিঙ্গা ভাষা ও সংস্কৃতি, তোফা পুঁথি : আখেরী মোকাম, রোহিঙ্গা ভাষার কোরআন শরিফ, পত্রিকার কাটিং,  রোহিঙ্গা বন্দি তালিকা,রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিভিন্ন তথ্য , ছবি ও সাক্ষাৎকার। 

সৃষ্টি পাঠোদ্যানের প্রতিষ্ঠাতা  আশরাফুল আলম বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ, শিশুতোষ গল্পের বই রচনা করে প্রকাশ, বাংলা ও ইংরেজিতে অনেক বই অনুবাদ করে প্রকাশ করেছেন।