Logo
Logo
×

সারাদেশ

মুষ্টি চালের অর্থে দুর্গাপূজার আয়োজক মহল্লার ২৩ নারী

Icon

শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:১২ পিএম

মুষ্টি চালের অর্থে দুর্গাপূজার আয়োজক মহল্লার ২৩ নারী

দেবীদুর্গা হচ্ছে নারী শক্তির প্রতীক। সেই বিশ্বাসকে ধারণ করে শেরপুর শহরের সাতানিপাড়া মহল্লার ২৩ জন সাহসী নারী ঐক্যবদ্ধ হয়ে আয়োজন করেছেন দুর্গতনাশিনী দুর্গাপূজা। নিজেদের সংগৃহীত মুষ্টি চাল বিক্রির টাকায় মহল্লার দুর্গাপূজা আয়োজনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে সনাতন ধর্মলম্বী হিন্দু সম্প্রদায়ের এসব নারীরা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন।

এই সাহসী উদ্যোগ গ্রহণকারী নারী ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, শেরপুর জেলা শহরের পৌর এলাকার সাতানিপাড়া মহল্লায় আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের হতদরিদ্র মানুষের বসবাস। তারা সবাই দিন আনে দিন খায়। তারপরও তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দুর্গাপূজা করার আলাদাভাবে উদ্যোগ নিয়েছেন। 

গত বছর প্রথম ‘উমা সংঘ’ নামে একটি ক্লাব গঠন করে ছোট পরিসরে দুর্গাপূজার আয়োজন করে। এরই ধারাবাহিকতায় এবারও তারা একটু জাঁকজমকপূর্ণ পূজার আয়োজন করে এলাকায় হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন। 

শুধুমাত্র নারীদের নিয়ে ২৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা সভা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই মহল্লায় বসবাসরত ৪২টি ঘর থেকে প্রতিদিন মুষ্টির চাল সংগ্রহ করেন। 

সেই চাল বিক্রি করে বছর শেষে সঞ্চয় করেন মোট ৬০ হাজার টাকা। ওই টাকা নিয়ে তারা পূজা উদযাপনের উদ্যোগ নেন। ওই টাকায় পূজা করা সম্ভব না হওয়ায় তারা তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী এবং স্থানীয় ও শহরের অর্থশালী ব্যক্তিদের দ্বারস্থ হয়ে পূজার প্রয়োজনীয় টাকা সংগ্রহ করছেন।

ইতোমধ্যে প্রতিমা তৈরি ও রংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি প্রতিমার অন্য সাজসজ্জা, গেট নির্মাণ, আলোকসজ্জার কাজ। পূজার প্রয়োজনীয় নানা উপকরণ সংগ্রহ করছেন তারা। 

২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে দুর্গাপূজা শুরু হবে। উমা সংঘের নারীদের পাশাপাশি স্থানীয় পুরুষরাও তাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন বলে কমিটির নারী নেত্রীরা জানান।

সাতানিপাড়া মহল্লায় দুর্গাপূজা আয়োজনে মহল্লার তরুণ-তরুণীদের মাঝেও ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। কেবলমাত্র নারীদের আয়োজনে পূজা আয়োজনকে সাধুবাদ জানিয়ে এটি একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ বলে মনে করছেন তারা। তাই ওই মহল্লার তরুণ-তরুণীরাও পূজা আয়োজনকারী নারীদের নানাভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।

উমা সংঘের সভাপতি মুক্তি বিশ্বাস বলেন, নারীরা হচ্ছে শক্তির প্রতীক। তাই আমরা নারীশক্তি জাগরণের জন্য এবং পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে সেজন্য আমরা এ আয়োজন করেছি। 

তিনি আরও বলেন, আমরা গত বছর প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার আগে থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করি। আমাদের প্রত্যেকটা পরিবার থেকে মুষ্টির চাল সংগ্রহ ও বিক্রির ৬০ হাজার টাকা দিয়ে আয়োজন শুরু করেছি। 

যদিও দুর্গাপূজার ব্যয় অনেক বেশি। তারপরও আমাদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সমাজের পুরুষদের সহযোগিতায় আমরা এবারও দুর্গাপূজার আয়োজন করেতে পেরেছি। 

উমা সংঘের সাধারণ সম্পাদক সুমিতা বিশ্বাস বলেন, আমাদের পাড়ায় আদিবাসী-দলিত সম্প্রদায়ের পাশাপাশি ব্রাহ্মণ ও সাহা গোত্রের মানুষ বসবাস করেন। তারাও আমাদের নানাভাবে সহযোগিতা করে আসছেন। এতে আমাদের আত্মবিশ্বাসটা আরও বেড়ে গেছে। 

এবার সফলভাবে পূজা অর্চনা শেষ করতে পারলে আগামীতে আরও ভালোভাবে পূজা উদযাপনের পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। 

স্থানীয় আদিবাসী নেতা বিদ্বান বিশ্বাস বলেন, দেবীদুর্গা হচ্ছে নারী শক্তির প্রতীক। সেই বিশ্বাস থেকেই আমাদের এ মহল্লার নারীরা উদ্যোগ নিয়েছেন এবং তারা নিজেরাই দুর্গাপূজা আয়োজন করেছেন। যদিও এ মহল্লার সনাতনী সব মানুষই হতদরিদ্র এবং দিনমজুর। তারপরেও তারা সাহস করে যে আয়োজনটা করেছে আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। কারণ আমাদের ধর্মের সবচেয়ে বড় উৎসব এবং ব্যয়বহুল পূজা হচ্ছে দুর্গাপূজা। 

তিনি বলেন, সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের মধ্যে থেকে নারীরা যে সাহসী উদ্যোগ নিয়েছেন এদের পাশে থেকে যেন অর্থনৈতিক সাপোর্ট দেওয়া হয়। আমি স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এ দাবি জানাচ্ছি। 

শেরপুর জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহবায়ক জিতেন্দ্র মজুমদার বলেন, উমা সংঘের পূজা আয়োজনের বিষয়ে আমরা জেনেছি এবং সরেজমিন দেখেছি। তাই তাদের জন্য অন্য পূজা মণ্ডপের চেয়ে বরাদ্দ একটু বেশি রেখেছি। এছাড়া আমাদের ভলেন্টিয়ার এবং প্রশাসনের মাধ্যমে তাদের শান্তিপূর্ণভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপনের সার্বিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উমা সংঘ শুধু পূজার আয়োজনই নয়, নারী শক্তির আরাধনা করছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম