ভুয়া মেনিফেস্টের মাল বারবার আটক, মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে
মো. কামাল হোসেন, বেনাপোল
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৬:৫৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভুয়া মেনিফেস্ট ও ‘নো-এন্ট্রি’ মালামাল আমদানি বন্ধ হচ্ছে না। বারবার কোটি কোটি টাকার অবৈধ মালামাল জব্দ হলেও চক্রের মূলহোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, কারা এই সিন্ডিকেটের পেছনে থেকে সব নিয়ন্ত্রণ করছে?
সর্বশেষ গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে বন্দরের দায়িত্বরত বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ভুয়া মেনিফেস্ট ও ‘নো-এন্ট্রি’ মালামাল বহনকারী ট্রাক জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে কাস্টমস হাউসের তত্ত্বাবধায়নে ট্রাকটি সিলগালা করে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে ট্রাকটি বেনাপোল কার্গো ভেহিক্যাল টার্মিনালে পাহারায় রয়েছে।
তবে গোপন সূত্রে জানা গেছে, ট্রাকটিতে ভারত থেকে বডি স্প্রের আড়ালে উচ্চ শুল্কযুক্ত উন্নতমানের ফেব্রিক্সের চালান বাংলাদেশে আনা হচ্ছিল। যে কারণে বেনাপোল কার্গো ভেহিক্যাল টার্মিনালে ট্রাক রেখে ড্রাইভার পালিয়ে যায়। এ পণ্য চালানের আমদানি কারক প্রতিষ্ঠান ছিল রাইচ ট্রেডিং ইন্টারন্যশনাল এবং রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ছিল বিলিসিভ কসমেটিক্স লিমিটেড।
এর আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর রাতে বিজিবি বন্দরের বাইপাস সড়কে অভিযান চালিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকার ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, কসমেটিকস, ওষুধ ও মোটরসাইকেলের টায়ার আটক করেন। এ ঘটনায় দুইজনকে আটক করা হলেও মূল কারবারিদের এখনো চিহ্নিত করা যায়নি। চালানটি আমদানি করেছিল মেহেরপুরের ‘বাজিতপুর বীজ ভাণ্ডার’ নামক আমদানি কারক এবং সোনারগাঁও এজেন্সি নামক সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান ছাড় করানোর দায়িত্বে ছিলেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল বলছে, প্রতিবারই কিছু ট্রাকচালক বা বাহক ধরা পড়ছে, কিন্তু পেছনের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কোনো সদস্য গ্রেফতার হচ্ছে না। এছাড়াও বেনাপোল বন্দর ও কাস্টমস হাউসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহায়তায় স্থানীয় একটি চোরাচালান চক্র কোটি কোটি টাকার শুল্ক ফাকি দিয়ে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভুয়া মেনিফেস্ট আর নো-এন্ট্রি পণ্য আমদানি বন্ধ হবে না।
বেনাপোল সিএন্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান স্বজন জানিয়েছেন, বেনাপোল অবৈধ পণ্য আটক তৎপরতায় দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের গাফিলতি এখানে দৃশ্যমান। উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রশাসন দ্বারা বেনাপোল বন্দর পরিচালনা করা না গেলে, এ ধরনের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি চলতে থাকবে।
বেনাপোল সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি বলেন, প্রায়ই ভুয়া মেনিফেস্ট ও নো-এন্ট্রি পণ্য আটক হচ্ছে। এতে বৈধ ব্যবসায়ীরা বারবার সমস্যায় পড়ছেন। ইতোপূর্বে ভুয়া মেনিফেস্টের মাধ্যমে তারা ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে, যার প্রমাণ সম্প্রতি দুটি অবৈধ পণ্য চালান আটক হওয়ার ঘটনায় মিলেছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছি; কিন্তু বেনাপোল বন্দর ও কাস্টমসের কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই অবস্থা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। অবিলম্বে এর বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়িয়ে দোষীদের আইনের আওতায় না আনলে আমদানি-রপ্তানির সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে।
বেনাপোল স্থলবন্দর পরিচালক শামীম রেজা বলেন, বন্দরে প্রতিটি ঘটনায় আমাদের নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে মালামাল তল্লাশি ও সন্দেহভাজন চিহ্নিত করার কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। আমরা শুধু আটক অভিযানেই সীমাবদ্ধ থাকছি না, মূলহোতাদের ধরার জন্য সিসিটিভি মনিটরিং, রিস্ক প্রোফাইলিং ও সমন্বিত টিম কার্যক্রমে মনোযোগ দিচ্ছি। তবে সিন্ডিকেটের জটিলতার কারণে কিছু ঘটনা আমাদের চোখের আড়াল হতে পারে।
তবে এ ঘটনায় বন্দর সংশ্লিষ্ট ১৫ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। যদি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হস্তে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার খালেদ মোহাম্মদ আবু হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
