Logo
Logo
×

সারাদেশ

লক্ষ্মীপুরের পুত্রবধূ ফরাসি সিনথিয়া

জীবন আমার ধন্য হলো, হয়ে বাংলাদেশি বউ

Icon

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম

জীবন আমার ধন্য হলো, হয়ে বাংলাদেশি বউ

‘আতা গাছে তোতা পাখি, ডালিম গাছে মৌ, জীবন আমার ধন্য হলো, হয়ে বাংলাদেশি বউ’। এমনই একটি কন্টেন্টে নিজের অনুভূতি জানিয়েছেন বাংলাদেশি পুত্রবধূ সিনথিয়া ইসলাম।

কারণ ছোটবেলা থেকে মায়ের ভালোবাসা না পেলেও শাশুড়ির ভালোবাসায় মুগ্ধ ফরাসি সিনথিয়া। এজন্যই বারবার ছুটে আসতে চান শ্বশুরবাড়ি লক্ষ্মীপুরে। প্রেম ভালোবাসার মতো মধুর করেই সিনথিয়া ও তার স্বামী আরিফুল ইসলাম রাসেল একটি ফেসবুক পেইজকে সাজিয়ে তুলেছে। যেখানে তারা সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করছেন।

প্রায় ১ বছর ৯ মাসে ২.১ মিলিয়ন ফলোয়ারের ভালোবাসা পেয়েছেন তারা। তাদের কন্টেন্ট যেন মিলিয়ন পার করতে নেয় না। 

জানা গেছে, ২০১৭ সালে খ্রিস্টান থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে লক্ষ্মীপুরের রাসেলের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন সিনথিয়া। তার পূর্বের নাম ছিল অম। তাদের সংসারে ফুটফুটে দুটি সন্তান রয়েছে। এর মধ্যে মেয়ের নাম আমেনা ইসলাম (৬) ও ছেলে আলিফ ইসলাম (৪)।

সম্প্রতি রাসেল স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে বাড়িতে এসেছেন। মেঘনা নদী এলাকাসহ লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে ঘুরে গ্রামীণ পরিবেশে আনন্দ উদযাপনের চিত্রও তাদের পেইজে তুলে ধরেছেন। পৃথিবীর বৃহৎ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারও তারা ঘুরে এসেছেন। 

আরিফুল ইসলাম লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার রাজিবপুর এলাকার সমসের উদ্দিন খলিফা বাড়ি মৃত তাজুল ইসলামের ছেলে ও সিনথিয়া ফ্রান্সের লারোসাল শহরের পচিচ জুবের মেয়ে।

রাসেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের কাছে বিদেশকে এবং বিদেশের মাটিতে বসে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করার উদ্দেশ্য নিয়ে ২০২৪ সালে রাসেল এন্ড সিনথিয়া নামে ফেসবুক পেইজ খোলা হয়। এর আরেকটি উদ্দেশ্য রয়েছে সেটি হলো মানুষের সঙ্গে পরিচিত ও যোগাযোগ বৃদ্ধি করা। বর্তমানে পেইজে প্রায় ২.১ মিলিয়ন ফলোয়ার রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ বাংলাদেশি আর ৬০ শতাংশ বিদেশ থেকে। এরাবিয়ান দেশ থেকে আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি ফলো করে। একটা মানুষ যে পারফেক্ট হবে তা না, আমাদেরও ভুল থাকতে পারে। তারপরও যে বাংলাদেশের মানুষ যে আমাদেরকে এতটুকু ভালোবাসে এবং ভালোবাসা দেবে এটা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। 

জানা গেছে, ২০১১ সালে রাসেল উচ্চ শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড যান। সেখান থেকে ২০১৩ সালে তিনি ফ্রান্সে চলে যান সেই উচ্চ শিক্ষার জন্য। সেখানেই সিনথিয়ার সঙ্গে রাসেলর পড়ালেখা এবং পরিচয়। 

এদিকে ইংরেজি জানলেও ফ্রান্সের মানুষ ফরাসি ভাষায় কথা বলেন। এতে সম্পর্কে মাঝখানে ভাষা জটিলতায় পড়েছেন রাসেল। সিনথিয়ার সঙ্গে কথা বলতে হলে তাকে সহযোগিতা নিতে হতো গুগল ট্রান্সলেটের। এভাবেই ১ বছর যায় তার ভাষা জটিলতা থেকে বের হতে। একপর্যায়ে সিনথিয়ারও বাংলা ভাষা শেখার জন্য আগ্রহ জাগে। তবে মনের মিলন থেকে তাদের ভাব হয়ে যায়। 

রাসেল জানান, সিনথিয়ার এক বান্ধবীকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে যান তিনি। কিন্তু ঘটনাস্থলে সিনথিয়ার হাসিতে ফেঁসে গেলেন তিনি। মনে মনে ভাবেন যদি সিনথিয়া তার জীবনে আসে, তাহলে সবচেয়ে ভালো হবে। আল্লাহর নিয়তি, শেষে প্রেমের সম্পর্ক থেকে দুইজন এখন স্বামী-স্ত্রী। 

বিয়ের বিষয়ে প্রথমে সিনথিয়ার বাবা রাজি হননি। তখন তার বয়স ছিল ১৮ বছর। বিদেশে ১৮ বছরের মেয়েদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা রয়েছে। এতে পরে তার বাবাকে অনুরোধ করে সে বাংলাদেশে আসে। ২০১৭ সালে লক্ষ্মীপুর ইসলাম ধর্ম গ্রহণের মাধ্যমে তার নাম অম থেকে সিনথিয়া ইসলাম রাখা হয়। পরে ইসলামিক রীতিনীতি অনুযায়ী রাসেল ও সিনথিয়ার বিয়ে হয়। এনিয়ে সিনথিয়া ৫বার শ্বশুর বাড়ি লক্ষ্মীপুরে এসেছেন। 

সাংসারিক জীবনে বিশ্বাস ও ভালোবাসার মাধ্যমে যেকোনো পরিস্থিতি মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা সিনথিয়ার অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন রাসেল। তারা সুখে আছেন। বিদেশি অন্যান্য মেয়েদের চেয়ে সিনথিয়ার মন-মানসিকতাও অনেক ভালো।

রাসেলের দাবি, সিনথিয়ায় সংসারকে সুখী রাখছে। এতে নিজের অবদান কম বলে জানালেন রাসেল। বাচ্চা হওয়ার আগে সিনথিয়া চাকরি করতো। এরপর তাকে উৎসাহ দিলেও বাংলাদেশের মায়েদের মতো সেও দায়িত্ববান হয়ে উঠে। এখন সে চাকরি করে না। রাসেলের আয়-উপার্জনেই এখন সুখী পরিবার তাদের। 

রাসেল বলেন, আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশ। দেশেতে আসতে হবেই। আমার বাচ্চাদের মায়ের দেশ হচ্ছে ফ্রান্স। সেটা ভোলা যাবে না। বাচ্চারা বাংলাদেশী এবং ফরাসিও। দুটিই আমি মানতে চেষ্টা করি। আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে পরবর্তীতে যদি কোন ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারি তাহলে আমি ৬ মাস বাংলাদেশে এবং ৬ মাস ফ্রান্সে থাকবো। বাচ্চাদেরকে আমাদের দেশের সংস্কৃতি শেখানো যাবে। সঙ্গে তারা যেন তাদের মায়ের দেশের কথাও যেন না ভুলে। 

কন্টেন্ট ক্রিয়েট নিয়ে তিনি বলেন, মানুষের ভালোবাসা পেতে হলে সেক্রিফাইস করতেই হবে। কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের সবকিছু আমিই করি। মাঝে মাঝে সিনথিয়া কিছু আইডিয়া দেয়। তার চালচলন কথাবার্তা মানুষ বেশি ভালোবাসে। যেহেতু এটি আমরা শুরু করেছি শেষ আমাদেরই করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অনেকেই প্রশ্ন করেন আপনার বাড়িতো লক্ষ্মীপুর, আপনি নোয়াখালীকে রিপ্রেজেন্ট করেন কেন? আসলে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী আমরা একই মায়ের সন্তান। লক্ষ্মীপুরের কথা বললে নোয়াখালীর বিষয়টি আগে আসে। নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা সারাদেশেই খুব পরিচিত। বিদেশেও অনেক মানুষ নোয়াখালীর ভাষায় কথা বলে। সেজন্য আমরা চেষ্টা করি আঞ্চলিক ভাষায় দেশের মানুষের কথাগুলো ফুটিয়ে তোলার জন্য। 

সিনথিয়ার পরিবার নিয়ে রাসেল বলেন, সিনথিয়ার ছোট বেলায় তার বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়ে যায়। যার কারণে সে মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সেই ভালোবাসা সে আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়ার আশা করে এবং পাচ্ছে, আলহামদুলিল্লাহ। সেজন্য সে বারবার বাংলাদেশে ফিরে আসার জন্য চেষ্টা করছে। 

ফরাসি ভাষায় সিনথিয়া বলেন, বাংলাদেশে পরিবারের বন্ধন, একে অপরের প্রতি ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে। এমন সম্পর্ক আসলে বিদেশে দেখা যায় না। এদেশের সামাজিকতাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।

বাংলা ভাষায় কথা বলতে বললে তিনি বলেন, ‘আমার দেশ বাংলাদেশ’। আসলে তিনি মেনে নিয়েছেন যে বাংলাদেশ শুধু তার স্বামীর দেশ নয়, তারও দেশ। শাশুড়ির হাতে বানানো পিঠা তার পছন্দের খাবার। নিরহংকারী সিনথিয়া সবার সঙ্গে সহজে মিশতে পারেন। 

রাসেল বলেন, আমার মেয়ের নাম আমেনা ইসলাম (৬)। এ নামটি তার মায়ের দেওয়া। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর মায়ের নামে আমাদের মেয়ের নাম রাখা হয়েছে। আর আমার ছেলে নাম হচ্ছে আলিফ ইসলাম (৪)। ছেলেটা বাংলা একটু কম পারে। ভাষা শেখানো নিয়ে এটা আমার ব্যর্থতা। আমি এখনো আমার স্ত্রীকে বাংলা ভাষা শিখাতে পারিনি। বাচ্চারা যেটা শিখে সেটা বেশিরভাগই মায়ের কাছ থেকে শেখে। আমিতো কাজের কারণে বেশিরভাগ সময়ই বাহিরে থাকি, এজন্য তাদের ভাষা শেখাতে পারিনি। রক্তের টানে নাড়ির টানে তাদের বাংলা শিখতে হবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম