Logo
Logo
×

সারাদেশ

ঢালচরে বাস্তুচ্যুত মানুষ খাসজমিতে অধিকার চান

Icon

শিপুফরাজী, চরফ্যাশন

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৫২ পিএম

ঢালচরে বাস্তুচ্যুত মানুষ খাসজমিতে অধিকার চান

চরফ্যাশনের সর্বদক্ষিণের জনপদ ঢালচর নদী ভাঙনে ছোট হয়ে এলেও এর পশ্চিম ও দক্ষিণে পড়ে আছে প্রায় দুই হাজার একর পতিত খাসজমি। বলতে গেলে ভাঙনের বিপরীতে বিপুল সম্ভাবনার হাতছানি। 

দ্বীপের মানুষ এই জমিতে অধিকার চান। গড়তে চান বসতি, আবার গড়ে তুলতে চান সাজানো গোছানো বাড়ি; কিন্তু আইনগত জটিলতা তাদের সে দাবি পূরণে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র বলছে, চরের পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম এবং দক্ষিণ দিকে বিপুল পরিমাণ খাসজমি পড়ে আছে। যার পরিমাণ হবে প্রায় দুই হাজার একর। সেখানে কোনো গাছপালা নেই। কিছু এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ছড়ানো ছিটানো কিছু গাছ রয়েছে। ৪০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই চরের জমি বেশ উর্বর। 

এখানে চাষাবাদ হতে পারে। বসতি গড়তে পারে নদীভাঙনে নিঃস্ব চরের অন্তত ১২-১৩শ পরিবার।  ঢালচরের পশ্চিমে আনন্দবাজার লাগোয়া বনে এখন আর গাছপালা নেই বললেই চলে। প্রকৃতি যেন সবুজ ঘাসের গালিচা বিছিয়ে রেখেছে এই চরে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে গরু-মহিষের বিচরণ চোখে পড়লো। কিন্তু এই চরে গাছপালার সংখ্যা একেবারেই কম। গাছ মরে যাচ্ছে, চুরি হয়ে যাচ্ছে। বনের পাশে চরের সরু খাল। খালের ওপারে আবারও বৃহৎ বনাঞ্চল। কিন্তু এই বনের গা ঘেঁষে আরও রয়েছে বিশাল খাস জমি; যেখানে কোন গাছপালা নেই।

চরের বালু দেখে বোঝা যায়, এখানে সমুদ্র বা নদী থেকে পানি ওঠে না। বালু শুকিয়ে গেছে। ওপরে জন্মেছে সবুজ ঘাস। ছড়ানো ছিটানো কিছু কুল গাছ দেখা যায় এই চরে। হয়তো সমুদ্রের পানিতে ভেসে আসা বীজ থেকে এই গাছের জন্ম হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমের এই চরের পাশে বন বিভাগের একটি বড় এলাকা রয়েছে। বনের ভেতরের খালে এখন আর জোয়ারের পানি প্রবেশ না করায় সেখানে কেওড়া গাছের শ্বাসমূল মরে যাচ্ছে। 

পতিত খাসজমিতে নিঃস্ব মানুষের পুনর্বাসন বিষয়ে কথা হয় কাঞ্চন মুন্সি নামের চরের এক বাসিন্দার সাথে। কাঞ্চন মুন্সি, চরফ্যাশন উপজেলার বিচ্ছিন্ন সাগর মোহনার ঢালচর ইউনিয়নের ভদ্রপাড়া এলাকার মেঘনা নদীর তীরে বসবাস করেন। বাঁশের কঞ্চি ও ত্রিপাল দিয়ে ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করে স্ত্রী, তিন সন্তান ও এক ছেলে বউ ও নাতি নিয়ে বসবাস করছেন।

সে আগে তার ভালো বসতঘর, ফসলি জমি ছিল; কিন্তু মেঘনা নদী তার বসতভিটা, ফসলি জমি নিয়ে গেছে। এ পর্যন্ত ৪ বার ভাঙনের শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়েছেন তিনি। গত ১০ দিন আগে তিনি মেঘনা নদীর পাশে সন্তানদের নিয়ে ওই আশ্রয়টি নির্মাণ করে বসবাস করছেন। নদীভাঙনের কারণে দেনায় জর্জড়িত তিনি। বর্তমানের দুই সন্তান নিয়ে সাগর মোহনার মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করে কোনোরকম খেয়ে বেঁচে আছেন।

তিনি আরও জানান, জমিজমা টাকা-পয়সাও নাই। তাই বাধ্য হয় বনের বাঁশ কাইটা ও ত্রিপাল দিয়া কোনোরকম তাঁবুর মতো ঘর নির্মাণ করাই থাকতেছি। প্রচন্ড শীতে মাটিতে ঘুমাতে হয়। এহন যেখানে থাকতেছি এইডা আবার পরের জমি। উডাই দিলে কই যামু জানি না। সরকার যদি আমারে একটু জমি দিত তাইলে ধার-দেনা ও ঋণ নিয়া ঘর উঠাইয়া থাকতে পারতাম।

তার স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, নদী আমাগো জমি, ঘর সব নেওয়ার পর থেকে কয়েকবার ঋণ কইরা আমার স্বামী অন্যের জমিতে ঘর তুলছিল। তাও আবার নদী নিয়ে গেছে। এখন তো আমরা নিঃস্ব।    

কাঞ্চন মুন্সির ছেলের বউ শিরিনা বেগম বলেন, বাবা-মা শ্বশুরের জমি-জমা ও সুন্দর ঘর দেইখা বিয়ে দিছে। এখন তো সব নদীতে লইয়া গেছে। আমরা এহন নদীর পারে ত্রিপালের তাঁবুর মতো ঘরে থাকি। শীতের মধ্যে মাটিতে ঘুমাই। ছোট একটা অবুঝ শিশু নিয়ে ঘুমাইতে হয়। সবাই এক সঙ্গে থাকি।

অন্যদিকে সব হারিয়ে ঢালচর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিনগর এলাকার বন বিভাগের বাগানে ঝুঁকি নিয়ে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন জেলে মো. হুমায়ুন কবির। 

তিনি জানান, এ পর্যন্ত মেঘনা নদীর ৮-১০ বার ভাঙনের কবলে পড়েছেন। বাবা-দাদার জমি, বসতঘর ও নিজের জমানো টাকা সবই হারিয়েছেন মেঘনা নদীর ভাঙনের কারণে। তাই জমি কেনার টাকা না থাকায় বন বিভাগের বাগানের এক ফাঁকে টিন, বাঁশ ও ত্রিপালের বেড়া দিয়ে ঝুঁপড়ি ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। শীতে কষ্ট পাচ্ছেন। বৃষ্টি ও ঝড়ের সময় ঘরে পানি ঢুকে সব ভিজে যায়। 

তিনি আরও জানান, বন বিভাগের বাগানে বসবাস করায় রাতের বেলায় সাপ, বন্যপ্রাণীর আতঙ্কে থাকতে হয়। এছাড়া বন বিভাগ প্রতিদিনই তাদের এখান থেকে উঠে যেতে বলে। ঢালচর ইউনিয়নের সরকারি খাসজমি আছে কিন্তু আজ পর্যন্ত কাউকে বন্দোবস্ত দেয়নি। যার কারণে জমিগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। অথচ আমরা গরিবরা জমির অভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি। তাই সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন সরকারি জমি আমাদের বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য।

ঢালচর ইউনিয়নের বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার মানুষের বসবাস। এর মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই ভূমিহীন। আমরা বর্তমান সরকারের কাছে অনুরোধ করছি ঢালচরের ভূমিহীন মানুষের মানবেতর জীবন থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য।

চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কমর্কতা লোকসান হোসেন জানান, ঢালচরের ভূমিহীন মানুষ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী খাসজমি পাওয়ার জন্য আবেদন করলে তা যাচাই-বাছাই করা হবে। যাচাই-বাছাইতে যারা খাসজমি পাওয়ার যোগ্য হবে আমরা তাদের মাঝে খাসজমি বন্দোবস্ত দেব।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম